প্যারিস: হঠাৎ করেই কভিড-১৯ মহামারীর প্রাদুর্ভাব প্রতিটি সমাজকে মুখোমুখি সাক্ষাতের বিষয়ে ভীত করে তুলেছে। রেস্তোরাঁ, ক্যাফে, কনসার্ট হল এবং একটি সমৃদ্ধ নগর সভ্যতার জন্য প্রয়োজনীয় অন্যান্য সাংস্কৃতিক সুযোগ-সুবিধা কোনো কোনো দেশে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে বন্ধ ছিল। এটা করা হয়েছিল সংক্রমণের ঝুঁকি থেকে মানুষকে রক্ষা করতে এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে বিপর্যয়ের হাত থেকে বাঁচাতে। ফলে মানুষের জীবনযাত্রা পরিবারের মধ্যে সীমিত হয়ে গেছে এবং মানসিক চাপ ও হতাশার বোঝা বেড়ে গেছে।

বিভিন্ন দেশের সরকার আরোপিত লকডাউনের সময় কোম্পানিগুলো কর্মীদের অনলাইনে সহজে কাজ করার সুযোগ দিয়েছিল। কোনো বাস্তব দোকানে প্রবেশ না করেই পণ্য কেনা এবং বাইরে না গিয়ে বিনোদন উপভোগের সুযোগ হয়েছিল। এ সময়ে বড় বিজয়ী ছিল অ্যামাজন, অ্যাপল ও নেটফ্লিক্সের মতো কোম্পানি, যাদের বাজারমূল্য সংকটের সময় বেড়েছে।

এ কথিত ডিজিটাল পুঁজিবাদ দৈহিক মিথস্ক্রিয়া হ্রাস করা এবং মুখোমুখি বৈঠকের প্রয়োজনীয়তা দূর করার ওপর ঘুরপাক খাচ্ছে। কভিড-১৯ অনেক ক্রিয়াকলাপকে ভার্চুয়াল মাধ্যমে স্থানান্তর করেছে। যেমন স্বাস্থ্যসেবার পরামর্শগুলো এখন প্রায়ই দূর থেকে পরিচালিত হচ্ছে। মহামারীটি এভাবে ডিজিটাল শিল্পের প্রভাবশালী খেলোয়াড়দের ভার্চুয়াল জগতের ভেতর আত্তীকরণ সম্পর্কিত একটি পূর্ণমাত্রার পরীক্ষা চালানোর সুযোগ করে দিয়েছে।

ডিজিটাল অর্থনীতি কেন সামনাসামনি মিথস্ক্রিয়া থেকে বেঁচে থাকার সঙ্গে সমন্বয় করে চলে তা বোঝার জন্য ফরাসি অর্থনীতিবিদ জ্যাঁ ফোরাস্তির ১৯৪৮ সালে প্রকাশিত বই The Great Hope of the Twentieth Century পড়া যেতে পারে। ফোরাস্তি কৃষিভিত্তিক সমাজের পরে ভবিষ্যতের বিশ্ব সম্পর্কে একটি আশাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি প্রস্তাব করেছিলেন। কৃষিভিত্তিক সমাজ মাটি কর্ষণ করেছিল, শিল্পভিত্তিক সমাজ পদার্থ নিয়ে কাজ করেছে, সেবামূলক সমাজে মানুষ অবশেষে নিজেদের চাষ করবে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অবসর নতুন বিশ্বের কেন্দ্রবিন্দু হবে।

ফোরাস্তি লিখেছেন, ‘টার্শিয়ারি সেক্টরের সভ্যতা উজ্জ্বল হবে; জনসংখ্যার অর্ধেক বা তিন-চতুর্থাংশ উচ্চশিক্ষার সুবিধা ভোগ করবে। কয়েক প্রজন্মের মধ্যে এমনকি স্বল্প দক্ষ কাজের ক্ষেত্রেও উদ্যোগ, পরিবহনের উপায় এবং অবসর ক্রিয়াকলাপের বৈচিত্র্য মানুষের ব্যক্তিত্ববাদী প্রবণতাকে সমর্থন করবে।’

এরপর তিনি উপসংহার টেনেছেন এভাবে, ‘সেই সময় আসছে যখন ইতিহাস এতটা এগিয়ে যাবে যে মানুষ বৈধভাবে নতুন যুগের দর্শনকে বিস্তৃত করার চেষ্টা করতে পারবে এবং একটি নাটকীয় জন্মের জন্য কম নিপীড়ক অন্ধকারে কাজ করতে পারবে। জড় পদার্থ মানুষের বিকল্প হয়ে করে দিতে পারে এমন শ্রম থেকে মানুষকে মুক্ত করার জন্য যন্ত্রকে অবশ্যই আমাদের এমন কাজের দিকে নিয়ে যেতে হবে যা সব সৃষ্ট প্রাণীর মধ্যে শুধু মানুষই করতে পারে, যেমন বুদ্ধিবৃত্তিক সংস্কৃতি ও নৈতিক উন্নতি।’

একটি ‘মানবিক’ সমাজে রূপান্তরের ধারণাটি অনেক ভাষ্যকারকে প্ররোচিত করেছিল। লিওন ব্লুম ত্রিশের দশকে ফ্রান্সের প্রথম সমাজতান্ত্রিক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে কাজ করেছিলেন। তিনিও বইটি প্রকাশিত হওয়ার সময় এটির একটি ইতিবাচক পর্যালোচনা লিখেছিলেন। তবে সবাই একটি কেন্দ্রীয় সমস্যা চিহ্নিত করেছিল, তা হলো এটি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ছাড়া একটি বিশ্বের পূর্বাভাস দিয়েছিল। ফোরাস্তির নিজের কোনো সন্দেহ ছিল না যে সেবাভিত্তিক সমাজ মেশিনের আক্রমণের অধীন না হয়ে প্রবৃদ্ধিকে অদৃশ্য করে দেবে। যদি একজন ব্যক্তি যে পণ্যটি বিক্রি করে তা হয় অন্যদের সঙ্গে কাটানো সময়, তাহলে সংজ্ঞা অনুসারে প্রবৃদ্ধি সময় দ্বারা সীমাবদ্ধ।

অর্থনীতিবিদরা এর নাম দিয়েছিলেন ‘বাউমল’স কস্ট ডিজিজ’, যা ষাটের দশকে উইলিয়াম জে. বাউমল ও উইলিয়াম জি. বোয়েন দ্বারা প্রবর্তিত হয়েছিল। যখন একজনকে ব্যক্তিগতভাবে দেখা করতে হয়, রোগীদের পরীক্ষা করতে হয়, ক্লাসে পাঠদান করতে হয় বা নাটকে অভিনয় করতে হয় তখন প্রবৃদ্ধি প্রয়োজনে নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়। ‘বেশি উপার্জনের জন্য বেশি পরিশ্রম করা’ বিষয়টি অবশ্যই সম্ভব, যেমন প্রাক্তন ফরাসি প্রেসিডেন্ট নিকোলাস সারকোজি একবার তার দেশের নাগরিকদের এমন কাজ করতে আহ্বান জানিয়েছিলেন। তবে শিল্পক্ষেত্রে পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে যেমন ঘটেছিল সেভাবে প্রতি ১৫ বছরে একজনের আয় দ্বিগুণ করা কখনই সম্ভব হবে না।

ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যতীত সব সেবা খাতের কর্মীদের স্কেল অর্থনীতির অভাব অনুভূত হবে, যা একজন প্রদায়ককে আরো বেশিসংখ্যক গ্রাহকের কাছে পৌঁছার সুযোগ করে দেয়। স্কেল অর্থনীতির ধারণা (যেখানে একটি ব্যবসা তার খরচ একই রেখে বা সামান্য বাড়িয়ে উৎপাদন বাড়াতে পারে) অর্থনৈতিক বিশ্লেষণের একটি মৌলিক বিষয়। এটি একটি কোম্পানিকে একটি সদ্গুণ চক্র চালু করার সুযোগ দেয়। তা হলো গ্রাহক ভিত্তি যত বড় হবে, তার ব্যবসা তত বেশি সমৃদ্ধ হবে। অন্যথায় একটি নির্দিষ্ট আকারের পর কোম্পানি স্থবির হয়ে যায়।

সেবা খাতে অর্থনীতি থেকে সর্বাধিক সুবিধা অর্জনের জন্য নতুন প্রযুক্তির প্রয়োজন, যা বিনিয়োগকারীদের প্রভাব বাড়াতে পারে। উদাহরণস্বরূপ ফিল্ম ও টেলিভিশনে অভিনেতাদের সবসময় বড় দর্শকদের সামনে অভিনয় করার সুযোগ দেয়া হয়।

ব্যয়বহুল সমস্যার সমাধান খুঁজে পেতে দীর্ঘ সময়, ট্রায়াল ও ত্রুটিমুক্ত করার একটি দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। কিন্তু উত্তরটি আজকের উদীয়মান ডিজিটাল সমাজে মিথ্যা বলে মনে হচ্ছে। একজনকে মানুষের মাংস ও আত্মাকে শুধু ডাটা সেটে রূপান্তর করতে হবে, যা আমাদের স্বাস্থ্য বা আকাঙ্ক্ষা সম্পর্কে তথ্যের ক্ষুদ্র অংশ, যাতে আমরা ডিজিটাল বিশ্বের অংশ হতে পারি, যেখানে আমরা অ্যালগরিদম দ্বারা পরিচালিত হতে পারব। ‘কর্মদক্ষতা’ অর্জন করতে প্রত্যেককেই ডাটা বিট হতে হবে, যা অন্যান্য ডাটা বিট দ্বারা ব্যাখ্যা করা যায়।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সফটওয়্যার অসংখ্য ক্লায়েন্টকে চিকিৎসা, পরামর্শ ও বিনোদন দিতে সক্ষম হবে, যদি তারা আগেই ডিজিটালাইজড হয়। যখন আমার কবজিতে থাকা একটি ঘড়ি আমার গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণগুলো বিশ্লেষণ করতে পারে, তখন একটি অ্যালগরিদম আমার স্বাস্থ্য সমস্যার একটি নিয়মতান্ত্রিক সমাধান তৈরি করতে পারবে। ২০১৩ সালে মুক্তি পাওয়া ভবিষ্যদ্বাণীমূলক সিনেমা ‘হার’ একটি অনুভূতিসম্পন্ন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার গল্পকে তুলে ধরেছে (যেখানে সফটওয়্যারের কণ্ঠ হিসেবে অভিনেত্রী স্কারলেট জোহানসনের মনোহর কণ্ঠকে ব্যবহার করা হয়েছে), যেটি একসঙ্গে কয়েক মিলিয়ন লোকের সঙ্গে প্রেম করছে। হোমো ডিজিটালিসের ঘোষিত প্রতিশ্রুতিটি এমনই—মানবদেহের সীমা থেকে মুক্তিপ্রাপ্ত একটি বিশ্ব।

ফোরাস্তি যেমন ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে মানুষ সেবামূলক সমাজের কেন্দ্রবিন্দু, কিন্তু বর্তমানের প্রবৃদ্ধির অক্ষয় তৃষ্ণা মেটানোর জন্য প্রথমে তাদের ডিজিটাইজড হতে হবে। কভিডতাড়িত লকডাউন স্পষ্ট করে দিয়েছে যে যখন মানুষ সরাসরি সাক্ষাতের বাধ্যবাধকতা থেকে মুক্তি পাবে তখন আবার অনলাইনে প্রবৃদ্ধি সম্ভব হবে।

স্পষ্টতই এখন বড় প্রশ্ন হলো ডিজিটাল নিরাময় রোগের চেয়ে বেশি খারাপ হবে কিনা। রোবট কি মানুষের জায়গা দখল করে দারিদ্র্য বাড়াবে? ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাসেম্বলি লাইনের কাজ কি ফেসবুক ও নেটফ্লিক্সের মাধ্যমে মনের বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনার পথ সৃষ্টি করবে?

ঐতিহাসিক সময়ের একটি অসাধারণ বক্রতার মাধ্যমে শিল্পজগতের পুরনো প্রশ্নগুলো ডিজিটাল সময়ের গভীরে পুনরুত্থিত হচ্ছে। আমাদের কি পুরনো বিশ্বের প্রতিটি পর্যায়ের পুনরুত্থান করতে হবে? যার মধ্যে রয়েছে নৈতিক দেউলিয়াত্ব, আর্থিক সংকট ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীনতার পর্যায়গুলো। নাকি আমরা আরো ভালো কিছু করতে পারি? ২০২২ সালে আমরা তা খোঁজা শুরু করতে পারি।

 

ড্যানিয়েল কোহেন: প্যারিস স্কুল অব ইকোনমিকসের পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি

ভাষান্তর: হাসান তানভীর