রাত জেগে কাজ করে ঘুমালে সকালে উঠতে সাধারণত দেরি হয়। তবে কামরুল ইসলাম সিদ্দিক ছিলেন এর ব্যতিক্রম। প্রাত্যহিক কাজ শেষ করে ঘুমাতে দেরি হলেও উঠতেন সবার আগে। নিজে কাজ করে আনন্দ পেতেন। মনোযোগ ও নিষ্ঠার সাথে সময়মতো কাজ সম্পন্ন করতেন। একইভাবে সহকর্মীদের কাজ করতে দেখেও খুশি হতেন। তাদের অন্যান্য দেশের কর্মপদ্ধতি বিশ্লেষণ এবং নিজ দেশে উপযোগী পদ্ধতি উদ্ভাবন ও প্রয়োগে উত্সাহিত করতেন। কর্মজীবনে তিনি যথেষ্ট সফলতার স্বাক্ষর রেখে গেছেন। বাংলাদেশে প্রত্যন্ত এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি, যাতায়াত, পণ্য পরিবহন, বাজারজাতের সুবিধা, বন্যা ব্যবস্থাপনা, বন্যার পানি নিষ্কাশন ও সেচসুবিধা বৃদ্ধিতে কামরুল ইসলাম সিদ্দিক উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন।

নিজে প্রকৌশলী হলেও সব বিষয়ে তার সমান আগ্রহ ছিল। বিশেষ করে সামাজিক ও পরিবেশ উন্নয়নে। আত্মবিশ্বাসী ও আস্থাশীল ছিলেন। সভা ও সেমিনারে তিনি সহজে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করতেন। তার আলোচনা-বক্তব্যে তথ্য ও উপাত্ত থাকত। সমস্যা চিহ্নিত ও বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য, যুক্তিসঙ্গত ও গ্রহণযোগ্য সমাধান তুলে ধরতেন। আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলোয় তার খ্যাতি ছিল। সব নির্মাণকাজে জনঅংশগ্রহণ ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণে গুরুত্ব দিতেন। তিনি দীর্ঘকাল স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর সংক্ষেপে এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী ছিলেন। তার সময়ে এলজিইডি নির্মিত সব রাস্তার পাশে বৃক্ষরোপণ জোরদার হয়। প্রতিটি জেলায় নির্মিত এলজিইডি ভবনের চত্বরে ফুলের বাগান তৈরি ও নানা জাতের বৃক্ষরোপণ শুরু হয়। গাছের নাম ও রোপণকারীর পরিচয়সহ ফলক স্থাপনের নির্দেশ ছিল। জেলা পর্যায়ে কার্যক্রম পরিদর্শনকালে বাগান ও গাছগাছালির অবস্থা নিরীক্ষা করতেন। বিভিন্ন জেলায় নার্সারি স্থাপন করা হয়েছিল গাছের চারা উত্পাদন ও সরবরাহের জন্য। এসব বাগান, গাছগাছালি ও নার্সারি এখনো অনেককেই আকর্ষণ করে। কামরুল ইসলাম সিদ্দিক প্রতিটি কার্যক্রমের অগ্রগতি ও ফলাফল নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতেন। যতই ব্যস্ততা থাক না কেন, এর কোনো ব্যতিক্রম হতো না। নথিপত্র, প্রতিবেদন ও স্মারক সবই বিশদভাবে পড়তেন, মন্তব্য করতেন ও নির্দেশনা দিতেন। নির্দেশনা অনুযায়ী কাজের অগ্রগতির ওপর লক্ষ রাখতেন। ফলে কাজকর্মে গাফিলতি বা ব্যর্থতার সম্ভাবনা কম হতো। কোনো এক জেলা কার্যালয় পরিদর্শনকালে তিনি এলজিইডি ভবনের সামনে একটি গাছের বর্ণনা এবং যিনি রোপণ করেছেন, তার নাম লেখা ফলকটি দেখতে না পেয়ে নির্বাহী প্রকৌশলীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। নির্বাহী প্রকৌশলীকে অবিলম্বে নতুন ফলক তৈরি করে স্থাপনের নির্দেশ দিয়ে ঢাকার দিকে রওনা হন। নির্বাহী প্রকৌশলী একটু বিশ্রাম নিয়ে কাজটা সম্পন্ন করবেন বলে স্থির করেন। এদিকে পথে আরেকজন কর্মকর্তার সাথে দেখা হলে কামরুল ইসলাম সিদ্দিক ফলকটি স্থাপনের জন্য নির্বাহী প্রকৌশলীকে তাগাদা দেয়ার কথা বলেন। বিকালে এয়ারপোর্টে আরেকজন কর্মকর্তার সাথে দেখা হলে তাকেও বলে দেন। নির্বাহী প্রকৌশলী তাগাদার পর তাগাদা আসায় বিশ্রাম ভঙ্গ করে ওইদিনই ফলক স্থাপনের ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হন। কামরুল ইসলাম সিদ্দিকের স্মরণশক্তি খুব প্রখর ছিল। সহকর্মী ও অধীনস্থদের নাম ভুলতেন না। তাদের কোনো মৌখিক বা লিখিতভাবে নির্দেশনা দিলে ভুলতেন না। ওই কাজ সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত খবরাখবর নিতে থাকতেন। সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ার পর কার্যকারিতার ওপর তথ্য নিতেন। সফলতা ও ব্যর্থতার কারণ বিশ্লেষণ করে অভিজ্ঞতা নিতেন এবং অন্যদেরও এতে উত্সাহিত করতেন।

জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে কর্মরত অধীনস্থদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন। প্রতিটি কার্যক্রমে অগ্রগতি ও সমস্যার ওপর অবগত থাকার জন্য হালনাগাদ তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের জন্য এলজিইডিতে ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম সংক্ষেপে এমাআইএসের ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়, যাতে তাত্ক্ষণিক সমস্যা সমাধানে পরামর্শ দেয়া এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া যায়। এমাআইএস উন্নয়নের মাধ্যমে ত্বরিত ও জরুরি তথ্য সরবরাহে এলজিইডি উদাহরণ সৃষ্টি করে। প্রকল্প বাস্তবায়নকালে এবং সম্পন্ন হওয়ার সাথে সাথে কর্মশালার আয়োজন করে সহকর্মীদের উপস্থিতিতে কার্যক্রম বিশ্লেষণ করা হতে থাকে। যোগ্যতা ও দক্ষতা অনুযায়ী কামরুল ইসলাম সিদ্দিক সহকর্মীদের দায়িত্ব দিতেন। দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য যোগ্যতার ভিত্তিতে তাদের দেশে-বিদেশে প্রশিক্ষণ ও উচ্চশিক্ষার জন্য যাওয়ার ব্যবস্থা করতেন। সফলতার সাথে কাজ সম্পন্ন করলে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেয়া হতো। কাজে গাফিলতি দেখলে অসন্তুষ্ট এমনকি রুষ্ট হতেন। সহকর্মীদের মধ্যে তিনি প্রিয় ছিলেন, আবার অপ্রিয়ও ছিলেন। সহকর্মীদের নিয়ে এলজিইডিকে তিনি একটি সফল সরকারি অধিদপ্তর হিসেবে গড়ে তুলতে অবদান রেখেছিলেন। তাদের প্রতিটি কাজের মধ্যে সমন্বয় বজায় রাখতে উত্সাহ দিতেন। কাজকর্মে স্বাধীনতা থাকত। প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে হস্তক্ষেপ করতেন না। দক্ষ ব্যক্তিদের স্বীকৃতি দিয়ে অধিকতর যোগ্য পদে নিযুক্তির জন্য অনুমোদন করতেন। নতুন প্রযুক্তির ওপর তার বিশেষ আকর্ষণ ছিল। নব্বই দশকের প্রথম দিকে এলজিইডিতে জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সিস্টেম সংক্ষেপে জিআইএসের সূচনা হয়। এর আওতায় দেশের সব থানার ম্যাপ তৈরি করা হতে থাকে। থানা উন্নয়ন পরিকল্পনার কাজ শুরু হয়। বায়োগ্যাস ও সোলার পাওয়ার বা সৌরশক্তি ব্যবহারের ওপর প্রকল্প হাতে নেয়া হয়। উজান থেকে প্রবাহিত পানি সংরক্ষণ করে সেচ এলাকা সম্প্রসারণে রাবার ড্যাম নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু হয়। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে নতুন প্রযুক্তি ছড়িয়ে দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়। এ কাজে সহযোগিতার জন্য অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সাথে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করা হতে থাকে। এলজিইডি বাস্তবায়িত প্রকল্পগুলোয় সুযোগ অনুযায়ী কৃষি, মত্স্য, বন ও পশুসম্পদ উন্নয়ন এবং ক্ষুদ্রঋণ পাওয়ার সুযোগ প্রদানের ব্যবস্থা করা হয়। প্রযুক্তি ব্যবহারে সফল ব্যক্তিদের খুঁজে বের করে বিভিন্ন সভা, সেমিনার ও কর্মশালায় তাদের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করার ব্যবস্থা নেয়া হয়।

এলজিইডি সরকারি ও বৈদেশিক অর্থায়নে অসংখ্য প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে থাকে। বিশেষ করে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে। একই অধিদপ্তরে এত বিদেশী দাতা সংস্থার সংশ্লিষ্টতা সচরাচর দেখা যায় না। বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নে দেশী-বিদেশী পরামর্শকদের কাজ করার সুযোগ তৈরি হয়। পারস্পরিক সহযোগিতায় প্রকল্প বাস্তবায়নে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও এলজিইডির মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। এলজিইডির কার্যক্রমে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, এনজিও, স্থানীয় জনগণ, উপকারভোগী এবং স্বার্থসংশ্লিষ্টদের সমন্বয় গড়ে ওঠে। কোনো ভৌত অবকাঠামো নির্মাণে কেউ যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকে নজর দেয়া হতে থাকে। কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকলে তাদের সাথে আলোচনা করে তাদের উপযোগী ও গ্রহণযোগ্য প্রশমন ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ তৈরি করা হয়। ভৌত অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণে স্থানীয় জনগণকে সংশ্লিষ্ট করা হতে থাকে, যাতে এর ব্যবহার দীর্ঘস্থায়ী হয়। অবকাঠামো নির্মাণে স্থানীয় দরিদ্র জনগণও যেন অংশীদার হতে পারে, সে লক্ষ্যে সব মাটির কাজে চুক্তিবদ্ধ শ্রমিক দল নিয়োজিত করা হতে থাকে। এই শ্রমিক দল গঠনে নিঃস্ব ও হতদরিদ্র নারীদের অগ্রাধিকার দেয়া হয়। পরিচয়পত্র প্রদান, হাজিরা বই তৈরি ও অর্থ পরিশোধের তথ্য রেকর্ডভুক্ত করে শ্রমিকদের যথাযথ মজুরিপ্রাপ্তিতে স্বচ্ছতার বিধান রাখা হয়। দেশব্যাপী এলজিইডি সুপরিচিত হয়ে পড়ে।

সহকর্মীদের আপদে-বিপদে কামরুল ইসলাম সিদ্দিক সহযোগিতা প্রদানের ব্যবস্থা নিতেন। নিজ পরিবারের সদস্য ভেবে নিয়মিত খবরাখবর রাখতেন। প্রকল্প পরিচালক পদে চাকরিরত তার একজন সহকর্মী ও অভিজ্ঞ প্রকৌশলী নৌকা দুর্ঘটনার শিকার হন। নৌকার অন্যান্য আরোহী নিরাপদে নদীর পাড়ে উঠে এলেও ওই সহকর্মীকে খুঁজে পাওয়া যায়না। কামরুল ইসলাম সিদ্দিক দুর্ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে তদারক করতে থাকেন। পরে তার মরদেহ উদ্ধার হলে অনুশোচনায় ভেঙে পড়েন। আরেক অধস্তন সহকর্মী ও সহকারী প্রকৌশলী দুর্ঘটনায় আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার খবর পান। ওই সহকর্মীর ওপর তিনি খুব একটা সন্তুষ্ট ছিলেন না। তবুও তাকে দেখাশোনার জন্য অন্য সহকর্মীদের পাঠিয়ে দেন। নিজেও দেখতে চলে আসেন। আহত সহকর্মী জ্ঞান ফিরে আসার পর চোখ খুলে সামনে প্রধান প্রকৌশলীকে দেখে আবেগে কেঁদে ফেলেন। হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর তাকে তার নিজ জেলায় অন্য একটি প্রতিষ্ঠানে যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরির ব্যবস্থা করে দেন কামরুল ইসলাম সিদ্দিক। নতুন পদটি আগের চেয়ে উপরে হয়। তিনি অসহায়দের চাকরি পেতে সাহায্য করতেন।

কামরুল ইসলাম সিদ্দিক গ্লোবাল ওয়াটার পার্টনারশিপের কান্ট্রি চ্যাপটার বাংলাদেশ ওয়াটার পার্টনারশিপের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। ইনস্টিটিউট অব ইঞ্জিনিয়ারস, বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন। ঢাকা ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন বোর্ডের নির্বাহী পরিচালক ছিলেন। বিদ্যুত্ উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান হওয়ার পর এ সংস্থায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন নিয়ে আসতে অবদান রাখেন। গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব হয়ে ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও খুলনা নগরের মাস্টারপ্ল্যান তৈরিতে ভূমিকা রাখেন। তিনি যমুনা সেতু বিভাগের সচিব ও প্রাইভেটাজেশন কমিশনের চেয়ারম্যান পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। তিনি ২০ জানুয়ারি ১৯৪৫ সালে জন্মগ্রহণ করেন। মাত্র ৬৪ বয়সে ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরের প্রথম দিন মৃত্যুবরণ করেন। গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনে কামরুল ইসলাম সিদ্দিক সফলতার স্বাক্ষর রেখে গেছেন।

 

লেখক: উন্নয়ন গবেষক