‘বাংলাদেশ এখন যুদ্ধে লিপ্ত। পাকিস্তানের ঔপনিবেশিক নিপীড়নের বিরুদ্ধে জাতীয় স্বাধীনতা যুদ্ধের মাধ্যমে আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার অর্জন ছাড়া আমাদের হাতে আর কোনও বিকল্প নেই।’ একাত্তরের ১৭ এপ্রিল বাংলাদেশের পশ্চিম সীমান্ত জেলা কুষ্টিয়ার মেহেরপুর মহকুমার (বর্তমানে জেলা) অখ্যাত একটি গ্রাম বৈদ্যনাথতলার আম্রকাননে বিদেশী সাংবাদিক ও স্থানীয় জনগণের সামনে বক্তৃতায় এ ঘোষণা দেয়ার মধ্য দিয়ে সারা পৃথিবীতে বাংলাদেশকে তুলে ধরেন স্বাধীন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ। বৈদ্যনাথতলাকে তিনি তাদের কাছে তুলে ধরেন মুজিবনগর নামে। সাংবাদিকরা তাকে প্রশ্ন করেন, ‘বাংলাদেশ সরকার কি এই মুজিবনগর থেকেই যুদ্ধ পরিচালনা করবে?’ উত্তরে তিনি বলেন, ‘যুদ্ধের সময় সরকার শুধু এক জায়গাতেই থাকবে না। যেখানে থাকবে সেটাই হবে মুজিবনগর।’ এক বছর পর পাকিস্তানি হানাদারমুক্ত স্বাধীন বাংলাদেশে একই দিনে বৈদ্যনাথতলা বা মুজিবনগরে সেই বাংলাদেশ সরকারের কেউই ছিলেন না। তাজউদ্দীন ছিলেন ডাক বাছাই কর্মচারী সমিতির এক কর্মী সমাবেশে। সেখানে তিনি বলছিলেন, ‘ধ্বংসের মধ্যে সোনার বাংলার ভিত্তি স্থাপন করতে হবে এবং বঙ্গবন্ধুর ঘোষিত বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে’ (দৈনিক ইত্তেফাক, ১৮ এপ্রিল ১৯৭২)।

একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথে, রাষ্ট্রের মূলনীতি ও শাসনতান্ত্রিক কাঠামো নির্মাণের পথে নানা চড়াই-উতরাই পেরোতে হয় রাজনীতিকদের। যেমন, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আহ্বান শুধু তাজউদ্দীন আহমদই নন— বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিজেও রেখেছেন; যদিও কালক্রমে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার উপহাস শুধু জাসদ-বাসদের ঘাড়ে গিয়ে বর্তায়। তাজউদ্দীনের সামনে রাজনীতির পথ খুলে যায় খুব কম বয়সেই। ভাওয়ালের (বর্তমানের গাজীপুর) কাপাসিয়ার দরদরিয়া গ্রামে তার জন্ম হয় ১৯২৫ সালের ২৩ জুলাই। মা মেহেরুন্নেসা খানম ও বাবা মৌলভী মুহাম্মদ ইয়াসিন খানের সন্তান তাজউদ্দীনের রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয়েছিল তখনকার বেশির ভাগ বাঙালি মুসলমানের মতোই মুসলিম লীগের রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে। কিন্তু ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের বিভিন্ন ধারার সঙ্গেই তিনি কমবেশি পরিচিত হন বাল্যকালেই। ফলে উদারতাবাদী, ধর্মীয় গোঁড়ামিমুক্ত ধ্যানধারণারও বিকাশ ঘটে তার মধ্যে। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদবিরোধী বিপ্লবীদের গ্রেফতার করে তখন দেশের বিভিন্ন দুর্গম থানার কর্তৃত্বে নজরদারির মধ্যে রাখা হতো। কাপাসিয়া থানাতেও ১৯৩৭ সালে এমন তিনজন শিক্ষিত বিপ্লবী রাজবন্দি নারায়ণ চ্যাটার্জি, বীরেশ্বর ব্যানার্জি ও মনিন্দ্র শীমাণিকে রাখা হয়েছিল। কাপাসিয়া মাইনর ইংরেজি স্কুলে চতুর্থ শ্রেণীতে পড়ার সময় এদের সংস্পর্শে আসেন তিনি। মাত্র ১২ বছর বয়সেই তিনি ইতিহাস, ভূগোল, অর্থনীতি, রাজনীতি, যুদ্ধ সম্পর্কে ধারণা অর্জন করেন বিপ্লবীদের দেয়া বিভিন্ন বই পড়ে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের মাঝামাঝি সময়ে ১৯৪৩ সালে স্কুলে পড়ার সময় মুসলিম লীগের সক্রিয় সদস্য হন তিনি, যুক্ত হন পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে। কিন্তু তার সংশ্লিষ্টতা ছিল দলটির কামরুদ্দিন আহমদের নেতৃত্বাধীন অপেক্ষাকৃত অগ্রসর অংশের সঙ্গে। ‘মুসলিম লীগকে ঢাকার নবাবদের প্রাসাদ আহসান মঞ্জিল থেকে বের করে আনতে হবে’— প্রথমে নারায়ণগঞ্জে, তার পর ঢাকার পাকিস্তান ময়দানে আবুল হাশিমের এই বক্তব্য শুনে আকৃষ্ট হন তিনি। পরের বছর ১৯৪৪ সালে তিনি একদিকে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন, অন্যদিকে মুসলিম লীগের কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। ওই বছরই তিনি পরিচিত হন শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে। তবে পাকিস্তান আলাদা হয়ে যাওয়ার আগেই মুসলিম লীগের প্রতি তার মোহভঙ্গ ঘটে। ঢাকায় কামরুদ্দিন আহমদ, মোহাম্মদ তোয়াহা, অলি আহাদ, নূরুল ইসলাম খান প্রমুখের সঙ্গে তাজউদ্দীনও ধর্মবাদী রাজনীতিমুক্ত একটি গণতান্ত্রিক দল গঠনের কথা ভাবতেন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আগেই ১৯৪৭ সালের ৪ আগস্ট তাজউদ্দীনসহ তারা মুসলিম লীগের মধ্যে থেকে রাজনৈতিক তত্পরতা চালানোর পাশাপাশি এ-সম্পর্কিত একটি ইশতেহার প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেন। কয়েক দিন পর ৭ আগস্ট তারা ঠিক করেন, নতুন দলটির নাম হবে ‘ইস্ট পাকিস্তান ইকোনমিক ফ্রিডম লীগ (পূর্ব পাকিস্তান অর্থনৈতিক মুক্তি লীগ)’। এ দল গঠনের কাজ না এগোলেও নতুন রাষ্ট্র আত্মপ্রকাশের মাত্র ১৫ দিনের মাথায় ৩০ আগস্ট ঢাকা নগরে মুসলিম লীগের ছাত্র সংগঠন গড়ে তোলার লক্ষ্যে সভা করা হয়। তাজউদ্দীন এ সভায় নতুন করে গঠিত কোনো কমিটিতে ‘মুসলিম’ শব্দটি ব্যবহার বা যুক্ত করার বিপক্ষে জোরালো বক্তব্য তুলে ধরেন। এ চিন্তার ভিত্তিতেই ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি গড়ে ওঠা ছাত্র সংগঠনের নাম রাখা হয় ‘পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ’। এ বছরেই তিনি আইএ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। পরে ১৯৫৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক (সম্মান) উত্তীর্ণ হন তিনি। এর এক দশক পর তিনি ১৯৬৪ সালে কারাবন্দি অবস্থায় পরীক্ষা দিয়ে আইনশাস্ত্রে ডিগ্রি অর্জন করেন।

