বয়স চল্লিশ পেরোলেই আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষ ভাবতে শুরু করে তার জীবন ভাটির দিকে। ফলে ক্যারিয়ারের উন্নয়নকেন্দ্রিক ভাবনা ক্রমেই দুর্বল হতে থাকে। এরই মধ্যে যেসব কাজে (চাকরি বা ব্যবসায়) জড়িয়ে পড়েছেন, সাধারণত সেগুলোই সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনে মনোযোগী হন। অবসরে গেলে ধর্ম-কর্মে মন দেন; নাতি-নাতনিদের সঙ্গে হেসেখেলে সময় কাটান। নতুন কোনো উদ্যোগ নেয়ার ক্ষেত্রে শারীরিক ও মানসিক নানা সীমাবদ্ধতার কথা ভেবে খুব একটা সাহস পান না। কিন্তু জীবনের প্রথম ভাগে একজন সৈনিক এবং পরবর্তীকালে খুবই সফল ব্যবসায়ী এক্ষেত্রে পুরোপুরি ব্যতিক্রম দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তিনি হলেন প্রাণ (প্রোগ্রাম ফর রুরাল অ্যাডভান্সমেন্ট ন্যাশনালি) ও আরএফএল (রংপুর ফাউন্ড্রি লিমিটেড) কোম্পানি দুটির প্রতিষ্ঠাতা মেজর জেনারেল (অব.) আমজাদ খান চৌধুরী। চাকরিজীবন শেষে একেবারে নতুন করে ভিন্নধারার কিছু (যার সঙ্গে এ পর্যন্ত অর্জিত অর্থ খোয়া যাওয়ার ঝুঁকি জড়িত) শুরু করার জন্য সত্যিকারের সংগ্রামী হতে হয়। হয়তো সে কারণেই সম্প্রতি কৃষির উন্নয়নে নিরন্তর কাজ করে যাওয়া মিডিয়া ব্যক্তিত্ব শাইখ সিরাজ তাঁর এক লেখায় বলেছেন, আমজাদ খান ছিলেন সত্যিকারের একজন ‘বিপ্লবী উদ্যোক্তা’।
শিল্প, বাণিজ্য কিংবা মার্কেটিং বিষয়ে একটা কিছু করার কথা ভাবতে গেলে নিজের অজান্তেই কল-কারখানায় উত্পাদিত শিল্পপণ্যের কথা মাথায় আসে। অথচ দেশের সিংহভাগ মানুষ যে পেশায় নিয়োজিত, আর্থসামাজিক উন্নয়নে যে খাতের রয়েছে অপরিসীম ভূমিকা— সেই কৃষির কথা আমাদের খেয়াল হয় না। কৃষিকে অবলম্বন করেও যে বহুমুখী শিল্প হতে পারে এবং তা দিয়ে বিশ্ব জয় করা সম্ভব, সেটা সবাইকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছেন স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের এ মানুষটি। উত্তরাঞ্চলের মানুষের আর্থিক ক্ষেত্রে অনগ্রসরতা বিবেচনায় নিয়ে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যকে ‘অভিশাপ’ হিসেবে চিহ্নিত করে তা নিরসনে কাজ শুরু করেন। গ্রামের মানুষের নিরাপদ খাওয়ার পানি ও কৃষিজমিতে সেচ সুবিধা নিশ্চিত করতে ৩৫ বছর আগে যে মহতী উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন তা বর্তমানে ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বময়। সেনাবাহিনীতে কাজ করার সুবাদে অর্জিত নেতৃত্ব, কর্মনিষ্ঠা, নিয়মানুবর্তিতা, শৃঙ্খলা, লক্ষ্য অর্জনের দৃঢ়প্রত্যয় প্রভৃতি মানবীয় গুণাবলি তাঁকে প্রচণ্ডভাবে সাহায্য করেছে সংগঠনটির প্রতিষ্ঠা ও উন্নয়নে। সফল ও প্রতিভাবান মানুষের নানা আঙ্গিক থেকেই মূল্যায়ন করা যায়। তবে একজন উদ্যোক্তা হিসেবে জনাব খানের ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্যগুলো আলোচনা করাই এ নিবন্ধের উদ্দেশ্য।
আমাদের দেশের বৃহদাকার অধিকাংশ শিল্পের কাঁচামাল বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। প্রতি বছর সে বাবদ বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে চলে যায়। কিন্তু ব্যবসায় ধারণার শুরু থেকেই তিনি মনোযোগী ছিলেন স্থানীয় কাঁচামাল ব্যবহার করে পণ্য উত্পাদনে। হাতের নাগালে উত্পাদিত আম, লিচু, কলা, আলু, চাল, ডাল, ময়দা বিবিধ কাঁচমালের সদ্ব্যবহার করে এত বড় ব্যবসায়ে লিপ্ত হওয়া যায়— সম্ভবত উনার আগে এভাবে কেউ ভাবেনি। তাছাড়া শুরুর দিকে কৃষি (শিল্পের সহায়ক খাত হিসেবে) এতটাই অবহেলিত ছিল যে, উল্লেখ করার মতো কোনো প্রতিযোগীও ছিল না। তাই জনাব খানের উদ্যোগের ফলে একদিকে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশ যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে, অন্যদিকে পণ্যগুলোর নানা স্তরে ভ্যালু অ্যাড করায় ভোক্তাদের জীবনমান উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে। মফস্বল অঞ্চলের অর্থনীতিকে গতিশীল করার যে সূচনা তিনি করেছেন, তা প্রত্যন্ত গ্রামের কৃষককে উত্পাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পেতে বেশ সাহায্য করেছে। পাশাপাশি তারা নতুন নতুন পণ্য উত্পাদনেও উদ্বুদ্ধ হচ্ছে। উচ্চফলনশীল জাতের ধান, আম, লিচু, কলা, মুগডাল, কালোজিরা যাদের অন্যতম।
আরেকটি খুব লক্ষণীয় বিষয় হলো, শিল্প-কারখানা স্থাপনের ক্ষেত্রে স্থান নির্বাচন। সবাই যখন রাজধানী ঢাকা কিংবা বন্দরনগরী চট্টগ্রামের দিকে ছুটছিল, তখন তিনি বেছে নিয়েছেন দেশের মফস্বল শহরগুলো। একসময়ের মন্দাকবলিত রংপুরে হয়েছে যার গোড়াপত্তন। নিজ জেলায় স্থাপন করেছেন উত্তরবঙ্গের সবচেয়ে বড় উত্পাদন কারখানা। নাটোরের মতো অর্থনৈতিকভাবে পশ্চাত্পদ অঞ্চলে বেসরকারি উদ্যোগে এত বড় বিনিয়োগ হতে পারে, তা হয়তো একসময় (বিশেষত যমুনা নদীর ওপর সেতু না থাকায় এটা ছিল রাজধানী থেকে মোটামুটি বিচ্ছিন্ন) কেউ কল্পনাও করেনি। তাছাড়া শুরুর দিকে স্থানীয় চেয়ারম্যান ও প্রভাবশালীদের সঙ্গে মতের মিল না হওয়ায় তাঁকে বেশ ঝামেলায় পড়তে হয়েছিল। হতোদ্যম না হয়ে তিনি ধীরে ধীরে সংশ্লিষ্টদের বোঝাতে সক্ষম হন যে, এ উদ্যোগটি বাস্তবায়ন হলে স্থানীয় মানুষ কর্মসংস্থানসহ নানাভাবে লাভবান হবে; পরবর্তীকালে সেটা হয়েছেও। ফলে এখন নাটোরের মানুষ প্রাণ কোম্পানির জন্য গর্ববোধ করে।
একটি দেশের অর্থনীতির টেকসই উন্নয়নের জন্য দরকার বিভিন্ন স্তরের মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা। কারণ একজন মানুষের ভালো কর্মসংস্থান পুরো পরিবারটিকেই এগিয়ে নেয়। ফলে এক হাজার মানুষের কাজের সুযোগ সৃষ্টি করা মানে এক হাজার পরিবারকে মানসম্পন্ন জীবনযাপনে সহযোগিতা করা। প্রাণ-আরএফএলের প্রকাশিত তথ্যমতে, বর্তমানে মোট ৬৪ হাজার মানুষের সরাসরি কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছে জনাব খানের ব্যবসায় উদ্যোগ। এ প্রসঙ্গে বলে রাখা ভালো, তৈরি পোশাক খাতের পর সম্ভবত অন্য কোনো শিল্প-কারখানায় এত বেশি নারী শ্রমিকের কর্মসংস্থান হয়নি। ঢাকা শহরের ওপর অযাচিত চাপ না বাড়িয়ে, নিজের বাড়িতে বসবাস করে বিপুল সংখ্যক নারীকর্মী প্রাণ কোম্পানিতে চাকরি করছে। কোম্পানির শ্রমিক বহনকারী বাসগুলো সকালে তাদের বাড়ি থেকে তুলে নেয় এবং সন্ধ্যায় নিরাপদে পৌঁছে দেয়। এ উদ্যোগ স্থানীয় পর্যায়ে নারীর আর্থিক সচ্ছলতা বৃদ্ধি ও ক্ষমতায়নে বড় ভূমিকা রাখছে। এমনিভাবে নরসিংদীতে রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির প্রক্রিয়াজাতকরণ বৃহদাকার ফ্যাক্টরি। সাম্প্রতিককালে হবিগঞ্জে গড়ে ওঠা প্রাণ ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক তো আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর অনন্য এক স্থাপনা। দেশের বাইরেও তাদের বেশকিছু স্থাপনা রয়েছে, যেগুলো সেসব দেশের চাহিদার সঙ্গে খাপ খাইয়ে পণ্য বাজারজাতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে।
ছোটবেলা দেখতাম বাড়ির আশপাশে অনেক জমি পতিত থাকত। ভালো ফসল হয় না বলে মানুষ সেগুলো ফেলে রাখত। কিন্তু প্রকৃতির আশীর্বাদপুষ্ট বাংলাদেশের ভূখণ্ডটি কৃষির জন্য যে খুবই উপযোগী, সেটা বুঝতে পেরে তিনি কৃষি-সম্পর্কিত ব্যবসায় উদ্যোগ নেন। নাটোরে প্রাণ কোম্পানির ফ্যাক্টরি স্থাপনের পর এলাকাবাসী বুঝতে পারে— পতিত জমিগুলোয় একটু যত্ন করে আম, লিচু, লেবু, বরই, তেঁতুল, চালতা ইত্যাদি গাছ লাগালে উত্পাদিত ফল-ফসল থেকে বাড়তি আয় করা সম্ভব। এমনকি খুবই স্বল্পমেয়াদের ফল যেমন— কলা, পেঁপে, পেয়ারাগাছ লাগিয়েও লাভবান হওয়া যায়। ফলে এলাকার মানুষ পতিত জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে সচেষ্ট হয়। একটি বড় উদ্যোগ ছোট অসংখ্য সৃজনশীল কাজকে উদ্বুদ্ধ করে। ফলে প্রাণ-আরএফএল কোম্পানির উদ্যোগও ক্ষুদ্র ও মাঝারি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে। নানা ধরনের পণ্যের সরবরাহকেন্দ্রিক ব্যবসায়ের পরিমাণ সংশ্লিষ্ট এলাকায় বেশ বেড়েছে। ভোক্তাপণ্যের অধিকাংশ দেশীয় কোম্পানি যখন ঝিমিয়ে পড়ছিল, ঠিক তখনি প্রাণ কোম্পানির উদ্যোগ সেই ঘাটতি পূরণে এগিয়ে আসে। বর্তমানে সেটি নিঃসন্দেহে গর্ব করার মতো জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে।
অবসরপ্রাপ্ত অন্য সেনা বা সরকারি কর্মকর্তাদের মতো তিনি অন্যের প্রতিষ্ঠানে কাজ না করে কিংবা প্রথাগতভাবে রাজনীতিতে না জড়িয়ে বেছে নিয়েছিলেন উদ্যোক্তা হওয়ার চ্যালেঞ্জিং পথ। তিন দশকের বেশি সময় নীরবে কাজ করে লক্ষাধিক মানুষের জীবনকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বদলাতে সাহায্য করে প্রমাণ করেছেন তাঁর চিন্তা সঠিক ও দূরদর্শিতাপূর্ণ ছিল। ব্যবসায় উদ্যোগের ব্যাকওয়ার্ড ও ফরোয়ার্ড লিংকেজে অসংখ্য মানুষ যুক্ত হয়ে বদলে ফেলেছেন নিজেদের জীবন; ঘটেছে বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে ব্যাপক পরিবর্তন। উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রেও মি. খান অত্যন্ত ভাগ্যবান। কারণ দেশের বহু সফল উদ্যোক্তারই সন্তানরা ঠিকমতো তাদের ‘ভিশন’কে ধারণ করতে পারেননি। ফলে কর্মজীবনে তাঁরা যে সফলতা অর্জন করেছেন কিংবা প্রতিষ্ঠানকে ঈর্ষণীয় সাফল্যের জায়গায় নিয়ে গেছেন, পরবর্তী প্রজন্ম সেটা ধরে রাখতে বা প্রত্যাশিতমাত্রায় এগিয়ে নিতে পারেনি। এক্ষেত্রে জনাব খানের ছেলে খুব দক্ষতার সঙ্গেই টেকওভার করেছেন বলে প্রতীয়মান হয়। তাঁর মেয়েও ভালোই সাপোর্ট দিয়ে যাচ্ছেন। কারণ গত বছর তিনি ইহলোক ত্যাগ করলেও ব্যবসায়ের গতি এতটুকুও কমেনি, বরং তা ক্রমাগত প্রসারিত হচ্ছে।
বিদেশী পণ্যের ক্রেতা হওয়াই নিয়তি বলে যখন আমরা ধরে নিয়েছিলাম, তখন ব্যতিক্রমী এ উদ্যোক্তা দেখিয়েছেন কীভাবে নিজের ঘর সুরক্ষিত রেখে তাদের বাজারেও প্রবেশ করা সম্ভব। একসময় দেশের উচ্চবিত্ত ও উচ্চমধ্যবিত্ত শ্রেণীর ঘরোয়া কাজে ব্যবহূত বস্তুগুলো প্রায়ই হতো বিদেশী পণ্য। ইলেকট্রনিক তো বটেই, এমনকি প্লাস্টিকের তৈরি ছোটখাটো জিনিসগুলোও আসত চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া কিংবা থাইল্যান্ড থেকে। এ খাতে প্রাণ-আরএফএলের উল্লেখযোগ্য সাফল্য এখন শুধু দেশের চাহিদাই মেটাচ্ছে না, বরং দেশের বাইরের বাজার দখলেও বেশ সফল হয়েছে। দুই শতাধিক আইটেম বেশ গৌরবের সঙ্গেই পৃথিবীর ১০৬টি দেশে রফতানি হচ্ছে। এক্ষেত্রে প্রতিবেশী দেশ ভারতের অনগ্রসর অঞ্চলগুলোয় (বিশেষত পূর্বাঞ্চলের সাতটি রাজ্যে) ব্যাপক সফলতা পেয়েছে। পাশাপাশি প্রাণের সফলতা অন্যান্য কোম্পানিকেও উদ্বুদ্ধ করেছে এ-জাতীয় পণ্য উত্পাদন ও বিপণনে। আমজাদ খানের দেখানো পথে এখন অনেকেই নিত্যনতুন উদ্যোগ নিচ্ছে এবং প্রতি বছর আমদানির পরিবর্তে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ দ্রব্যাদি রফতানি হচ্ছে। ফলে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের গতিকে ত্বরান্বিত করতে এবং বহির্বিশ্বে দেশের ইমেজ বাড়াতে জনাব খানের মতো অসংখ্য উদ্যোক্তা দরকার, যারা নীরবে বদলে দিতে পারবে মানুষের জীবন এবং ঘোঁচাতে পারবে আমাদের অনুন্নত দেশের পরিচয়।
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগ
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট






