বাংলাদেশের অর্থনীতি চলে স্বমহান গতিতে, একটি আন্তঃসহায়ক শক্তির বলে, শত সহস্র কৃষক, শ্রমিক, মেধাবী ও পরিশ্রমী শিল্পোদ্যোক্তা, পেশাজীবী আমজনতার নিরলস পরিশ্রমের ফসলে। একটা দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পরিমাপক হচ্ছে দেশটির মোট সার্বিক অভ্যন্তরীণ উৎপাদন (বা জিডিপি) যা একটা নির্দিষ্ট সময়ে ওই দেশটির প্রাকৃতিক ও মানবসম্পদ, শ্রম, পুঁজি ও অন্যান্য উপকরণ দিয়ে উৎপাদিত পণ্য ও সেবা। আর জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার হচ্ছে পণ্য বা সেবা উৎপাদন বছর বছর তুলনায় শতকরা কী হারে বাড়ছে। 

বাংলাদেশের অর্থনীতি কৃষিপ্রধান। বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের ১৯৭২ সালে শতকরা ৪৮.৮, ১৯৮০ সালে ৪৪.২, ১৯৯০ সালে ৩৭.৬, ২০০০ সালে ১৯.৫১, ২০১০ সালে ১৪.৫ ও ২০২০ সালে ১২.০৮ ভাগ আসে কৃষি ও তত্সংশ্লিষ্ট খাত থেকে। সমতল ভূমির মোট জমির শতকরা ৯২ ভাগ ব্যবহার হয় কৃষিকাজে আর কৃষিকে অবলম্বন করে জীবিকা নির্বাহ করে শতকরা ৬৪ ভাগ মানুষ। কৃষি খাতে দেশের সিংহভাগ ভূমি ব্যবহূত এবং এ খাতেই কর্মসংস্থানের অন্যতম উৎস। খাদ্য ঘাটতির দেশে দানাদার খাদ্যে এসেছে স্বয়ংসম্পূর্ণতা। কৃষিপণ্যের রফতানি ছুঁয়েছে ১০০ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক।

মূলত চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করেই বাংলাদেশের কৃষির উন্নতি করতে হচ্ছে বা হবে। এজন্য কৃষিতে সরকারি বিনিয়োগের জায়গাটিতে আগ্রহ বাড়াতে হবে। প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তা দিতে হবে। কৃষিতে অর্থায়ন ও প্রযুক্তি বাড়াতে পারলে, সরকারের নীতিসহায়তা বৃদ্ধি ও কিছু প্রতিবন্ধকতা দূর করা গেলে কৃষি খাত তাত্পর্যপূর্ণ অবদান রাখতে এবং বিশ্ব কৃষির বাজারে প্রথম সারির দেশগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে সক্ষম হবে। এখন বড় চ্যালেঞ্জ উৎপাদিত কৃষিপণ্যের সঠিক ব্যবস্থাপনা। অভ্যন্তরীণ বাজার নিয়ে পড়ে থাকলে চলবে না। আন্তর্জাতিক বাজারের অবস্থান উন্নত করতে হবে। বিশ্বব্যাপী খাদ্যেরও একটি প্রচণ্ড শক্তিশালী জায়গা রয়েছে। সেখানে বাংলাদেশকে পৌঁছতে হবে। সেজন্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্পকে আরো এগিয়ে নেয়ার বিকল্প নেই। দেশকে এগিয়ে নিতে হলে কৃষি প্রক্রিয়াজাত শিল্পকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। দেশে-বিদেশে কৃষিপণ্য ও প্রক্রিয়াজাত পণ্যের মার্কেট বড় না হলে কোনোভাবে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। অতএব কৃষিকে রূপান্তর করতে হবে। এজন্য প্রয়োজনে কিছু আইন-কানুন-নীতি বদলাতে হতে পারে। রফতানিমুখী অর্থনীতি তৈরির জন্য কৃষি খাতকে এগিয়ে নেয়ার বিকল্প নেই। করোনার অভিঘাতে এটা উপলদ্ধিতে আসতে হবে যে কৃষির উন্নয়ন ছাড়া স্থিতিশীল উন্নয়ন সম্ভব নয়। কৃষি খাতে বিশেষ করে প্রান্তিক মানুষের প্রয়োজনে যেসব-সুবিধা যেমন স্বল্প সুদে ঋণ এবং দরিদ্র ও অতিদরিদ্র উদ্যোক্তাদের ঋণ এবং প্রণোদনা সহায়তা বাড়ানো। ক্ষুদ্র ও অতিক্ষুদ্রদের ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর আগ্রহ কম। তারা তাদের নির্ধারিত ঋণের বড় অংশ বড় খাতগুলোকে দিচ্ছে। কৃষিতে কম দিচ্ছে। অথচ বাংলাদেশের কৃষকরাও উৎপাদনশীলতায় নেদারল্যান্ডসের মতো উন্নত কৃষি উৎপাদনকারীর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে সক্ষম। বলা বাহুল্য, বাংলাদেশের কৃষক ভারত-পাকিস্তানের তুলনায় অনেক ভালো রয়েছে। দেশের ৬০ শতাংশ অর্থনীতি তাদের ওপর নির্ভর করছে। কৃষকের মেয়ে গার্মেন্টসে কাজ করছে, আর ছেলে বিদেশ থেকে রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছে। কৃষি খাতে ব্যক্তি উদ্যোগ অস্বীকার করার কোনো অবকাশ নেই।

কৃষির চেয়ে জিডিপিতে শিল্প খাতের অবদান বৃদ্ধি পেয়েছে সময়ের অবসরে। ১৯৭২ সালে জিডিপিতে শিল্প খাতের অবদান ছিল শতকরা ৯, ১৯৮০ সালে ১০.৮, ১৯৯০ সালে ৯.৯, ২০০০ সালে ১৫.৬, ২০১০ সালে ২৪.৯৬ ও ২০২০ সালে ২৮.৭৯। প্রসঙ্গত, জিডিপিতে সেবা খাতের অবদান ছিল ২০১০ সালে ৫৩.৩ যা ২০২০ সালে ৫৪.৬-এ উন্নীত হয়। বাংলাদেশের অর্থনীতিকে ট্রেডিং-নির্ভরতা থেকে ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে উন্নয়নের পথে নিয়ে যাওয়ায় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে বাংলাদেশ উদীয়মান অর্থনীতি হতে পেরেছে। দেশীয় শিল্প সম্ভাবনাকে উপযুক্ত প্রযত্ন প্রদানের মাধ্যমে স্বয়ম্ভর শিল্প ভিত্তি ওঠার ওপর বাংলাদেশের জিডিপির প্রবৃদ্ধি ঊর্ধ্বগামী হয়েছে। দেশজ কাঁচামাল ব্যবহার দ্বারা প্রয়োজনীয় ফিনিশড প্রডাক্ট তৈরিতে দেশের শিল্প খাতকে সক্ষম করে তোলা এবং এর ফলে বিদেশী পণ্যের ওপর আমদানিনির্ভরতা তথ্য মহার্ঘ্য বৈদেশিক মুদ্রায় আমদানি ব্যয় হ্রাস, শিল্প ব্যবসা বাণিজ্যে বিনিয়োগে আর বৈদেশিক সাহায্যের ব্যবহারে অর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে প্রত্যাশিত অগ্রগতির হিসাবসংক্রান্ত তুলনামূলক সারণিগুলোর সাথে বিশ্ব অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অবস্থান ও সম্পর্কের শুমার ও বিশ্লেষণ করলে বাংলাদেশ অর্থনীতির অগ্রগতি ও গতিধারা শনাক্তকরণে অসুবিধা হয় না। দেখা যায় আমদানি ও রফতানির পরিমাণ জিডিপির অংশ হিসেবে ক্রমে বৃদ্ধি পেলেও রফতানির মিশ্র প্রবৃদ্ধি ঘটেছে। যদিও অস্থিতিশীল ও ভিন্নমাত্রিক শুল্ক কাঠামোর প্রভাব পড়েছে বহির্বাণিজ্যে ভিন্ন অনুপাতে। এতে বোঝা যায় বিশ্ববাজারের সঙ্গে সংগতি রেখে বাংলাদেশের বহির্বাণিজ্য সাধারণ সূত্র অনুসরণপূর্বক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করেই এগিয়েছে। উৎপাদন না বাড়লেও সরবরাহ বাড়ার প্রবণতায় অভ্যন্তরীণ বাজারে মূল্যস্থিতিতে বিরূপ প্রতিক্রিয়া পড়েছে। আবার ইনফরমাল বর্ডার ট্রেডের ফলে দেশজ উৎপাদনের বিপত্তি ঘটেছে। ইনফরমাল ট্রেড বাংলাদেশের বহির্বাণিজ্যের ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অদৃশ্য এক অন্ধগলি ও কালো গর্ত হিসেবে কাজ করেছে। বাংলাদেশের আমদানীকৃত সামগ্রী অন্য দেশে পাচার হয়েছে আবার কোনো কোনো বিদেশী পণ্যের অবৈধ প্রবেশ ঠেকাতে গিয়ে আরোপিত ট্যরিফে দেশী সামগ্রী উৎপাদন ব্যবস্থার স্বার্থের সাথে সংঘাত হয়েছে।

দেশের অভ্যন্তরীণ সঞ্চয় ও বিনিয়োগের জন্য পুঁজির অপ্রতুলতা থাকায় বিপুল শ্রমিক শক্তির জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি, দেশীয় কাঁচামালের কার্যকর ব্যবহারকল্পে উপযুক্ত প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতি আমদানির দ্বারা উৎপাদন কৌশল জানা, আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে রফতানিমুখী শিল্পোদ্যোগ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন এবং প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ ও রূপান্তরে বাংলাদেশ বরাবরই বিদেশী পুঁজিপ্রত্যাশী। বাংলাদেশে বিদেশী বিনিয়োগের প্রত্যাশা ও সম্ভাবনা সেই সত্তরের দশক থেকে। সত্তরের দশকের প্রথমার্ধে যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি পুনর্গঠন ও পুনর্বাসনকালে প্রাইভেট সেক্টরের ওপর পাবলিক সেক্টরের প্রধান্য ও নিয়ন্ত্রণ বলবৎ ছিল, দ্বিতীয়ার্ধে রাজনৈতিক পটপরির্তন ও স্থিতিশীল পরিস্থিতি প্রেক্ষাপটে শিল্পোদ্যোগে পাবলিক সেক্টরের নিয়ন্ত্রণ শিথিল এবং আধিপত্য হ্রাস পেতে থাকে। ১৯৮০-৮১ সালে সরকার প্রাইভেট সেক্টরের উন্নয়ন লক্ষ্যে নয়া শিল্পনীতিতে কিছু মৌল পরিবর্তন আনেন। উল্লেখ্য, এ সময় ১৯৮০ সালেই ফরেন ইনভেস্টমেন্ট প্রমোশন অ্যান্ড প্রটেকশন অ্যাক্ট জারি হয়। বাংলাদেশ এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোনস অথরিটি (বেপজা) অ্যাক্টও পাস হয় এ সময়। এতৎসত্তেও আশির দশকে বিদেশী বিনিয়োগ তেমন আসেনি বাংলাদেশে। পুরো দশকে ইপিজেডের বাইরে বিদেশী বিনিয়োগ প্রস্তাব নিবন্ধিত হয় মাত্র ৪০৪ মি. মা. ডলার।

সত্তর ও আশির দশকে অর্থনৈতিক সাহায্য হিসেবে বাংলাদেশে বিদেশী ঋণ ও অনুদান এসেছে মূলত পাবলিক সেক্টরের জন্য। প্রাইভেট সেক্টরের পুঁজির প্রয়োজনীয়তা ও তার চাহিদা সৃষ্টি হয় আশির দশকের শেষ ভাগে। প্রাইভেট সেক্টরের বিকাশ শুরু হলে এবং বিদেশী পুজি প্রবেশের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও সুযোগ-সুবিধার সমাহার ঘটানোর নীতিমালা ঘোষিত হলে বিনিয়োগ বোর্ড অ্যাক্ট, ১৯৮৯ বলে প্রতিষ্ঠিত পোষক প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগ বোর্ডের কার্যক্রম শুরু হলে বাংলাদেশে বিদেশী বিনিয়োগপ্রবাহের পরিবেশ সৃষ্টি হয়। একই সাথে বিশ্বায়ন প্রক্রিয়া ও বাজার অর্থনীতির অবগাহনে বাংলাদেশ সিক্ত হলে এশীয় উন্নয়ন দেশেগুলো বিশেষ করে দক্ষিণ-পূর্ব ও দূরপ্রাচ্যের দেশগুলোর উন্নয়নের নতুন ধারা সূচিত হলে (যা এশিয়ান মিরাকল নামে খ্যাত) বাংলাদেশ বিদেশী বিনিয়োগ উৎসক্ষেত্র হিসেবে প্রতিভাত হয়।

বাংলাদেশে বেসরকারি খাতে বিদেশী পুঁজি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে যে নীতিমালা ঘোষিত হয় তাতে বলা হয় (১) বিদেশী বিনিয়োগ আহ্বান করা হবে ওই সব খাতে বা ক্ষেত্রে যেসব শিল্পোৎপাদন ব্যবস্থা বাংলাদেশে নেই অথচ যা বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজনীয়, (২) বিদেশী বিনিয়োগ আহ্বান করা হবে বাংলাদেশে বিদ্যমান ওই-জাতীয় শিল্পোৎপাদন ব্যবস্থার অধিকতর বিকাশ ঘটানোর জন্য যা সামাজিক প্রয়োজন ও চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল বিদ্যমান এবং (৩) বিদেশী বিনিয়োগে সেই শিল্প প্রতিষ্ঠায় উৎসাহ ও সহায়তা প্রদান করা হবে যা অবদান রাখতে সক্ষম (ক) দেশে পুঁজি, প্রযুক্তি এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনা বৃদ্ধিতে, (খ) প্রাকৃতিক সম্পদের অনুসন্ধান, জরিপ ও আহরণে (গ) বাংলাদেশের ব্যালান্স সব পেমেন্ট পরিস্থিতির উন্নয়নে (ঘ) বাংলাদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিতে এবং (ঙ) অন্য যেকোনো উপায়ে দেশের অর্থনীতির সার্বিক বিকাশ সাধনে।

নীতিমালায় বলা হয়, দেশীয় শিল্পোদ্যোক্তা বা উৎপাদন উদ্যোগে যেসব সুুযোগ-সুবিধা ও নিরাপত্তা নিশ্চয়তার বিধান দেয়ার ব্যবস্থা অনুসরণ করা হবে বিদেশী বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও একই সুুযোগ-সুবিধা ও নিরাপত্তার বিধান থাকবে এবং এ ব্যাপারে কোনো প্রকার পক্ষপাতিত্ব ও বৈষ্যম্যমূলক আচরণ করা হবে না। বিদেশী বিনিয়োগকে অধিকতর আকর্ষণের লক্ষ্যে ইকুইটি শেয়ারের ক্ষেত্রে কোনো প্রকার মাত্রা বেঁধে না দেয়া এবং লভ্যাংশসহ পুরো পুঁজি প্রত্যাবাসনের অবাধ সুযোগ ঘোষিত হয়। মাত্র পাঁচটি খাত বাদে সব খাতে দেশী-বিদেশী বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়। নির্দিষ্ট পরিমাণ বিদেশী পুঁজি বিনিয়োগকারীকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব দেয়ার সুযোগও ঘোষিত হয়। বিদেশী প্রযুক্তি হস্তান্তরের সুযোগ প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশায় বিদেশী বিশেষজ্ঞ কর্মীদের জন্য কর রেয়াতসহ সহজ শর্তে ওয়ার্ক পারমিট প্রদানের সুযোগ রাখা হয়। রফতানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মেশিনারি ও কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক মওকুফের ব্যবস্থা ষোষিত হয়। দেখা যায় প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বেসরকারি খাতে বিদেশী বিনিয়োগের জন্য বাংলাদেশ ঘোষিত সুযোগ-সুবিধাদি বেশি এবং অধিকতর উদার।

বিদেশী বিনিয়োগের দ্বারা রফতানি বৃদ্ধি তথা ব্যালান্স অব পেমেন্ট পরিস্থিতির উন্নতির শুমারি করলে দেখা যায়, ইপিজেডে প্রতিষ্ঠিত বিদেশী বিনিয়োগ প্রকল্প থেকে রফতানি আয় স্বাভাবিক ও সহজভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে তবে সে মাত্রা আমদানি (কাঁচামাল) বাদ দিয়ে ভ্যালু অ্যাডিশনের ক্ষেত্রে খুব একটা উল্লেখজনক নয়। ১০০ শতাংশ রফতানিমুখী শিল্পের জন্য কাঁচামালও যন্ত্রপাতি আমদানির ওপর শুল্ক রেয়াত বাবদ রাজস্ব আয় ভর্তুকি দিয়ে প্রকৃত প্রাপ্তির হিস্যা অনেক কম। ইপিজেডে প্রতিষ্ঠিত শিল্প-কারখানাগুলোর শতকরা ৮৭ ভাগের উৎপাদনে কাঁচামাল ও খুচরা যন্ত্রপাতি আমদানিনির্ভর। এরই মধ্যে আরো পাঁচটি নতুন আঞ্চলিক ইপিজেড এবং গত পাঁচ বছরে সরকারি খাতে বঙ্গবন্ধু শিল্পনগর এবং বেশ কয়েকটি বেসরকারি শিল্পাঞ্চল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, আরো কয়েকটি দেশী ও বিদেশী শিল্পাঞ্চল হতে চলেছে। স্থানীয় কাঁচামাল ও শিল্পোদ্যোক্তাদের রফতানিমুখী শিল্প প্রতিষ্ঠায় আগ্রহী করে তোলা সম্ভবপর হলে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি শিল্প হাব হয়ে উঠবে বাংলাদেশ।

বাংলাদেশের মতো জনসংখ্যাবহুল, স্বল্প কৃষিজমি, বেকারের ভারে ন্যুজ, অতি আমদানিনির্ভর অর্থনীতিতে শ্রমঘননির্ভর শিল্প প্রতিষ্ঠা, বৈদেশিক মুদ্রা আনয়নকারী ও প্রযুক্তিবাহী বৈদেশিক বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। কিন্তু এ দেশে বিগত পাঁচ দশকে আসা বৈদেশিক বিনিয়োগের স্থিতিপত্র কষলে দেখা যায় বা যাবে সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগ সূত্রে বৈদেশিক মুদ্রা ততটা আসেনি যতটা বরং দেশী মুদ্রায় অর্জিত মুনাফা বৈদেশিক মুদ্রায় রূপান্তরিত হয়ে বিদেশে চলে গিয়েছে (যেমন টেলিকম, সিমেন্ট, ধূমপান সেক্টরে) বা যাচ্ছে। আসেনি তেমন কোনো শ্রমঘন শিল্প। বাংলাদেশের অদক্ষ শ্রমিকরা যখন অধিক অর্থ ব্যয় করে স্বল্প মজুরিতে বিদেশে যেয়ে অনেক ক্ষেত্রে মানবেতর জীবন যাপন করছে এবং দেশে শিক্ষিত বেকারের মিছিল যখন দ্রুত ধাবমান, তখন এ দেশে স্টেট অব আর্টে চালিত কতিপয় বিদেশী শিল্প (যেমন সিমেন্ট, সিগারেট, টেলিকম, শিপিং) গড়ে উঠছে আর গার্মেন্টসসহ প্রায় সব বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে মধ্য ও উচ্চপর্যায়ে বিদেশীদেরই মোটা বেতনে অধিক কর্মসংস্থান হয়েছে বা হচ্ছে। বাংলাদেশ থেকে বিদেশীরা বছরে প্রায় ৭-৮ বিলিয়ন ডলার বেতন, পারিশ্রমিক বাবদ নিয়ে যাচ্ছে। লক্ষণীয় যে দেশে রেমিট্যান্স আসছে অধিক অর্থ ব্যয় করে বিদেশে যাওয়া অদক্ষ শ্রমিকদের কাছ থেকে। সেকেন্ড হোম কিংবা মেধা পাচার হয়ে যাওয়া শিক্ষিত, পেশাজীবীদের কাছ থেকে অর্থনীতি কোনো প্রত্যাবসন পায় না। তারা দেশী পুঁজি বা মুদ্রা বরং বিদেশে নিয়ে যান। আবার অন্যদিকে দেশে প্রত্যাবাসিত অর্থের টাকা অলস হয়ে যাচ্ছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি থেকে তা বোঝা যায়। আমদানিনির্ভর অর্থনীতিতে বিদেশী মুদ্রার রিজার্ভ একটি আনুপাতিক পর্যায় পর্যন্ত হওয়া বা থাকার আবশ্যকতা রয়েছে। অর্থনৈতিকভাবে সদাচঞ্চল ও সক্রিয় অর্থনীতির জন্য রিজার্ভ অবশ্যই ভালো। কিন্তু অলসভাবে পড়ে থাকার কারণে রিজার্ভের বৃদ্ধি এবং সেই বৃদ্ধির জন্য আত্মতৃপ্তি ও গর্ববোধ বেমানান বৈকি। কেননা ‘প্রশান্তিবোধ’ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ের সচেতনতায় শৈথিল্য আনতে পারে। অতিরিক্ত তারল্য বিনিয়োগ ব্যর্থতার পরিচয় বহন করে, মানি সাপ্লাইয়ে প্রতিকূল পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে। গত কয়েক বছর ডলারের সাথে টাকার বিনিময় হারকে স্ট্যাটিক রাখতে হয়েছে। সামষ্টিক অর্থ ব্যবস্থাপনায় অলস অতিরিক্ত রিজার্ভ একটা ‘অতিনিরাপদ’ ধারণার জন্ম দিয়ে কর্ম ও দায়িত্ব সচেতনতাকে নীতিনির্ধারণে প্রভাবিত করে ব্যয়ে দায়িত্বহীন ও বলগাহীন করে দিতে পারে।

বিদেশী বিনিয়োগে রফতানিমুখী শিল্প কারখানাগুলোর সিংহভাগই হলো রেডিমেড গার্মেন্টস সেক্টরে। হালে আইটি সেক্টরে বিদেশী বিনিয়োগসংবলিত কিছু শিল্প নিবন্ধিত হয়েছে কিন্তু তাদের রফতানির হিসাব সাধারণত দৃশ্যগোচর নয়। বাংলাদেশে বাকি বড় বড় বিদেশী বিনিয়োগ গ্যাস ও বিদ্যুৎ সেক্টরে। আহরিত গ্যাসের প্রধান ক্রেতা বাংলাদেশ নিজে আর উৎপাদিত বিদ্যুতের ব্যবহারকারীও বাংলাদেশ। রফতানির আপাত সুযোগ সৃষ্টি হওয়ার মতো শিল্প এসব ক্ষেত্রে নেই। সিমেন্ট শিল্পে ব্যাপক বিদেশী বিনিয়োগ হলেও তা দেশীয় বাজার দখলকে কেন্দ্র করে। অধিকন্তু সিমেন্ট শিল্পে ভ্যালু অ্যাডিশন নেই বললে চলে। বাংলাদেশে এখনো ওই বিদেশী বিনিয়োগ প্রয়োজন ও আরাধ্য যা এ দেশীয় কাঁচামাল ব্যবহার করে রফতানি পণ্য উৎপাদনে, আমদানী ব্যয় হ্রাসকারী প্রতিস্থাপনীয় পণ্য উৎপাদনে, শ্রমশক্তির জন্য উপযুক্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সক্ষম প্রযুক্তি হস্তান্তরমূলক টেকনিক্যাল প্রশিক্ষণের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। আর ঢালাওভাবে সব সেক্টরকে বিদেশী বিনিয়োগের জন্য উন্মুক্ত না করে এবং সবাইকে একই সহায়তা ও সুযোগ না দিয়ে দেশীয় শিল্পোদ্যোক্তাদের টেকসই ও সহনশীল উন্নয়নের স্বার্থে সময়ে সময়ে পরিস্থিতি পর্যালোচনার ভিত্তিতে শুধু নির্ধারিত খাতে বিনিয়োগ আহ্বান করা উচিত এবং খাতওয়ারি অগ্রগতি যাচাই করে সুযোগ-সুবিধা প্রদানের শর্তগুলোও পুনর্বিবেচনার অবকাশ রয়েছে।

মধ্যম আয়ের দেশ অভিলাষী একটি দেশে সামাজিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় আর্থিক ‘অন্তর্ভুক্তি’র দৃষ্টিভিঙ্গ বিশেষ পুষ্টিকর ও উপাদেয় এ বিষয়ে কোনো দ্বিমত নেই। অন্তর্ভুক্তির দর্শনকে সার্বিকভাবে টেকসই ও বাস্তবায়নযোগ্য করতে হলে প্রশাসনে, আর্থসামাজিক পরিবেশে, সংস্থায়, প্রতিষ্ঠানে, দেশজ সংস্কৃতিতে সর্বত্র পক্ষভুক্তকরণের দৃষ্টিভঙ্গি ও বিচ্যুতকরণ ব্যবস্থাপনার উপস্থিতিতেই অন্তর্ভুক্তি উন্নয়ন দর্শন যাতে ব্যর্থতায় পর্যবসিত না হয় সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। রাষ্ট্রের সেবা ও সুবিধা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে (ক্ষেত্রবিশেষে) বিশেষ প্রাধান্য প্রাপ্তি এবং ব্যাংক খাতে অধোগতির প্রতিকার প্রতিবিধান এ পক্ষপাতিত্ব কিংবা অপারগতার মধ্যে অন্তর্ভুক্তির মতো কার্যকর দর্শন হারিয়ে যেতে পারে না। উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব ঘটার কারণে যে দু-তিন গুণ ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে, ব্যাংক খাতে বড় দাগে আত্মসাৎ ও লোপাট হচ্ছে, তা তো যেকোনো বিবেচনায় ‘গুডস অ্যান্ড সার্ভিস প্রডিউস না হয়েও অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়’। নানা অস্থিরতায় উৎপাদন ব্যাহত হয়ে, সরবরাহে বিঘ্ন ঘটে, নানা দুর্ঘটনায়, দুর্নীতিতে, অগ্নিকাণ্ডে, বন্যায় যে বিপুল ক্ষতি হয় সেটিই বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি দুই ডিজিটে যাওয়ার সুযোগ ও সম্ভাবনাকে নাকচ করে দিচ্ছে।

সব উন্নয়ন ভাবনায় আস্থা একটি বড় জিনিস। বিশেষ করে ব্যাংক ও পুঁজিবাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে নিকট অতীতের কয়েকটি অর্থবছরে ব্যাংক খাতে ও পুঁজিবাজারে যেসব আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতি সংঘটিত হয়েছে বা হচ্ছে তাকে ‘সামান্য ক্ষতি’ হিসেবে দেখার অবকাশ নেই এজন্যে যে আখেরে এসব ক্ষত বৃহৎ আকারে ব্যাংকিং সেক্টর, মানি মার্কেট ও পুঁজিবাজারকে আস্থাহীন করে বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। একটি প্রাগ্রসরমান অর্থনীতিতে আস্থা বিনষ্টকারী এ ধরনের বিচ্যুতি বিভ্রান্তি বহুমুখী প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে।

জিডিপিতে মানবসম্পদের অবদান পর্যালোচনায় দেখা যায় বিগত পাঁচ দশকে বাংলাদেশের বিদ্যমান শিক্ষা ব্যবস্থা এ দেশের জনগণকে বিশেষ করে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ট হিসেবে অবস্থানরত যুবসমাজকে এখনো পর্যাপ্ত যথাযথ দক্ষ জনসম্পদে বা প্রশিক্ষিত লোকবল হিসেবে গড়ে তুলতে পারেনি। যার জন্য এ দেশ থেকে বিদেশে যাচ্ছে অদক্ষ শ্রমিক আর বিদেশের দক্ষ জনবল এ দেশের মধ্য ও উচ্চতর পদগুলোতে বেশি বেতনে নিয়োজিত হচ্ছে। বিভিন্ন গবেষণা পর্যালোচনায় বেরিয়ে এসেছে, বাংলাদেশী তরুণ উদ্যোক্তা ও ব্যবস্থাপকদের মধ্যে নেতৃত্বদানের ক্ষেত্রে আত্মবিশ্বাসের অভাব, ক্ষেত্রবিশেষে দুর্বলতা, প্রায়োগিক জ্ঞানের নিম্নগামিতা, প্রশিক্ষণ ও অধিক শিক্ষাগ্রহণে আগ্রহের অভাব, সৃজনশীল পৃষ্ঠপোষকতাদানের ঘাটতি বা কমতি রয়েছে। বাংলাদেশের জন্য উঠতি বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ-পরিস্থিতিতে টিকে থাকা কিংবা অধিকতর যোগ্যতা নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার মতো উপর্যুক্ত ও দক্ষ জনবলের যেমন প্রয়োজন তেমনি টেকসই ও লাগসই প্রযুক্তি প্রয়োগ ও সমন্বয়ে দক্ষ জনবলের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। তার সাথে প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক কর্মকুশলতা। এ প্রয়োজনীয়তার বিপরীতে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার গুণগত মান কমে যাচ্ছে এবং বিভিন্ন সম্প্রসারণমূলক কর্মকাণ্ডে নতুন নতুন যেসব চ্যালেঞ্জ দেখা যাচ্ছে, সেসব চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়ে তা মোকাবেলা করার জন্য পর্যাপ্ত ও উপর্যুক্ত লোকবলের অভাব প্রকট হয়ে উঠছে।

অবকাঠামো খাতে পাঁচ দশকের উন্নতি চোখে পড়ার মতো। যমুনায় বঙ্গবন্ধু সেতু নির্মাণের ( ১৯৯৮) ফলে উত্তরবঙ্গের সাথে কেন্দ্রের সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থাই শুধু প্রতিষ্ঠিত হয়নি, উন্নয়নে পিছিয়ে পড়া উত্তরবঙ্গ দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে অবদান রাখতে সক্ষম হয়েছে। যেমন আশার সঞ্চার হতে চলেছে পদ্মা সেতু নির্মাণের ফলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অবহেলিত জনপদের কর্মচাঞ্চল্যে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে প্রায় ২ শতাংশ যোগ হবে। মেঘনা, গোমতি ও ভৈরব সেতু এরই মধ্যে ইতিবাচক অবদান রেখে চলেছে। বাংলাদেশে প্রতিটি দশকে পল্লী সড়ক বেড়েছে। ১৯৯০ সালে গ্রামীণ পাকা সড়ক ছিল ৮ হাজার ৬৭০ কিলোমিটার। ২০১০ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ৭২ হাজার ৪৬০ কিলোমিটারে আর বর্তমানে ১ লাখ ২৮ হাজার ৫২৮ কিলোমিটার। এভাবে সড়ক বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পেছনের দশকগুলোজুড়ে থাকা দরিদ্র মানুষ সচ্ছল হতে শুরু করেছে। খানা আয়-ব্যয় জরিপ অনুযায়ী, দারিদ্র্যসীমার নিচে পল্লী দারিদ্র্যের পরিমাণ ২০০৫ সালে ২৮.৬ শতাংশ থাকলেও ২০১০ সালে তা কমে ২১.১ শতাংশে নেমে আসে। এ সময়ে নগর দারিদ্র্য পল্লী দারিদ্র্য হারের চেয়ে কম হারে কমেছে।

 

ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ: সরকারের সাবেক সচিব

এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান