৫০ বছর আগে স্বাধীনতা যুদ্ধের ধ্বংসাত্মক ও দারিদ্র্যের ক্ষত মুছে বাংলাদেশ আজ অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটি বৈশ্বিক দৃষ্টান্ত। এ সাফল্যের নেপথ্যে অনেকগুলো অনুঘটক কাজ করলেও তাদের রাজনৈতিক অর্থনীতির দুটো সতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ফুটে উঠেছে।

বছর বছর প্রাকৃতিক দুর্যোগ, দীর্ঘদিন বৈদেশিক সাহায্য আর প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভরশীলতা এবং উদ্বাস্তু ও অভিবাসীদের উৎসভূমি বাংলাদেশ একদা পরিচিত ছিল ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ হিসেবে, যেমনটা জিয়া হায়দার রহমান তার ‘ইন দ্য লাইট অব হোয়াট উই নো’ নামের প্রথম উপন্যাসে উল্লেখ করেছেন। তবে স্বাধীনতার ৫০ বছর উদযাপনকালে বাংলাদেশ আজ বিশ্বব্যাপী উন্নয়নের দৃষ্টান্ত হিসেবে পরিচিত।

বাংলাদেশের অন্যন্য অর্জনের মধ্যে রয়েছে নাগরিকদের গড় জীবনমানের নাটকীয় উন্নতি। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সাম্প্রতিক তথ্যানুসারে, বাংলাদেশের মাথাপিছু জিপিডি (ক্রয়-শক্তি-সমতা শর্তে পরিমাপ করা) যেখানে ১৯৮৭ সালে পাকিস্তানের প্রায় অর্ধেক ছিল, সেখানে ২০০৭ সালে তা বেড়ে ভারতের দুই ভাগের তিন ভাগে পৌঁছে। কিন্তু ২০২০ সালে বাংলাদেশ লেটার মার্ক অর্জনের মাধ্যমে প্রাক্তন ও প্রতিবেশী দেশকে ছাড়িয়ে যায়। তৈরি পোশাক শিল্পের সফলতার ওপর নির্ভর করে বাংলাদেশ আজ চীন ও ভিয়েতনামের সঙ্গে সমানতালে পাল্লা দিয়ে চলেছে। আরো লক্ষণীয় বিষয় হলো তাদের সামাজিক সূচকের উন্নতি, যেমন—গড় আয়ু বৃদ্ধি, শিশু ও মাতৃমৃত্যু হ্রাস এবং শ্রমশক্তি হিসেবে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি। সমগুরুত্বপূর্ণ দিকটি হচ্ছে বাংলাদেশ এর গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে।

তবে এ-জাতীয় হিসাব-নিকাশের বাইরে গিয়ে আমরা যদি দেখি তাহলে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা দুটি দিক থেকে সতন্ত্র; ব্যাপক উন্নয়নের দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে বিবেচনার ক্ষেত্রে হয়তো খুব উদারভাবে প্রশংসা করা সম্ভব নয়। প্রথমটি দেশ গঠন ও সক্ষমতা সম্পর্কিত। আধুনিক রাষ্ট্রের সংজ্ঞায়িত বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এটি প্রয়োজনীয় পরিষেবাদি বিধানের ক্ষেত্রে একক কর্তৃত্ব বজায় রাখে। দ্বিতীয় একচেটিয়া কর্তৃত্বটি তৃতীয়টির উদ্দেশ্য পরিবেশন করে। এমনকি রাষ্ট্র যখন সরাসরি পরিষেবা সরবরাহ করে না তখন তারা বিভিন্ন শর্ত বেঁধে দেয়।

তবে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে পরিষেবা সরবরাহের বিষয়গুলোকে স্বেচ্ছায় এককভাবে বেসরকারি খাতের ওপর ছেড়ে দিয়েছে। ব্র্যাকসহ বিভিন্ন নাম করা এনজিও স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও আর্থিক পরিষেবা, ডায়রিয়াজনিত অসুস্থতায় পানিশূন্যতা দূর করতে ওরাল রিহাইড্রেশন থেরাপি ও জনস্বাস্থ্য নিশ্চিতে টিকাদানের মতো বিষয়গুলো ঘিরে পালন করছে প্রধান ভূমিকা। এনজিওগুলোর বাহ্যিক উপস্থিতি সত্ত্বেও বাংলাদেশের নেতারা এখন পর্যন্ত এটা বুঝে উঠতে পারেনি যে ওই কাজগুলো করা মূলত রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

এ পর্যায়ে রাজনৈতিক অর্থনীতি পাঠ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ নিজেদের বিশেষভাবে আর্কষণীয় করে তোলে। সাধারণত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের লক্ষ্য থাকে তাদের নাগরিকদের প্রয়োজনীয় সেবা সরবরাহ করে জনসমর্থন নিশ্চিত করা। ক্ষমতা ও বৈধতা হারাতে হতে পারে বলে বেশির ভাগই এটাকে ঘৃণা করে। কারণ সরকার সংশ্লিষ্ট নয় এমন ব্যক্তি ও সংস্থাগুলো পরিষেবা সরবরাহের ক্ষেত্রে যত বেশি বেশি সংক্রিয় হয়ে উঠবে, রাষ্ট্রগুলো তত বেশি হুমকি অনুভব করবে। তবে বাংলাদেশ কিন্তু এ-জাতীয় বিষয়গুলো নিপুণভাবে কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছে।

আংশিকভাবে যদি বলা হয় তাহলে বলা যায়, বাংলাদেশ উঠে এসেছে অনেক বেশি দারিদ্র্য ও সীমিত রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার মধ্য দিয়ে। বিশেষ করে স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়গুলোতে জনপরিষেবা-সংক্রান্ত বিষয়গুলো নিয়ে বড্ড বেশি ভুগতে হয়েছে তাদের। রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা না থাকায় সৃষ্ট শূন্যতা পূরণে এগিয়ে এসেছে অন্যরা। সে সময় যারা সুযোগগুলো কাজে লাগিয়েছে তারা বড় অংকের বৈদেশিক সাহায্যপ্রাপ্ত হয়েছে। সহস্রাব্দ শুরুর আগে ২৫ বছর অর্থাৎ ২০০০ সাল পর্যন্ত ধরে যা ছিল বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির ৫ শতাংশের সমপরিমাণ।

অন্তর্নিহিত আরো কিছু গভীর কারণও থাকতে পারে। যেমন বাংলাদেশের কর-জিডিপির অনুপাত গড়ে ১০ শতাংশেরও কম। এ থেকে যে কেউ অনুমান করে নিতে পারে যে রাজনৈতিকভাবে ব্যয়বহুল কর আরোহণ কার্যক্রম এড়াতে রাষ্ট্র সুস্পষ্টভাবে এর পরিষেবা সরবরাহের বিধানটিকে অস্বীকার করেছিল। সুতরাং পাকিস্তানকে একটি ব্যর্থ রাষ্ট্র, ভারতকে বিপর্যস্ত রাষ্ট্র মনে হলেও বাংলাদেশ তার দক্ষিণ এশীয় প্রতিবেশীদের তুলনায় ভালো অবস্থায় অর্থাৎ উন্নয়ন পরিক্রমার মধ্যেই রয়েছে।

বাংলাদেশের আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে রফতানি সক্ষমতার ব্যাপক উন্নয়ন। এ উৎপাদন সক্ষমতার নেপথ্যে রয়েছে বাংলাদেশী নারীদের বড় ধরনের অংশগ্রহণ। বিশেষ করে নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিতের মাধ্যমে বাংলাদেশে কীভাবে অগ্রসর হয়েছে, অর্থনীতিবিদ আহমেদ মুশফিক মোবারাক ও র্যাচেল হিথ খুব ভালোভাবে তা তুলে ধরেছেন।

শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে রঘুরাম রাজনের সঙ্গে করা আমার যৌথ গবেষণা অনুসারে, ঐতিহাসিকভাবে উন্নয়নশীলদের মধ্যে তুলনামূলক গরিব দেশগুলোকে যে রফতানি-সংক্রান্ত সহায়তা দেয়া হয়েছে, তা মূলত ‘অভিশপ্ত-আনুকূল্য’—প্রাকৃতিক সম্পদের বিকল্প। বৈদেশিক সহায়তা কোনো অংশে প্রাকৃতিক তেল কিংবা গ্যাসের চেয়ে কম নয়, এটি প্রকৃত বিনিময় হারকে অনেক বেশি শক্তিশালী করে, অপ্রতিরোধ্য করে তোলে রফতানি খাতকে। তবে বাংলাদেশ এটিকে আরো গতিশীল করেছে।

সৌভাগ্য ও সুযোগের বাইরেও অন্যান্য যে কারণ রফতানি সাফল্যে অবদান রেখেছে তার মধ্যে রয়েছে প্রচুর স্বস্তা শ্রমশক্তি, যা ডলার মজুরির পরিমাণ কম রেখে বৈদেশিক সাহায্য ও রেমিট্যান্সের মাধ্যমে বিনিময় হারকে শক্তিশালী করে এবং বিদেশী বাজারে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার লাভ করে। প্রথমত, মাল্টি-ফাইবার এগ্রিমেন্ট (এটি বিলুপ্ত হওয়া অবধি) এবং পরবর্তী সমেয় আমেরিকা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন কর্মসূচির আওতায় তারা এ অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত হয়।

বাংলাদেশের সামনে আগামীতে রয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ। তবে এর অর্থনৈতিক রূপান্তরকে টিকিয়ে রাখার ক্ষমতা নির্ভর করবে ওই স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য দুটি কীভাবে বিকশিত হয় তার ওপর। বেসরকারি নিয়ামকগুলো যদি রাজনীতিতে প্রবেশ করে তবে তারা রাষ্ট্রের পরিষেবা সরবরাহের বিধানকে বিঘ্নিত করে বিদ্যমান ভারসাম্যকে বিচলিত করতে পারে। তবে যদি এমনটা ঘটে, তাহলে রাষ্ট্রটিকে অবশ্যই করের পরিমাণ বাড়িয়ে তুলে প্রমাণ করতে হবে যে তারা এনজিওগুলোর মতোই পরিষেবামূলক কাজগুলো সম্পাদনে সক্ষম।

একইভাবে মজুরি বৃদ্ধি, দক্ষতাসম্পন্ন শ্রমিক তৈরি ও শ্রমমান বাস্তবায়ন, বিধিগুলোর প্রয়োগ এবং উন্নত বাজারগুলোতে অগ্রাধিকারভিত্তিক প্রবেশ প্রতিবন্ধকতার মাধ্যমে বাংলাদেশের রফতানি প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমতে পারে।

১৯৪৭ সালে বাংলাদেশ ধর্মীয় কারণে ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন হয় এবং ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের বিপরীতে ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক কারণে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। কয়েক দশক ধরে দেশটি ভারত ও পাকিস্তানের অনুকম্পার বিষয় ছিল। এখন আর নয়। দৃশ্যপটের পরিবর্তন হয়েছে। বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। দ্বিভাঙা দেশটি যে গতিতে সমৃদ্ধির পথে অগ্রসরমান তা থেকে কোণঠাসা হয়ে পড়া ভারত ও পাকিস্তান আজ শিক্ষা নিতে পারে।

স্বত্ব:
প্রজেক্টসিন্ডিকেট

 

অরবিন্দ সুব্রামানিয়াম: ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের সাবেক প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টা

ভাষান্তর: রুহিনা ফেরদৌস