জন্মাবধি একজন আশাবাদী মানুষ হওয়ার কারণে ২০২১ সালকে আমি পুনরুদ্ধারের বছর হিসেবে দেখি। কভিড-১৯ মহামারী এখনো শেষ হয়নি, কিন্তু সুন্দর ভবিষ্যতের আশার আলো দেখা যাচ্ছে। এ কথা স্বাস্থ্য খাত এবং অন্যান্য বিস্তৃত অর্থনীতির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। নিরাপদ ও কার্যকর ভ্যাকসিন কভিড-১৯ আক্রান্তদের মৃত্যুঝুঁকি কমিয়েছে এবং সরকারের রাজস্বজনিত হস্তক্ষেপের কারণে অর্থনৈতিক বিকাশ অনুপ্রাণিত হয়েছে। কিন্তু পুনরুদ্ধারের বৈশ্বিক চিত্র দেখলে বৈষম্য পরিলক্ষিত হয়। দেশগুলোর মহামারী-পূর্ব অর্থনৈতিক অবস্থা এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতির বৈচিত্র্যের কারণে এ ঘটনা ঘটেছে।

স্পষ্ট করে বললে কভিড-১৯ ভ্যাকসিন চলমান পরিস্থিতি বদলে দিয়েছে। ভ্যাকসিনেশনের হার বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে হার্ড ইমিউনিটি তৈরির মাধ্যমে বিধিনিষেধ শিথিল করে দ্রুততম সময়ে অর্থনৈতিক কাজ শুরু করা সম্ভব হয়েছে। অবশ্য বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠানগুলো যখন ভ্যাকসিনের বৈশ্বিক বিতরণ সুষ্ঠুভাবে নিশ্চিত করতে চেষ্টা করছে, তখন বহু উন্নয়নশীল দেশ টিকা নিশ্চিতকরণে হিমশিম খাচ্ছে। উন্নত দেশগুলো ঠিকই দ্রুত ভ্যাকসিনেশন চালু রেখেছে। এ ঘটনার মাধ্যমে বৈশ্বিক পুনরুদ্ধার বাধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি বৈষম্য বাড়ছে।

মহামারীর সঙ্গে লড়ার ক্ষেত্রে আমাদের দুর্বলতম সুযোগের সমপরিমাণ শক্তিশালী, বৈশ্বিক সহযোগিতা এখানে বাধ্যতামূলক। প্রতিটি দেশই ভাইরাসকে নিয়ন্ত্রণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চায়। তাই বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নিশ্চিত করা প্রয়োজন যে তারা দ্রুততম সময়ের মধ্যে ভ্যাকসিন জোগান দেয়ার ক্ষেত্রে আরো বড় ভূমিকা গ্রহণ করবে।

আমাদের পক্ষ থেকে একটি আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা এবং সংকট মোকাবেলার প্রস্তুতি উন্নত করতে হবে। রসদ, শাসন ব্যবস্থা, নীতিনির্ধারণ পদ্ধতি এবং তথ্য বিনিময়ের মাধ্যমে পরবর্তী মহামারী মোকাবেলার স্বার্থে এ কাজ করতে হবে। জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও বৈশ্বিক শাসনের মধ্যকার দ্বন্দ্ব এখানে একটি প্রধান প্রতিকূলতা হিসেবে উপস্থিত হবে। কভিড-১৯ আমাদের দেখিয়ে দিয়েছে, প্রস্তুতি নিশ্চিত করতে না পারলে ভবিষ্যতে ধ্বংসাত্মক পরিস্থিতি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

অর্থনীতির ক্ষেত্রে বলতে গেলে বিভিন্ন দেশ বর্তমানে পুনরুদ্ধারের ভিন্ন ভিন্ন পর্যায়ে রয়েছে এবং তারা তাদের নীতি ও সময় অনুসারে নানা রকম মহামারী-পরবর্তী কৌশল অবলম্বন করছে। অথচ ভিন্ন কিন্তু সম্পর্কযুক্ত বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে আন্তঃসম্পর্ক নিয়ে থাকা বিশ্বে একটি অর্থনীতির অবস্থা পরিবর্তনের চেষ্টা করলে অন্যগুলোর ওপরও তার প্রভাব পড়বে। উল্লেখ্য, উন্নত দেশগুলোর মুদ্রা ব্যবস্থার সাধারণীকরণের বিষয়টি স্বচ্ছতার সঙ্গে আলোচনা করা না হলে অস্থিরতা বৃদ্ধির পাশাপাশি উদীয়মান বাজার থেকে আসা মূলধনের প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

কভিড-১৯ সংকট বহু উন্নয়নশীল দেশের সরকারি অর্থায়নকে চাপের মুখে ফেলেছে। মহামারীর সঙ্গে লড়তে গিয়ে দেশগুলোর ঋণের পরিমাণ বেড়ে গেছে। আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি ঋণদাতাদের একত্রে কাজ করে ন্যায্য পরিমাণে দায়িত্ব ভাগাভাগি পরিকল্পনায় তাদের সহায়তা করা উচিত। যদিও জি২০-এর সাধারণ ফ্রেমওয়ার্কে ‘ডেবট সার্ভিস সাসপেনশন ইনিশিয়েটিভ’ এক্ষেত্রে উপযোগী বলে মনে হয়েছে, কিন্তু এটিও সাময়িক ব্যবস্থা হিসেবেই থাকবে। বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে আরো বড় কোনো তদারকি ও নির্দেশনা থাকতে হবে, যার মাধ্যমে উন্নয়নশীল দেশগুলোর ক্রমবর্ধমান ঋণের পরিমাণের সংকট চিহ্নিত করার পাশাপাশি বেড়ে যাওয়া অর্থনৈতিক সংকট কমানো যাবে।

এছাড়া অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার শুরু হওয়ার পর বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার পক্ষে বর্তমান চাহিদা মেটানো সম্ভব হচ্ছে না। মহামারীর সময়ে সাপ্লাই চেইন বাধাগ্রস্ত হওয়ার কারণে স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরা কঠিন হচ্ছে। সংকটটি হয়তো ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু ব্যয়বহুল। তাই ব্যবসাকে দ্রুত বদল এবং বর্তমান বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা ও রসদ বরাদ্দ করার ক্ষেত্রে এ সম্পর্কে পুনরায় মূল্যায়ন করার মাধ্যমে নীতিনির্ধারকদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ধারণা করা যায়, এর মাধ্যমে উদীয়মান বাজারগুলো গতি লাভ করবে এবং এভাবে পুনরুদ্ধারের অধিকাংশ পদক্ষেপ বাস্তবায়ন সম্ভব হবে।

এরই মধ্যে শক্তির বর্তমান চাহিদা মহামারী-পূর্ববর্তী সময়ের চাহিদাকে ছাড়িয়ে বৈশ্বিক সংকটে পরিণত হয়েছে। মূল্যবৃদ্ধির মাধ্যমে মুদ্রাস্ফীতির পাশাপাশি জ্বালানি সংকটের কারণে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা কঠিন হয়ে উঠছে। মহামারী মোকাবেলার মতো বৈশ্বিক উষ্ণায়ন মোকাবেলার ক্ষেত্রে গৃহীত ব্যবস্থা তখনই কার্যকর হবে, যদি আমরা এ দুটোর বিরুদ্ধে একত্রে এবং সামঞ্জস্য রেখে কাজ করি।

অর্থনীতিকে পুনর্জীবিত করার সঙ্গে সঙ্গে জলবায়ু সমস্যা মোকাবেলা করার সুযোগ আজ আমাদের আছে। একটি সরল, চলমান, স্থিতিস্থাপক ও সর্বব্যাপী পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে তা সম্ভব। এটি অর্জনের জন্য আমাদের একটি জলবায়ুবান্ধব অর্থনীতি গ্রহণ করার পাশাপাশি টেকসই অর্থায়ন প্রয়োজন হবে। উদাহরণস্বরূপ ইন্দোনেশিয়ার পুনরুদ্ধার প্রকল্পের অংশ হিসেবে সরকারের পক্ষ থেকে আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি আঞ্চলিক জনসাধারণের জন্য বন রক্ষার জন্যও বিকল্প ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল।

সবুজ পুনরুদ্ধার প্রকল্পগুলো নারীর ক্ষমতায়নেও কাজ করে। সাধারণভাবে মহামারীতে যারা পুরুষের তুলনায় বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাদের জন্য এ কাজ করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে নারীরাই টেকসই উদ্যোগের বাহক হিসেবে কাজ করেন। পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ রেইনফরেস্টের অধিকারী হিসেবে সবুজ পুনরুদ্ধারে ইন্দোনেশিয়ার স্পষ্ট ও দৃঢ় অঙ্গীকার রয়েছে। কোয়ালিশন অব ফাইন্যান্স মিনিস্টারস ফর ক্লাইমেট অ্যাকশনের সহসভাপতি হিসেবে আমার ক্ষমতানুসারে আমি বিশ্বাস করি, অর্থায়ন ছাড়া সবুজ পুনরুদ্ধার হতে পারে না।

ইন্দোনেশিয়া ২০২২ সালে জি২০-এর সভাপতি পদ এবং ২০২৩ সালে আসিয়ানের সভাপতিত্ব করবে। এ কারণে দেশটি টেকসই, স্থিতিশীল ও সর্বব্যাপী বৈশ্বিক পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে এ গ্রুপগুলোকে কৌশল গ্রহণে নির্দেশনা দিতে পারে। নির্দিষ্ট করে বললে জি২০ সদস্যদের পক্ষ থেকে আমাদের বর্তমান বিশ্বের প্রধান সমস্যাগুলো চিহ্নিত করার জন্য একটি কার্যকরী ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করতে হবে। এর মধ্যে বিশেষত মহামারী প্রতিরোধ, টেকসই অর্থায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনে গুরুত্ব দিতে হবে।

এর মধ্যে কোনোটিই সহজ নয়। কিন্তু যেমনটা বলেছি, আমি একজন আশাবাদী মানুষ। আমি আত্মবিশ্বাসী যে পর্যাপ্ত রাজনৈতিক সদিচ্ছা তৈরির মাধ্যমে আমরা একত্রে কাজ করে পুনরুদ্ধারে সক্ষম হব এবং কভিড-১৯ সংকট থেকে বেরিয়ে শক্তিশালী হওয়া সম্ভব হবে।

 

শ্রী মূল্যানী ইন্দ্রাবতী: ইন্দোনেশিয়ার অর্থমন্ত্রী ও কোয়ালিশন অব ফাইন্যান্স মিনিস্টারস ফর ক্লাইমেট অ্যাকশনের সহসভাপতি

ভাষান্তর: মাহমুদুর রহমান