জহির রায়হান যখন চলচ্চিত্র নির্মাণ করে খ্যাতি অর্জন করছেন, চারদিকে তার নামডাক, তখনো তাকে আমি দেখিনি। সে সময় আমি কেবলই স্কুলে পড়ি। যদিও ততক্ষণে জেনে গেছি, জহির রায়হান নামের একজন ভালো নির্মাতা আছেন, যিনি ভালো ছবি বানান, ভালো লেখেন। আমার সঙ্গে তার প্রথম সাক্ষাৎ ‘বেহুলা’ ছবির সুবাদেই। আমাদের দুজনার এই প্রথম দেখা হওয়া নিয়েও মজার ঘটনা আছে। বেহুলা ছবির কাজে যখন তিনি আমাদের বাড়িতে প্রথম এলেন, সেদিন আমি তাকে দেখে অবাক হয়ে গিয়েছিলাম, অনেকক্ষণ তার দিকে নির্বিকার অপলক দৃষ্টিতে চেয়েছিলাম। এই তাকিয়ে থাকার একটা কারণ ছিল, আমার একটা ধারণা ছিল, জহির রায়হান হবেন একজন বয়স্ক লোক ও খুব ম্যাচিউরড। একই সঙ্গে তিনি হবেন, ভাবগম্ভীর, ভাবুক ও গম্ভীর স্বভাবের লোক। কারণ তার এত প্রতিভা, এত গুণের কথা শুনেছি যে, তাকে দেখে এত যুবক বা চঞ্চল মনে হবে, এরকম মনেই হয়নি। আমার কল্পনার ঠিক বিপরীত অনুভূতি নিয়েই জহির রায়হানের সঙ্গে আমার পরিচয়। এর পর তাকে যতই দেখেছি, যতই তার সঙ্গে কাজ করেছি, ততই যেন তার প্রতি আমার শ্রদ্ধাবোধ ও আকর্ষণ বেড়ে যাচ্ছিল। দূর থেকে যতটুকু ভেবেছিলাম, তার চেয়েও তাকে অনেক বেশি প্রতিভাবান মনে হয়েছে। এর পর তাকে আরো জানতে চাইলাম, বুঝতে চাইলাম। এবং যতই বুঝতে ও জানতে চেষ্টা করেছি, সে জানার যেন শেষই হচ্ছিল না। মনে হচ্ছিল জহির রায়হানকে আরো জানি, আরো বুঝি।
জহির রায়হান অত্যন্ত সাহসী একজন মানুষ ছিলেন। বিশেষ করে তিনি সবসময় ঘুণে ধরা সমাজ, পোড়-খাওয়া মানুষ, মধ্যবিত্ত-নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারকেই বেশি করে বোঝার চেষ্টা করতেন। যত লেখা তিনি লিখেছেন সেগুলোর মধ্য থেকে এগুলোই বেরিয়ে এসেছে, আসবে। সোজা কথায় বললে, তিনি উচ্চবিত্তের দিকে অত আগ্রহী ছিলেন না যতটা ছিলেন মধ্যবিত্তের প্রতি। মধ্যবিত্তের জীবনকে তুলে আনার একটা গভীর ঝোঁক তার ছিল। এই শ্রেণীর জীবনযাপন, সমস্যা, জীবনধারা, এই জিনিসগুলোকে তিনি তার লেখা, ভাবনায় তুলে এনেছেন। তার নির্মিত ‘কাঁচের দেয়াল’, ‘কখনো আসেনি’ ছবিগুলো দেখুন, তাতেও ওই একই কথা।
তিনি সব ধরনের ছবি তৈরির চেষ্টা করেছেন, যখন পশ্চিম পাকিস্তানেও প্রথম রঙিন ছবি নির্মাণ হয়নি, সেখানে তিনি প্রথম এটি নির্মাণ করার সাহস করলেন এবং করে দেখালেন। আবার তিনি সাহস করে উর্দু ছবি ‘সঙ্গম’ বানিয়েছিলেন এবং এটা কিন্তু দারুণ ব্যবসায়িক সফলতা পেয়েছিল। তার পর তিনিই প্রথম সিনেমাস্কোপ ছবি তিনি নির্মাণ করেছেন। এর বাইরে তিনি ‘আনোয়ারা’, ‘জীবন থেকে নেয়া’ ও লোককাহিনীভিত্তিক ছবি নির্মাণও করেছেন।
সত্যজিৎ রায় তো রীতিমতো জহির রায়হানকে প্রচণ্ড ভালোবাসতেন। একদিন আমি তার সঙ্গে থাকা অবস্থায় সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে জহির রায়হানের কথা হয়েছিল। ওইদিন আমি দেখেছি, তাদের সে কি হূদ্যতা! মুক্তিযুদ্ধের সময় আমি ও জহির রায়হান কলকাতায় ছিলাম। তো ওই সময় আমি দেখেছি, জীবন থেকে নেয়া ছবি দেখে জহির রায়হানের পিঠে একটা আদর করে থাপ্পর দিয়েছিলেন সত্যজিৎ রায়। এবং তাকে বলেছিলেন, জহির, তোমার জন্ম কেন যে বাংলাদেশে হলো! এ কথার অর্থটা পরে বুঝতে পারি, তিনি আসলে কী বোঝাতে চেয়েছিলেন।
‘লেট দেয়ার বি লাইট’ জহির রায়হানের নিজের একটা চিন্তা। এই ছবিটা তার বানানোর কথা ছিল। সারা বিশ্ব যে হানাহানি চলছে সেটার ওপর ভিত করে এ ছবির গল্পটা এগোচ্ছিল। ছবিটার কাজ প্রায় শেষই করে ফেলেছিলেন জহির। অল্প একটু কাজ বাকি ছিল। তার পর জহির তো নিখোঁজ হলেন। ফলে অসমাপ্তই রয়ে গেল লেট দেয়ার বি লাইট। আমি ছবিটার অংশবিশেষ দেখেছি; আমি জানি, এই ছবিটা তৈরি হলে সারা বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করত। ওই সময়ে বানানো ছবিটি এই সময়ের মানুষেরা দেখলে মনে করত, এটা এখনকার কথাই বলছে। কারণ এখন সারা বিশ্বে যা কিছু হচ্ছে, সেটারই একটা প্রতিচ্ছবি ওখানে ছিল। অদূর ভবিষ্যেক জহির রায়হান আগে যে কী করে বুঝতে পারতেন, এটাই ছিল আমার কাছে বড় কৌতূহলের জায়গা। আমি খেয়াল করেছি, জীবন থেকে নেয়া, লেট দেয়ার বি লাইট ছবিতে অগ্রিম কিছু চিন্তা যোগ করতে পেরেছেন তিনি। মাঝে মাঝে নিজেকে প্রশ্ন করতাম, কীভাবে তিনি সামনের পরিস্থিতি বুঝতে পারতেন?
চলচ্চিত্র ও সংসার এই দুটোর ভারসাম্য জহির রায়হান কখনো রক্ষা করতে পারতেন না। একজন বাবা, একজন স্বামী হিসেবে খুব যে ‘ভালো’ ছিলেন তা বলব না। তিনি সবসময়ই কাজপাগল মানুষ ছিলেন। তিনি কাজ নিয়েই ব্যস্ত থাকতেন। ফলে পরিবারের কী সমস্যা বা পরিবারের কী অবস্থা, তার কাছ থেকে পরিবারের কোনো চাওয়া-পাওয়া থাকতে পারে কিনা, সেটা নিয়ে তিনি মোটেও মাথা ঘামাতেন না। সন্তানরা কীভাবে মানুষ হবে বা ভবিষ্যৎ কী হবে এসব নিয়ে কোনো ভাবনা তিনি করার সুযোগই পেতেন না এবং তিনি করতেন না। স্ত্রী হিসেবে তার এ আচরণ আমার কাছে মাঝে মধ্যে খারাপ লাগত, কষ্ট লাগত। কিন্তু আবার পরক্ষণেই ভাবতাম, আমার স্বামী তো অনেক গুণী, প্রতিভাবান ব্যক্তি। তাকে তো একটু সেক্রিফাইস করতেই হবে। তিনি তো আর সাধারণ মানুষ নন, তিনি তো একটু অন্যরকম। এরকম কথা ভেবে মনকে একটু সান্ত্বনা দিতাম। আসলেই ঘটনাটা কিন্তু তাই। তিনি তার কাজ নিয়ে অন্তত খুবই গোছালো ও ভীষণ কাজপাগল ছিলেন। ওটা নিয়েই তার যত স্বপ্ন, চিন্তা, কল্পনা— সবকিছু। পরিবারকে তিনি যে একেবারে বিচ্ছিন্ন করে রাখতেন, তাও নয়। তিনি বেশ মজা করে কথা বলতেন। খুব রোমান্টিক কথা বলতেন, আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে দেখা হলে খুব সুন্দর করে কথা বলতেন। ছোটদের সঙ্গে বেশ মজাও করতেন। এসব গুণ তার ছিল। কিন্তু থাকে না, স্ত্রীর প্রতি স্বামীর যে দেখভাল করা, ওত কিছু করার সময় তার ছিল না। আমি মনে করি, যারা গুণী ব্যক্তি তাদের স্ত্রী হওয়া একটা কঠিন কাজ। মানে স্ত্রী হিসেবে তাদের সংসার করাটা একটু কঠিনই বটে। তাদের অনেক কিছু ত্যাগ করতে হয়। জীবনে অনেক কিছু বাদ দিতে হয়। আমি যদি সাধারণ একজন মানুষকে বিয়ে করতাম, তাহলে হয়তো আমার পারিবারিক জীবনটা একটু অন্যরকম হতো। কিন্তু আমি তো জহির রায়হানকে তার গুণের কদর করেছি। তিনি রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন, আবার সাহিত্য চলচ্চিত্র নিয়ে ভেবেছেন। তার এই জগতে একটা জিনিসই খুঁজে পাওয়া যায়, সেটা হলো মানুষ, সমাজ, মানুষের জীবন।
জহির আমাকে বলত, সুচন্দা, অন্য মেয়েদের মতো তুমি নও, তুমি আসলেই একটু অন্যরকম। জহির রায়হান বিয়ে করলে তো আর মেয়ের অভাব ছিল না। আমাদের বিয়ের আগে তিনি আমাকে একটা কথাই বলেছিলেন, ‘তোমার এমন কিছু বিষয় আমার ভালো লেগেছে, এমন কিছু আমি তোমার মধ্যে দেখেছি, যেটা আমি আর কারো মাঝে খুঁজে পাইনি। সেজন্যই আমি তোমাকে জীবনসঙ্গী হিসেবে পেতে চাই।’
তার ভেতর একটা সত্যি মনোবল ছিল, তিনি পড়াশোনা করতেন। প্রণয়ের শুরু থেকে তিনি হারিয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত প্রতিদিনই আমি দেখেছি, জহির যত কাজই করুক না কেন, একটা কাজ করতে তিনি ভুলতেন না, তিনি কখনো বই না পড়ে ঘুমাতে যাননি। তিনি যাই করতেন, নিয়মিত লেখাপড়া করা, বিশ্ব সম্পর্কে খোঁজখবর রাখার চর্চাটা করতেন। তার জানার অনুসন্ধিত্সু একটা মন ছিল। অথচ এই সময়ের প্রজন্ম এখন আর এসব করার সুযোগই পায় না। তারা সময় ব্যয় করার মতো নানা জিনিস পেয়ে গেছে। যদিও এটা শুধু এ প্রজন্মের দোষ নয়। পারিপার্শ্বিক সমস্যা।
জহির রায়হানের অসংখ্য সৃষ্টির মধ্য থেকে ‘হাজার বছর ধরে’ নিয়ে সিনেমা বানাতে যাওয়ার একটাই কারণ, আমি একজন নারী। তাই প্রাকৃতিকভাবেই নারীদের সংকট, অবহেলা সবদিক থেকে বেশি অনুভব করাটাই স্বাভাবিক। নারীদের বঞ্চনার গল্প তার এই বইয়ে রয়েছে। যেটা আমাকে মুগ্ধ করেছে এবং কাজ করতে অনুপ্রাণিত করেছে। ফলে আমি হাজার বছর ধরে নির্মাণ করেছি।
ব্যক্তি ও শিল্পী দুই জায়গা থেকেই আমি জহির রায়হানকে খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ পেয়েছি। তার ভেতর আমি এমন কিছু দেখিনি, যাতে মনে হয়েছে, ব্যক্তি ও শিল্পী জহির রায়হান আলাদা। তিনি যেটা ভাবতেন, সেটা করে প্রমাণ রাখতেন।
একটা কথা প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে, জহির রায়হান তার ভাই শহীদুল্লাহ কায়সারকে খুঁজতে গিয়ে নিখোঁজ হয়েছেন। এটা পুরো ভুল কথা। জহির রায়হান শুধু তার ভাইকে খুঁজতেই যাননি, তিনি খুঁজতে গিয়েছিলেন সে সময় তার আরো যেসব মুক্তিযোদ্ধারা নিখোঁজ ছিলেন তাদেরও। তবে এটা ঠিক, তিনি প্রায় সকালেই ভাইকে খোঁজ করতে বের হতেন।
আমার সামনে থেকে জহির রায়হান যখন শেষবারের মতো চলে গেলেন এবং নিখোঁজ হলেন, তখন কখনো কখনো নিজের কাছে খারাপ লাগত, মনে হতো, আমি তো তাকে বলতে পারতাম, তুমি গেলে কেন? না গেলেও তো পারতে। শুধু ভেবেছিলাম, তোমাকে আমি হারিয়ে ফেললাম! তোমার মতো একটা মানুষ হারিয়ে গেল! আমার জীবন থেকে ও তোমার সন্তানদের কাছ থেকে হারিয়ে গেলে, দেশের মানুষের কাছ থেকেও হারিয়ে গেলে! তবে পরক্ষণেই মনে হয়েছে, জহির রায়হান যে ধরনের মানুষ, তিনি যে চিন্তাকে ধারণ করেন, তাকে এভাবে বাধা দেয়া ঠিক হবে না।
চলচ্চিত্র নিয়ে এখন আমরা যে হা-হুতাশ করছি, সেখানে জহির রায়হানের মতো নির্মাতা থাকলে এ অবস্থা বদলে যেত, চলচ্চিত্র অন্য ধারায় প্রবাহিত হতো। তিনি নিজেই বলতেন, ‘আমি এমন সব সিনেমা বানাব, যেটা বাংলাদেশের আপামর মানুষ দেখবে, সারা বিশ্বে আলোচিত হবে। আমি এমন সুন্দর সিনেমা বানাব, যেটা মানুষ কখনো ভুলতে পারবে না।’ জহির রায়হানের মতো মেধাবী মানুষ যে দেশে জন্ম নিয়েছে, সে দেশে হাজারো জহির রায়হান জন্ম নেবে, সেটা আজ হোক আর কাল হোক। জহির রায়হানরা এভাবেই বেঁচে থাকবে বাংলার বুকে।
লেখক: জহির রায়হানের স্ত্রী






