শিক্ষা ও সংস্কৃতি অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। শিক্ষা সারা বিশ্বে আবশ্যক বলে জায়গা করে নিয়েছে কিন্তু সংস্কৃতি কোথাও কোথাও পারেনি। এই না পারার একটি বিশেষ কারণও রয়েছে। কারণটি সামাজিক রক্ষণশীলতা। বিশেষ করে মুসলমান সমাজে। যদিও মুসলমানি যুগেই সংগীত প্রাণ প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল। সুলতান আলাউদ্দীন খিলজি নিরক্ষর হলেও বিদ্যোত্সাহী ও শিক্ষানুরাগী ছিলেন। তাঁর রাজত্বকাল ছিল ১২৯৫-১৩১৬ খ্রি.। প্রখ্যাত সংগীতবিদ আমীর খসরু প্রতি রাতে তাঁকে একটি নতুন গজল শোনাতেন, সেই থেকেই মুসলমানদের সংগীতপ্রীতি শুরু। পরবর্তীতে ১৫৫৬ খ্রি. থেকে সম্রাট আকবরের পৃষ্ঠপোষকতায় নবরত্ন সমাবেশের মাধ্যমে সংগীত আরো মুখরিত হয়ে ওঠে। এরই ধারাবাহিকতা চলতে থাকে এ উপমহাদেশে।
কিন্তু মুসলমান নারী সমাজে সংগীত প্রতিষ্ঠা লাভ করেনি, তা এসেছে আরো অনেক পরে। আজ যাকে স্মরণ করে এই লেখা, তিনি এ উপমহাদেশের প্রখ্যাত শিল্পী ‘ফিরোজা বেগম’। তাঁকে নিয়ে লিখতে বসলে ‘সেই সময়’কে উপেক্ষা করা যাবে না। তাঁর জন্ম ১৯৩০ সালে, রক্ষণশীলতার চার দেয়াল অতিক্রম করে তিনি সুরের সম্রাজ্ঞীরূপে আবির্ভূত হয়েছিলেন। চল্লিশের দশকে যে ক’জন মহিলা শিল্পী সাংস্কৃতিক জগতে আলোড়ন তৈরি করেছিলেন এই বাংলায়, তাদের মধ্যে ফিরোজা বেগম অন্যতম এবং উল্লেখযোগ্য। আরো যাঁরা ছিলেন তাঁদের মধ্যে লায়লা আর্জুমান বানু, হুসনা বানু, আঞ্জুমান আঞ্জুমান আরা বেগম, হাসিনা মমতাজ, ফেরদৌসি রহমান প্রমুখ।
তবে ফিরোজা বেগম— এই নামটি একটু আলাদা করেই বিবেচনায় আনতে বাধ্য হই। কারণ তিনি দুই বাংলা অর্থাৎ পশ্চিমবঙ্গ এবং বাংলাদেশ এ দুটি ভূখণ্ডেই সমানভাবে সমাদ্রিত ছিলেন। এটির একটি কারণ ছিল প্রখ্যাত সুরকার, সংগীত পরিচালক এবং সংগীতশিল্পী কমলদাস গুপ্তের সাহচর্য।
কাজী নজরুলের গানের সুরকার হিসেবে তিনি ছিলেন প্রথম শ্রেণীর। ১৯৫০ থেকে ১৯৭০ —এ সময়ে যেসব কালজয়ী শিল্পী ছিলেন, তাদের মধ্যে আঙ্গুর বালা, ইনু বালা, যূথিকা রায়, গীতা দত্ত উল্লেখযোগ্য। শিল্পী ফিরোজা বেগমকে সেই সব শিল্পীর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে টিকে থাকতে হয়েছিল, এ কিন্তু সহজ কথা নয়।
পঞ্চাশের দশকে তাঁর সংগীতজীবনের যাত্রা শুরু। তিনি চলচ্চিত্রে কিছু নাম করেছিলেন বটে, কিন্তু চলচ্চিত্রের গান তাঁকে টানেনি। নজরুল সংগীতই তাঁকে বেশি আকৃষ্ট করেছিল। গীত গজলও করেছিলেন, তাঁর সহধর্মী কমলদাস গুপ্তের আধুনিক গানও করেছিলেন, কিন্তু নজরুলের গানের রেকর্ড সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। তাঁর আত্মাজুড়ে ছিল নজরুলসংগীত। ধ্যানে-জ্ঞানে নজরুলের বাণী ও সুর এমন বাঁধন সৃষ্টি করেছিল যে, তিনি কাজী নজরুলের ‘মানসকন্যা’ রূপ ধারণ করেছিলেন।
যুগে যুগে মহাকবিরা পৃথিবীতে আসেন, সৃষ্টি করে যান সব অসাধারণ কাব্যগাথা। কিন্তু গীতিকবিদের আরো একটি ধাপ বাড়তি কাজ করতে হয়; কবিতাটি সুষ্ঠুভাবে গীত হলো কিনা, সে ভাবনাও তাড়িত করে কবিকে। কাজী নজরুল তাই একাধারে সংগীতশিল্পী, কবি, গীতিকবি, কম্পোজার এবং সংগীত পরিচালক। সুতরাং তাঁর রচিত গান গাওয়ার ক্ষমতা ও সাহস যাঁদের ছিল, তাঁদের একেবারেই নিবেদিত সাধক বলা যায়। ফিরোজা বেগম ছিলেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম।
কিশোরী বয়স থেকে পারিবারিকভাবে সংগীতকে চর্চার বিধিবিধান করা ছিল। ফলে পারিবারিক সহযোগিতা তাঁকে এগিয়ে চলতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। অবশ্য সে যুগের মুসলিম সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়ে হয়ে নিজের ঐকান্তিক আগ্রহ ও চেষ্টা, তাকে নজরুলসম্রাজ্ঞী করেছে এ কথা অনস্বীকার্য।
পারিবারিক সূত্রে তাঁর ভাই আসাফউদ্দৌলা বলেছিলেন, ‘ফিরোজা বেগম অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে প্রতিদিন সারগাম চর্চা করে গলা সাধতেন, কোনো কারণই তাতে ব্যত্যয় ঘটাত না।’
সংগীতের প্রচার এবং প্রসারের তখন উল্লেখযোগ্য প্রচার মাধ্যম আকাশবাণী এবং গ্রামোফোন কোম্পানির রেকর্ড। একেকটি রেকর্ড বের হতো, আর চারদিকে হৈ হৈ রৈ রৈ পড়ে যেত। কঠোর প্রতিযোগিতায় চারদিক সব বিদুষী শিল্পীর আনাগোনার মধ্যে নিজেকে টিকিয়ে রেখেছিলেন সুদৃঢ়ভাবে। তাঁর সংগীতজীবন নিয়ে পর্যালোচনা করলে আমার ক্ষুদ্র বোধশক্তি যা মূল্যায়ন করে তা হলো— ফিরোজা বেগম একজন আত্মপ্রত্যয়ী শিল্পী ছিলেন এবং নিজের সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা রাখতেন।
তাঁর কণ্ঠে কোন গান যথাযথ হবে, সেটি তিনি ভালোভাবে বুঝে তবেই তা গাইতেন বা রেকর্ড করতেন। তাঁর গলায় কারুকার্য ছিল না— এ কথা কিন্তু বলা যাবে না। তিনি ‘এসো হে সজল শ্যাম ঘন দেয়া’ গানে যে কারুকার্য দিয়েছেন তাতে স্পষ্টত বোঝা যায় তাঁর চর্চার মাত্রাকে। কিন্তু তিনি তাঁর কণ্ঠে তুলে নিয়েছিলেন নজরুলের আধুনিক প্রেমের গানগুলোকে।
উপরোক্ত বিষয়গুলো আমি অত্যন্ত সচেতনভাবে লক্ষ্য করেছি এবং আমার মধ্যে গ্রহণ করার চেষ্টা করেছি। একজন শিল্পী কখন শ্রোতাকুলকে এমনভাবে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়।
তাঁর কণ্ঠে কোন গানটি মানাবে, সে বিষয়ে তিনি অত্যন্ত সচেতন ছিলেন। যেমন— আবেগের গানের মধ্যে সর্বপ্রথম যে গানটি মনে পড়ে— ‘মনে পড়ে আজ যে কোন জনমে বিদায় সন্ধ্যা বেলা...।’ এই গানটি তাঁর কণ্ঠে এতটাই যথাযথ ছিল যে আজো তা কেউ অতিক্রম করতে পারেনি বা পারবে না বলে আমার বিশ্বাস।
আরো একটি গান ‘ওরে শুভ্রবাসনা রজনীগন্ধা বনের বিধবা মেয়ে...।’ এই গানটিও যেন তার কণ্ঠের জন্যই তৈরি। বনের বিধবা মেয়ে সেজে তিনি যখন গানটি পরিবেশন করতেন সে এক অদ্ভুত দৃশ্যকল্প তৈরি হতো, যা শত চেষ্টা করেও চোখ থেকে সরানো যেত না।
তিনি আঙ্গুর বালা যে ভঙ্গিমার গান করেছেন যেমন— চেয়ো না সুনয়না..., ছাড়িতে পরান নাহি চায়... অথবা নিশি ভোর হলো
জাগিয়া... সেই ধারার গানগুলো হয়তো সচেতনভাবেই এড়িয়ে গেছেন।
আবার চটুল গান যেমন— শুকনো পাতার নূপুর পায়ে..., চমকে চমকে ধীরে ভীরু পায়..., মোর ঘুম ঘোরে..., দূর দ্বীপবাসিনী ইত্যাদি গানে চটুল চঞ্চলা ভাবকে ফুটিয়ে তুলেছেন অত্যন্ত সুনিপুণভাবে, চঞ্চলা কিশোরীর মতো।
প্রখ্যাত সুরকার ও সংগীত পরিচালক কমলদাস গুপ্তের সাহচর্য হয়তো তাঁকে এই নিপুণতায় আরো সচেষ্ট করেছে।
মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় তিনি একজন ‘মানুষ’। এর পর স্থান পায় সে কি শিল্পী? না কবি? না কি চিত্রশিল্পী? অথবা নৃত্যশিল্পী? জগত্সংসারে টিকে থাকার জন্য একজন মানুষই তাঁর নিষ্ঠা, চর্চা, নৈতিকতা দিয়ে হয়ে ওঠে সমাজের শ্রেষ্ঠ মানুষে। প্রখ্যাত এ মানুষটিকে অত্যন্ত কাছ থেকে পেয়েছি এবং দেখেছি। তাঁর সাধনা এবং সংগীত পরিবেশনার অসাধারণ বৈশিষ্ট্য আমাদের সব শিল্পীর পথিকৃৎ। তার প্রভাবে, তাঁরই অনুকরণ ও অনুসরণে আমরা এগিয়ে চলি। বাঙালি মুসলিম এই মহীয়সী শিল্পীকে জানাই আমার প্রাণঢালা শ্রদ্ধা।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, চেয়ারপারসন, সংগীত বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়






