খুব কম সংখ্যক লেখা লিখে একটা শক্তিশালী আসন করে নিয়েছেন— এমন নজির বাংলা সাহিত্যে খুব বেশি নেই। অন্য সাহিত্যেও যে খুব বেশি কেউ আছেন তা নয়; তবে ইংরেজি সাহিত্যে ঊনবিংশ শতকে এমিলি ব্রন্টি এবং বিংশ শতকে যুক্তরাষ্ট্রের র্যাম্প এলিসনের এ ধরনের ঔপন্যাসিক যারা একটি কি দুটি উপন্যাস লিখেই তাদের সাহিত্যে পাকাপোক্ত স্থান অর্জন করেছেন। কিন্তু বাংলা সাহিত্যে সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহর পর সম্ভবত আখতারুজ্জামান ইলিয়াসই সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য লেখক, যিনি দুটো মাত্র উপন্যাস, বাইশটির মতো ছোটগল্প ও কয়েকটি প্রবন্ধ লিখে বাংলা সাহিত্যে একটি স্থায়ী মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছেন।

অবশ্য ইলিয়াস নিজে মনে করতেন না যে, তিনি খুব কম লিখেছেন। তাঁর দুটো উপন্যাস যেমন মহাকাব্যিক ব্যাপ্তিতে লেখা, তেমনি ছোটগল্পগুলোও ছোট প্রাণ, ছোট ব্যথা নিয়ে রচিত নয়। বরং গল্পগুলো খুব ঘন সন্নিবদ্ধ সমাজচিত্র, মানবিক সম্পর্ক ও প্রচ্ছন্ন অথচ জোরালো বক্তব্যে ঠাসা। হোর্হে লুইস বোর্টেস বলতেন যে, একজন লেখকের যা বলার তা প্রথম কয়েক পৃষ্ঠাতেই বলা হয়ে যায়। এজন্য তার সৃষ্টিকর্মে কলেবর বৃদ্ধির অর্থ একটা বক্তব্যের নানামাত্রিক পুনরাবৃত্তি। শিশু যেমন মাকে নামের নেশায় নানা ছলে, নানা সুরে ডাকে, তেমনি লেখার নেশায় পেয়ে বসলে লেখকও হয়তো নানা সুরে নানা ছন্দে একই কথার পুনরাবৃত্তি ঘটান। ইলিয়াসের সাহিত্যকর্ম সম্পর্কে অন্তত এ পুনরাবৃত্তির অভিযোগ করা যাবে না। তার গল্পগুলো একটা থেকে অন্যাটা এবং উপন্যাস দুটো খুব স্পষ্টভাবে স্বতন্ত্র— যদিও দুটোই রাজনৈতিক উপন্যাস। তো এসব বিচার কররে ইলিয়াস একই কথা নানাভাবে বলেন— অন্তত একথা বলা যাবে না। স্বল্পপ্রজ লেখক হিসেবে পরিচিতি থাকলেও ইলিয়াস নিজে কিন্তু মনে করতেন না যে, তিনি খুব কম লিখেছেন। তাঁর একেকটি  ছোটগল্পের রসদ নিয়ে বলে জনপ্রিয় ও বহুপ্রজ লেখকরা দু-একটি উপন্যাস লিখে ফেলতে পারতেন। আর কয়েক বছরের ব্যবধানে দীর্ঘদিনের প্রস্তুতি নিয়ে সৃষ্টি করা চিলেকোঠার সেপাই আর খোয়াবনামা তো নিঃসন্দেহে তাঁদের দু-এক ডজন উপন্যাসের জন্ম দিতে পারত। এসব কারণে অর্থাত্ এই দীর্ঘদিনের ভাবনা-চিন্তা ও পরিকল্পনার অভিজ্ঞতা, রসদ সংগ্রহের প্রস্তুতি এবং দীর্ঘ সময় ধরে লেখার যে যন্ত্রণা/আনন্দ, সেই অভিজ্ঞতা থেকেই হয়তো ইলিয়াস মনে করতেন যে, তাঁর রচনার পরিসর নেহাত সংকীর্ণ নয়।

