কয়েক দশক ধরে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াজুড়ে ‘জনগণ চালিত’ তৃণমূল আন্দোলনগুলো গণতান্ত্রিক সংস্কার, মানবাধিকার, মানসম্পন্ন শিক্ষা, উন্নত স্বাস্থ্যসেবার নিশ্চয়তা এবং চরম দারিদ্র্যের অবসানের জন্য লড়াই করেছে। এ আন্দোলনগুলো অন্তর্ভুক্তিমূলক সমৃদ্ধি এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের দৃষ্টিভঙ্গি দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছে, যা নব্য উদারপন্থী ‘রোড টু সার্ফডম’-এর বিকল্প হিসেবে অবস্থান করে নিয়েছে। যার সঙ্গে অঞ্চলটির অনেক অংশ আগে থেকেই সহাবস্থান করে আসছে।

দুর্ভাগ্যবশত সাম্প্রতিক দশকের কঠিন লড়াইয়ের অর্জন এখন হুমকির মুখে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া গণতন্ত্রের সূচকে পিছিয়ে যাচ্ছে। জবাবদিহিতার অবক্ষয় আগের অবস্থার দিকেই নিয়ে যাবে, যেমন ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, ব্যাপক দুর্নীতি, ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক অভিজাতদের মুনাফাখোরি, মিডিয়া দমন এবং সমাবেশের স্বাধীনতার সীমাবদ্ধতা। এর সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, ব্যাপক অভিবাসন, ক্রমবর্ধমান খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা এবং অর্থনৈতিক বৈষম্যের মতো বিষয়গুলো যুক্ত করলে ঝুঁকিগুলো আরো তীব্র হবে।

ফ্যাসিবাদ ও কর্তৃত্ববাদের উত্থান এবং মুক্ত সমাজের পতন ক্রমেই সম্ভাব্য হয়ে উঠছে; প্রকৃতপক্ষে এটা এরই মধ্যে ঘটছে। প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, সুশাসন এবং জবাবদিহিতার প্রতি দৃঢ় অঙ্গীকার এ শক্তিগুলোকে মোকাবেলা করার একমাত্র উপায়।

গণতান্ত্রিক সূচকে পিছিয়ে যাওয়া একটি বিশ্বব্যাপী প্রবণতা। এমনকি বিশ্বের সবচেয়ে আদর্শ রাষ্ট্রগুলোও এর মাধ্যমে প্রভাবিত হয়েছে। তবে বর্তমানে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এটি বিশেষভাবে দৃশ্যমান। এ বছরের শুরুর দিকে একটি সামরিক অভ্যুত্থানের পর মিয়ানমারে কর্তৃত্ববাদ তুঙ্গে উঠেছে। থাইল্যান্ডে একটি রাজকীয় সামরিক ব্লক ক্ষমতায় তার দখল সুসংহত করেছে। ফিলিপাইনে বিচারবহির্ভূত হত্যাসহ পপুলিস্ট দণ্ড স্থান পেয়েছে। অঞ্চলজুড়ে দুর্নীতি বেড়ে চলেছে। নাগরিকদের মানসম্পন্ন চাকরি, অবকাঠামো, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা নষ্ট হচ্ছে।

কভিড-১৯ মহামারী, বিদেশী হস্তক্ষেপ এবং সন্ত্রাসবাদের ভয় দেখিয়ে নাগরিক স্বাধীনতা এবং মানবাধিকার সীমিত করার অজুহাতে নেতারা গণতান্ত্রিক ক্ষয়কে আরো বাড়িয়ে তুলেছে। মিয়ানমারের মতো কর্তৃত্ববাদ এবং সংঘাতের দীর্ঘ ইতিহাসের দেশগুলোতে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো কখনই সম্পূর্ণরূপে পরিপক্ব হয়নি। ফলে সহজেই এসব দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো ভেঙে দেয়া সম্ভব হয়েছে। এদিকে থাইল্যান্ড ও ফিলিপাইনে সংখ্যাগরিষ্ঠদের ক্রমবর্ধমান সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থতা মেরুকরণকে ত্বরান্বিত করেছে, যা ক্যারিশম্যাটিক, উদারপন্থী নেতাদের উত্থানকে সহজ করেছে।

মালয়েশিয়ার মালাইজ

সম্ভবত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কোথাও গণতান্ত্রিক পশ্চাত্পসরণ মালয়েশিয়ার চেয়ে বেশি স্পষ্ট এবং নাটকীয়রূপে দেখা যায়নি। মাত্র কয়েক বছর আগেও বিষয়গুলোর জন্য দেশে প্রত্যাশা ছিল। ২০১৮ সালে ছয় দশকেরও বেশি সময় পর একদলীয় শাসনের অধীনে শাসিত মালয়েশিয়ানরা বহুজাতিক পাকাতান হারাপান জোটকে নির্বাচিত করেছিল।

জোটের বিজয় দুই দশকের দীর্ঘ আন্দোলনের সমাপ্তি টেনেছিল, যার নেতৃত্বে ছিল ছাত্র, সুশীল সমাজ এবং তৃণমূল কর্মীদের একটি বৈচিত্র্যময় দল। পরবর্তী রূপান্তর শান্তিপূর্ণ এবং আশার আলোয় পূর্ণ ছিল। মালয়েশিয়া শেষ পর্যন্ত আধা স্বৈরাচারী শাসনের জোয়াল থেকে রেহাই পেয়েছে বলে মনে হচ্ছে। এখন ব্যাপক প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার সাধন করতে হবে। সেই সময়ে আমি আশাবাদী হয়ে লিখেছিলাম, নতুন সরকার ক্ষমতায় গেলে মালয়েশিয়া ‘অবশেষে ন্যায্য, ন্যায়সংগত এবং কার্যকর গণতন্ত্র গড়ে তুলতে শুরু করতে পারে, যা এর সংস্কারকরা দীর্ঘদিন ধরে স্বপ্ন দেখছিলেন।’

কিছু অগ্রগতি হয়েছে। মিডিয়া আরো স্বাধীনতা লাভ করেছে এবং একটি সাংবিধানিক সংশোধনী ১৮ বছরের বেশি বয়সী নাগরিকদের ভোটাধিকার প্রদান করেছে। এছাড়া ২০১৯ সালে মালয়েশিয়া ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের কম দুর্নীতি সূচকে ১০ পয়েন্ট এগিয়েছে।

কিন্তু সবচেয়ে অত্যাবশ্যকীয় সংস্কার, যেমন বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, প্রতিরোধমূলক গ্রেফতার বিধি বাতিল করা এবং প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদের সীমা নির্ধারণ করা এগুলো সংশোধন করা যায়নি। আশা করি যে তারা দ্রুতই এগুলো সংস্কার করবে। ২০২০ সালের মার্চে ক্ষমতাচ্যুত সরকার একটি অভ্যুত্থান ঘটিয়েছিল, যা জাতিগত মেরুকরণের বিষাক্ত প্রভাব এবং মালয়েশিয়ার শ্রমিক শ্রেণী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবন ও জীবিকার বাস্তব উন্নতি করতে নতুন সরকারের ব্যর্থতার কারণে সম্ভব হয়েছিল।

এর পরই কভিড-১৯ সংকট সামনে এল, যা সরকারকে জরুরি অবস্থা জারি করতে এবং সংসদকে সাত মাসের জন্য স্থগিত করার জন্য একটি ধূম্রজাল পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছিল, যার ফলে সংসদীয় তত্ত্বাবধান এবং প্রাতিষ্ঠানিক নিরীক্ষা ও ভারসাম্য এড়ানো যায়। ২০২০ সালে মালয়েশিয়া দুর্নীতি সূচকে ৬ পয়েন্ট নিচে নেমে গেছে।

মালয়েশিয়ার ৭০ সদস্যের মন্ত্রিসভা, যা মাথাপিছু ভিত্তিতে বিশ্বের সবচেয়ে স্ফীত সরকার, মহামারী বা এর ফলে সৃষ্ট অর্থনৈতিক সংকট মোকাবেলা করতে সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়েছে। ইকোনমিস্ট, ব্লুমবার্গ এবং নিক্কেই এশিয়ার মতো বেশকিছু বৈশ্বিক মহামারী প্রতিক্রিয়া সূচক মালয়েশিয়াকে তালিকার নিচে বা নিচের দিকে রেখেছে। এটি আশ্চর্যের বিষয় নয় যে মালয়েশিয়ার অর্থনীতি ২০২০ সালে ৫ দশমিক ৬ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে, যা ১৯৯০-এর ‘এশিয়ান অর্থনৈতিক সংকটে’র পর সবচেয়ে খারাপ অবস্থা। ২০২১-এর অনুমিত প্রবৃদ্ধি বারবার নিম্নগামী হয়েছে—৭ শতাংশ থেকে ৩ শতাংশের নিচে। অধিকন্তু কিছু অর্থনীতিবিদ অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে ধীরগতির পূর্বাভাস দিয়েছেন।

মালয়েশিয়ার অভিজ্ঞতা যেমন দেখায়, রাজনীতিবিদদের মোটা বেতন, সুযোগ এবং সরকারি সম্পদের সুবিধা গ্রহণ, তাদেরকে সরকারি দায়বদ্ধতা থেকে অব্যাহতি—এগুলোই সরকারি সম্পদ নষ্ট করা এবং অর্থনীতিকে ধ্বংস করার একটি মোক্ষম উপায়। মহামারীর লকডাউনের কারণে মধ্যবিত্তের প্রায় ৫০ শতাংশ (প্রায় ৫,৮০,০০০ পরিবার) জনগণকে দারিদ্র্যসীমার নিচে ঠেলে দিয়েছে। অন্যদিকে দেশের সবচেয়ে ধনী ১০ শতাংশ তাদের উন্নতি অব্যাহত রেখেছে।

দুর্নীতির ফাঁদ

আমি যেমন ২৫ বছরেরও বেশি আগে লিখেছিলাম, ‘সামাজিক ন্যায়বিচার এবং সামাজিক সমস্যাগুলোকে তুচ্ছ করে সম্পদ আহরণকে অগ্রাধিকার দিলে পূর্ব এশিয়ার সমৃদ্ধি টেকসই বা নিরাপদ হওয়ার সম্ভাবনা নেই’। আমি যুক্তি দিয়েছিলাম যে সুশাসন, জবাবদিহিতা এবং স্বচ্ছতা টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের ভিত্তি। আমি সতর্ক করে দিয়েছিলাম যে ‘যদি আমরা অভিজাতদের নৈতিক অবক্ষয়, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি এবং অন্যান্য বাড়াবাড়ির বিষয়ে ছাড় দিই, তাহলে পূর্ব এশিয়ার অর্থনৈতিক উত্থান স্বল্পস্থায়ী হবে।’

মালয়েশিয়ায় তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে বড় ধরনের দুর্নীতি ও মুনাফাখোরি নিয়মে পরিণত হয়েছে। ২০১৫ সালে মালয়েশিয়া অবৈধ অর্থ পাচারের জন্য বিশ্বে পঞ্চম স্থানে ছিল। ২০০৪ সাল থেকে প্রায় ৪২০ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে। পানামা ও প্যান্ডোরা পেপারস কেলেঙ্কারিতে মালয়েশিয়ার বর্তমান ও সাবেক অর্থমন্ত্রীসহ রাজনীতিবিদদের নাম রয়েছে, যেখানে ফাঁস হওয়া নথিতে দেখানো হয়েছে যে কীভাবে ধনীরা তাদের অর্থ গোপন করে। রাজনীতিবিদ, তাদের পরিবারের সদস্য এবং তাদের ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের বিদেশে গচ্ছিত সম্পদের প্রকৃত পরিধি সম্ভবত এ ফাঁসের চেয়ে অনেক বেশি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আরো তদন্ত করা প্রয়োজন।

মালয়েশিয়ানদের বিশ্বাস নেই যে তাদের দেশের রাজনৈতিক নেতারা তাদের অনেক সমস্যার সমাধান করতে পারেন এবং সংগত কারণে অর্থবহ শাসন সংস্কার এবং কার্যকর অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা সম্পদ কুক্ষিগত করা, মুনাফাখোরি ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা হ্রাসের পরিবেশে অসম্ভব। শুধু দুর্নীতির মূলোৎপাটন করে এবং দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদদের নির্মূল করে মালয়েশিয়া কভিড-১৯ মহামারীর পর তার অর্থনীতি এবং জনগণের জীবিকা পুনর্গঠন করতে পারে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাকি অংশের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। দেশগুলোকে অবশ্যই ‘মানবিক অর্থনীতি’ গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিতে হবে।

কভিড-১৯ মহামারী চলাকালীন সরকারগুলো যে জরুরি অবস্থা জারি করেছে, তার জন্য স্পষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করা একটি প্রথম পদক্ষেপ হওয়া উচিত। এ সংকটকে রাজনীতিবিদদের ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে রাখার জন্য এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে আর কোনোভাবে ধ্বংস করার জন্য ব্যবহার করতে দেয়া উচিত নয়। আরো সহনশীল, বহুত্ববাদী দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া বিনির্মাণে অগ্রগতি সমর্থন করার জন্য নিরীক্ষা ও ভারসাম্য সময়মতো পুনঃস্থাপন অপরিহার্য। তাহলে এ অঞ্চল সামাজিক ন্যায়বিচার, অন্তর্ভুক্তিমূলক সমৃদ্ধি এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে এবং যৌথ সমস্যাগুলো মোকাবেলায় বিশ্বব্যাপী প্রচেষ্টায় অবদান রাখতে সক্ষম হবে।

 

আনোয়ার ইব্রাহিম: মালয়েশিয়ার সংসদ সদস্য ও বিরোধী দলীয় নেতা

ভাষান্তর: হাসান তানভীর