আজ থেকে
প্রায় ৬০
বছর আগে
ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ
ডাডলি সিয়ার্স
তার রচনায়
‘উন্নত’
ও ‘উন্নয়নশীল’
দেশের পার্থক্য
নিরূপণের উপায়
কী হতে
পারে তা
নিয়ে বিস্তারিত
আলোচনা করেছেন।
সিয়ার্স উন্নত
দেশগুলোকে সংজ্ঞায়িত
করেছিলেন তাদের
কাঠামোগত বৈশিষ্ট্যের
মাধ্যমে। এ
কাঠামোগত বৈশিষ্ট্যের
আঙ্গিকগুলোর ভেতর
রয়েছে ১)
উৎপাদনের উপকরণের
(factors of production) ধরন
যেমন—শিক্ষিত
ও সচল
শ্রমশক্তি যার
বেশির ভাগই
কর্মসংস্থানে নিয়োজিত,
যথেষ্ট পরিমাণে
দক্ষ শ্রমশক্তির
উপস্থিতি, চাষযোগ্য
জমির সর্বোচ্চ
ব্যবহার, সব
অর্থনৈতিক খাতেই
মূলধনের সহজলভ্যতা
এবং বিস্তীর্ণ
পরিবহন ও
বিদ্যুৎ ব্যবস্থা;
২) অর্থনৈতিক
খাতগুলোর ধরন
যেমন—কৃষি
সম্পূর্ণভাবে বাণিজ্যিক,
খনিজ সম্পদ
আহরণের ওপর
সীমিত নির্ভরশীলতা,
বৈচিত্র্যপূর্ণ ম্যানুফ্যাকচারিং
যা কৃষি
বা খনিজ
সম্পদ খাতের
তুলনায় আকারে
বড়; ৩)
সরকারি আয়-ব্যয়ের
ধরন যেমন—প্রত্যক্ষ
করের ওপর
নির্ভরতা, কর
আইনগুলোর যথাযথ
প্রয়োগ, সামাজিক
নিরাপত্তা ও
কৃষি ভর্তুকিতে
অধিকতর ব্যয়;
৪) বৈদেশিক
বাণিজ্যের ধরন
যেমন—উচ্চমূল্য
ও আয়-স্থিতিস্থাপকতাসম্পন্ন
অনেক দেশে
রফতানি পণ্যগুলো
বিক্রি, মূলত
প্রাথমিক পণ্যের
আমদানি ও
আমদানি পণ্যের
চাহিদার আয়
সংবেদনশীলতা সীমিত;
৫) খানাগুলোর
(households) ভোগের
ধরন যেমন—দারিদ্র্যসীমার
নিচে অতি
অল্পসংখ্যক মানুষের
অবস্থান, কর-পরবর্তী
আয়ের সুষম
বণ্টন, খানার
মোট ব্যয়ে
খাদ্যের পরিমিত
অংশ।
সিয়ার্সের লেখার
পর উন্নয়নের
গতিধারা পর্যালোচনায়
অবশ্যই বহু
পরিবর্তন এসেছে।
শিল্পায়ন বলতে
একসময় আনুলম্বিকভাবে
সমন্বিত (vertically
integrated) দেশজ
শিল্পের বিকাশকে
বোঝানো হতো
যার দ্বারা
জাতীয় অর্থনৈতিক
সমৃদ্ধি অর্জিত
হবে। কিন্তু
যুগের পরিক্রমায়
শিল্পায়নের মানে
এসে দাঁড়িয়েছে
বৈশ্বিক ভ্যালু
চেইন এবং
প্রত্যক্ষ বিদেশী
বিনিয়োগের সঙ্গে
আনুভূমিক একীকরণে।
তা সত্ত্বেও
কাঠামোগত রূপান্তরের
(structural transformation) আলোচনার
গুরুত্ব ফুরিয়ে
যায়নি। ম্যাকমিলান
ও রড্রিকের
(২০১১) মতে
অর্থনৈতিক উন্নয়নের
আলোচনার সবচেয়ে
প্রাথমিক ও
কেন্দ্রীয় অন্তর্দৃষ্টিগুলোর
মধ্যে একটি
হলো কাঠামোগত
রূপান্তর উন্নয়নের
অবিচ্ছেদ্য অংশ।
সেই দেশগুলোই
দারিদ্র্য থেকে
বেরিয়ে সমৃদ্ধির
দিকে ধাবিত
হতে পারে,
যারা কৃষিসহ
অন্যান্য গতানুগতিক
খাতনির্ভরতা থেকে
সরে গিয়ে
অধিকতর উৎপাদনশীল
খাতগুলোতে বহুমুখীকরণ
করতে সমর্থ
হয়। শ্রমসহ
অন্যান্য উৎপাদনের
উপকরণ কৃষি
থেকে ‘আধুনিক’
অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের
দিকে অগ্রসর
হওয়ায় সামগ্রিক
উৎপাদনশীলতা এবং
আয় বৃদ্ধি
পায়। যে
গতিতে এ
কাঠামোগত রূপান্তর
ঘটে তা
উন্নত দেশগুলোকে
অনুন্নত দেশ
থেকে আলাদা
করার ক্ষেত্রে
মূল নির্ণায়ক
হিসেবে আবির্ভূত
হয়। তবে
লেখকদ্বয় এ
কথাও স্মরণ
করিয়ে দেন
যে কাঠামোগত
রূপান্তর প্রবৃদ্ধি-সহায়ক
হবে কিনা
তা নির্ভর
করবে শ্রমের
পুনর্বিন্যাস স্বল্প
থেকে অধিক
উৎপাদনশীল খাতে
হচ্ছে কিনা
তার ওপর।
খাতের ‘আধুনিকতা’
এখানে প্রধান
বিবেচ্য নয়।
কাঠামোগত রূপান্তরের
বিশ্লেষণে স্যার
উইলিয়াম আর্থার
লুইসের কালজয়ী
‘লুইস
গ্রোথ মডেল’-এর
প্রাসঙ্গিকতা ঠিক
এখানেই। বহুল
প্রশংসিত ও
উন্নয়ন অর্থনীতিতে
অবশ্যপাঠ্য এ
মডেল অর্থনীতিকে
একটি দ্বৈত
কাঠামোতে ভাগ
করে, যেখানে
কৃষি ও
অকৃষি দুটি
খাত বিদ্যমান।
কৃষি খাতে
মূলধন ও
ভূমির তুলনায়
বিপুল পরিমাণ
উদ্বৃত্ত শ্রমের
কারণে প্রান্তিক
উৎপাদনশীলতা প্রায়
শূন্যে নেমে
আসে। লুইস
মডেলে কৃষি
মজুরির হার
গড় উৎপাদনশীলতার
সমান বলে
ধরে নেয়া
হয়, যাকে
প্রাতিষ্ঠানিক মজুরি
বলা হয়।
অকৃষি খাতে
শ্রমের অনুপাতে
প্রচুর মূলধন
এবং অন্যান্য
সম্পদ থাকে।
লুইসের অনুমিতি
অনুসারে অকৃষি
খাতে মজুরির
হার প্রান্তিক
কৃষি খাতের
তুলনায় গড়ে
প্রায় ৩০
শতাংশ বেশি
থাকে (লুইস,
১৯৫৪)।
ফল কৃষি
খাতের উদ্বৃত্ত
শ্রমশক্তি অকৃষি
খাতে চলে
যায়। যখন
এই উদ্বৃত্ত
শ্রম শেষ
হয়ে যায়,
তখন অর্থনীতি
উন্নয়নের একটি
শ্রম-দুষ্প্রাপ্য
পর্যায়ে প্রবেশ
করে। এ
পর্যায়ে কৃষি
খাতের মজুরি
ক্রমান্বয়ে বাড়তে
শুরু করে।
আলোচ্য মডেল
অনুসারে কৃষি
মজুরির উল্লেখযোগ্য
বৃদ্ধি এ
ইঙ্গিত বহন
করে যে
অর্থনীতি কাঠামোগত
রূপান্তরের একটি
নতুন পর্যায়ে
প্রবেশ করছে,
যাকে ‘লুইস
টার্নিং পয়েন্ট’
বলা হয়।
একটি উন্নয়নশীল
দেশ এ
পর্যায়ে প্রবেশ
করলে তার
উদ্বৃত্ত শ্রমশক্তি
নিঃশেষিত হয়ে
যায় এবং
ফতে তার
শিল্পকে ক্রমবর্ধমান
মজুরি হারের
মুখোমুখি হতে
হয়।
স্বাভাবিকভাবেই তাহলে
প্রশ্ন আসে
বাংলাদেশের মতো
একটি স্বল্পোন্নত
দেশের জন্য
কাঠামোগত রূপান্তর
এবং সেই
রূপান্তরের প্রকাশ
হিসেবে ‘লুইস
টার্নিং পয়েন্টের’
গুরুত্ব কতখানি।
এটি প্রত্যাশিত
যে বাংলাদেশ
স্বল্পোন্নত দেশের
(এলডিসি) তালিকা
থেকে উত্তরণের
তিনটি মানদণ্ডই
(মাথাপিছু জাতীয়
আয়, মানবসম্পদ
সূচক ও
অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা
সূচক) পূরণের
মাধ্যমে উন্নয়নশীল
দেশের তালিকায়
নাম লেখাতে
যাচ্ছে। কিন্তু
২০২৬ সালে
আসন্ন এ
উত্তরণ বাংলাদেশের
জন্য একটি
নিখাদ আশীর্বাদ
মনে করার
বিষয়ে সতর্ক
হতে হবে।
এটি অবশ্যম্ভাবী
যে বাংলাদেশের
অর্থনীতি এলডিসি
উত্তরণ-পরবর্তী
পর্যায়ে বেশকিছু
চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন
হবে। বিশেষত
বৈশ্বিক পর্যায়ে
প্রতিযোগিতা সক্ষমতা
ধরে রাখা
এবং এর
মাধ্যমে অর্জিত
প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতা
বজায় রাখা
কষ্টকর হয়ে
দাঁড়াবে যদি
না কাঠামোগত
রূপান্তরের উন্নতির
জন্য ব্যবস্থা
গ্রহণ করা
হয়। বিশেষ
করে চলমান
কভিড-১৯
অতিমারী কাঠামোগত
রূপান্তর অর্জনের
এ প্রক্রিয়াকে
আরো দুরূহ
করে তুলবে।
সিপিডির এক
সাম্প্রতিক গবেষণায়
দেখা গিয়েছে
যে কভিড-১৯
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে
উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষ
সেবা খাত
থেকে কৃষি
খাতে কর্মসংস্থানে
নিয়োজিত হয়েছে।
এক দশক
ধরেই (বিশেষত
কভিড-১৯-পূর্ববর্তী
সময়ে) বাংলাদেশের
মোট দেশজ
উৎপাদনে (জিডিপি)
৬ শতাংশের
বেশি হারে
বাড়ছে। এ
ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি
বাংলাদেশকে নিম্ন
আয় থেকে
নিম্নমধ্যম আয়ের
দেশের মর্যাদায়
উন্নীত করেছে।
এ প্রবৃদ্ধির
একটি বৃহৎ
অংশের নির্ধারক
হিসেবে অকৃষি
খাত, বিশেষত
ম্যানুফ্যাকচারিং ও
নির্মাণ খাতের
প্রবৃদ্ধিকে উল্লেখ
করা যায়।
যদিও কৃষি
খাত দেশের
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি
ও দারিদ্র্য
বিমোচনে উল্লেখযোগ্য
অবদান রাখছে,
কিন্তু জিডিপিতে
এর অবদান
ক্রমান্বয়ে হ্রাস
পাচ্ছে। বাংলাদেশের
জিডিপিতে কৃষির
বর্তমান অবদান
প্রায় ১৩
শতাংশ, যা
২০০০ সালে
ছিল ২৩
শতাংশ এবং
১৯৯০ সালে
৩০ শতাংশ।
এ প্রসঙ্গে
উল্লেখ্য, দেশের
মোট জনসংখ্যার
বেশির ভাগই
বর্তমানে গ্রামীণ
অঞ্চলে বসবাস
করে এবং
তাদের বেশির
ভাগই কৃষির
ওপর বহুলাংশে
নির্ভরশীল।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে,
বিশেষ করে
কভিড-১৯-পূর্ববর্তী
সময়ে গ্রাম
থেকে শহরে
অভিবাসন এবং
কৃষি থেকে
অন্যান্য খাতে
শ্রমের স্থানান্তরের
স্পষ্ট প্রমাণ
পাওয়া যায়।
সাম্প্রতিক তথ্য-উপাত্তের
ভিত্তিতে বলা
যায় যে
অকৃষি খাত,
বিশেষ করে
সেবা ও
শিল্প প্রচুর
কাজের সুযোগ
সৃষ্টি করছে,
ফলস্বরূপ কৃষি
খাত থেকে
উদ্বৃত্ত শ্রম
আত্মীভূত (absorb)
করার একটি
সম্ভাবনা অকৃষি
খাতে তৈরি
হয়েছে। এটিও
স্পষ্ট যে
কৃষি খাতে
প্রকৃত মজুরি
উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি
পাচ্ছে—২০১৫
সালে দৈনিক
মজুরির হার
২০০০-এর
তুলনায় প্রায়
দ্বিগুণ ছিল।
কৃষি মজুরির
এ উল্লেখযোগ্য
বৃদ্ধি একটি
ইঙ্গিত হতে
পারে যে
দেশ অর্থনৈতিক
রূপান্তরের একটি
নতুন পর্যায়ে
প্রবেশ করছে।
একটি দেশের
শ্রমবাজারের রূপান্তর,
শ্রমের সরবরাহ
ও প্রকৃত
মজুরির পরিবর্তন
বোঝা অত্যন্ত
গুরুত্বপূর্ণ। কারণ
এ রূপান্তর
দেশের খাদ্যনিরাপত্তা
ও দারিদ্র্য
পরিস্থিতিকে উল্লেখযোগ্যভাবে
প্রভাবিত করতে
পারে। বর্তমানে
বাংলাদেশের কৃষি
খাত দেশের
অভ্যন্তরেই প্রধান
খাদ্য চালের
সিংহভাগ উৎপাদনে
সক্ষম। এটি
গ্রামীণ দারিদ্র্য
কমাতেও গুরুত্বপূর্ণ
ভূমিকা পালন
করে। ২০০০-১০
সময়ে এটি
দেশের দারিদ্র্যের
মাত্রা প্রায়
২০ শতাংশ
হ্রাস করতে
সহায়তা করেছিল
(বিশ্বব্যাংক, ২০১৬)।
শ্রমের সরবরাহে
পরিবর্তনের সাথে
সাথে কৃষি
ও অকৃষি
খাতের মধ্যে
শ্রমের জন্য
প্রতিযোগিতা তীব্র
হয়ে ওঠে।
ফলে প্রকৃত
মজুরি বৃদ্ধি
পায় এবং
ফলস্বরূপ উৎপাদন
খরচ বৃদ্ধি
পায়। অতএব,
অর্থনৈতিক রূপান্তরের
পটভূমিতে মজুরির
গতিধারা বিশ্লেষণ
করা খুবই
গুরুত্বপূর্ণ, যাতে
গ্রামীণ অঞ্চলে
শ্রমস্বল্পতার প্রভাব
এড়াতে প্রয়োজনীয়
নীতি (যেমন
কৃষি যান্ত্রিকীকরণ)
গ্রহণ করা
যায়।
বাংলাদেশের অর্থনীতি
‘লুইস
টার্নিং পয়েন্টের’
কতখানি কাছে
তা নিয়ে
এর আগে
যে সীমিতসংখ্যক
বিশ্লেষণ হয়েছে
তাতে বিপরীতমুখী
ফলাফল লক্ষ
করা যায়।
উদাহরণস্বরূপ রানিস
তার ২০১২
সালের গবেষণায়
দাবি করেন,
বাংলাদেশ তখনো
লুইস টার্নিং
পয়েন্টে পৌঁছেনি।
ইসলাম (২০১৫)
উল্লেখ করেন
যে যদিও
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে
তৈরি পোশাক
ছাড়া অন্যান্য
শিল্পও যথেষ্ট
প্রবৃদ্ধি অর্জন
করেছে, তার
পরও তা
নিকট ভবিষ্যতে
লুইস টার্নিং
পয়েন্টে পৌঁছার
জন্য পর্যাপ্ত
নয়। পূর্ববর্তী
এক গবেষণায়
তিনি উল্লেখ
করেন যে
বাংলাদেশ লুইস
টার্নিং পয়েন্ট
থেকে এখনো
অনেক দূরে
এবং উদ্বৃত্ত
শ্রমকে পুরোপুরি
আত্মীভূত করতে
১৫ বছরেরও
বেশি সময়
লাগতে পারে
(ইসলাম, ২০১৪)।
বিপরীতভাবে ঝ্যাং
ও সহকর্মীরা
(২০১৪) দাবি
করেন যে
বাংলাদেশ লুইস
টার্নিং পয়েন্টে
এরই মধ্যে
পৌঁছে গেছে
এবং মজুরির
ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা
এ ধারণার
সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
এর পাল্টা
যুক্তিতে বলা
যায় যে
যদিও অনেক
উন্নততর এশীয়
দেশ (যেমন
চীন, ভারত,
ফিলিপাইন ইত্যাদি)
এখনো লুইস
টার্নিং পয়েন্টে
পৌঁছেনি, এটি
অসম্ভাব্য যে
বাংলাদেশ নিম্নমধ্যম
আয়ের একটি
দেশ, এরই
মধেই তাতে
পৌঁছে গেছে
বা কাছাকাছি
চলে এসেছে।
অধিকন্তু বাংলাদেশে
এখনো বিপুলসংখ্যক
মানুষ কর্মহীন
ও ছদ্মবেকার
এবং তাদের
অধিকাংশই গ্রামাঞ্চলে
বসবাস করছে।
তাই গ্রামাঞ্চলে
শ্রমস্বল্পতার ধারণা
আপাত অসম্ভাব্য।
গ্রামীণ মজুরির
যে ঊর্ধ্বমুখী
প্রবণতার কথা
এরই মধ্যে
উল্লেখিত হয়েছে
তার পেছনে
অন্যান্য অনুঘটক
যেমন কৃষি
উৎপাদনশীলতার বৃদ্ধি
এবং অকৃষি
খাতের মজুরির
প্রভাব বিবেচনা
করতে হবে।
এ প্রেক্ষাপটে
পূর্ববর্তী গবেষণাকর্মের
সীমাবদ্ধতার দিকে
নজর রেখে
১৯৭৩ থেকে
২০১৫ সালের
উপাত্তের ভিত্তিতে
একটি বিশ্লেষণ
করা হয়
(বৈরাগী ও
কামাল, ২০১৯)।
এ বিশ্লেষণে
লুইস-রানিস-ফেই
অর্থনৈতিক মডেলের
ওপর ভিত্তি
করে মূল্যায়ন
করা হয়েছে
বাংলাদেশ লুইস
টার্নিং পয়েন্টের
কতটা সন্নিকটে।
এরই অংশ
হিসেবে কৃষি
ও অকৃষি
উভয় খাতের
জন্যেই কোব-ডগলাস
উৎপাদন ফাংশন
(production function) প্রাক্কলন
করা হয়
যা লুইসের
তত্ত্বের গতানুগতিক
ও আধুনিক
খাতের প্রতিনিধিত্ব
করে। পরিশেষে
এ মডেল
থেকে প্রাপ্ত
সহগগুলো (regression
coefficient) ব্যবহার
করে অর্থনৈতিক
প্রবৃদ্ধিতে কৃষি
থেকে অকৃষি
খাতে স্থানান্তরিত
শ্রমের অবদান
পরিমাপ করা
হয়। এ
পরিমাপের ক্ষেত্রে
বিশ্বব্যাংক (১৯৯৬)
প্রস্তাবিত শ্রম
পুনর্বিন্যাস (labour
reallocation effect) মডেল
ব্যবহার করা
হয়।
বিশ্লেষণে প্রাপ্ত
ফলাফলে থেকে
দেখা যায়
যে ১৯৭৩-২০১৫
সময়ে বাংলাদেশ
কৃষি ও
অকৃষি শ্রমের
বার্ষিক বৃদ্ধির
হার প্রায়
একই। কিন্তু
আলোচ্য সময়ে
অকৃষি খাতে
মূলধন নিবেশ
কৃষি খাতের
তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে
উচ্চগতিতে বৃদ্ধি
পাচ্ছে। একই
সাথে অর্থনৈতিক
প্রবৃদ্ধিতে অকৃষি
খাতের অবদান
কৃষি খাতের
তুলনায় প্রায়
১.২৩
গুণ বেশি
পাওয়া গেছে।
এ ফলাফল
থেকে বোঝা
যায় যে
বাংলাদেশের সামগ্রিক
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি
মূলত অকৃষি
খাত দ্বারাই
নির্ধারিত হয়।
খাতভিত্তিক প্রবৃদ্ধির
বিশ্লেষণে দেখা
যায় যে
অকৃষি খাতের
প্রবৃদ্ধি মূলধন
আহরণ (৫৯.৮১%)
ও শ্রম
(৪০.১৯%)
উভয় দ্বারা
চালিত হয়।
একইভাবে কৃষি
খাতের প্রবৃদ্ধি
শ্রম (২৬.৫৭%)
ও মূলধন
(৬২.৫৫%)
দুটির মাধ্যমেই
নির্ধারিত হয়।
পূর্বোক্ত শ্রম
পুনর্বিন্যাস মডেলের
আলোকে দেখা
যায় যে
আলোচ্য সময়ে
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক
প্রবৃদ্ধিতে কৃষি
থেকে অকৃষি
খাতে শ্রমের
পুনর্বিন্যাসের একটি
ইতিবাচক কিন্তু
নগণ্য অবদান
ছিল (মাত্র
০.৪৬%)।
কৃষি শ্রমের
প্রান্তিক উৎপাদনশীলতার
(প্রাক্কলিত) গতিধারা
থেকে দেখা
যায় যে
২০০৮ সাল
থেকে এটি
বৃদ্ধি পাচ্ছে,
যদিও এর
গতি অত্যন্ত
ধীর। এ
থেকে বোঝা
যায় যে
কৃষি থেকে
অতি মন্থরগতিতে
উদ্বৃত্ত শ্রমের
স্থানান্তর ঘটছে।
অন্য কথায়
উদ্বৃত্ত কৃষি
শ্রম বাংলাদেশের
অর্থনীতিতে এখনো
পুরোপুরি আত্মীভূত
হয়নি। অতএব,
এ উপসংহারে
পৌঁছা যায়
যে বাংলাদেশ
এখনো তার
অর্থনৈতিক উন্নয়নের
গতিধারায় লুইস
টার্নিং পয়েন্টে
পৌঁছেনি।
যদিও বাংলাদেশ
লুইস টার্নিং
পয়েন্ট থেকে
অনেক দূরে,
তবু এ
কথা অনস্বীকার্য
যে ক্রমান্বয়ে
আমরা সেই
উন্নয়নের পথের
দিকে এগিয়ে
যাচ্ছি। কীভাবে
এ প্রক্রিয়াকে
আরো বেগবান
করা যায়
এবং সে
সঙ্গে বাংলাদেশ
যখন লুইস
টার্নিং পয়েন্টে
পৌঁছে যাবে
তখন কী
করা উচিত
সে-সংক্রান্ত
নীতিমালা প্রণয়ন
ও বাস্তবায়নে
মনোনিবেশ করা
জরুরি।
প্রথমত, ম্যানুফ্যাকচারিং
ও সেবা
খাতে অধিকতর
কর্মসংস্থান সৃষ্টির
দিকে মনোনিবেশ
করা উচিত,
যাতে বাংলাদেশের
উদ্বৃত্ত শ্রমশক্তি
আত্মীভূত করা
সম্ভব হয়।
ম্যানুফ্যাকচারিং খাত,
বিশেষ করে
তৈরি পোশাক,
কিছু শ্রম
আত্মীভূত করে
চলেছে (যার
বেশির ভাগই
নারী)।
কিন্তু চলমান
এ প্রক্রিয়ার
গতি অত্যন্ত
মন্থর। একই
সাথে স্মরণ
রাখতে হবে,
খাতটি স্বয়ংক্রিয়করণের
(automation) কারণে
অদূরভবিষ্যতে শ্রম
আত্মীভূত করার
পরিবর্তে অব্যাহতি
দিতে পারে।
অন্যদিকে সেবা
খাতে অতিরিক্ত
কর্মসংস্থান সৃষ্টির
বিশাল সম্ভাবনা
রয়েছে।
দ্বিতীয়ত, যখন
বাংলাদেশে টার্নিং
পয়েন্ট পৌঁছবে,
তখন আর
কৃষি খাতে
শ্রমের প্রচুর
সরবরাহ থাকবে
না। অতএব,
বর্ধিত মজুরি
বিবেচনা করে
সামগ্রিক কৃষি
উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির
জন্য একটি
উন্নয়ন কৌশল
তৈরি করা
উচিত। একইভাবে
কৃষি নীতিমালায়
পুনর্বিন্যাসের প্রয়োজনীয়তা
বিবেচনা করা
অত্যন্ত জরুরি।
উদাহরণস্বরূপ, শ্রমিকদের
কর্মহানি হওয়ার
আশঙ্কায় কৃষি
যান্ত্রিকীকরণ এখন
পর্যন্ত তেমনভাবে
প্রসারিত হয়নি।
অতএব, যান্ত্রিকীকরণকে
ত্বরান্বিত করার
চেষ্টা করা
উচিত।
সবশেষে বাংলাদেশের
গ্রামীণ শ্রমবাজারে
নারীদের অংশগ্রহণ
বরাবরই কম
থাকে। কৃষিকাজে
নারীদের অংশগ্রহণকে
ত্বরান্বিত করার
জন্য প্রয়োজনীয়
নীতিগত পদক্ষেপ
(যেমন শিক্ষা)
নেয়া উচিত,
যা বাংলাদেশের
গ্রামাঞ্চলে প্রকৃত
মজুরি কমাতে
সাহায্য করতে
পারে। একই
সাথে নারীর
অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নেও
এটি অবদান
রাখতে পারে।
(লেখাটি
সাউথ এশিয়া
ইকোনমিক জার্নালে
প্রকাশিত ‘Is
Bangladesh’s Economy Approaching the Lewis Turning Point?’
নিবন্ধের ভিত্তিতে
রচিত। মূল
নিবন্ধটি লিখেছেন
ড. সুবীর
বৈরাগী ও
মুনতাসির কামাল)
মুনতাসির কামাল:
সিনিয়র
রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)





