আমাদের সর্বোচ্চ রেটিং প্রাপ্তির কারণ হিসেবে রেটিং এজেন্সি বিশেষভাবে আমাদের শক্তিশালী করপোরেট গভর্ন্যান্স, অভিজ্ঞ ও দক্ষ ব্যবস্থাপনা, সম্পদের গুণগত মান, কম খেলাপি ঋণের হার এবং শক্তিশালী মূলধনের পর্যাপ্ততাকে প্রধান হিসেবে উল্লেখ করেছে।

একই সঙ্গে আমাদের অধিকাংশ ঋণের বিপরীতে আছে পর্যাপ্ত জামানত, যা ঋণ পরিশোধের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় নন-ইন্টারেস্ট ইনকামের প্রবৃদ্ধিও আমাদের আর্থিক স্থিতিশীলতাকে আরো শক্তিশালী করেছে।

আমরা সবসময় দ্রুত প্রবৃদ্ধির চেয়ে টেকসই প্রবৃদ্ধিকে অগ্রাধিকার দিয়েছি। এ দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গিই আমাদের সর্বোচ্চ ক্রেডিট রেটিং ধরে রাখতে সহায়তা করেছে।

এই রেটিং ধরে রাখার জন্য বর্তমানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী?

বর্তমান বৈশ্বিক ও দেশীয় অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে ‘ট্রিপল এ’ রেটিং ধরে রাখা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জিং। উচ্চ সুদহার, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং প্রতিযোগিতামূলক তহবিল বাজারে আমাদের প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো একই সঙ্গে মুনাফা অর্জনের সক্ষমতা, সম্পদের গুণগত মান এবং তারল্যের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা। ২০২৫ সালে সুদের ব্যয় বৃদ্ধির কারণে আমাদের নেট ইন্টারেস্ট ইনকাম কিছুটা কমেছে এবং মুনাফাও কিছুটা চাপের মধ্যে ছিল। তবে আমাদের লক্ষ্য হলো দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী ব্যালান্স শিট ও উচ্চমানের পোর্টফোলিও বজায় রাখা, যা ‘ট্রিপল এ’ রেটিং ধরে রাখার মূল শর্ত।

‘ট্রিপল এ’ রেটিং কি তহবিল সংগ্রহের খরচ কমাতে, বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে বা ব্যবসা সম্প্রসারণে বাস্তব কোনো সুবিধা দিচ্ছে?

‘ট্রিপল এ’ রেটিং আমাদের প্রতি বিনিয়োগকারী, আমানতকারী ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আস্থা সুদৃঢ় করার পাশাপাশি তহবিল সংগ্রহের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা সৃষ্টি করে এবং অনুকূল শর্তে দীর্ঘমেয়াদি তহবিল সংগ্রহের সম্ভাবনা বৃদ্ধি করে।

বিশেষত, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে তহবিল সংগ্রহের ক্ষেত্রে, ক্রেডিট রেটিং আর্থিক স্থিতিশীলতার একটি নির্ভরযোগ্য সূচক হিসেবে কাজ করে।

তবে আমরা মনে করি, রেটিং নিজে কোনো ব্যবসা এনে দেয় না; এটি একটি বিশ্বাসযোগ্যতার প্লাটফর্ম তৈরি করে। সে আস্থা ধরে রাখতে প্রতিদিনই আমাদের আর্থিক শৃঙ্খলা, সেবা মান ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় উৎকর্ষ বজায় রাখতে হয়।

আপনার প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণের বর্তমান অবস্থা কী? ঋণের গুণগত মান নিশ্চিত করতে কী ধরনের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা অনুসরণ করছেন?

১৯৯৭ সালে যাত্রা শুরু করে সুদীর্ঘ ৩০ বছরে ‘ডিবিএইচ’-এর খেলাপি ঋণের হার কখনো ১ শতাংশ অতিক্রম করেনি। বর্তমানে আমাদের খেলাপি ঋণের হার (এনপিএল) দশমিক ৮8শতাংশ, সামগ্রিক আর্থিক খাত বিবেচনা করলে যা অন্যতম সেরা। এটি কোনো কাকতালীয় বিষয় নয়; বরং দীর্ঘদিনের রক্ষণশীল ঋণনীতি এবং কঠোর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার ফল। আমরা ঋণ অনুমোদনের আগে গ্রাহকের নগদ প্রবাহ, পরিশোধ সক্ষমতা, সম্পদের গুণমান এবং খাতভিত্তিক ঝুঁকি গভীরভাবে মূল্যায়ন করি। ঋণ বিতরণের পরেও নিয়মিত মনিটরিং, আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম এবং স্ট্রেস টেস্টিং পরিচালনা করি। পাশাপাশি সম্ভাব্য ঝুঁকির বিপরীতে আমরা নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনার তুলনায় অতিরিক্ত প্রভিশনও বজায় রেখেছি, যা ভবিষ্যৎ ঝুঁকি মোকাবেলায় আমাদের সক্ষমতা আরো শক্তিশালী করেছে।

আমাদের লক্ষ্য সমস্যা তৈরি হওয়ার আগেই ঝুঁকি শনাক্ত করে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে একটি উচ্চমানের ও টেকসই ঋণ পোর্টফোলিও বজায় রাখা।

বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় তহবিল সংগ্রহ ও তারল্য ব্যবস্থাপনায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী?

বর্তমান বাজারে তহবিলের ব্যয় বৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদি তহবিলের সীমিত প্রাপ্যতা পুরো আর্থিক খাতের জন্যই একটি বড় চ্যালেঞ্জ। যেহেতু আমাদের অর্থায়নের বড় অংশই দীর্ঘমেয়াদি, তাই কার্যকর সম্পদ ও দায় ব্যবস্থাপনা (এএলএম) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আমরা তহবিলের উৎস বহুমুখীকরণ, ব্যক্তিগত ও দীর্ঘমেয়াদি আমানত বৃদ্ধি, পর্যাপ্ত তারল্য সংরক্ষণ এবং সম্পদ-দায়ের মেয়াদ পূর্তির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছি। আমাদের শক্তিশালী তারল্য ব্যবস্থাপনা এবং সুশৃঙ্খল ব্যালান্স শিট এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সহায়ক ভূমিকা পালন করছে।

বাংলাদেশে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য করপোরেট বন্ড বাজার ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন কতটা গুরুত্বপূর্ণ? এক্ষেত্রে কী ধরনের নীতিগত পরিবর্তন প্রয়োজন বলে মনে করেন?

আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য একটি কার্যকর করপোরেট বন্ড বাজার শুধু একটি বিকল্প অর্থায়নের উৎস নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধির অন্যতম ভিত্তি। যেহেতু আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অর্থায়নের বড় অংশই আবাসন, অবকাঠামো ও শিল্প খাতের মতো দীর্ঘমেয়াদি খাতে, তাই দীর্ঘমেয়াদি তহবিলের সহজলভ্যতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি উন্নত করপোরেট বন্ড বাজার দীর্ঘমেয়াদি ও স্থিতিশীল তহবিলের উৎস সৃষ্টি করবে, সম্পদ ও দায় ব্যবস্থাপনা আরো কার্যকর করবে, ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর চাপ কমাবে এবং দেশের মূলধন বাজারকে আরো গভীর ও গতিশীল করে তুলবে।

এ লক্ষ্য অর্জনে করপোরেট বন্ড ইস্যুর অনুমোদন প্রক্রিয়াকে আরো সহজ, দ্রুত ও সময় উপযোগী করতে হবে। এবং পেনশন ফান্ড, বীমা কোম্পানি, মিউচুয়াল ফান্ডসহ প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ আরো বাড়াতে হবে। পাশাপাশি একটি সক্রিয় সেকেন্ডারি বন্ড মার্কেট, কার্যকর মার্কেট মেকার এবং স্বচ্ছ প্রাইস ডিসকভারি ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।

এছাড়া ব্যাংকনির্ভর অর্থায়নের পাশাপাশি পুঁজিবাজারভিত্তিক অর্থায়নের উপকরণ, যেমন করপোরেট বন্ড, সুকুক, অ্যাসেট-ব্যাকড সিকিউরিটিজ ও আরইআইটির ব্যবহার বাড়ানো প্রয়োজন। এতে দীর্ঘমেয়াদি তহবিলের নতুন উৎস তৈরি হবে, অর্থায়নের ব্যয় আরো প্রতিযোগিতামূলক হবে এবং দেশের আর্থিক খাত আরো শক্তিশালী ও বহুমুখী হবে।

আগামী পাঁচ বছরে আপনার প্রতিষ্ঠানের প্রধান কৌশলগত অগ্রাধিকার কী এবং বাংলাদেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী?

আগামী পাঁচ বছরে আমাদের কৌশলগত অগ্রাধিকার হবে টেকসই, গুণগত ও দায়িত্বশীল প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা। তাই আমাদের কৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে গ্রাহকের আস্থা, শক্তিশালী ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, সুশাসন ও দীর্ঘমেয়াদি মূল্য সৃষ্টি।

আবাসন অর্থায়নে আমাদের নেতৃত্ব সুদৃঢ় করার পাশাপাশি দেশের মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর জন্য সাশ্রয়ী আবাসনে অর্থায়নের সুযোগ সম্প্রসারণ এবং ঢাকাকেন্দ্রিক কার্যক্রমের বাইরে উদীয়মান অর্থনৈতিক অঞ্চল ও শহরে আমাদের উপস্থিতি বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। ডিজিটাল প্লাটফর্ম, দ্রুততর ঋণ প্রক্রিয়াকরণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর গ্রাহকসেবার মাধ্যমে সারা দেশে আরো সহজে গ্রাহকদের কাছে পৌঁছার সক্ষমতা বাড়ানো হবে।

সম্পদের গুণগত মান, শক্তিশালী ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, পর্যাপ্ত প্রভিশন এবং শক্তিশালী মূলধন ভিত্তি বজায় রেখে আমরা একটি স্থিতিশীল ও সহনশীল ব্যালান্স শিট গড়ে তুলতে চাই। পাশাপাশি তহবিলের উৎস বহুমুখীকরণ, খুচরা আমানত ভিত্তি সম্প্রসারণ, বিকল্প দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন, মানবসম্পদ উন্নয়ন, প্রযুক্তি, সাইবার নিরাপত্তার ওপর গুরুত্ব অব্যাহত থাকবে।

বাংলাদেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আমি আশাবাদী। স্বল্পমেয়াদে কিছু চ্যালেঞ্জ থাকলেও দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করবে। সে যাত্রায় ‘ডিবিএইচ’ একটি দায়িত্বশীল, উদ্ভাবনী ও দীর্ঘমেয়াদি অংশীদার হিসেবে তার ভূমিকা আরো সুদৃঢ় করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।