বাংলাদেশের যেসব বিজ্ঞানী নিজ দেশকে খুব কাছ থেকে নিবিড় সাহচর্য দিয়েছেন, ড. কুদরত-এ-খুদা (১৯০০-১৯৭৭) তাঁদের মধ্যে প্রথম সারির। তিনি একাধারে শিক্ষাবিদ এবং বিভিন্ন বিষয়ের গবেষক। ১৯০০ সালের ১ ডিসেম্বর ড. কুদরত-এ-খুদা পশ্চিমবঙ্গের বীরভূমের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর মায়ের নাম সৈয়দা ফাসিহা খাতুন এবং বাবা খোন্দকার আব্দুল মুকিদ। বিখ্যাত এ বিজ্ঞানীর শিক্ষাজীবন শুরু হয় নিজ গ্রামের এম.ই. স্কুলে। এর পর কলকাতা মাদ্রাসায়। যদিও এর আগে তাঁকে মক্তবে পাঠানো হয়েছিল হাফেজ হিসেবে তৈরির জন্য, কিন্তু সেখানে অন্য পড়ুয়াদের সঙ্গে শিক্ষকদের প্রহারের নীতি তাঁকে ভড়কে দেয়। যাই হোক, ১৯১৮ সালে তিনি কলকাতা মাদ্রাসা থেকেই ম্যাট্রিকুলেশন সার্টিফিকেট পাস করেন। এর পর পা রাখেন কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে। ১৯২৫ সালে এ বিদ্যাপীঠ থেকে রসায়নশাস্ত্রে কৃতিত্বের সঙ্গে মাস্টার্স ডিগ্রি লাভ করে অধিকতর উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার জন্য চলে যান ইংল্যান্ড। Stainless Configuration of Multiplanmet Ring বিষয় নিয়ে গবেষণা করেন লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে। একপর্যায়ে দেশের প্রতি দায়িত্ববোধ থেকে ফিরে আসেন পূর্বপুরুষদের সংস্পর্শে। ফিরে এসে তিনি গবেষণা শুরু করেন প্রেসিডেন্সি কলেজে।

মা-বাবার সাত সন্তানের মধ্যে দ্বিতীয় কুদরত-এ-খুদা যখন পড়াশোনা শেষ করলেন, তখনকার দিনে নামি সরকারি চাকরি আজকের মতো এত দুর্লভ ছিল না। অথচ তিনি সে পথে হাঁটলেন না। কথিত আছে, তিনি তখন মনোনিবেশ করেন ধর্মচর্চায়।

ড. কুদরত-এ-খুদার সমগ্র জীবনই ছিল কৃতিত্ব আর সাফল্যে ভরপুর। ছোটবেলা থেকেই এর স্বাক্ষর রাখতে থাকেন তিনি। গ্রামের স্কুল ছেড়ে মিরজাপুর স্ট্রিটের উডবার্ন এম.ই. স্কুলে থেকেই তাঁর সাফল্য চোখে পড়ে। বাংলা ভাষায় পড়াশোনার বন্দোবস্ত না থাকায় তাঁকে যে উর্দুতে পড়তে হয়েছিল, সেখানেও তিনি কৃতিত্ব দেখান। বৃত্তি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে সাফল্যের সঙ্গে বৃত্তি লাভ করেন। এর দুই বছর পর মধ্য ইংরেজি বৃত্তি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেন তিনি। কলকাতা মাদ্রাসায় সপ্তম শ্রেণীতে থাকা অবস্থায় শিক্ষকের নিকটে বিশেষ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে বাংলা পড়তে শুরু করেন। ১৯১৮ সালে কলকাতার আলিয়া মাদ্রাসার অ্যাংলো পারসিয়ান বিভাগ থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় মেধা তালিকায় প্রথম দশের ভেতরে অবস্থান করে অর্জন করেন প্রথম বিভাগ।

পারিবারিকভাবে আর্থিক সচ্ছলতা না থাকায় তাঁকে নিজের বৃত্তির টাকায় পড়াশোনার খরচ নির্বাহ করতে হতো। তিনিই প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে রসায়নে মাস্টার্স পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়ে জয় করেন স্বর্ণপদক।

মাস্টার্স পাসের পর তিনি আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক হিসেবে যোগদানের নিয়োগপত্র হাতে পান। এ সময়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রদত্ত স্টেট স্কলারশিপ নিয়ে চলে যান লন্ডন। ১৯২৯ সালে কুদরত-এ-খুদার ডি.এস সি. ডিগ্রির গবেষণাকাজের পরীক্ষক হয়ে এসেছিলেন সেকালের প্রসিদ্ধ রসায়নবিদ এবং অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক উইলিয়াম হেনরি পার্কিন জুনিয়র।

কথিত আছে, অক্সফোর্ডের এ অধ্যাপক কুদরত-এ-খুদার গবেষণাকাজে সন্তোষ প্রকাশ করেন এবং তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার একটি অংশ সম্পন্ন করার জন্য আমন্ত্রণ জানান। কিন্তু দেশের প্রতি দায়িত্ববোধ ও আনুগত্য তাঁকে দেশের মাটিতে ফিরে আসতে উৎসাহ দেয়।

চাকরি ও দায়িত্ব পালন: ড. কুদরত-এ-খুদা ১৯৩১ সালে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে প্রভাষক হিসেবে যোগদানের মধ্য দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন এবং ১৯৩৬ সালে তিনি একই বিভাগের প্রধান হিসেবে অধিষ্ঠিত হন। এর পর অর্থাৎ ১৯৪২ থেকে ১৯৪৪ সাল পর্যন্ত তিনি কলকাতা ইসলামিয়া কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এর পর ফের প্রেসিডেন্সি কলেজে ফেরেন এবং স্বল্পসময়ের জন্য সেখানকার অধ্যক্ষ হিসেবে যোগদান করেন। একই সময়ে অর্থাৎ ১৯৪৭ সালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফেলো ও সিনেট সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ভারত ভাগ হলে তিনি পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসেন এবং ১৯৪৭ থেকে ১৯৪৯ সাল পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তান সরকারের পাবলিক ইনস্ট্রাক্টরের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৪৯ সালে পাকিস্তান সরকারের সশস্ত্র মন্ত্রণালয়ের বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টা হিসেবে নিযুক্ত হন। পরে তিনি করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, মাধ্যমিক শিক্ষাবোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। পাকিস্তান কাউন্সিল অব সায়েন্টিফিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চের আওতায় ইস্ট ল্যাবরেটরির প্রথম পরিচালক হিসেবে নিযুক্ত হন এবং ১৯৫৫ সালে তাঁর তত্ত্বাবধানে ঢাকায় একটি ল্যাবরেটরি প্রতিষ্ঠা হয় এবং এই পদ থেকে ১৯৬৬ সালে অবসরগ্রহণের পর তিনি কেন্দ্রীয় বাংলা উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন।

১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশে তাঁরই নেতৃত্বে কুদরত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশন নামে একটি শিক্ষা কমিশন গঠিত হয় এবং এ কমিটি কুদরত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশন প্রতিবেদন নামে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। আমৃত্যু তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে দায়িত্ব পালন করে গেছেন।

শিক্ষা কমিশন: ড. কুদরত-এ-খুদার নেতৃত্বে যে কমিশন গঠন করা হয়, সেটি মূলত সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য নতুন দিকনির্দেশনা নিয়ে হাজির হবে বলেই প্রত্যাশা করা হয়। কমিশন বাংলাদেশের আর্থসামাজিক এবং ঐতিহ্যগত দিক আমলে নিয়ে তিনি প্রতিবেদন প্রস্তুত করেন। নবগঠিত রাষ্ট্রের সংবিধানের একটি প্রতিফলন সেই প্রতিবেদনে লক্ষ্য করা যায়। কুদরত-এ-খুদা কমিশন বাংলাদেশের প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা পদ্ধতিকে ঢেলে সাজানোর প্রস্তাব করে। কমিশন বলে, প্রাথমিক শিক্ষা হবে প্রথম থেকে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত, মাধ্যমিকের বিন্যাস হবে নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় চার বছর মেয়াদি অনার্স এবং এক বছর মেয়াদি মাস্টার্স প্রোগ্রামের কথা বলা হয়। সিলেবাস, পাঠ্যবইসহ আনুষঙ্গিক বিষয়ের ওপর দিকনির্দেশনা দিয়ে মূলত প্রাথমিক পর্যায়ের ওপরই বেশি জোর দেয়া হয় কমিশনের প্রতিবেদনে, যদিও সেই কমিশনের সুপারিশমালা বাস্তবায়নে অনাকাঙ্ক্ষিত বিলম্ব দেখা দেয় তখন।   

পুরস্কার ও সম্মাননা: একজন খ্যাতিমান বিজ্ঞানী হিসেবে তাঁর স্বীকৃতিও মিলেছে রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে শুরু করে সমাজের বিভিন্ন স্তর থেকে। এ শিক্ষাবিদ ও লেখক পাকিস্তান আমলে তামঘা-ই-পাকিস্তান, সিরাত-ই-ইমতিয়াজ লাভ করেন। স্বাধীন বাংলাদেশেও তিনি দেশের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে অবদানের জন্য সর্বোচ্চ পুরস্কার যেমন— একুশে পদক (১৯৭৫), স্বাধীনতা পদক (১৯৮৪, মরণোত্তর) লাভ করেন এবং বিজ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করে। এছাড়া তিনি এশিয়াটিক সোসাইটির ফেলো ছিলেন।

তাঁর অবদান: তাঁর গবেষণার ক্ষেত্র ছিল মূলত অর্গানিক কেমিস্ট্রি। তিনি ভেষজ উদ্ভিদ, পাট, লবণ, কয়লা, মাটি এবং খনিজ নিয়ে বিস্তর গবেষণা করেন। বহুবিধ ঔষধি ব্যবহারের জন্য তিনি স্থানীয় উদ্ভিদ থেকে বায়োকেমিক্যাল পৃথক করেন।

 

তিনি ও তাঁর সহযোগীদের ১৮টি গবেষণা প্যাটেন্ট রয়েছে। পাটকাঠি থেকে পারটেক্সের ম্যানুফ্যাকচারিং হলো তাঁর বড় অবদানগুলোর মধ্যে অন্যতম। আখের রস ও গুড় থেকে তিনি মল্ট ভিনেগার, পাট ও পাটকাঠি থেকে কৃত্রিম রেশম এবং পাট থেকে কাগজের ম্যানুফ্যাকচারিং করেন।

বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় ড. কুদরত-এ-খুদার অভূতপূর্ব অবদানের বিভিন্ন দিক ছাড়াও এর বাইরে তাঁর আরো এক বিস্ময়কর প্রচেষ্টা বাঙালিকে অনুপ্রাণিত করে। তিনি বাংলা ভাষাবিজ্ঞান চর্চার পথিকৃৎ। বিজ্ঞানকে তিনি এ অঞ্চলের মানুষের কাছে বাংলায় মজাদার করে উপস্থাপন করেছেন। আমাদের এ প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা যে মাতৃভাষায় বিজ্ঞানের খুঁটিনাটি জানছে, সেটিও মূলত তাঁরই অবদানের কারণে ঘটেছে।

তিনি যে কেবল বাঙালিকে বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করতে উদ্বুদ্ধ করেছেন তাই নয়, বরং তিনি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক বিশাল সংখ্যক গ্রন্থও রচনা করেছেন বাংলা ভাষায়। এগুলোর মধ্যে রয়েছে— বিজ্ঞানের সরস কাহিনী, বিজ্ঞানের সূচনা, চার খণ্ডের জৈব রসায়ন, পূর্ব পাকিস্তানের শিল্প সম্ভাবনা, পরমাণুু পরিচিতি এবং বিজ্ঞানের পহেলা কথা প্রভৃতি। এছাড়া তাঁর সার্বিক দিকনির্দেশনায় বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান-বিষয়ক দুটি ম্যাগাজিন ছাপা হয়। এগুলো হলো— পুরাগামী বিজ্ঞান (১৯৬৩) এবং বিজ্ঞানের জয়যাত্রা (১৯৭২)। ধর্মবিষয়ক বিভিন্ন গ্রন্থও তিনি রচনা করেছেন। বিজ্ঞান ছাড়াও তিনি বাঙালি জাতীয়তাবাদের উন্মেষ এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে অসামান্য অবদান রেখে গেছেন।

   

লেখক: অধ্যাপক, গণিত বিভাগ

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়