ছাত্র হওয়ার কারণে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত না থাকলেও তাজউদ্দীন আহমদ ছিলেন ১৯৪৯ সালে গঠিত আওয়ামী মুসলিম লীগের অন্যতম উদ্যোক্তা। এ সময় থেকেই বিস্তৃত হতে থাকে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন— যার সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত ছিলেন তিনি, ছিলেন সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের সদস্যও।

কালক্রমে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার যুদ্ধে নেতৃত্বের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন তাজউদ্দীন, যার প্রস্তুতি তিনি নিচ্ছিলেন অনেক আগে থেকেই। প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যায়, ১৯৫২ সালের এক অনুষ্ঠানে সরকারি কর্মকর্তা, পরবর্তী সময়ে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামি শামসুর রহমান খান জনসনকে তাজউদ্দীন বলেছিলেন, ‘পাকিস্তানের সঙ্গে আমাদের এক থাকা সম্ভব হবে না।’ এ ঘটনা থেকে সুস্পষ্ট, স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রত্যয় নিয়ে তখন থেকেই এগোচ্ছিলেন তিনি। যুক্তফ্রন্টের সদস্য হিসেবে কাপাসিয়া থেকে পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য হন। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে কাপাসিয়া থেকে পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য হন তিনি। ১৯৫৫ সালে আওয়ামী লীগের ঢাকা জেলা কমিটির সাংস্কৃতিক ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক এবং পরে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৪ সালে আওয়ামী লীগের পুনরুজ্জীবন ঘটলে সাংগঠনিক সম্পাদক নিযুক্ত হন তিনি। এর পর ১৯৬৬ সালের কাউন্সিলে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হওয়ার পর তাজউদ্দীন আহমদ সভাপতি শেখ মুজিবুর রহমানের সার্বক্ষণিক সাহচর্যে আসেন এবং ১৯৭২ সালের কাউন্সিল পর্যন্ত দলীয় পর্যায়ে তাদের সহাবস্থান অব্যাহত ছিল। ওই বছর কাউন্সিলে তাকে দলের সাধারণ সম্পাদক পদ থেকে সরে যেতে হয়। কেননা বলা হয়, রাষ্ট্রের সরকার কাঠামোয় আছেন এমন কাউকে সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ পদে রাখা যাবে না।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাজউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ স্বাধীনতাপূর্ব সময়ে সর্বস্তরের জনগণের সংগঠন হয়ে ওঠে। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর প্রতি শর্তহীন বিশ্বস্ততা থাকার পরও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে তাদের দূরত্ব ক্রমেই বাড়তে থাকে। এ দূরত্বের ধরন সম্পর্কে বিভিন্নজন এমনও মনে করেন, শেখ ফজলুল মণির রাজনৈতিক অবস্থানে দূরত্ব তৈরির ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু তাজউদ্দীনের এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক পথপরিক্রমায় এখনো এমন কিছু অব্যাখ্যাত বা অনুদ্ঘাটিত বিষয় রয়েছে, যেগুলোর দিকে তাকালে মনে হয়, বিষয়টি এত ক্ষুদ্র পরিসরের নয়। যেমন, ১৯৫২ সাল থেকে তাজউদ্দীন স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়ে এগিয়ে চলেছেন জানলেও ঠিক কী সাংগঠনিক কার্যক্রমের মধ্যে দিয়ে তিনি এগোচ্ছিলেন, তা এখনো অনুদ্ঘাটিত বা অনালোচিত। ১৯৭১-এ বাংলাদেশ সরকার গঠনের পর ‘র’ ‘সব ডিম এক ঝুড়িতে রাখা যাবে না’ এ রকম তত্ত্বের নিরিখে বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স বা বিএলএফ গড়ে তুলেছিল বলে ব্যারিস্টার আমিনুল ইসলাম কিংবা অধ্যাপক আনিসুজ্জামানসহ বিভিন্ন জন মনে করলেও বিএলএফ মূলত গড়ে উঠেছিল ১৯৬২ সালেই। বিভিন্ন রাজনীতিক ও বিশিষ্টজন স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখলেও বা ব্যক্তিগতভাবে ধারণ করলেও রাজনৈতিক-সাংগঠনিকভাবে স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নিয়ে কার্যক্রম শুরু করেছিল শুধু সিরাজুল আলম খান, আবদুর রাজ্জাক ও কাজী আরেফ আহমেদের গড়ে তোলা নিউক্লিয়াস, ১৯৬৮ সালের মধ্যেই যেটি বিভিন্ন স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩০০ ইউনিট গড়ে তোলে। ১৯৬৯ সালের পর ঢাকার বিভিন্ন স্থানে বিএলএফের দেয়াললিখনও দেখা গেছে। এই বিএলএফের কার্যক্রম সম্পর্কে বঙ্গবন্ধুও জানতেন এবং ১৯৭০-এর নভেম্বরের দিকে তাঁর আগ্রহে এতে যুক্ত করা হয় শেখ ফজলুল হক মণি ও তোফায়েল আহমেদকে। বিএলএফ বা ছাত্রলীগের ওই সময়ের গুরুত্বপূর্ণ সংগঠক আফতাব আহমাদের বিবরণ অনুযায়ী, ছাত্রলীগের র্যাডিক্যাল ধারার সমাজতন্ত্রপন্থী সদস্যরা ভিয়েতনাম যুদ্ধের অনুপ্রেরণা থেকে এ সংগঠন গড়ে তোলে। অন্যদিকে ডা. মাহফুজুর রহমানের বক্তব্য অনুযায়ী, সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশকে স্বাধীন করার চিন্তা থেকে বঙ্গবন্ধু নিউক্লিয়াসের দুজন (সিরাজুল আলম খান ও আবদুর রাজ্জাক) এবং শাসনতান্ত্রিক গ্রুপের দুজনকে (শেখ ফজলুল হক মণি) নিয়ে যুদ্ধ শুরুর আগেই বিএলএফ গঠন করেন। এ রকমও জানা যায়, মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই বঙ্গবন্ধু বিএলএফের নির্বাচিত সদস্যদের দু’দফায় ভারত ও ইন্দোনেশিয়ায় পাঠানোর উদ্যোগ নিয়েছিলেন। বুদ্ধিজীবী আহমদ শরীফেরও বিএলএফের সঙ্গে সংযুক্তি ছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় পর্যায়ের অন্য নেতাদের, যেমন তাজউদ্দীনের বিএলএফের সঙ্গে সম্পর্কের ধরনটি কী ছিল, তা আজো অনালোচিত। এ অনালোচনা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস চর্চার ক্ষেত্রেও অনেক মিসিং লিংকের জন্ম দিয়েছে। যেমন, কাজী আরেফ আহমেদ, তোফায়েল আহমেদের বিভিন্ন আলোচনা থেকে জানা যাচ্ছে, ১৯৭১ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারিতে তাজউদ্দীন আহমদের উপস্থিতিতেই বঙ্গবন্ধু তার বাসভবনে শেখ ফজলুল হক মণি, সিরাজুল আলম খান, আবদুর রাজ্জাক ও তোফায়েল আহমেদকে বলেন, ‘পড়ো, মুখস্থ করো। ঠিকানা ২১ রাজেন্দ্র রোড, নর্দার্ন পার্ক, ভবানীপুর, কলকাতা। ...আক্রান্ত হলে এখান থেকেই মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত করবে।’ এ বিবরণ থেকে মনে হয়, মুক্তিযুদ্ধ বা গেরিলা যুদ্ধ সম্পর্কে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনা ছিল এবং নিজের অনুপস্থিতি বা কারাবন্দিত্বের ব্যাপারেও তিনি তার নিকটতম নেতাদের প্রস্তুত করেছিলেন।

যদিও বিভিন্নজন বলার চেষ্টা করেন, ২৫ মার্চের কালরাতে তাজউদ্দীন আহমদ বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে গিয়ে প্রত্যাশিত সাড়া পাননি এবং বিচ্ছিন্নভাবে ভাবতে গেলে তা যথেষ্ট উত্তেজকও মনে হয়, কিন্তু ইতিহাসের টুকরো টুকরো ঘটনা জোড়া লাগালে সামগ্রিক পরিস্থিতির ধারাবাহিকতায় তা আর তত উত্তেজক মনে নাও হতে পারেন। কেননা ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের এক মাসেরও বেশি সময় আগে যেখানে সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে, যে-কোনো সময় সবাইকে একসঙ্গে হোক আর আলাদাভাবে হোক ভবানীপুর যেতে হবে, সেখানে ২৫ মার্চে কোনো কাগজের ওপর শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতা ঘোষণার স্বাক্ষর করলেন কিনা, তা নিশ্চয়ই মূল ইস্যু হতে পারে না। ১৩ ডিসেম্বর ১৯৭২ সালে দৈনিক বাংলায় এক সাক্ষাত্কারে তাজউদ্দীন আহমদ বলেন, ‘জাতীয় স্বার্থে মিথ্যা বলব না, সত্য গোপন করতে পারি। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সম্ভাব্য গেরিলা যুদ্ধের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত ছিল।’ ওই সাক্ষাত্কারে তিনি আরো জানান, ২৫ মার্চের আগের কয়েক দিনে কমপক্ষে ৪০টি দেশের রাষ্ট্রদূত তার সঙ্গে সাক্ষাত্ করেছেন। শুধু তাই নয়, ২৫ মার্চের আগে ইয়াহিয়া খানের সামরিক উপদেষ্টা লে. জে. পীরজাদার কাছে পাঠানো লে. জে. টিক্কা খানের গোপন বার্তাও হাতে আসে তাজউদ্দীনের। তিনি তা বঙ্গবন্ধুকে দেখান। প্রশ্ন হলো, জাতীয় স্বার্থে মিথ্যা না বললেও যে সত্য তাজউদ্দীন তখন গোপন রেখেছেন, তা আসলে কী?

মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা আনতে গিয়ে তাজউদ্দীনকে শুধু পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধেই নয়, সংগ্রাম করতে হয়েছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পরাশক্তি ও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের বিরুদ্ধেও। দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের অনেকেও তাজউদ্দীনের নেতৃত্ব মেনে নিতে পারেননি; যদিও শেষ পর্যন্ত নিজেদের সীমাবদ্ধতার কারণে অনমনীয় অবস্থান থেকে সরে আসেন তারা। দেশ থেকে ভারতে চলে যাওয়া আওয়ামী লীগের বিভিন্ন সংসদ সদস্য ও নেতাদের মধ্যে দায়িত্ব ও কাজের বণ্টন করা ছিল তার জন্য একটি প্রধান সমস্যা; এমনকি তাদের ব্যক্তিগত বা পারিবারিক সমস্যাগুলোর সমাধানও করতে হতো তাকে। যদিও সরকারের উচ্চতম পর্যায়ের পাঁচ রাজনৈতিক নেতা (সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, খোন্দকার মোশতাক আহমদ, কামরুজ্জামান ও ক্যাপ্টেন মনসুর আলী) যুদ্ধের শুরুতে শপথ নিয়েছিলেন তারা দেশ স্বাধীন না হওয়া পর্যন্ত পারিবারিক জীবনযাপন করবেন না, থিয়েটার রোডের মেসে থেকে কার্যক্রম চালাবেন, কিন্তু বাস্তবত একমাত্র তাজউদ্দীনই সার্বক্ষণিক মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করেন। এর পাশাপাশি ছিল খোন্দকার মোশতাকের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের একটি অংশের গোপন ও নীরব অসহযোগিতা ও ষড়যন্ত্রের খেলা। কিন্তু তার জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল বিএলএফ। জুন মাসেই ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা বিএলএফের প্রশিক্ষণ শুরু করে, কেননা সরকারের রূপরেখা-সংক্রান্ত বিরোধ এ সময় তুঙ্গে ওঠে। তাজউদ্দীন তার নেতৃত্ব ও প্রধানমন্ত্রিত্ব সম্পর্কে যাবতীয় সংশয়-সন্দেহের অবকাশ ঘটানোর লক্ষ্যে ৫-৬ জুলাই শিলিগুড়িতে আওয়ামী লীগের জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচিত সদস্যদের সম্মেলন ডাকেন এবং যুদ্ধ পরিচালনাকারী সরকারের শাসনতান্ত্রিক ভিত্তি মজবুত করেন। আস্থা ভোটাভুটির এ সম্মেলনে প্রতিনিধিরা তাজউদ্দীনের ওপর আস্থা রাখেন। বিএলএফ নেতাদের কাঙ্ক্ষিত ‘বিপ্লবী সরকারের’ বদলে মজবুত হয় ‘শাসনতান্ত্রিক’ সরকারের ভিত্তি। ফলে মুক্তিযুদ্ধের ওপর একক দলের কর্তৃত্ব ও নেতৃত্বও দৃঢ় হয়। এ সময় তাজউদ্দীনকে হত্যা করারও অপচেষ্টা হয়— যদিও সে ষড়যন্ত্র ফাঁস হয়ে যায়। তবে বোধকরি বামপন্থী ছাত্রনেতাদের আধিক্যে উদ্বিগ্ন হয়েই নভেম্বরে ভারত সরকার বিএলএফ বা মুজিব বাহিনীর প্রশিক্ষণ বন্ধ করে দেয়।

একাত্তরের ২২ ডিসেম্বর ঢাকায় ফিরে আসার পর তাজউদ্দীন তার প্রথম ভাষণেই বলেন, ‘বাংলার সাড়ে সাত কোটি মানুষ স্বাধীনতা লাভের জন্য যে বিপ্লবে মেতে উঠেছিল, সেই বিপ্লব থেমে গেলে চলিবে না, বরং বিপ্লবকে গঠনমূলক কাজে সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। সাম্যবাদী অর্থনীতি, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষ সমাজ কায়েম করা যখন সম্ভব হবে, তখনই বিপ্লব সম্পূর্ণ হবে’ (ইত্তেফাক, ২৩ ডিসেম্বর ১৯৭১)। পরের দিন সেক্রেটারিয়েট প্রাঙ্গণে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উদ্দেশে বক্তব্য রাখতে গিয়েও তিনি সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য সব শ্রেণীর মানুষের সহযোগিতা কামনা করেন। এ সময় আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের বিভিন্ন সভায় বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের কথা উঠে আসে এবং বাংলাদেশ ছাত্রলীগের ভাঙনের আগ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাজউদ্দীন আহমদ দুজনকেই বিভিন্ন সময় বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রত্যয় ব্যক্ত করতে দেখা গেছে। যদিও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর দ্রুত রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটতে থাকে। ১৯৭২-এর ১২ জানুয়ারিতেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। অন্যদিকে তাজউদ্দীন প্রধানমন্ত্রীর পদ ত্যাগ করে অর্থমন্ত্রীর পদ গ্রহণ করেন। অবশ্য বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রত্যয় ঘোষণায় তাদের অবস্থান একই ছিল। ২ এপ্রিল, ১৯৭২-এ তাজউদ্দীন ভিয়েতনামি শান্তি প্রতিনিধি দলের সম্মানে বাংলাদেশ শান্তি পরিষদ ও আফ্রো-এশীয় গণসংহতি পরিষদের যুক্ত উদ্যাগে সংবর্ধনা সভায় বলেন, ‘বাংলাদেশে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রই প্রতিষ্ঠিত হবে। অন্য কোনো মতবাদ নয়। বঙ্গবন্ধুর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে আমরা শোষণহীন সমাজতান্ত্রিক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ কায়েমে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ’ (দৈনিক বাংলা, ৩ এপ্রিল ’৭২)। এর কয়েক দিন পর ঢাকায় ৭-৮ এপ্রিলে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশন ১৯৭২-এ সাধারণ সম্পাদকের রিপোর্টে তাজউদ্দীন বলেন, ‘গত অধিবেশনে (৩-৫ জুন ১৯৭০) আমরা সেই সাধারণ নির্বাচনে (১৯৭০) অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম একদিকে ছয় দফাভিত্তিক শাসনতান্ত্রিক প্রস্তাবকে সামনে রেখে এবং অন্যদিকে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শকে লক্ষ্য হিসেবে বেছে নিয়ে। আওয়ামী লীগের বিঘোষিত নীতির সঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাই ঘোষণা করেছেন যে, ‘সমাজতন্ত্রই হবে আমাদের লক্ষ্য। আর এই সমাজতন্ত্র কোনো লোক-দেখানো ব্যাপার হবে না, এ হবে সত্যিকার বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র।’

কৌতূহলোদ্দীপক ঘটনা হলো, জাসদ গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হলে তাজউদ্দীন ‘বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র’-বিষয়ক বক্তব্য থেকে সরে আসতে থাকেন। ১৯৭২-এর ২০ জুলাই সলিমুল্লাহ হল ছাত্র সংসদের অধিষ্ঠান উত্সবে তিনি বলেন, ‘আমি নির্ভেজাল সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী। সমাজতন্ত্র শব্দের পূর্বে কোন বিশেষণের প্রয়োজন হয় না। সমাজতন্ত্র শব্দটি স্বয়ংসম্পূর্ণ। সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কোন সংক্ষিপ্ত পথ নেই’ (দৈনিক বাংলা, ২১ জুলাই ১৯৭২)। জাসদ গঠনের দিন জাতীয় সংসদে সংবিধান বিলের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তাজউদ্দীন বলেন, ‘বাংলাদেশের সংবিধানে সমাজতন্ত্র ও গণতন্ত্রের এক চমত্কার সমন্বয় ঘটিয়ে এ দেশের সাধারণ মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে সুন্দরভাবে প্রতিফলিত করা হয়েছে। ...আওয়ামী লীগ ১৯৫৪ সালেই তার মেনিফেস্টোতে সমাজতন্ত্রের কথা বলেছে এবং দীর্ঘদিন তার জন্য সংগ্রাম করে এসেছে।’ পরের দিন তিনি আবারো জানান, ১৯৬৪ দলের কাউন্সিলে সমাজতন্ত্রের সিদ্ধান্ত নেয়া হয় (পূর্বদেশ, ১ নভেম্বর ১৯৭২)। পরের বছর ৬ এপ্রিল পশ্চিম জার্মানির পাঁচটি সংবাদপত্রের লন্ডন প্রতিনিধি ডিয়েটার স্পাডাকের সঙ্গে সাক্ষাত্কারে তিনি বলেন, ‘আমরা বাংলাদেশে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করব, যা সোভিয়েত রাশিয়া কিংবা চীনের ধরনের হবে না, বরঞ্চ তা হবে আমাদের নিজেদের মত। আমরা গণতন্ত্র এবং সমাজতন্ত্রের মধ্যে সুষম সমন্বয় ঘটাবো, যা বিশ্বে একটি অসাধারণ ব্যাপার হবে’ (পূর্বদেশ, ৮ এপ্রিল ১৯৭৩)। পরে ১৯৭৫-এর ২৫ জানুয়ারি একদলীয় বাকশাল সরকার প্রতিষ্ঠা হয়। কিন্তু তাজউদ্দীন এর বিরোধিতা করেন। এসব ঘটনাপ্রবাহ থেকে মনে হয়, তাজউদ্দীনের ‘সমাজতন্ত্র’ মূলত বৈষম্যহীন, শোষণহীন সমাজের আদর্শিক বহিঃপ্রকাশমাত্র— একদলীয় শাসন ব্যবস্থা কিংবা মার্কসবাদ-লেনিনবাদ কোনোটার সঙ্গেই এর যোগ ছিল না।

বঙ্গবন্ধু দেশে ফেরার আগেই সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দুটি রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ব্যাপারে তাজউদ্দীন যা বলেছিলেন, তা থেকে শুধু তাজউদ্দীনের দেশপ্রেম নয়, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে জনগণের আকাঙ্ক্ষাও দৃষ্টিগ্রাহ্য হয়। ১৯৭১-এর ১৯ ডিসেম্বর মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে তাজউদ্দীন জানান, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে অর্থনৈতিক সাহায্য নেয়া হবে না (ইত্তেফাক, ২১ ডিসেম্বর ১৯৭১)। ঢাকায় ফেরার পর ২৮ ডিসেম্বর বঙ্গভবনে সাংবাদিকদের কাছে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ সরকার যখনি চলে যেতে বলবেন তখনই ভারতীয় সেনাবাহিনী দেশে ফিরে যাবেন’ (পূর্বদেশ, ২৯ ডিসেম্বর ১৯৭১)। ২৫ জানুয়ারি ১৯৭২-এ ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবসের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে নয়াদিল্লি যাওয়ার পথে দমদম বিমানবন্দরে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমাদের সংগ্রাম পরিচালনার সময় চীন আমাদের প্রতি যে মনোভাব দেখিয়েছে তাতে আমরা দুঃখিত। কিন্তু চীন বাস্তবতাকে উপলব্ধি করলে ও তা মেনে নিলে সেসব আমরা ভুলে যেতে রাজি আছি’ (ইত্তেফাক, ২৬ জানুয়ারি ১৯৭২)। এই পররাষ্ট্রীয় চিন্তার ছাপ কাজকর্মেও রেখেছেন তিনি। একটি সদ্য স্বাধীন দেশের অর্থমন্ত্রী হিসেবে বাংলাদেশ সফরকারী বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট রবার্ট ম্যাকনামারার সঙ্গে তিনি যে আচরণ করেন, তা কূটনৈতিক শিষ্টাচারের সঙ্গে না মিললেও ত্যাগ-তিতিক্ষার মধ্য দিয়ে স্বাধীন হওয়া একটি দেশের দৃঢ় রাজনৈতিক অবস্থানকে তুলে ধরে। অন্যদিকে পৃথিবীর দেশে দেশে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ যে অর্থনৈতিক ফাঁদ পাতে, সে সম্পর্কে বাংলাদেশের সতর্কতারও প্রকাশ ঘটায়। ১৯৭৩ সালের প্রথম দিকে দেশজুড়ে ভারতে ছাপানো টাকার নোট নিয়ে নানা অপপ্রচার শুরু হলে তিনি এসব নোট (এক টাকার নোট বাদে) বাজার থেকে তুলে নেয়ার সিদ্ধান্ত নেন এবং ভারতীয় উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বলেন, ‘যে ভারত জন্মে বাংলাদেশকে লালন করেছে, সে ভারত দোলনায় তাকে হত্যা করছে কিনা তা আমাদের দেখতে হবে।’ পরে দেখা যায়, ভারতে মুদ্রিত যত নোট বাজারে ছাড়া হয়েছিল, তত নোট ব্যাংকে জমা পড়েনি। এ সময় ভারতের সঙ্গে তাজউদ্দীন গোপন চুক্তি করেছেন, এমন গুজবও ছড়িয়ে পড়ে। এ প্রসঙ্গে ১৯৭৩-এর ২ জুন তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘মুজিবনগরে প্রতিষ্ঠিত বিপ্লবী সরকারের প্রধানমন্ত্রী থাকার সময় ভারতের সঙ্গে কোন গোপন চুক্তি করেছি বলে যদি কোন প্রমাণ করতে পারেন, তবে আমি সঙ্গে সঙ্গে পদত্যাগ তো করবই, এমনকি ফাঁসিতে ঝুলতেও রাজি আছি।’

১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ তাকে উদ্বিগ্ন করে তোলে এবং অর্থনীতিকে চাঙ্গা করে তোলার লক্ষ্যে আগস্ট মাস থেকে একটানা বিদেশ সফর করেন। কয়েকটি আরব দেশ সফরের লক্ষ্যে তিনি ৮ আগস্ট ঢাকা ছাড়েন। বাগদাদ হয়ে তিনি ১২ আগস্ট জেদ্দায় ইসলামিক উন্নয়ন ব্যাংকের সম্মেলনে অংশ নেন। তিনি বাংলাদেশকে সর্বসম্মতিক্রমে ইসলামিক ব্যাংকের সদস্যভুক্ত করার জন্য সম্মেলনের প্রতিনিধিদের ধন্যবাদ জানান এবং ঘোষণা দেন, বাংলাদেশ ইসলামিক ব্যাংকে ১ কোটি ইসলামিক দিনার চাঁদা দেবে। এ সময় তিনি মস্কোও সফর করেন, যেখান থেকে তার ওয়াশিংটনে বিশ্বব্যাংকের সভায় যাওয়ার কথা ছিল। ওই সময় শেখ মুজিবুর রহমানও জাতিসংঘের সভায় যুক্তরাষ্ট্রে যান। মস্কোয় বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত শামসুর রহমান খানের বাসায় আমন্ত্রণ রাখতে গিয়ে তাজউদ্দীনকে বঙ্গবন্ধু টেলিফোনে জানান, তিনি ওয়াশিংটন গিয়ে প্রেসিডেন্ট ফোর্ডের সঙ্গে দেখা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এ সিদ্ধান্তে তাজউদ্দীন মনঃক্ষুণ্ন হন। কেননা দেশে অবস্থানের সময়েই তিনি বলেছিলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আপনাকে রাষ্ট্রীয় অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হলেই কেবল আপনার ফোর্ডের সঙ্গে বৈঠক করা ঠিক হবে। না হলে আপনার উচিত হবে জাতিসংঘের বৈঠক শেষ করে সরাসরি দেশে ফিরে আসা।’ বঙ্গবন্ধুকে তিনি টেলিফোনে বলেন, ‘আপনি যদি ওভাবে দেখা করতেই চান, তাতে আমার আর কী করার আছে, বলুন?’ পরে ওয়াশিংটন গিয়ে তাজউদ্দীন জানতে পারেন, ফোর্ডের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর মাত্র ১৫ মিনিটের একটি বৈঠকের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এমন সাক্ষাত্কার বঙ্গবন্ধুর মতো নেতার জন্য অবমাননাকর বিবেচনায় তিনি মুষড়ে পড়েন। তাছাড়া সফররত বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতের কাছ থেকে তিনি অভিযোগ পান, বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে বিদেশের পত্রপত্রিকায় যেসব সংবাদ ছাপা হচ্ছে, তা খণ্ডন করা তাদের পক্ষে অসম্ভব; তাই মর্যাদার সঙ্গে কাজ করাও তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। এ পরিস্থিতিতে তিনি সিদ্ধান্ত নেন, এবার দেশে ফিরে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে রাষ্ট্র পরিচালনা সম্পর্কে খোলাখুলি কথা বলবেন।

একনাগাড়ে এক মাস সাতদিন বিদেশ সফর করে তাজউদ্দীন ১৯৭৪-এর ১৩ অক্টোবর দেশে ফিরে আসেন। বিমানবন্দরে তিনি দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতিতে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। প্রসঙ্গক্রমে তিনি ১৯৫৬ সালের সর্বদলীয় খাদ্য কমিটির উদাহরণ টেনে জানান, সকল দলের ও মতের নেতা ও বিশেষজ্ঞদের একত্রিত করে সংকট মোকাবেলায় সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিতে তিনি প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ করবেন। তিনি জানান, লন্ডনে বসে নিজের দেশের দুই বিপরীত ও অমানবিক দৃশ্য টেলিভিশনে দেখে তিনি মর্মাহত ও লজ্জিত হয়েছেন। তিনি বলেন, ‘সরকারি দলই হোক আর বিরোধী দলই হোক, কারো হাতে অস্ত্র থাকা উচিত নয়।’ দেশে ফেরার ত্রয়োদশ দিনে প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নির্দেশে পদত্যাগ করতে হয় তাজউদ্দীন আহমদকে। এর কয়েক সদিন আগে তিনি তার একান্ত সচিব আবু সাঈদ চৌধুরীকে সামনে বসিয়ে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেন। এ সময় তিনি বঙ্গবন্ধুর একদলীয় শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তনের সিদ্ধান্তের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন। ওই টেলিফোনের একমাত্র প্রত্যক্ষদর্শী আবু সাঈদ চৌধুরীর ভাষ্যমতে, তাজউদ্দীন এ সময় বলেন, ‘বাই টেকিং দিস স্টেপ ইউ আর ক্লোজিং অল দ্য ডোরস টু রিমুভ ইউ পিসফুলি ফ্রম ইউর পজিশন।’ আবেগকম্পিত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘মুজিব ভাই, আমি আমার সারা জীবনের অভিজ্ঞতা দিয়ে বলছি, কেউ যদি আপনাকে ক্ষমতা থেকে সরাতে চায় তা হলে সে এরপর কী করবে? আপনি তো আপনাকে সরানোর সব পথ নিজেই বন্ধ করে দিচ্ছেন। এরপর আপনাকে সরানোর একটা পথই খোলা থাকে— আর সেটা অস্ত্রের পথ, উত্খাতের পথ।’ এ কথায় বঙ্গবন্ধু ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন, টেলিফোন থেকে দূরে থাকলেও আবু সাঈদ চৌধুরী তা বুঝতে পারেন। তিনি তাজউদ্দীনকে বলতে শোনেন, ‘কিন্তু মুজিব ভাই, সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা কী ঘটবে জানেন, আপনাকে এত নিষেধের পরও আপনার সাথে ওই বন্দুকের গুলিতে আমরাও মারা যাব। শুধু আপনি তো মারা যাবেন না। দেশটার ভয়ানক ক্ষতি হয়ে যাবে।’

ঘটনাক্রমে সে রকমই হয়— ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সামরিক অভ্যুত্থানে বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হন। একটি তথ্যমতে, এ সময় জাসদের কয়েক সংগঠক তার বাসায় গিয়ে তাকে বের করে আনার চেষ্টাও করেছিলেন। কিন্তু তিনি সিরাজুল আলম খানকে আসতে বলেন। ঘটনাক্রমে ওই সময় সিরাজুল আলম খান ভারতে ছিলেন। কার্যত বঙ্গবন্ধুর মৃত্যু তাজউদ্দীন ও সিরাজুল আলম খান দুজনের রাজনৈতিক ভবিষেকই মৃত্যুর দিকে নিয়ে যায়। কয়েক দিন পর ২৩ আগস্ট সামরিক আইনের বিধিমালায় ‘দুর্নীতি, সমাজবিরোধী তত্পরতা, স্বজনপ্রীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে বিপুল সম্পদ ও সম্পত্তি হস্তগত করার অভিযোগে গ্রেফতার করা হয় তাজউদ্দীন আহমদসহ ২৬ জন নেতাকে। এর আগেও পাঁচ-পাঁচবার কমবেশি মেয়াদে কারাভোগ করেছেন তিনি। কিন্তু এবারের কারাজীবন তার জীবনের উপসংহার ডেকে আনে। ওই বছরেরই ৩ নভেম্বর ওই সময়ের রাষ্ট্রপতি খোন্দকার মোশতাক ও মেজর রশীদের নির্দেশে ক্যাপ্টেন মোসলেমের নেতৃত্বে কয়েক সেনাসদস্য পুরান ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারে গিয়ে তাকেসহ চার নেতাকে হত্যা করে।

কারাগারে থাকার সময় ১ নভেম্বর স্ত্রী জোহরা তাজউদ্দীন দেখা করতে গেলে তাজউদ্দীন আহমদ তাকে জানিয়েছিলেন, সেদিন রাতেই শেষ হবে তার ডায়েরি লেখা— যেখানে তিনি মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার দিনগুলোর কথা লিখেছেন, লিখেছেন মুক্তির সংগ্রাম ও যুদ্ধে যেসব প্রতিবন্ধকতা, দ্বন্দ্ব ও অন্তর্ঘাতের মধ্যে দিয়ে এগোতে হয়েছে সেসবের বিবরণ। কারাগার থেকে রহস্যজনকভাবে ওই ডায়েরিটিও হারিয়ে যায়।

ঢাকা, ১৭-১৮ ভাদ্র ১৪২৩ (১-২ সেপ্টেম্বর ২০১৬)

 

লেখক: সাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক