জ্ঞানচর্চাই ছিল যেন শাহ এএমএস কিবরিয়ার প্রিয় শখ। সময় পেলেই নিয়ম করে বই পড়তেন, নিজে লিখতেন। খুব অল্প সময়ের মধ্যে তিনি একজন মননশীল লেখক হয়ে উঠেছিলেন। অর্থনীতি বিষয়ে তার লেখাগুলোর ভাষা ছিল খুবই সহজ-সরল, সবার বোধগম্য কিন্তু যুক্তিতে ঠাসা। পত্রিকায় ছাপানো লেখাগুলো সংকলিত করে বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় দুটি করে মোট চারটি বই বের হয়েছে সম্ভ্রান্ত প্রকাশনা সংস্থা ইউপিএল থেকে। অর্থনীতির মতো জটিল বিষয়টিকেও তিনি এত সহজ-সরল ভঙ্গিতে প্রকাশ করতে পারতেন কীভাবে? কারণ বিষয়ের ওপর ছিল তার দক্ষতা। যিনি যে বিষয়ে ভালোভাবে জানেন, তিনি সহজ-সরল ভাষায় সে বিষয়ে লিখতে পারবেন, এটাই স্বাভাবিক। বিষয়ের ওপর যাদের গভীরতা থাকে না, তারাই নাকি জটিল করে লেখেন, দুর্বোধ্য করে লেখেন। শাহ এএমএস কিবরিয়া যে বিষয়ে লিখতেন সে বিষয়টি জানতেন বেশ ভালো করে। তাই তার লেখা পড়ে তৃপ্তি পেত সাধারণ পাঠক থেকে বিদগ্ধজন পর্যন্ত সবাই।
সক্রিয় রাজনীতিতে যোগ দিয়েছিলেন, রাজনীতি নিয়ে চিন্তাভাবনাও করতেন প্রচুর। কীভাবে রাজনীতিতে সুস্থতা ও স্বচ্ছতা আনা যায়, এটা ছিল তার ভাবনার বিষয়। কিন্তু এ সময়েও রাজনীতিবিদদের মধ্যেই তার বেশি সময় কেটেছে তেমন কিন্তু মোটেও নয়। সৃজনশীল কাজের প্রতি আকর্ষণ ছিল বলে দেশের অনেক কবি-সাহিত্যিক, সাংবাদিক-শিল্পীর সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল। শিল্পী-সাহিত্যিকদের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটাতে পারলে তিনি খুব আনন্দ পেতেন। অন্তত কয়েকজন লেখক-শিল্পীর সঙ্গে যে তার নিয়মিত যোগাযোগ ছিল এটা আমি জানি। কবি শামসুর রাহমানকে যথেষ্ট শ্রদ্ধা করতেন, তার কবিতার প্রশংসা করতেন। মৃদুভাষণের বিশেষ সংখ্যায় আর কারো কবিতা না হলেও শামসুর রাহমানের কবিতা যাতে থাকে, সেটা আমাকে বারবার মনে করিয়ে দিতেন। শামসুর রাহমান জনকণ্ঠে লিখেছেন, তিনি হূদরোগে আক্রান্ত হলে চিকিত্সার জন্য কিবরিয়া সাহেব কতটা ও কতভাবে সাহায্য করেছেন। সৈয়দ শামসুল হকও ছিলেন তার প্রিয় লেখকদের একজন। সৈয়দ শামসুল হকের একটি লেখা পড়ে মুগ্ধ হয়ে তাকে ব্যক্তিগতভাবে একটি চিঠিও পাঠিয়েছিলেন। এই দুই কবির জন্মদিনে তাদের ব্যক্তিগতভাবে শুভেচ্ছা জানাতেন। শামসুজ্জামান খানের লেখা পছন্দ করতেন, তিনি কিছুদিন মৃদুভাষণে নিয়মিত লিখেওছেন। শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী, হাশেম খানের সঙ্গেও তার সম্পর্ক আন্তরিকতাপূর্ণ ছিল বলে আমি জানি। বর্তমানে লন্ডনপ্রবাসী বিশিষ্ট কলামিস্ট আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর লেখার তিনি ছিলেন একজন মুগ্ধ পাঠক। বলতেন, তার লেখার মধ্যে একটা জাদুকরী প্রবাব আছে, পড়তে শুরু করলে শেষ না করে উপায় নেই। একজন লেখকের এটা এক দুর্লভ ক্ষমতা। আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর সঙ্গেও তার চমত্কার সম্পর্ক ছিল। তার কোনো কোনো লেখা পড়ে খুশি হয়ে লন্ডনে তাকে চিঠিও পাঠিয়েছেন। আর তিনি কখনো যদি লন্ডনে যেতেন তাহলে একটি সন্ধ্যা কাটত অবশ্যই আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর সঙ্গে।
ইতিহাসবিদ ও জনপ্রিয় কলাম লেখক মুনতাসীর মামুনের লেখারও তিনি ভক্ত ছিলেন। মুনতাসীর মামুনের লেখায় শব্দচয়নে যে হুল ফোটানোর প্রবণতা তা তিনি উপভোগ করতেন। তবে তিনি নিজে কখনই আক্রমণাত্মক ধরনের লেখা লিখতে চাইতেন না, আমরা প্ররোচিত করলেও। তিনি যেমন ছিলেন মৃদুভাষী, তেমন লেখার ক্ষেত্রে শব্দচয়নেও ছিলেন সংযমী ও যুক্তিবাদী। মুনতাসীর মামুনের জন্য তার মনে যে কত বড় দরদ ছিল সেটা বোঝা যায়, জোট সরকারের আমলে ময়মনসিংহে সিনেমা হলে বোমা বিস্ফোরণের পর মুনতাসীর মামুনকে গ্রেফতারের পর। তার গ্রেফতারের খবর শুনে কিবরিয়া সাহেব খুবই বিচলিত হয়েছিলেন। তিনি বলতেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক, গবেষক, অসংখ্য গ্রন্থ প্রণেতা, জনপ্রিয় কলাম লেখককে যখন নাশকতামূলক কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকার অভিযোগে গরাদে ঢোকানো হয়, জিজ্ঞাসাবাদের নামে চালানো হয় নিষ্ঠুর নির্যাতন, তখন যারা এসব করে তাদের মুখে আর গণতন্ত্রের কথা শোভা পায় না। আগের রাতে, মুনতাসীর মামুন গ্রেফতার হয়েছেন শুনে কিবরিয়া সাহেব সকালেই মৃদুভাষণ অফিসে এসেছেন, আমাকে বলেছেন মিসেস মামুনের সঙ্গে যোগাযোগ করে এ কথাটা জানাতে যে, তার এই বিপদের দিনে তিনি একা নন, মৃদুভাষণ পরিবারও তার সঙ্গে আছে। যেকোনো সমস্যার কথা যেন অসংকোচে তিনি আমাদের জানান।
লেখক-সাংবাদিক শাহরিয়ার কবির গ্রেফতার-নির্যাতনের শিকার হলেও কিবরিয়া সাহেব দুঃখ পেয়েছিলেন। আমাদের দেশটা যে সভ্যজগতের বাইরে চলে যাচ্ছে, সেটা বলেছেন। একজন লেখককে যে দেশে তার লেখালেখির জন্য জেল-জুলুমের শিকার হতে হয়, সে দেশের পরিণতি সম্পর্কে দুর্ভাবনা না হয়ে পারে না। অথচ এই দেশটিকেই এক নদী রক্ত দিয়ে আমরা স্বাধীন করেছিলাম অনেক আশা ও স্বপ্ন বুকে নিয়ে। দেশের এই উল্টোমুখী পরিবর্তন সারাক্ষণ তাকে ব্যথিত রাখত।
কারো অনুপস্থিতিতে তিনি আমাদের সামনে কারো নিন্দা করেছেন বলে মনে পড়ে না। পরচর্চা পছন্দ করতেন না। কারো সম্পর্কে তার বিশেষ রিজার্ভেশন থাকলে তার সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করতেন না, চুপচাপ থাকতেন। কারো সম্পর্কে কটূক্তি করতেন না, রূঢ় আচরণও করতেন না কারো সঙ্গে। সঙ্গত কারণেই তার সঙ্গে কেউ দুর্বিনীত আচরণ করলে ব্যথিত হতেন। অন্যদিকে অপরিচিত, তরুণ কোনো সাংবাদিক বা লেখকের কোনো প্রতিবেদন বা নিবন্ধ পড়ে যদি তার ভালো লাগত তাহলে তার প্রশংসা করতেন, মৃদুভাষণে তাকে দিয়ে লেখানো যায় কিনা, সে ব্যাপারে খোঁজখবর নিতে বলতেন। ভালো কাজের প্রশংসা করতে তার কোনো কার্পণ্য ছিল না। এটা ছিল তার এক মহৎ গুণ। মৃদুভাষণে মুহম্মদ জাফর ইকবালের লেখা নিয়মিত ছাপানোর খুব ইচ্ছে ছিল কিবরিয়া সাহেবের। জাফর ভাইকে আমি কয়েকবার তা জানিয়েওছি। কিন্তু প্রথম সংখ্যায় একটি লেখা দিলেও তিনি আর মৃদুভাষণের জন্য লেখার সময় করে উঠতে পারেননি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক ও লেখক সৈয়দ মনজুরুল ইসলামকেও তিনি মৃদুভাষণে লেখার জন্য অনুরোধ জানিয়েছিলেন। তরুণ লেখকদের মধ্যে হাসান মামুনের লেখা তার বেশ পছন্দের ছিল। মামুন শুরু থেকেই মৃদুভাষণের সঙ্গে যুক্ত। তার ভালো লাগত আনিসুল হকের রম্য রচনা। আমাকে অনেকবার তাগিদ দিয়েছেন আনিসুল হকের লেখা মৃদুভাষণে ছাপানোর জন্য। দু-একটি লেখা তিনি দিয়েছেন, ব্যস্ততার জন্য আর কনটিনিউ করেননি। তার সম্পর্কে তিনি প্রায়ই খোঁজখবর নিতেন। মোজাম্মেল হোসেন ও মওলানা হোসেন আলীর লেখা মৃদুভাষণে যখন ছাপা শুরু হয়, তখন কিবরিয়া সাহেব ছিলেন বিদেশে। তাদের লেখা তার ভালো লাগত। এ দুজনের সঙ্গে আলাপ-পরিচয় করার ইচ্ছে প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু সেটা আর সম্ভব হলো না।
দেশের প্রায় সব বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ-শিক্ষাবিদের সঙ্গে তার ব্যক্তিগত আলাপ-পরিচয় ছিল। বিভিন্ন বিষয়ে অর্থনীতিবিদ-শিক্ষাবিদদের মতামতকে তিনি বিশেষ গুরুত্ব দিতেন। গুরুত্বপূর্ণ কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে কারো না কারো সঙ্গে পরামর্শ করতেন। তার কোনো বক্তব্যের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করে কেউ যদি ভালো যুক্তি তুলে ধরতেন তাহলে তিনি তাতে খুশি হতেন। কিন্তু কোনো তথ্য-উপাত্ত ছাড়া কেউ যদি তার বক্তব্যের ঢালাও সমালোচনা করতেন তাহলে তিনি কিছুটা ক্ষুণ্ন হতেন। আমাদের সঙ্গে আলাপকালে রেহমান সোবহান, ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদের মতো প্রবীণ অর্থনীতিবিদ ছাড়াও যাদের প্রশংসা প্রায়ই করতেন তাদের মধ্যে অধ্যাপক আবদুল বায়েস, ড. আতিউর রহমান, মুস্তাফিজুর রহমান, মইনুল হোসেনের নাম এই মুহূর্তে আমার মনে পড়ছে। অধ্যাপক ড. আবুল বারকাতের স্পষ্ট ও সরাসরি মন্তব্য তিনি বেশ পছন্দ করতেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের বেশ কয়েকজন শিক্ষকও ছিলেন তার বিশেষ পছন্দের তালিকায়। এর মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা সমিতির সভাপতি ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, সাবেক উপাচার্য ড. এ. কে. আজাদ চৌধুরী, ড. হারুন-অর-রশীদসহ আরো কয়েকজনের নাম অনেক প্রসঙ্গেই উল্লেখ করতেন।
মৃদুভাষণকে একটি উন্নতমানের রাজনৈতিক সাপ্তাহিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার স্বপ্ন দেখতেন তিনি। বলতেন, আমি জীবনে কোনো ক্ষেত্রে বিফল হইনি। মৃদুভাষণ কি আমাকে শেষ জীবনে ব্যর্থ হিসেবে তালিকাভুক্ত করবে? নিজেই বলতেন, সংবাদপত্র শিল্পে যেভাবে বিপুল অঙ্কের পুঁজি বিনিয়োগ হচ্ছে সেখানে আমার সামান্য পুঁজির মৃদুভাষণ কি বেঁচে থাকবে? আবার এ-ও বলতেন, আমি হার মানার লোক নই। শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করে যাব। পত্রিকার গুণ ও মান যদি ঠিক রাখতে পারেন, তাহলে এটা অবশ্যই টিকে থাকবে। মৃদুভাষণে বিজ্ঞাপন দিয়ে সহায়তা করার জন্য বেশকিছু ব্যবসায়ী-শিল্পপতির কাছে ফোন করেছেন। কারো কারো কাছ থেকে আশানুরূপ সাড়া পাননি। কেউ কেউ চালাকি করেছেন। বিজ্ঞাপন দেয়ার কথা বলে কালক্ষয় করেছেন, শেষ পর্যন্ত বিজ্ঞাপন দেননি। এতে কিবরিয়া সাহেব বেশ দুঃখিত হয়েছেন। বলেছেন, অর্থমন্ত্রী থাকার সময় যারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা আমার সামনে বসে থেকেছেন, আনুকূল্য নিয়েছেন, নানাভাবে আমাকে সাহায্য করতে চেয়েছেন, এখন তাদেরই কেউ কেউ যেভাবে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন, সেটা ভাবতেও আমার কষ্ট হয়। নিজেকে তখন খুব ছোট মনে হয়। জীবনে আমাকে কখনো কারো কাছে কিছু চাইতে হয়নি। আমার কাছেই অনেকেই চেয়েছেন, সাধ্যমতো আমি দেয়ারও চেষ্টা করেছি। মৃদুভাষণ বের করে এখন আমাকে সামান্য একটি বিজ্ঞাপন চাইতে হয়েছে। লাভ একটা অবশ্য হচ্ছে কিছু মানুষকে নতুন করে চিনতে পারছি।
মৃদুভাষণ প্রকাশের আগে তার আশা ছিল, সারা দেশের আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকরা হয়তো নিজেদের রাজনৈতিক আগ্রহ থেকেই কাগজটি পড়বে। এই কাগজ পড়লে তারা সরকারি অপপ্রচারে যুক্তিসঙ্গত জবাব দিতে পারবে। তিনি নিজে আওয়ামী লীগের সব জেলা ও থানা কমিটির সভাপতি/সাধারণ সম্পাদকের কাছে এ ব্যাপারে আবেদন জানিয়ে চিঠি লিখেছেন। দু-একজন ছাড়া কেউ তার চিঠির জবাবও দেয়নি। বিষয়টি তাকে খুবই বিস্মিত করেছিল। অবশ্য এজন্য তিনি কখনো কাউকে দোষারোপ করেননি।
আমাদের দেশে সংবাদপত্রের ভূমিকা নিয়ে কিবরিয়া সাহেব সাধারণভাবে খুশি ছিলেন। তবে কোনো কোনো সংবাদপত্রে কখনো কোনো দায়িত্বহীন খবর বা মন্তব্য প্রকাশিত হলে অথবা অসত্য বা বিকৃত তথ্য প্রকাশ হতে দেখলে তিনি খুবই বিরক্তিবোধ করতেন। একটি বিষয় সম্পর্কে ভালোভাবে না জেনে কিছু লিখলেও তিনি অখুশি হতেন। সাংবাদিকদের নিয়মিত জ্ঞানচর্চার প্রতি জোর দিতেন। আধুনিক জগতের বিস্ময়কর সব আবিষ্কার সম্পর্কে আপডেট না থাকলে ভালো সাংবাদিক হওয়া যাবে না বলে তিনি মনে করতেন। তিনি বলতেন, আমাদের দেশের বিভেদের রাজনীতি মানুষকে এমনিতেই বিভ্রান্ত করছে, সংবাদপত্রও যদি একই ভূমিকায় নামে, তাহলে দেশে সুস্থ-স্বাভাবিক ধারা ফিরে আসবে কীভাবে? সম্পাদক হিসেবে মতিউর রহমান ও মাহফুজ আনামের প্রশংসা করতেন। ডেইলি স্টারে তিনি বেশ কিছুদিন নিয়মিত কলাম লিখেছেন। আবার মতিউর রহমানের আগ্রহ ও উত্সাহেই তিনি ভোরের কাগজে বাংলায় কলাম লেখায় অভ্যস্ত হয়ে ওঠেন। এই দুই সম্পাদকের পত্রিকা সম্পাদনায় চিন্তা ও পরিকল্পনার ছাপ থাকে বলে তিনি বলতেন। তবে মাঝে মাঝে দুঃখ করে এটাও বলতেন যে, এই দুই বিচক্ষণ সম্পাদক নিজেদের নিরপেক্ষ বলে দাবি করলেও আওয়ামী লীগের সমালোচনায় তারা যতটা আক্রমাণাত্মক, বিএনপির ব্যাপারে ততটা নন। বিএনপির ক্ষেত্রে তারা যেন কিছুটা নমনীয়। শেখ হাসিনার ছোট দোষকে তারা বড় করে দেখেন, আর খালেদা জিয়ার বড় দোষকেও না দেখার ভান করেন। কোনো কারণে আওয়ামী লীগের ব্যাপারে তাদের বিরূপতার মাত্রাটা বেশি ছিল বলে তার মনে হয়েছে। বিএনপি-জামায়াত জোটকে ক্ষমতায় আনার পেছনে তাদের ভূমিকা ছিল বলে তিনি শুনেছেন। ২০০১ সালের নির্বাচনের পর দেশজুড়ে সংখ্যালঘু নির্যাতন এবং আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের ওপর আক্রমণের ঘটনার খবরগুলো প্রকাশ করতে ডেইলি স্টার ও প্রথম আলো শুরুর দিকে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ছিল বলে তার কাছে মনে হয়েছে। পরে অবশ্য তারা এই ত্রুটি কাটিয়ে উঠে ভালো ভূমিকা নিয়েছিলেন বলে তিনি মনে করতেন। সবকিছু সত্ত্বেও পত্রিকা পড়ার ক্ষেত্রে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার ছিল তার প্রায়োরিটি। আওয়ামী লীগের নেতৃস্থানীয় অনেক এবং আওয়ামী বুদ্ধিজীবীদের কেউ কেউ প্রথম আলো বা ডেইলি স্টার পড়াটাকে প্রতিক্রিয়ার শক্তিকে সহায়তা করার শামিল বলে মনে করলেও কিবরিয়া সাহেব তা মনে করতেন না। তিনি বলতেন, যতক্ষণ আমরা নিজেরা এরকম মানসম্পন্ন পাঠকপ্রিয় পত্রিকা প্রকাশ করতে না পারি, ততক্ষণ এদের নিন্দা করার অধিকার আমাদের নেই। অন্যের ব্যাপারে ঈর্ষা প্রকাশ করে নিজেদের অক্ষমতা আড়াল করা যায় না। তিনি বলতেন, সবাই এক মতের, এক পথের মানুষ হবে কেন? যে যার মতো কাজ করুন, দেশের জন্য তার কাজ যতক্ষণ ক্ষতিকর না হয় ততক্ষণ আমি তার পক্ষে। তবে আমাদের দেশের কয়েকজন উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তির অন্ধ বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগ বিরোধিতা তাকে পীড়িত করত। বাংলাদেশের অস্তিত্বে বিশ্বাস করবেন অথচ বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগকে কারণে-অকারণে হেয় করবেন, এটা কোনো সুস্থ মানসিকতার লক্ষণ বলে তিনি মনে করতেন না। যারা পাকিস্তান ভাঙার জন্য বঙ্গবন্ধুকে দায়ী করতেন, আবার জিয়াউর রহমানকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার নেতা বলে মনে করতেন, তাদের সম্পর্কে তার মনে সবসময় ঘৃণাবোধ ছিল।
রাজনীতিতে যোগ দিলেও দেশের, এমনকি নিজ দলের মধ্যেও তিনি ছিলেন একজন ব্যতিক্রমী রাজনীতিবিদ। মিছিলের সামনে গিয়ে ছবি তোলার জন্য ঠেলাঠেলি করতেন না। মঞ্চে উঠে চেহারা দেখানোর বাতিকও তার ছিল না। তিনি নিজেকে একটু আড়ালে রাখতেই যেন পছন্দ করতেন। তিনি দলের মধ্যে নিজের কোনো ফলোয়ার গোষ্ঠী তৈরির চেষ্টা করতেন না। তার কথা ছিল, কারো আমার ব্যক্তিগত ফলোয়ার হওয়ার দরকার নেই, সবাইকে হতে হবে দলের ফলোয়ার, আদর্শের ফলোয়ার। দলের মধ্যে কোনো ধরনের গ্রুপিংয়ে তার সামান্যতম সংশ্লিষ্টতা ছিল না, এসব একেবারেই পছন্দ করতেন না। বরং এগুলোকে দলের জন্য ক্ষতিকর বলে মনে করতেন। হবিগঞ্জে আওয়ামী লীগ বা এর কোনো অঙ্গ সংগঠনের কমিটি গঠনের ব্যাপারে তিনি কোনো হস্তক্ষেপ করতেন না। তার কাছে কেউ যদি কারো বিরুদ্ধে কোনো নালিশ বা অভিযোগ জানাতে আসত, তাহলে তাকে ধমকে দিতেন। নিজেরা বিবাদ-বিসম্বাদ না করে মিলেমিশে কাজ করার পরামর্শ দিতেন সবাইকে।
তার আরো কিছু বিরল গুণের কথা উল্লেখ করা যায়। একটি লোক তাকে পছন্দ করে না, এটা জানার পরও ওই লোকটির সঙ্গে তিনি খুব সহজ-স্বাভাবিকভাবে কথা বলতেন। তিনি বলতেন, মানুষকে আহত করা, ব্যথা দেয়া খুব সহজ কাজ, ইচ্ছা করলেই এটা করা যায়; কিন্তু মানুষের মন জয় করাটা, মানুষের কাছে প্রিয় হওয়াটা অত সহজ কাজ নয়। তিনি কোনো অবস্থাতেই মিথ্যা কথা বলা বা চালাকি করা একদম পছন্দ করতেন না। কেউ কথা দিয়ে কথা না রাখতে পারলে তার সম্পর্কে ধারণা খারাপ হয়ে যেত। বিএনপির দায়িত্বশীল বা শীর্ষ নেতাদের ক্রমাগত মিথ্যা কথা শুনে তিনি খুবই বিরক্ত হতেন। বলতেন, নেতারা যদি সত্য ভাষণ না দেন, তাহলে এ জাতি কীভাবে শক্ত নৈতিক ভিতের ওপর দাঁড়াবে? বিশেষ করে সিজনড পলিটিশিয়ান বলে বিএনপিতে যারা পরিচিত, যেমন আবদুল মান্নান ভূঁইয়া, সাইফুর রহমান, শামসুল ইসলামের মতো মন্ত্রীরাও বিরোধী দলের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করা বা মিথ্যা অভিযোগ উত্থাপন করা ছাড়া বক্তৃতা করেন না দেখে কিবরিয়া সাহেব দুঃখ পেতেন। বলতেন, সবাই এভাবে সত্যভ্রষ্ট হলে ভবিষ্যৎ নিয়ে আমরা আশাবাদী হবো কীভাবে? মিথ্যার বিরুদ্ধে প্রকৃত সত্য প্রকাশে আমাদের এগিয়ে আসতেই হবে। ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ ও ব্যারিস্টার নাজমুল হুদাকে দেশের রাজনীতির অত্যন্ত বিভ্রান্তিকর দুই চরিত্র বলে মনে করতেন। এরা কথার ছলাকলায় দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে যেভাবে বিভ্রান্ত করছেন, তা তাদের মর্যাদাকেই হেয় করে বলে তিনি বলতেন।
কিবরিয়া সাহেব দুঃখ করে বলতেন, দেশের তরুণ সমাজ যে বিকৃত বা অসত্য ইতিহাস জেনে বড় হয়ে উঠেছে এটা দেশের জন্য বড় ক্ষতির কারণ হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে জিয়ার ভূমিকার মধ্যে সীমাবদ্ধ করাটাকে তিনি মহা অপরাধ বলে মনে করতেন। এ ব্যাপারে তিনি একাধিক লেখা লিখেছেন। একজন তরুণ শিক্ষার্থী চোখে দেখছে এক সত্য, কানে শুনছে আরেকটা। বাজারে চাল-ডাল-তেলসহ সব জিনিসের দাম বেশি। প্রধানমন্ত্রী বলছেন, কোনো জিনিসের দাম বাড়েনি। তাহলে তরুণ সমাজের মনে যদি এই বিশ্বাসই দানা বাঁধে যে, বড় নেতা হতে হলে, মন্ত্রী-প্রধানমন্ত্রী হতে হলে, মিথ্যা চর্চা করতে হবে, সারাক্ষণ মিথ্যা কথা বলতে হবে, তাহলে তাদের কি দোষ দেয়া যাবে? বিএনপিতে একজনও বিবেকবান মানুষ নেই, এটা তিনি বিশ্বাস করতেন না কিন্তু তারা কীভাবে সব অন্যায়, সব মিথ্যাচার বিনা প্রতিবাদে মেনে নিচ্ছেন অথবা তাতে সায় দিয়ে চলেছেন তাতে তিনি বিস্ময় প্রকাশ করতেন।
তিনি আওয়ামী লীগ করতেন, তবে দলের সব সিদ্ধান্তের সঙ্গে যে একমত হতে পারতেন তা নয়, কিন্তু দলের সিদ্ধান্ত তিনি মেনে নিতেন এবং সেই সিদ্ধান্ত কার্যকর করার জন্য তার সাধ্যানুযায়ী সবকিছু করতেন। শৃঙ্খলা ভঙ্গ করা ছিল তার রীতিবিরুদ্ধ। দলের জন্য ক্ষতিকর কোনো কাজ নিজে যেমন করতেন না, তেমনি এটাও চাইতেন না যে, দল তাকে দিয়ে কোনো ক্ষতিকর কাজ করিয়ে নিক। হরতালের রাজনীতি তিনি পছন্দ করতেন না। আবার এটাও বলতেন, বিএনপি যেভাবে দেশ চালাচ্ছে, আওয়ামী লীগের কর্মীদের ওপর যেভাবে অত্যাচার-নির্যাতন চালাচ্ছে তাতে হরতাল না করেইবা কী করবে আওয়ামী লীগ। একটি গণতান্ত্রিক-নিয়মতান্ত্রিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগ তো সশস্ত্র পথ বা হিংসার পথ বেছে নিতে পারে না। আওয়ামী লীগের মতো এত বড় একটি দল যদি হিংসাশ্রয়ী রাজনীতি শুরু করে, তাহলে দেশ বিপর্যয়ের মুখে পড়বে বলে তিনি মনে করতেন। তিনি আশা করতেন, বিএনপির অন্তত কিছু নেতার শুভবুদ্ধির উদয় হবে এবং আওয়ামী লীগের শান্তিপূর্ণ সভা-সমাবেশে বাধা দেয়া বন্ধ হবে। কিন্তু সেটা না হতে দেখে তিনি নিরাশ হয়েছেন। পুলিশকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ওপর নিষ্ঠুর নির্যাতন করতে গিয়ে সরকার এই বাহিনীর কত বড় ক্ষতি করছে, সেটা তারা বুঝতে পারছে না বলে তিনি মনে করতেন। জিয়াউর রহমান সম্পর্কে তিনি অনেক কিছু জানতেন, তার সঙ্গে পররাষ্ট্র সচিব হিসেবে কাজ করেছেন। এমন কিছু ঘটনা আছে যেগুলো প্রকাশ হলে জিয়ার ইমেজ ক্ষুণ্ন হবে। আমরা পীড়াপীড়ি করা সত্ত্বেও তিনি তা প্রকাশ করেননি। বলতেন, এটা আমার নীতিবিরুদ্ধ। তিনি জীবিত থাকলে অবশ্য কিছু কিছু কথা আমি প্রকাশ করতাম। মৃত মানুষের চরিত্রের নেতিবাচক দিক তুলে ধরার মধ্যে সুস্থ রুচির পরিচয় পাওয়া যায় না। এমনই ছিল কিবরিয়া সাহেবের রুচি ও বিবেকবোধ।