ইলিয়াসের উপন্যাস ও ছোটগল্পের মূল শক্তিই ছিল তাঁর নিষ্ঠা ও সততা। নিজের লেখার প্রতি, পাঠকের প্রতি, সৃষ্ট চরিত্রের প্রতি এবং স্থান ও সময়ের প্রতি তিনি ছিলেন সর্বতোভাবে সত্ ও একনিষ্ঠ। নিজের কাজ সম্পর্কে যথেষ্ট আস্থাবান না হয়ে তিনি লেখা ছাপতেন না। পাঠকের নিছক মনোরঞ্জনের জন্য কিছু লেখা কিংবা একুশে বইমেলা ধরতে কিছু লেখা— না সে ধরনের লেখক ইলিয়াস ছিলেন না। তিনি এক প্রবন্ধে লিখছেনও, যে কাঠমিস্ত্রি সত্যই শিল্পী, তিনি কখনো চকচকে বাহারি কিছু তৈরি করে সন্তুষ্ট হন না, মনটা তাঁর খুঁত খুঁত করে। এমন কাজকে তিনি গ্রাহককে প্রতারণারই শামিল বলে মনে করেন। আর এই সন্তুষ্ট না হওয়ার জন্য তাকে দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করতে হয়। যাঁরা সত্যিকারের লেখক, তাঁদের উপন্যাসের প্রথম বাক্যটি লিখতেও কখনো কখনো দিনের পর দিন, এমনকি মাসের পর মাসও পেরিয়ে যায়। নাকি মার্কেসের কথায় জানতে পাই তিনি একটি উপন্যাস শুরু করতে বছরের পর বছর সময় অতিবাহিত করতেন। সার্ভেন্তেস দস্তয়ভস্কি, জয়েস, মার্কেসের একনিষ্ঠ পাঠক ইলিয়াসও তাঁদের দেখানো পথই অনুসরণ করেছেন।

উপন্যাস শুরুর প্রস্তুতিতে ইলিয়াস আরো যে একটি বিষয় অভ্যাস করতেন, তা হলো পটভূমি সম্পর্কে একটি পরিষ্কার ধারণা অর্জন। উপন্যাসের স্থান ও স্থানের ইতিহাস জানাটা তাঁর জন্য ছিল অপরিহার্য মহাকাব্যিক পরিসরে লেখা যেকোনো উপন্যাসের জন্যই এটি একটি প্রাথমিক শর্ত। ইলিয়াসের কাছে স্থানের অনুভব এবং জ্ঞান প্রায় বাতিকের পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছিল। মহাশ্বেতা দেবীকে লেখা সেই চিঠির কথা এখানে উল্লেখ করা যায়। মুক্তিযুদ্ধের ওপর না-লেখা কিংবা লেখার সময়— না উপন্যাসটির প্রস্তুতি সম্পর্কে ওই চিঠিতে ইলিয়াস বগুড়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চল বিস্তৃত জায়গাজুড়ে যুগে যুগে যে বিদ্রোহ হয়েছে, তার উল্লেখ করে লিখেছেন যে, ১৯৭১-এর স্বাধীনতা যুদ্ধের কাহিনী কেবল যদি একাত্তরে সীমিত রাখা হয়, তাহলে ওই জায়গাটিকে কি ‘ইজ্জত’ করা হবে? অর্থাত্ স্বাধীনতা সংগ্রামের কথা লিখতে কেবল স্বাধীনতার যুদ্ধই নয়, সেসঙ্গে তাকে সম্পর্কিত করতে হবে ওই অঞ্চলে এর আগে যত বিদ্রোহ প্রতিবাদ, প্রতিরোধ হয়েছিল— সবার সঙ্গে। এভাবেই কেবল ওই স্থান জনগোষ্ঠীর প্রতি যথার্থ সমান জানানো কি যথাযথ মর্যাদা দেয়া যায়। এবং তাঁর বিশ্বাস-আদর ভালোবাসাও মর্যাদা না দিয়ে স্থানকাল ও চরিত্রের উন্নত শিল্পরূপ সৃষ্টি সম্ভব নয়।

ইলিয়াসের এ ধরনের বিশ্বসের ভিত্তি ওই চিঠিতেই রয়েছে। তিনি লিখেছেন, ‘ওইসব জায়গায় অনেক ঘুরেছি। দেখেছি, কি করে একটি গল্প মিথে পরিণত হয়।’ স্বাধীনতা যুদ্ধের কথা শিল্পে রূপান্তরিত করতে গিয়ে কেন আমাদের দু’হাজার বছরের ইতিহাস জানতে হবে, তার কারণ হয়তো এই যে ইতিহাসের কাহিনী মিথে রূপান্তরিত হয়ে জাতিগত অবচেতনে ঠাঁই করে নেয়। একটি জনগোষ্ঠীর সমষ্টি অবচেতনে বা মেমোরি ব্যাংকে হয়তো জমা থাকে সুদূর অতীতের অভিজ্ঞতা; হয়তো পুরুষানুক্রমে শিরা-উপশিরায়, শোনিত ধারায় তা বাহিত হয়ে এসে সাম্প্রতিককালের মানুষের চেতন অবচেতনে মিশে থাকে এবং বিশেষ কোনো নাড়া দেয়া ঘটনায়, মুক্তিযুদ্ধের মতো কোনো বিপুল ব্যাপৃত শিকড় ধরে টান দেয়া ঘটনায় তা আবার জেগে ওঠে। তখন মানুষ সমষ্টি আবেগানুভূতিতে আপ্লুত হয় এবং একাট্টা হয়ে জাতীয় কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করে। কেবল দুর্যোগ দুর্বিপাক কিংবা সমষ্টি তোলপাড় করা ঘটনাইবা কেন, ব্যক্তির দৈনন্দিন ছোটখাটো আচরণেও যে হাজার বছরের সমষ্টি বৈশিষ্ট্য চেতনে অবচেতনে সক্রিয় থাকে না তাইবা কে বলবে? মানুষ যদি অদৃশ্য সুতায় তার পূর্বপুরুষের সঙ্গে বাঁধা থাকে, যদি পূর্বপুরুষেরই ক্রিয়াকর্মের পুনরাবৃত্তি ঘটায়, যদি দার্শনিকেরা যাকে বলেন পূর্বস্থাপিত শাসক বা প্রি-এস্টাবলিশড হার্মোনি সে রকম কিছু থেকেই থাকে, তাহলে আজকের ব্যক্তি যে তার আদি পরদাদাকে কাজেরই অনুকরণ করছে, সে কথা তো সম্ভব বলেই মনে হয়। এজন্যই একজন মহত্ ঔপন্যাসিককে তার স্থান-কাল-পাত্র পটভূমির আদ্যোপান্ত ইতিহাস জানতে হয়, সমষ্টি আচরণ, অভ্যাস, পুরাকালের আন্দোলন, প্রতিবাদ, প্রতিরোধের ইতিহাস পাঠ করতে হয়।

এসব কারণে অর্থাত্ সমষ্টি অভ্যাস আচরণের ভেতর একটা নিরবচ্ছিন্ন মিল আবিষ্কার এবং স্থানের বোধ অর্জনের জন্য ইলিয়াস তাঁর উপন্যাসের পটভূমিতে ফিরে যেতেন বারবার। সেখানকার লোকজনের সঙ্গে মিশতেন, গল্প করতেন, নোট নিতেন, জায়গায় নকশা আঁকতেন, সর্বোপরি ব্যক্তিমানুষের বাচনভঙ্গি সংলাপের আকারে লিখেও রাখতেন। এই অভ্যাস অনেক বড় ঔপন্যাসিক যেমন জেমস জয়েস, গার্সিয়া মার্কেস— এদের ছিল বলে আমরা জানি। ইলিয়াসের চিলেকোঠার সেপাই-এ যমুনার চরাঞ্চলের যে বৃত্তান্ত পাই, তা কোনো পড়াশোনালব্ধ বা কল্পনাপ্রসূত ভাবনা নয়; পিতার নির্বাচন উপলক্ষে ওইসব অঞ্চলে বেড়াতে গিয়ে তিনি চাক্ষুস অভিজ্ঞতা থেকেই সেসব পটভূমির শিল্পরূপ উপন্যাসে সৃষ্টি করেছেন। একইভাবে খোয়াবনামার পটভূমি কাত্লাহারের বিল, পোড়াদহের মেলা, মহিষাবান ইত্যাদি অঞ্চলের বৃত্তান্ত তার ওইসব জনপদে ফিরে ফিরে ভ্রমণের ফলেই সম্ভব হয়েছে। এছাড়া মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক নানা লেখা উপন্যাস রচনার প্রস্তুতি নিতে তিনি মহাস্থান, গোকূল, বৃন্দাবনপাড়া ইত্যাদি জনপদ সফর করেছেন বহুবার। ক্যান্সারে একটি পা হারিয়েও তিনি আশা ছাড়েননি। বিপুল উত্সাহে ক্রাচে ভর করে হাঁটা অভ্যাস করেন কলকাতার ফুটপাতে— উদ্দেশ্য মহাস্থানের উঁচু-নিচু প্রাচীন ভূমিতে তিনি ক্র্যাচ নিয়েই হেঁটে হেঁটে উপন্যাসের রসদ জোগাড় করবেন।

স্থানকে মর্যাদা দিতে গিয়ে ইলিয়াস এতটাই মগ্ন হয়ে স্থান আঁকেন, স্থানের প্রকৃতি, মাটি, মানুষ আর গাছপালা-পশুপাখির বিবরণ দেন যে, পড়তে পড়তে পাঠকের মনে হতে পারে যে উপন্যাসের অন্যান্য চরিত্রের মতো পটভূমিও যেন একটি চরিত্রে পরিণত হয়েছে। এবং তাদের মতো জনপদগুলোও যেন জীবন্ত হয়ে, স্বাতন্ত্র্য নিয়ে কথা বলছে। স্থানও যে নীরবে কথা বলে তা চিলেকোঠার সেপাই-এ নানা অনুষঙ্গ নিয়ে ওসমানের চিলেকোঠার ঘর, ঘরের সামনের ছাদ, সিঁড়ি, বস্তি, গ্রামের বুড়ো বট, যমুনার গভীর বন্দরের চরাঞ্চল, ডাকাত মারা চর— সব, সব যেন তাঁর জাদুকরী ভাষায় মূর্ত হয়ে একেকটি স্বতন্ত্র চরিত্র্য অর্জন করে।

ইলিয়াসের উপন্যাসে স্থানের মতো আরেকটি অনুষঙ্গ— সময় বা বলা যায় ইতিহাস— যা মূলত বিমূর্ত, তো সেই অনুষঙ্গ মূর্ত হয়ে জীবন্ত একটি চরিত্রে পরিণত হয়। তাঁর দুটো উপন্যাসই পুরোপুরি রাজনৈতিক, কারণ এদের উপজীব্য হলো আমাদের জাতীয় জীবনের দুটো গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনা অর্থাত্ ইতিহাসের দুটো খুবই উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। চিলেকোঠার সেপাই যেমন ঊনসত্তরের গণআন্দোলনকে ঘিরে গড়ে ওঠে, তেমনি খোয়াবনামা উপজীব্য করে ১৯৪৭-এর পাকিস্তান আন্দোলন বা দেশ বিভাগ। এ দুই আন্দোলনই ইলিয়াস এতটাই ব্যাপকভাবে এবং একাগ্রচিত্ত ব্যবহার করেন এবং এদের প্রভাবে মানবচরিত্রগুলোও এতটাই আলোড়িত আন্দোলিত হয় যে, তাদের ব্যক্তিগত জীবনের সুখ-দুঃখ প্রেমপ্রীতি মাঝে মাঝে স্ফুলিঙ্গের মতো উড়লেও তা রাজনীতির অমোঘ টানে অসহায়ভাবে ভেসে যায়। এবং এভাবে নানা ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে চরিত্র ও তাদের জীবনযাত্রার অমোঘ নিয়তি লিখে রাজনীতি, ইতিহাস, সর্বোপরি সময় হয়ে ওঠে এক অদৃশ্য কিন্তু মহাশক্তিধর চরিত্র।

উপন্যাসে ইলিয়াসের সবচেয়ে বড় সাফল্য মনে হয় তাঁর নির্মোহ, নিরাসক্ত নৈর্ব্যক্তিকতা অর্জন। এবং এই গুণটি তাঁকে বিশ্বমাপের লেখকদের এককাতারে প্রতিষ্ঠিত করে। স্যাঁতসেঁতে তরল কিংবা ছিঁচকাদুনে অনুভূতি ও ভাবাবেগ তাঁর লেখায় একেবারেই অনুপস্থিত। বরং এ ধরনের আবেগানুভূতি ইলিয়াস এমন কৌতূকের সঙ্গে উপস্থাপন করেন যে, তাতে কখনো সরব কখনো প্রচ্ছন্ন ঠাট্টামস্করার ভাবই ফুটে ওঠে। অবশ্য আবেগ যে তাঁর লেখায় নেই, তা নয়। আবেগ আছে। বিশেষ করে চিলেকোঠার সেপাই-এ হাড্ডি খিজিরের মৃত্যুদৃশ্য, কিংবা চেংটু খুন হবার পর আনোয়ারের জন্য চেংটুর মায়ের বানানো পিঠা নিয়ে বাসস্টপে তার বাবা নাদু পরামাণিকের বসে থাকা এবং ময়না পুঁটলির ভেতর থেকে পিঠা বের করে দেয়ার দৃশ্য, অথবা খোয়াবনামায় দাঙ্গায় টবকুণ্ঠগিরির নিহত হওয়ার দৃশ্য লেখক যথেষ্ট আবেগ সঞ্চার করেই লেখেন। কি আশ্চর্য! তাতে নেই হাল্কা আবেগের লেশমাত্র। ইলিয়াস যে সস্তা ভাবাবেগ সংযত রেখে ওইসব একেকটি অমর মুহূর্ত রচনা করেন, এ কেবল একজন বড় ও বিশ্বমানের শিল্পীর পক্ষেই সম্ভব। আর এর ফলেই ইলিয়াস অর্জন করেন এক ধরনের বিরল নিরাসক্তি, যা রক্ষাকবচ হিসাবে কাজ করে সস্তা ও ভাবাবেগে নেতিয়ে পড়ার বিরুদ্ধে। ফলে ইলিয়াসও অর্জন করেন সেই দুর্লভ নৈব্যক্তিকতা, যা কেবল এক উঁচু মাপের শিল্পীর পক্ষেই অর্জন করা সম্ভব।

এই নৈর্ব্যক্তিকতা বা নির্মোহ লাভ করতে ঔপন্যাসিক প্রধান যা করেন, তা হলো প্রচুর ডিটেইলসের ব্যবহার। প্রাসঙ্গিক ডিটেইলস ব্যবহারের মাধ্যমে একজন ঔপন্যাসিক নিজেকে আড়াল করে রাখতে পারেন এবং এই আড়াল করে রাখার মাধ্যমেই অর্জিত হয় নৈর্ব্যক্তিকতা, যা যেকোনো বড় শিল্পেরই একটি প্রাথমিক শর্ত। এ ব্যাপারে ডব্লিউ.এইচ. অডেনের একটা সনেটের কথা উল্লেখ করা যায়; যা ইলিয়াসেরও প্রিয় একটি কবিতা। ইলিয়াস নিয়মিত ডাইরি লিখতেন না, তবে ডজন দু-এক ডাইরিতে তিনি বিভিন্ন সাহিত্যকর্ম থেকে উদ্ধৃতি প্রবন্ধ ও উপন্যাসের পরিকল্পনা, এমনকি নতুন উপন্যাসের দু-এক পরিচ্ছেদ পর্যন্তও লিখেছেন। তো অডেনের দ্য নভেলিস্ট কবিতাটি সঙ্গত কারণেই তার প্রিয় ছিল এবং তিনি একাধিক ডাইরিতে ওই কবিতা লিখেও রেখেছেন। এই সনেটে অডেন ঔপন্যাসিকের চরিত্রের সম্প্রসারণ শীলতার ওপর জোর দেন। একজন ঔপন্যাসিক যেমন নিচুর কাছে নিচু এবং উত্তমের কাছে উত্তম, তেমনি সে মেশে সর্বস্তরে, আত্মস্থ করার জন্য প্রস্তুত থাকে সব রকমের অপবাদ ও গঞ্জনা এবং এভাবে দিন শেষে অর্জন করে বিরল সঞ্চরণশীলতা এবং নিরাসক্তি। একই ধরনের কথা বলেছে জেমস জয়েসও তার বিক্ষিপ্ত ভাবনাচিন্তার ধারক নোট বইয়ে। চারিত্রিক ইলাস্ট্রিসিটি বা সম্প্রসারণশীলতা ছাড়া বড় শিল্পীর পক্ষে, বিশেষ করে ঔপন্যাসিকের পক্ষে আত্মকে বিলীন করে নির্মোহ নিরাসক্তি অর্জন করা সম্ভব নয়।

এভাবে আলোচনার পর প্রায় নিশ্চিত করেই বলা যায় যে, আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের উপন্যাসে একজন বিশ্বমানের ঔপন্যাসিকের সব বৈশিষ্ট্যই বিদ্যমান। তার উপন্যাসের কালিক প্রেক্ষিত যেমন ব্যাপক, তেমনি তার ভৌগোলিক পরিপ্রেক্ষিত ও বেশ বড়। তার সৃষ্ট চরিত্রের সূক্ষ্ম মনস্তাত্ত্বিক জটিলতার শৈল্পিক প্রকাশ তার বর্ণনা ও সংলাপ ব্যবহারে পরিমিতি ও যথার্থতা এবং এভাবে জীবন্ত মানুষ, জীবন্ত মেয়ে মানুষ সৃষ্টির ক্ষমতা বাস্তবিকই তাকে বিশ্বের প্রথম সারির ঔপন্যাসিকের এককাতারে দাঁড় করায়।

 

লেখক: অধ্যাপক, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি