বাংলাদেশের অর্থনীতি-সমাজে পুঁজিবাদ প্রধান কিনা তা নিয়ে ৬০ দশক থেকে আমরা অনেক বিতর্ক দেখেছি, ৭০ দশকেও তা অব্যাহত ছিল। ১৯৭৪ সালে আখলাকুর রহমানের লেখা ‘বাংলাদেশের কৃষিতে ধনতন্ত্রের বিকাশ’ পুস্তিকা ঘিরেও আলোচনা-বিতর্ক ছিল বেশ কিছুদিন। তবে এ বিতর্ক এখন আর কেউ করবে বলে মনে হয় না। কেননা বাংলাদেশে পুঁজিবাদের বিকাশ এখন খুবই দৃষ্টিগ্রাহ্য বিষয়। তবে পুঁজিবাদের অভ্যুদয় প্রক্রিয়া, তার বিকাশ চারিত্র্য সব দেশে একরকম নয়। বিভিন্ন দেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি, ধর্ম, প্রতিষ্ঠান, শ্রেণীবিন্যাস, বিশ্ব ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কের ধরন ইত্যাদি কারণে পুঁজিবাদের অভ্যুদয়, বিকাশ ও ধরনের মধ্যেও কিছু পার্থক্য দেখা দেয়।

সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের জন্ম। ৬০ দশকে সামরিক জান্তাবিরোধী লড়াই থেকে শুরু করে এ যুদ্ধে প্রবেশ মানুষের মধ্যে পাকিস্তান থেকে মৌলিকভাবে ভিন্ন একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা তৈরি করেছিল। তারই প্রকাশ হিসেবে স্বাধীনতার ঘোষণায় নতুন দেশের জন্য লক্ষ্য ঘোষণা করা হয়েছিল—‘সাম্য, সামাজিক ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদা’। যুদ্ধ শেষে নতুন দেশের সংবিধানে চার মূলনীতির একটি নির্দিষ্ট করা হয়েছিল সমাজতন্ত্র। ৬০ ও ৭০ দশকে বৈশ্বিক-আঞ্চলিক পরিস্থিতি ও মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্ক্ষায় সংবিধানে সমাজতন্ত্র অন্যতম নীতিমালা হিসেবে অন্তর্ভুক্তি খুবই স্বাভাবিক ঘটনা ছিল। তবে পরিত্যক্ত শিল্প-কারখানা রাষ্ট্রায়ত্ত করা, ২৫ বিঘা পর্যন্ত কর মওকুফ, বিনিয়োগ ও বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণসহ কিছু কর্মসূচিকে সমাজতান্ত্রিক নীতির বাস্তবায়ন বলেই মনে করা হচ্ছিল। যারা পরিকল্পনা কমিশনে যুক্ত হয়েছিলেন, তারা সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়েই প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা করেছিলেন। সে সময় বাংলাদেশের অর্থনীতির ‘সমাজতান্ত্রিক পুনর্গঠনের’ বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্মেলনও অনুষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু বাংলাদেশে পুঁজির আদি গঠন শুরু সে সময়ই।

গত কিছুদিন ধরে বাংলাদেশে বর্তমান ‘উন্নয়ন’ নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশে ৭০ দশকের শুরুতে প্রকাশিত একটি বইয়ের কথা টানা হচ্ছে, নাম—বাংলাদেশ: এ টেস্ট কেস অব ডেভেলপমেন্ট। এর লেখক ছিলেন ১৯৭২-৭৪ সালে ঢাকার বিশ্বব্যাংকের আবাসিক প্রতিনিধি জাস্ট ফাল্যান্ড এবং একই সময়ে ঢাকায় বিশ্বব্যাংকের সিনিয়র অর্থনীতিবিদ জে আর পারকিনসন। এ গ্রন্থে স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশ নিয়ে গভীর হতাশা ব্যক্ত করা হয়েছিল। কিন্তু এ রকম হতাশা জনগণের মধ্যে প্রধান ছিল না। মুক্তিযুদ্ধকালে ও স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে হতাশার বদলে ছিল বিপুল প্রত্যাশা। কিন্তু এ প্রত্যাশার বিপরীতে প্রায় প্রথম থেকেই রাষ্ট্রের যাত্রা হয়। আকাঙ্ক্ষা ও বাস্তবতার এ বৈপরীত্য নিয়ে সে সময়ের অন্য আরো কিছু বই আছে, যেগুলোর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য তত্কালীন পরিকল্পনা কমিশনের প্রধান নূরুল ইসলাম এবং সদস্য রেহমান সোবহান ও আনিসুর রহমানের অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখা বইগুলো।

স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত অবকাঠামো, জনবলের সংকট, অর্থনীতি গুছিয়ে তোলার জটিলতার পাশাপাশি তেল সংকট বাংলাদেশকে খুবই অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলেছিল। অর্থনৈতিক অস্থিরতা বৃদ্ধির পেছনে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সংকট যেমন ভূমিকা রেখেছে, ভেতরের অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি, ভুলনীতিও যে যথেষ্ট কারণ ছিল তা তত্কালীন বিভিন্ন দলিলপত্র থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালনায় দলীয় বিবেচনায় এমন লোকজনকে নিয়োগ দেয়া হয়, যাদের দুর্নীতি, অনিয়ম, অযোগ্যতায় এসব প্রতিষ্ঠান দ্রুত লোকসানি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। শুরুতে এসব রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান, লাইসেন্স-পারমিটই ব্যক্তি পুঁজি গঠনের প্রধান উৎস হিসেবে কাজ করে।

১৯৭৪ সালের বন্যা নৈরাজ্যিক পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটায় এবং দেশজুড়ে দেখা দেয় দুর্ভিক্ষ। খাদ্য উৎপাদন সে বছর ভালো হলেও দুর্ভিক্ষে মানুষের মৃত্যু ১৯৪৩ সালের পর প্রথম সর্বব্যাপী হাহাকার তৈরি করে। তখনো দেশে রেশনিং ব্যবস্থা ছিল, না থাকলে মৃত্যুর সংখ্যা আরো বেশি হতে পারত। এ ১৯৭৪ সালেই বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির প্রথম সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সমিতির প্রকাশনায় (১৯৭৪) বলা হয়েছে, ‘ততদিনে দেশের অর্থনীতির গন্তব্য নির্ধারণে অর্থনীতিবিদ এবং তাদের বিশ্লেষণ পদ্ধতির ভূমিকার ওপর আস্থা নষ্ট হয়ে গেছে’ এবং সময়টা তখন ‘জাতীয় প্রত্যাশাভঙ্গ এবং হতাশার’। ওই সম্মেলনে সমিতির সভাপতি ডক্টর মাজহারুল হক তাঁর ভাষণে সমাজতন্ত্রের কথা বলে বাস্তবে তার উল্টোদিকে যাত্রা করা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, সমাজতন্ত্রের দিকে দেশকে নিয়ে যাওয়ার কোনো সক্ষমতা শাসক দলের নেই, উপরন্তু তার জন্য ন্যূনতম আন্তরিকতাও তাদের নেই। তিনি আরো বলেন, এ সময়ের প্রধান প্রবণতা হলো লুটপাট, বিলাসী ভোগ, জাঁকজমক অনুষ্ঠান ও অপচয়।   

পুঁজিপন্থী যাত্রা

স্বাধীনতার কিছুদিন পর থেকেই বাংলাদেশ অর্থনীতির বাজারমুখী/পুঁজিপন্থী সংস্কারে বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ও এডিবি পাকিস্তানের মতোই পথপ্রদর্শক ও তত্ত্বাবধায়কের ভূমিকা গ্রহণ করে। ১৯৮০-এর দশকে যেসব কর্মসূচির প্যাকেজ ‘কাঠামোগত সমন্বয়’ হিসেবে পরিচিত হয়, সেগুলো খণ্ড খণ্ডভাবে শুরু হয় ৭০ দশকের প্রথম দিকেই। তবে বাংলাদেশে অর্থনীতির গতিমুখ নির্ধারণে সবচেয়ে নির্ধারক ছিল ৮০ দশক। ১৯৭৫ সালেই বাংলাদেশ সামরিক শাসনে প্রবেশ করে, এরপর ১৯৮২ সালে দ্বিতীয় দফা সামরিক শাসন জারি হয়, এ দশকে ক্ষমতায় ছিলেন জেনারেল এরশাদ, প্রথমে সামরিক শাসন ও পরে নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় ছিলেন তিনি। এ দশকেই বাংলাদেশের অর্থনীতির বড় ধরনের পরিবর্তনের ভিত্তি স্থাপিত হয়। বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের কাঠামোগত সমন্বয় কর্মসূচির যে মূল দিকগুলো তার কিছু বাস্তবায়ন আমরা ১৯৭৪ সাল থেকেই দেখছিলাম, ১৯৭৫ সালের পর সামরিক শাসনামলে তা গতিপ্রাপ্ত হয়, ১৯৮২ সালের সামরিক শাসনের পর তা সর্বব্যাপী বিস্তৃত হয়।

বস্তুত আশির দশকে বাংলাদেশে পুঁজিবাদ বিকাশের যে ভিত্তি তৈরি হয়, তার ওপরই পরবর্তী দশকগুলোতে যাত্রাপথ তৈরি হয়। এ কয় দশকে সরকারের বহু রকম পরিবর্তন হলেও এ গতিমুখে কোনো পরিবর্তন আসেনি, সাধ্যমতো সবাই তাতে যোগ করেছেন। বর্তমান আওয়ামী লীগের নির্বাচিত-অনির্বাচিত শাসনকালে এ গতি অনেক দ্রুত হয়েছে। এ দশকে সমাজ অর্থনীতির যেসব শক্তি সংহত হয়, যে পরিবর্তনগুলোর সূচনা হয় এবং পরে যেগুলো বাংলাদেশের সামাজিক অর্থনৈতিক গতিমুখ নির্ধারণে প্রধান ভূমিকা পালন করে, তার কয়েকটি এখানে চিহ্নিত করা দরকার।

প্রথমত, বাংলাদেশে ধনিক শ্রেণীর গঠন ও বিকাশে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক থেকে ঋণ একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে কাজ করেছে। নানা জাল দলিলে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক থেকে ঋণ পাওয়া, তা পরিশোধ না করা, সেই ঋণের টাকার ওপর ভর করে সম্পদ অর্জনের ক্ষেত্র সম্প্রসারণ, রাষ্ট্রের সম্পদ ব্যক্তিমালিকানায় দেয়ার নীতি, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ঋণের টাকা অনাদায়ী রেখে তার একাংশ দিয়ে প্রাইভেট ব্যাংক প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি এমনি এমনি হয় না, সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর সঙ্গে রাষ্ট্রের যোগসাজশ দিয়েই এগুলো হয়। আশির দশকে এ যোগসাজশ জোরদার হয় এবং তা পরবর্তী সময়েও অব্যাহত থাকে। সে কারণে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক তো বটেই, রাষ্ট্রায়ত্ত বিভিন্ন শিল্প-পরিষেবা প্রতিষ্ঠান এবং সেগুলোর সম্পদও ব্যক্তি পুঁজির বিকাশে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবলম্বন হয়ে দাঁড়ায়। এর মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের লোকসান, অদক্ষতা ইত্যাদিও বাড়তে থাকে। ফলে বিরাষ্ট্রীয়করণের মতাদর্শিক প্রচারও শক্তিশালী হয়।

রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প-কারখানা বিরাষ্ট্রীয়করণ জোরদারের পাশাপাশি অর্থকরী খাতে বাংলাদেশ ব্যাংকসহ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক সংস্কার, সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান যেমন জ্বালানি ও বিদ্যুৎ, পানি, যোগাযোগ ও পরিবহন খাতে রেলওয়েসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ব্যাপক সংস্কার কার্যক্রম শুরু হয় এ দশকেই। এসব সংস্কারের মূল লক্ষ্য ছিল মুনাফাভিত্তিক তত্পরতার সুযোগ বাড়িয়ে ব্যক্তি পুঁজির বিকাশকে বেগবান করা, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোকে ব্যক্তি পুঁজির অনুকূল করা।

দ্বিতীয়ত, এসব সংস্কার নীতি নির্ধারণ, প্রশিক্ষণ, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও পরিচালনা ব্যবস্থা নির্ধারণে মূখ্য ভূমিকা ছিল বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের, তার সঙ্গে এডিবি, ইউএসএইডসহ বিভিন্ন সংস্থা। এগুলো সম্ভব হয়েছে ‘উন্নয়ন সহায়তা’, ‘কারিগরি সহায়তা’ নামের ঋণ ও অনুদানের মধ্য দিয়ে। এসব ঋণ প্রকল্পের সুবিধাভোগী ছিল-আছে আমলাতন্ত্র, অর্থনীতিবিদসহ বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। এসব প্রকল্পের কারণে দেশের জন্য ঋণের বোঝার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ ছিল দেশের অর্থনীতির গতিমুখ নির্ধারণে নীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন।

সংস্কার প্রক্রিয়ায় বৃহৎ রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ বা বিরাষ্ট্রীয়করণ হওয়ায় শুধু যে ব্যক্তি পুঁজি বিকাশের পথ প্রশস্ত হয়েছে তা-ই নয়, কয়েক দশকে গড়ে ওঠা শ্রমিক আন্দোলনের শক্তিশালী ভিত্তিও প্রায় নির্মূল হয়েছে। কারণ বাংলাদেশে ৬০ দশক থেকে শ্রমিক আন্দোলনের সাংগঠনিক ভিত্তি তৈরি হয়েছিল, যেসব শিল্পপ্রতিষ্ঠানে সেগুলোই স্বাধীনতা-উত্তরকালে রাষ্ট্রায়ত্ত খাত গঠন করে। পাট, বস্ত্র, ইস্পাত, খাদ্যসহ বৃহৎ কারখানায় একসঙ্গে শ্রমিক সংখ্যাও ছিল অনেক বেশি এবং এসব প্রতিষ্ঠানেই ছিল বৃহৎ ট্রেড ইউনিয়ন। স্বাধীনতার পর ক্ষমতাসীন সরকার সব রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের ট্রেড ইউনিয়ন দখল করতে সর্বশক্তি নিয়োগ করে। এ ধারাবাহিকতাই পরে পরপর দুই সামরিক শাসনামলে এবং তারপর বেসামরিক সরকারগুলোর আমলে দেখা যায়। সরকারি শ্রমিক সংগঠনের কর্তৃত্ব থাকলেও শ্রমিকঘন উপস্থিতি যে রাজনৈতিক সম্ভাবনা জারি রাখে, সেটাও নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় এসব প্রতিষ্ঠান বিরাষ্ট্রীয়করণ বা বন্ধ হয়ে যাওয়ায়। সরকারি শ্রমিক সংগঠন, দুর্নীতির ভাগিদার নেতৃত্ব কী ভূমিকা পালন করে তা আদমজী থেকে শুরু করে সর্বশেষ ২৬টি পাটকল বন্ধ করার সাফল্য থেকে বোঝা যায়। এসব প্রতিষ্ঠানের পতন ও এগুলোর সম্পদ বিতরণে ব্যক্তি পুঁজির বিকাশ ত্বরান্বিত হয়েছে।

তৃতীয়ত, তৈরি পোশাক শিল্পের ভিত্তি স্থাপিত হয় এ দশকেই, যার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রফতানি আয় দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং প্রধান রফতানি খাত পাট ও পাটজাত দ্রব্যকে অতিক্রম করে নতুন প্রধান খাত হিসেবে আবির্ভূত হয়। এ খাতে দ্রুত বিকাশের মধ্য দিয়ে নতুন এক উদ্যোক্তা শ্রেণী সংগঠিত হয়, পুঁজিপতি হিসেবে ভিত্তি প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক সোপান হিসেবে যা অনেকে ব্যবহার করতে সক্ষম হন। রাজনৈতিক নেতা, এমপি, মন্ত্রী, পুলিশ-সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যে অনেকে গার্মেন্টস মালিক হিসেবে সাফল্য লাভ করে। এরা এখন সংগঠিতভাবে সবচেয়ে শক্তিশালী শ্রেণী ঐক্য গঠন করেছে।

শিল্প খাতে রফতানিমুখী তৈরি পোশাক উপখাতের বিকাশ ক্রমে শিল্প খাতের প্রধান ভিত্তিতে পরিণত হয়। এর মধ্য দিয়ে শ্রমিক শ্রেণীর বিন্যাসেও পরিবর্তন হয়। শিল্প খাতের মধ্যে পুরনো বৃহৎ রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের ধস এবং রফতানিমুখী তৈরি পোশাক শিল্পের বিকাশ এ সময়ে ঘটে। পুরনো শিল্পে শ্রমিকদের মধ্যে কর্মসংস্থান হারান অনেকে, নতুন কর্মসংস্থান বাড়তে থাকে গার্মেন্টস খাতে। এ দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য হলো যারা কর্মসংস্থান হারান তারা প্রধানত পুরুষ, অভিজ্ঞ আর নতুন শ্রমশক্তির প্রধান অংশ হলো প্রধানত নারী, অদক্ষ ও কম বয়সী। আরেকটি পার্থক্য হলো আগের শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়নের সুযোগ ছিল বেশি, তাদের কর্মসংস্থানে স্থায়ী অংশ ছিল বেশি, কাজের নিরাপত্তা ছিল অধিক এবং মজুরিও ছিল তুলনামূলকভাবে বেশি। নতুন শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়নের সুযোগ প্রথমেই ছিল না, পরেও তা ছিল খুবই সীমিত ও নিয়ন্ত্রিত। এ খাতে কাজে নিরাপত্তা নেই, নিয়োগপত্র-সাপ্তাহিক ছুটি ইত্যাদিও কয়েক দশক বেশির ভাগ কারখানাতেই ছিল না। প্রথম দুই দশক শিশু শ্রমিকদেরও আধিক্য ছিল, মজুরি তুলনামূলকভাবে কম, কর্মস্থলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বিশ্বের সবচেয়ে বড় দুর্ঘটনার জন্ম দিয়েছে। এ খাতই বাংলাদেশে দ্রুত পুঁজি সঞ্চয়নে বড় ভূমিকা রেখেছে। গার্মেন্টসের সঙ্গে সম্পর্কিতভাবে বহু ছোট ছোট উদ্যোক্তা, অর্থনৈতিক তত্পরতা তৈরি হয়।

চতুর্থত, বাংলাদেশ থেকে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে আদম রফতানি এবং তা থেকে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন দেশের অর্থনীতির অন্যতম খাতে পরিণত হতে থাকে। বর্তমানে এ খাত থেকে বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহ বহুগুণ বেড়েছে। আবাসন খাত, মোবাইল ও ইলেকট্রনিক্স বাজার, এ প্রবাসী আয়ের কারণে অনেকখানি সম্প্রসারিত হয়েছে।

পঞ্চমত, আশির দশক থেকেই এনজিও একটি শক্তিশালী ধারায় পরিণত হয়। গ্রামীণ সমাজ ও অর্থনীতিতে এনজিওর বহুবিধ প্রভাব আছে। পুঁজিবাদী শোষণ ব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে, রাষ্ট্রের ব্যর্থতার সমাধান হিসেবে, দারিদ্র্য বিমোচন-নারী ক্ষমতায়নের উপায় হিসেবে এগুলোকে উপস্থাপন করা হয়েছে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব, পরিকল্পনা হ্রাস এবং ব্যক্তি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে মানুষের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সমর্পণ করার এ প্রক্রিয়া ক্রমেই জোরদার হয়। ক্রমে এনজিও জগতেও মেরুকরণ, পশ্চাদপসরণ ও অঙ্গীভবন দেখা দেয়। এনজিও কর্মসূচির মধ্য দিয়ে বাজার ব্যবস্থার বিকাশ প্রত্যন্ত এলাকা পর্যন্ত সম্ভব হয়।

ষষ্ঠত, আবাসন, সরকারি প্রকল্প, অবকাঠামো নির্মাণে সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি, প্রবাসী আয়, বিদেশী ঋণের প্রবাহ নির্মাণ শিল্পের সম্প্রসারণ ঘটাতে বিশেষভাবে ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশে যোগাযোগ ও পরিবহন ক্ষেত্রে স্বাধীনতার পর থেকেই রেলওয়ে সরকারি উন্নয়ন অগ্রাধিকারে কখনই স্থান পায়নি। কিন্তু বরাবরই সড়ক যোগাযোগ নীতিগত ও বরাদ্দগত আনুকূল্য পেয়েছে। সে কারণে স্বাধীনতার পরপর রেললাইনের দৈর্ঘ্য যা ছিল তা বাড়েনি, কিন্তু সড়ক-মহাসড়কের দৈর্ঘ্য বেড়েছে এর কয়েক হাজার গুণ। এর কারণ হলো সড়ক, সড়ক-সেতু, গাড়ি-বাস-ট্রাক অর্থাৎ সড়ক পরিবহনই আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থাগুলোর কাছে গুরুত্ব পেয়েছে।

সপ্তমত, আশির দশকে বিশ্বব্যাংক-এডিবির উদ্যোগে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত নিয়ে যে নীতি কাঠামো তৈরি করা হয়, তার পথ ধরে বাংলাদেশের গ্যাসক্ষেত্রগুলোকে ২৩টি ব্লকে ভাগ করা হয় এবং বহুজাতিক কোম্পানির হাতে তুলে দেয়ার কর্মসূচি শুরু হয়। কানাডীয় কোম্পানি সিমিটারের সঙ্গে চুক্তি ছিল এর সূচনা। এ ধারা পরে জোরদারভাবে শুরু হয় বেসামরিক সরকারগুলোর সময়। প্রথম দফা চুক্তি হয় ১৯৯৩ সালে। দ্বিতীয় দফা ১৯৯৭ সালে। গত ১০ বছরে এ ধারা অনেক বেশি জোরদার হয়েছে, গ্যাস ব্লক দেয়ার পর দায়মুক্তি আইনের মধ্য দিয়ে সুন্দরবন বিনাশী রামপাল প্রকল্পসহ কয়লা ও পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার ভয়াবহ পথ গ্রহণ করেছে সরকার। এসব নীতিমালায় দেশীয় একটি সুবিধাভোগী গোষ্ঠী তৈরি হয়েছে—ব্যবসায়ী, আমলা, কনসালট্যান্ট, সাব-কন্ট্রাক্টর। জাতীয় বিপর্যয়ের বিনিময়ে দেশী-বিদেশী বিভিন্ন গোষ্ঠীর জন্য আকর্ষণ তৈরি করেছে উচ্চ মুনাফার এ খাত।

অষ্টমত, আশির দশকে গৃহীত নীতিমালা অনুযায়ী ৯০ দশক থেকে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যাপক ব্যক্তিমালিকানায় মুনাফাভিত্তিক তত্পরতা শুরু হয়। এর সুবিধাভোগী হিসেবে শিক্ষক ও চিকিৎসকদের একটি অংশ অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হয়। শিক্ষা ও চিকিৎসার ব্যয় বৃদ্ধি পেলেও শিক্ষা ও চিকিৎসার বাণিজ্যিক তত্পরতা বিস্তৃত হয়। প্রাইভেট স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়-ক্লিনিক-ডায়াগনষ্টিক সেন্টার-হাসপাতাল ব্যক্তি পুঁজি গঠনে যেমন ভূমিকা রাখে, তেমনি বিদ্বৎ সমাজের মুনাফামুখী তত্পরতা বাড়ে, ব্যক্তি পুঁজি বিনিয়োগের সহযোগী হিসেবে তাদের অবস্থান সমাজের বুদ্ধিবৃত্তিক ভূমিকাকেও প্রভাবিত করে।

পুঁজি সঞ্চয়নের বিভিন্ন পর্বে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সমর্থন বা অংশগ্রহণ বরাবরই ছিল নির্ধারক। মন্ত্রী, আমলাদের সহযোগিতা বা অংশীদারিত্বের ব্যবস্থারও তাই বিকাশ ঘটেছে নানাভাবে। লুম্পেন কোটিপতিদের সঙ্গে সঙ্গে লুম্পেন রাজনীতিবিদ ও লুম্পেন আমলার বিকাশ ঘটেছে, যারা বৃহৎ কমিশন, বড় আকারের ঘুষের মাধ্যমে অর্থবিত্ত অর্জন করে নতুন শ্রেণীতে উত্তরণ লাভ করছেন। আমলাতন্ত্র বস্তুত দেশী-বিদেশী করপোরেট গোষ্ঠীর সম্প্রসারিত হস্ত। এর সঙ্গে যুক্ত আরেক গোষ্ঠীর কথা বলা দরকার, এরা লুম্পেন বিশেষজ্ঞ/কনসালট্যান্ট যারা এসব কাজে বৈধতা দিতে নিজের বিশেষজ্ঞ পরিচয় বিক্রি করে, ধ্বংসের প্রকল্পকে উপকারী প্রকল্প বলে ঘোষণা দেয়, এর বদলে নিজেরাও দ্রুত অর্থবিত্তের মালিক হয়।

সামাজিক ও পরিবেশগত ব্যয়

পুঁজি সংবর্ধনের বিদ্যমান ধারায় বাংলাদেশে প্রাণ প্রকৃতির অভূতপূর্ব বিপর্যয় হয়েছে। সামাজিক পরিবেশগত ফলাফল এবং জনস্বার্থ বিবেচনা না করে চটজলদি মুনাফার লক্ষ্যে সব তত্পরতা পরিচালনা বিদ্যমান উন্নয়ন দর্শনে যৌক্তিক। অতীতে নদী-নালা, খাল-বিল নানাভাবে বাধাগ্রস্ত করে শত হাজার কোটি টাকার ‘উন্নয়ন’ প্রকল্প করা হয়েছে, এখন দেখছি এর ফল—স্থায়ী জলাবদ্ধতা, নদীভাঙন এবং পরিবেশ বিপর্যয়। দ্রুত মুনাফার লক্ষ্যে রাসায়নিক সার, কীটনাশক ওষুধ, কৃত্রিম রঙ ব্যবহারের ফলে পানি দূষণ এক মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। এর বিষ প্রভাব পড়েছে মত্স্য, বৃক্ষ, তরুলতাসহ জীববৈচিত্র্যের ওপর। উৎপাদন বেড়েছে কিন্তু নিরাপদ পানি ও খাদ্য বড় ঝুঁকির মধ্যে পতিত। নির্মাণকাজে উল্লম্ফন ইটের ভাটারও ভয়াবহ বিস্তার ঘটিয়েছে। আন্তর্জাতিক জরিপ জানিয়েছে ঢাকা মহানগরীর বায়ুদূষণ বিশ্বের দ্বিতীয় নিকৃষ্টতম। শুধু বায়ুদূষণ নয়, পানিদূষণ, দুর্ঘটনা, আশ্রয়হীন মানুষ, যানজট, যৌন নিপীড়ন, নিরাপত্তাহীনতা সব দিক থেকেই রাজধানী ঢাকা বিশ্বের নিকৃষ্ট শহরগুলোর সঙ্গে এখন পাল্লা দিচ্ছে।

গত কয় দশকে শিল্প, কৃষি, নির্মাণ, যোগাযোগ ইত্যাদি ক্ষেত্রে সক্ষমতার বিকাশ ঘটেছে অনেক, বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীর আবির্ভাব ঘটেছে। জাতীয় সক্ষমতার আরো বিকাশের সম্ভাবনাও সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু সব ক্ষেত্র মুনাফা বিবেচনার অধীনস্থ হওয়ায় বিপর্যস্ত হচ্ছে জনস্বার্থে এর প্রয়োগের বহু সম্ভাবনা। ঘুস, কমিশন, নিয়োগ বাণিজ্য, আটক বাণিজ্য সবই বর্ধনশীল, প্রায় সব প্রতিষ্ঠানেই আর্থিক লেনদেনের প্রক্রিয়া খুব শক্তিশালী। বিচার, জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা প্রান্তিক অবস্থানে। দখল, লুণ্ঠন অবারিত। একদিকে প্রাণ প্রকৃতি পরিবেশ বিপর্যয়, অন্যদিকে নজরদারি ব্যবস্থার অভূতপূর্ব বিস্তার; একদিকে নগ্ন মুনাফা আগ্রাসন, অন্যদিকে নাগরিকদের ওপর ডিজিটাল নজরদারি সম্প্রসারণ, গোয়েন্দা সংস্থার খবরদারি, রাষ্ট্রযন্ত্রের নিপীড়নমূলক ব্যবস্থার একচেটিয়াতন্ত্র, মিডিয়া-আদালত নিয়ন্ত্রণ এবং হাত-মোচড়ানো স্বাধীনতা, বিভিন্ন বাহিনীর অনিয়ন্ত্রিত ক্ষমতা সবই বর্তমান পুঁজিবাদ বিকাশের মডেলের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

করোনাকালে রাষ্ট্রীয় সুরক্ষার অভাবে দুই কোটিরও বেশি মানুষের দারিদ্র্যসীমার নিচে পতন ঘটেছে। ঠিক একই সময়ে দেশের মাথাপিছু গড় আয় বৃদ্ধি স্পষ্টত দেখায় যে, সংখ্যাগরিষ্ঠের আয় বিপর্যয় ঘটলেও কিছু লোকের হাতে আয় বাড়ছে অনেক উঁচু হারে। ধনিক গোষ্ঠীর সম্পদ প্রবৃদ্ধিতে বিশ্ব রেকর্ড, অর্থনীতিতে চোরাই টাকার অনুপাত বৃদ্ধি, বৈষম্যবৃদ্ধি, স্বাস্থ্য ব্যবস্থার করুণ দশা, উন্নয়ন বা পরিবেশ বিপর্যয় থেকে সৃষ্ট উদ্বাস্তু সংখ্যা ও নগর দারিদ্র্য বৃদ্ধি, টেকসই কর্মসংস্থানের হ্রাসপ্রাপ্তি এবং অনিরাপদ-অনিশ্চিত-কম মজুরির কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, যৌন বাণিজ্য ও নিপীড়ন, মাদক সাম্রাজ্যের বিস্তার, শিক্ষা ও চিকিৎসার অধিকতর বাণিজ্যিকীকরণের কারণে ব্যয়বৃদ্ধি, দখল বা সরকারি আয়োজনে বন-নদীসহ সর্বজনের সম্পদের ওপর মুনাফাভিত্তিক ব্যক্তি মালিকানার বিস্তার, সম্পদের অবিরাম পাচার, সর্বজন পরিবহনের দুরবস্থা ও ব্যক্তিগত গাড়ির রাস্তা দখল ইত্যাদি বাংলাদেশের পুঁজিবাদের উচ্চ প্রবৃদ্ধির অন্তর্গত গতিমুখের একেকটি চিহ্ন।

 

আনু মুহাম্মদ: অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়