বেগম সুফিয়া কামালের প্রয়াণের পরে দ্বিতীয় জন্মবার্ষিকীতে, যা ছিল তার নবতিতম জন্মজয়ন্তী, তাঁরই সংগঠন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের আমন্ত্রণে একটি ভাষণে বলতে চেয়েছিলাম কীভাবে এই মহীয়সী নারী দিশারির ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন আর পাশাপাশি যাদের তিনি দিশা দেখাতে চেয়েছিলেন, সেই জাতি ও দেশ কীভাবে দিশাহীনতায় বিপর্যস্ত হয়ে চলেছে। আজ বাংলাদেশের দিশাহীনতাও উত্তরোত্তর বেড়ে চলেছে, আর তাই একজন দিশারিকে সাক্ষী মেনে একটু দিশার খোঁজে ব্যাপৃত হতে পারি কিনা, সেটাই ভাবছি। আমাদের প্রেক্ষাপটজুড়ে যেন পথ রোধ করে দাঁড়িয়ে আছে নতুন এক ধারণা— জঙ্গিবাদ।
২.
মুসলমানের বাঙালি হওয়ার বিষয়টি কি তত্ত্বীয় বিভ্রান্তির চোরাবালি নাকি প্রকৃতই মৌলিক বিরোধ থেকে সৃষ্ট সংকট— সে প্রশ্ন দিনে দিনে জটিল ও ঘোরালো হয়েছে, এ থেকে মুক্তি পাইনি এখনো। যা সরলভাবে বোঝা যায় তা হলো, এ নিয়েও জাতি দিশেহারা।
বেগম সুফিয়া কামাল কিন্তু দিশা হারাননি, তাঁর জীবন বস্তুত এ প্রশ্নের জবাব। ফলে তাঁর জীবনেই দিশার সন্ধান করা যেতে পারে।
সুফিয়া কামাল জন্মেছিলেন এমন এক অভিজাত মুসলিম পরিবারে, যেটি তখন পড়তির দিকে। ক্ষয়িষ্ণু অভিজাতের জাত্যভিমান হয় সাধারণত চড়া এবং গোঁড়া। ধর্ম ও ভাষা-সংস্কৃতির একটা গণ্ডি টেনে সংকীর্ণ কৃত্রিম জগৎ তৈরি করে জনবিচ্ছিন্ন থেকে নিজেদের আভিজাত্যের জেদ বজায় রাখেন। তার মানে সুফিয়া কামালের জন্য এমনিতেই মুসলিম জাত্যভিমানের তেজটুকু বাঁচিয়ে রাখা ছিল পারিবারিকভাবেই স্বাভাবিক, তার ওপর তাঁর যৌবনের দিনগুলোয় দিনে দিনে এই জাত্যভিমানে হাওয়া দিয়ে জোরদার হচ্ছিল মুসলিম জাতীয়তার ঢেউ। গোঁড়া ইসলাম ও আশরাফ মুসলিমের জবান উর্দু ভাষা তাঁকে পাক বাংলারই যোগ্য দিশারি রূপে গড়ে তোলার কথা ছিল।
কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। তিনিও তাঁর সমসাময়িক মুসলিম সাহিত্যসেবীদের মতো যথাসময়ে পাকিস্তান চেয়েছিলেন, জিন্নাহ ও মুসলিম লীগের রাজনৈতিক ফসল পাকিস্তানকে স্বাগত জানিয়েছেন। তা সত্ত্বেও, আবারো অনেকের মতোই তাঁরও মন কেবল পাকিস্তানেই বাঁধা পড়েনি, একটি সক্রিয় সৃষ্টিশীল মন তার পরিধি বাড়িয়েছে এবং সক্রিয়তা ও গতিশীলতার সহায়ক আরো উেসর সন্ধান পেয়েছেন তিনি।
সুফিয়া কামালের যথার্থ পূর্বসূরি ছিলেন বেগম রোকেয়া— ক্ষয়িষ্ণু মুসলিম পরিবারের গোঁড়ামির গণ্ডি যেমন ভেঙেছেন, তেমনি পারিবারিক উর্দু ভাষার দাবি ছেড়ে আম মানুষের ভাষা বাংলাকে জীবনচর্চার ভাষা হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। এ দৃষ্টান্ত হয়তো সুফিয়া কামালের কাজ সহজ করে দিয়েছিল। দ্বিতীয় যে ব্যক্তি তাঁকে অনুপ্রাণিত করেছেন ও পথের দিশা দেখিয়েছেন, তিনি সৃষ্টি সুখের উল্লাসে মাতোয়ারা বাঁধনহারা শিল্পী নজরুল। নজরুলের পরে বাঙালি মুসলিম কবি-সাহিত্যিকদের আর সাহিত্য ও জীবনের ভাষা নিয়ে দ্বিধায় ভুগতে দেখা যায়নি। আর নজরুল ও রোকেয়ার পরে চিন্তাশীল সংবেদনশীল বাঙালির পক্ষে ধর্মীয় গোঁড়ামিকেও মেনে নেয়া স্বাভাবিক ছিল না।
সাহিত্যের সূত্রেই তত্কালীন মুসলিম লীগীয় ডামাডোলকে ছাপিয়ে সুফিয়া কামাল রবীন্দ্রনাথের সন্ধান পান। বস্তুত রবীন্দ্রনাথের কাব্যে যে নৈতিক, আধ্যাত্মিক ভাবলোক ফুঠে ওঠে, তাকেই আপন করে পেতে সমস্যা হয়নি সুফিয়া কামালের। শেষ জীবনে সাক্ষাত্কারে তিনি যখন রবীন্দ্রসংগীতকে ইবাদতের সঙ্গে তুলনা করেন, তখন এ যোগাযোগটা যে কত গভীর ও সার্থক হয়েছিল তা বোঝা যায়। বস্তুত তাঁর মানসের ভিত্তি তৈরিতে মূল অবদান বেগম রোকেয়ার, এগিয়ে চলার বেগ দিয়েছেন নজরুল আর পথ তৈরি হয়েছে প্রধানত রবীন্দ্রচেতনায়।
বলা দরকার, উপমহাদেশে ইসলামের মূল প্রচারক সাধক সুফি-দরবেশদের প্রদর্শিত সহিষ্ণু সমন্বয়ধর্মী উদার ইসলামের রূপটিও তাঁর জানা হয়েছিল এবং স্বাভাবিক ইসলামের যে উগ্র জঙ্গি সংকীর্ণ রূপটি তাঁর জীবনকালে রাজনীতির মাঠে দাপটে চালু ছিল, তার প্রতি আস্থা তাঁর ছিল না। তাঁর এই সহিষ্ণু মানবিক ধর্মীয় চেতনা সৃষ্টিতে নজরুল ও রবীন্দ্রনাথ স্বতন্ত্রভাবে কিন্তু বিপুলভাবে অবদান রেখেছেন এবং এই মানস তৈরি হওয়ার ফলে লালন-হাছন রাজা, পদাবলি-মঙ্গলকাব্য থেকে নিয়ে বাঙালির চিরায়ত সাহিত্যের সঙ্গে সংযোগের পথটা মুক্ত হয়ে যায়। বলা যায়, বাঙালি মনীষার হাজার বছরের যে ঐতিহ্য ও ধারা— তিনি এভাবে যুক্ত হয়ে যান তার সঙ্গে তারই সার্থক উত্তরাধিকারী রূপে।
এই বোধ যখন স্পষ্ট হয়, দৃঢ়ভাবে মনে গেঁথে যায় তখন সেই মানুষের জীবন সেই মুকুলই ফোটানোর দায় গ্রহণ করে নেয়। তিনি মানবতার কথা বলতে চেয়েছেন, দুঃখী মানুষের পাশে থাকতে চেয়েছেন।
আর পাকিস্তান যেহেতু রাষ্ট্র হিসেবে ব্যর্থ হতে থাকে, বাঙালির জন্য শোষণ-দুঃশাসনের জগদ্দল হয়ে ওঠে, তাই সংবেদনশীল মানবপ্রেমীর অঙ্গীকারের ও কর্মের ক্ষেত্রগুলো যেমন স্পষ্ট হয়ে উঠতে থাকে, তেমনি হতে থাকে ব্যাপ্ত। তাঁর মাপের এবং তাঁর মতো প্রতিষ্ঠান ও স্বীকৃতিপ্রাপ্ত ব্যক্তি সাধারণত দূরত্ব বজায় রেখে নিরপেক্ষতা রক্ষার চেষ্টা করে থাকেন। কিন্তু আমরা ষাটের দশকের গোড়া থেকে স্বাধীনতার পূর্বেই তাঁর প্রত্যক্ষ সাংগঠনিক সংযুক্তি ঘটতে দেখি দেশের বামঘেঁষা প্রগতিবাদী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে। আপওয়া-লেডিজ ক্লাব বা বেগম পত্রিকার মধ্যে সুফিয়া কামাল সীমাবদ্ধ থাকলেন না, বরং এসবের সংশ্রব ছেড়ে তাঁর নিরন্তর যোগাযোগ ঘটতে থাকল প্রগতিশীল ধারার সামাজিক-সাংস্কৃতিক উদ্যোগগুলোর সঙ্গে। তিনটি সংগঠনের কথা সহজেই বলা যায়, যেগুলোর আলঙ্কারিক হলেও সক্রিয়ভাবে প্রধান ছিলেন তিনিই— পাক সোভিয়েত মৈত্রী সমিতি, মহিলা পরিষদ এবং ছায়ানট।
প্রাকৃতিক বিপর্যয় বা রাজনৈতিক উপপ্লবের সময়ও তিনি অনেক সাময়িক উদ্যোগে নেতৃত্ব দিয়েছেন। এভাবে তিনি সুস্পষ্ট রাজনৈতিক সামাজিক একটি অঙ্গীকার প্রকাশ করতে একটুও কুণ্ঠিত হননি।
এখানে বেগম সুফিয়া কামালকে বা তাঁর জীবন ও কর্ম সূক্ষ্মভাবে বিচার করার ও বোঝার প্রশ্ন দেখা দেবে— বিশেষত বর্তমান সময়ে যখন সমাজের অসাম্প্রদায়িক বাতাবরণ ভেঙে পড়ছে। বাঙালি সমাজে অভাবিতভাবে উত্থান ঘটছে জঙ্গিবাদের। আজকের বাস্তবতায় আমরা মহীয়সী সুফিয়া কামালের অভাব বোধ করছি দারুণভাবে। এ রকম বিপর্যয়ের মধ্যেও সমাজের প্রভাবশালী অংশ নিরপেক্ষ ভূমিকা নিলে সমাজ বিপর্যয়ের সম্মুখীন হতে থাকে। রাজনৈতিক অবক্ষয়ের পাশাপাশি বর্তমান ভোগবাদী সমাজে বুদ্ধিজীবী ও শিল্পী-সাহিত্যিকদের মধ্যে আপসকামিতা দেখা দিয়েছে। অথচ আজ একাত্তরের মতো পক্ষ-বিপক্ষ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এখন নিরপেক্ষ বা নিষ্ক্রিয় থাকার উপায় নেই। সুফিয়া কামালের জীবন সেই শিক্ষাই দেয়।
সাধারণত দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে ইতিহাস কোনো জনগোষ্ঠীর সামনে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়। নতুন চিন্তা, নতুন উদ্ভাবন, জীবনের নতুন আকাঙ্ক্ষা ও প্রবণতা সনাতন প্রচলিত ধ্যান-ধারণাকে নবায়ন ও উত্তরণের ডাক দিতে থাকে। চলতে চলতে সমাজমানসে নানা নতুনের উপচার জমা হতে থাকে এবং যার ফলে নতুনে-পুরনোয় ঠোকাঠুকি লাগে। অনেক সময় ওভাবে ঠোকাঠুকি চলতে চলতেই সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। কিন্তু আবার কোনো কোনো সময় বিতর্কে-ব্যাখ্যায়ও হয় না, রীতিমতো সংঘাত-সংঘর্ষে গড়ায়। মোটকথা ইতিহাস উত্তাল সময় ও তার নায়কদের জন্য প্রেক্ষাপট তৈরি করে প্রতীক্ষায় থাকে পরিবর্তনের, নবায়নের। সুফিয়া কামাল বরাবর এই পরিবর্তন ও নবায়নের পক্ষে ছিলেন।
ইউরোপের ইতিহাসে তাকালে দেখব মন্থর সামন্ত মধ্যযুগকে বিদায় দিয়ে গতিশীল পুঁজিবাদী আধুনিক যুগকে জায়গা করে দিতে শাসককে কখনো ব্রিটেনের রাজা দ্বিতীয় জেমসের মতো আপসে পিছু হটতে হয়েছে, কখনো আবার ফ্রান্সের চতুর্দশ লুইস ও রানী আঁতোয়ানেৎ-এর মতো রক্তাক্ত পরিণতি বরণ করতে হয়েছে। ভাবুক ও উদ্ভাবক কখনো গ্যালিলিওর মতো ছদ্ম আপসে আপাত শান্তিতে সমস্যা চুকাতে পেরেছেন, কোথাওবা জেওর্দানো ব্রুনোর মতো নৃশংস আত্মাহুতি পর্যন্ত গড়িয়েছে। সামাজিক পটভূমিতে কোথাও জোয়ান অব আর্কের মতো বীভত্স হত্যার শিকার হতে হয়েছে, কোথাও গৌরবময় বিপ্লবের চুক্তিতেই গোল মিটেছে, কোথাওবা ফরাসি বিপ্লবের গিলোটিনে রক্তের আলপনা থামতেই চায়নি, কোথাও রিফরমেশনে সামলানো গেছে, কোথাও কিন্তু ইনকুইজিশনের ক্রূরতা এড়ানো যায়নি।
এসব ঘটনা কেবল দ্বিমুখী দ্বন্দ্বের ফল নয়, সমাজ বহুমুখী দ্বন্দ্বে আকীর্ণ হয়ে টগবগ করছিল আদতে নবায়ন, উত্তরণ ও রূপান্তরের জন্য। ইউরোপ অনেক ইস্যু মিটিয়েছে উত্তাল ঘটনাবহুল কয়েক শতাব্দীতে। রাজা-গির্জা ও গির্জা-রাষ্ট্র সম্পর্ক, সমষ্টির ভেতর থেকে ব্যক্তির উত্থান, অভিজাত ও সুবিধাভোগীর পাশাপাশি সাধারণ নাগরিকের প্রতিষ্ঠা, উৎপাদন ও আর্থিক ব্যবস্থায় পুঁজি ও অর্থকরী প্রতিষ্ঠানের কেন্দ্রীয় ভূমিকা, রাজা-অভিজাতদের খেয়ালখুশির স্থলে আইনের শাসন, গণতন্ত্র ইত্যাদি কত চাহিদা ও তাগিদের সুরাহা হয়েছে। ধর্ম, রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতিসহ জীবনের সব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তর্ক তুলে, এমনকি রক্তাক্ত বিপ্লবে ফেটে পড়ে, প্রয়োজনে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে তারা পুরনো তামাদি বাসি সমাজকে ছুড়ে ফেলে নতুন সমাজের জন্ম দিয়েছিল।
আমরা এর পোশাকি রূপটি নিলেও মানসটিতে ধাতস্থ হতে পারিনি, কারণ তার জন্য নিজেদের সনাতন অভ্যস্ত গতানুগতিক ধারাকে বদল ও বাতিলের যে প্রশ্ন, সজ্ঞানে তার মুখোমুখি হতে আমরা যেন অক্ষম। ফলে এ সমাজের বহিরঙ্গে নতুনের ছাপ পড়লেও পুরনো জমানার অচলায়তনের মৌরসীপাট্টা টিকে আছে অন্দরে। ছলের তার অভাব নেই— সামন্ত সংস্কৃতির সাম্প্রদায়িকতা-ধর্মান্ধতার বদ্ধ বাতাস মনোজগৎ থেকে তাড়াতে পারিনি; আইনের শাসন আছে বটে কিন্তু বারবার দেখি— ক্ষমতাধরের হাত আইনের চেয়ে অনেক দীর্ঘ এবং প্রবল; আধুনিক শিক্ষা বহুকাল প্রচলিত বটে কিন্তু অন্ধবিশ্বাসের অচলায়তনে যুক্তি-বিবেক প্রায়ই ফেঁসে যায়। এমনই আরো বলা যায়। আমাদের মনোজগতের জড়তা, ব্রীড়া ও ভীতির কতগুলো ক্ষেত্র আছে, যেগুলো সে স্পর্শকাতর জানে এবং কোনোভাবে অন্ধ আবেগ কাটিয়ে বিচার করে দেখার সাহস পায় না কিছুতে। তার সব সাহস সুকীর্তি এ ধরনের বদ্ধ ডোবায় পড়ে হাবুডুবু খায়। সিসিফাসের কিংবদন্তি এভাবে একালেও সত্য হতে থাকে।
মনীষী ক্ষিতিমোহন সেন ঠিকই বলেছেন, এসব ধর্মান্ধতা হালের ব্যাপার। ‘ধর্মের সংকীর্ণ আত্মসর্বস্ব ও আত্মসীমাবদ্ধ ভাবটা হইল বাহির হইতে হালের আমদানি। রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে দিন দিন যে তাহাকে ক্রমেই উগ্র করিয়া তোলা হইতেছে তাহাই এই দেশের চিরদিনের প্রকৃতিরুদ্ধ।’ এ কথা তিনি লিখেছেন ১৯৪৯ সালে। আজ এত বছরে দিনে দিনে একতরফা এই আমদানি চলতে থাকায় বাতাস কতটা প্রকৃতিবিরুদ্ধ হয়েছে একবার ভাবুন। নয়তো বাংলা ভূমিতে কীভাবে জঙ্গিবাদের বীজ মাথা উঁচিয়ে দাঁড়ায়, নির্বিচারে মানুষ হত্যা করে?
বহুদিনের অচলায়তন কাটিয়ে বাঙালির আধুনিক সমাজের গোড়াপত্তনে এগিয়ে আসেন রামমোহন, বিদ্যাসাগর ও তাঁদের সহযাত্রীরা, বাধা অপসারণে হাত লাগান রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল এবং আরো অনেকে। তখনই খোঁজ নিয়ে জানা গেল চিরকালের বাঙালি মানসটি শাস্ত্রাচারবিরোধী প্রেমপন্থী, আটপৌরে সহজ পথ চলার, যেমন— শ্রীচৈতন্যের দল, লালন শাহর দল, হাছন রাজার গোষ্ঠী। সুফিয়া কামাল সাধনায় সিদ্ধিলাভ করে বাঙালি; তিনি রবীন্দ্র-নজরুল হয়ে লালন অবধি সহজেই পৌঁছে গেছেন, এমনকি মুজিবের সাধনাও সহজ বুদ্ধিতেই অন্তর দিয়ে বোঝেন। তাঁর বাঙালিত্বের সাধনা সার্থক।
বাংলাদেশের বাঙালির দেশ হওয়ার সাধনা বারবার ঠেকে যাচ্ছে। সেখানে ইসলামী মৌলবাদ বাদ সাধে, সাম্প্রদায়িকতা সব উদ্যোগ ভেস্তে দেয়। আজ উগ্র বর্বর জঙ্গিবাদ পথ রোধ করে দাঁড়িয়েছে। সুফিয়া কামাল বাঙালির দেশের জন্য লড়ে গেছেন। অসাম্প্রদায়িক চিরায়ত বাঙালির আধুনিক রাষ্ট্র নির্মাণের সংগ্রামে তিনি অগ্রসেনা। কিন্তু আজ গুলশান ট্র্যাজেডির পর আমরা বুঝতে পারি— পথের বাধা সরানোর কাজে খামতি থেকে গেছে। সুফিয়া কামালের জীবন ও কর্ম এ শিক্ষাই দেয়— এই ভয়ঙ্কর ধর্মান্ধতার বিষ নামাতে হলে বাঙালির চিরায়ত মানবতার বাণীর প্রেরণায় কাজে নেমে পড়তে হবে। এজন্য কোনো উপলক্ষের প্রয়োজন নেই। গত ১ জুলাইয়ের মর্মান্তিক ভয়ঙ্কর ঘটনা জানান দিয়েছে, অনেক দেরি হয়ে গেছে। আর দেরি হলে সুফিয়া কামালের বাংলাদেশ হাতছাড়া হয়ে যাবে।
লেখক: কবি, সাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক






