এ অর্জনের পেছনে মূল কারণ হলো আমরা যেকোনো অপ্রত্যাশিত আর্থিক ধাক্কা সামলে নেয়ার সক্ষমতা বজায় রেখেছি। নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্ধারিত সীমার চেয়ে অনেক বেশি মূলধন আমরা বজায় রাখি, যা সরকারি বন্ডের মতো নিরাপদ বিনিয়োগ দ্বারা সুরক্ষিত। বিশ্বসেরা আন্তর্জাতিক পুনঃবীমা কোম্পানিগুলোর সঙ্গে আমাদের অংশীদারত্ব আছে। এর মাধ্যমে আমরা বড় ধরনের বিপর্যয় বা ক্যাটাস্ট্রফিক ঝুঁকিগুলো নিজেদের ওপর থেকে সরিয়ে নিই, যা আমাদের সার্বিক ঝুঁকিকে একটি নির্দিষ্ট সীমায় আটকে রাখে।

আমাদের পোর্টফোলিও অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। অগ্নি, নৌ, মোটর ও বিমান বীমার মতো বিভিন্ন খাতে ব্যবসা ছড়িয়ে দেয়ার কারণে যেকোনো একটি খাতে বড় ক্ষতি হলেও তা পুরো কোম্পানিকে অস্থিতিশীল করতে পারে না। এছাড়া আমরা করপোরেট গভর্ন্যান্স কঠোরভাবে অনুসরণ করি। আমাদের শক্তিশালী এন্টারপ্রাইজ রিস্ক ম্যানেজমেন্ট (ইআরএম) ফ্রেমওয়ার্ক এবং স্থিতিশীল নেতৃত্ব আমাদের সব ধরনের আইনি কমপ্লায়েন্স ও প্রাতিষ্ঠানিক ঝুঁকিগুলোকে দূর করে। ফলে আমরা এ ক্রেডিট রেটিং অর্জন করে এত বছর ধরে তা বজায় রাখতে পেরেছি।

গ্রীন ডেল্টাকে ‘‌ট্রিপল এ’ রেটিং দিতে এজেন্সিগুলো কোন মূল সূচকগুলো মূল্যায়ন করেছে?

রেটিং এজেন্সিগুলো সাময়িক বাজার পরিস্থিতির ওপর নির্ভর না করে মূলত কাঠামোগত স্থিতিস্থাপকতা এবং আর্থিক শৃঙ্খলার ওপর জোর দেয়। এক্ষেত্রে আর্থিক সক্ষমতা, মূলধন পর্যাপ্ততার হার, নগদ ও দায়ের অনুপাত এবং সরকারি বন্ডে বিনিয়োগের পরিমাণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিভিন্ন খাতের ক্ষতির অনুপাত এবং আন্ডাররাইটিং মার্জিনের পাশাপাশি পরিচ্ছন্ন নিরীক্ষা প্রতিবেদন, করপোরেট সুশাসনের প্রকাশ এবং রিয়েল-টাইমে ঝুঁকির বিপরীতে আর্থিক প্রভিশনও এখানে মূল ভূমিকা রাখে।

এ ধরনের রেটিং বীমা গ্রাহক ও বিনিয়োগকারীদের ওপর বাস্তবিক কোনো প্রভাব তৈরি করে কিনা?

অবশ্যই। রেটিং হলো একটি বৈশ্বিক মানদণ্ড, যা উভয় পক্ষকেই অনন্য নিশ্চয়তা দেয়। গ্রাহকের শতভাগ দাবি, বড় ধরনের শিল্প, করপোরেট বা খুচরা ক্ষতি অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে পরিশোধ করার সক্ষতার বার্তা দেয় এ রেটিং। ফলে একটি বীমা পলিসি সাধারণ কাগজের টুকরো থেকে নিরেট আর্থিক নিশ্চয়তার রূপ নেয়। এছাড়া বিনিয়োগকারীদেরও এটি নিরাপদ পুঁজির আশ্রয়স্থল হিসেবে নির্দেশ করে। এ রেটিং প্রমাণ করে নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান ঝুঁকিপূর্ণ বাজারে বাজি না ধরে বরং সুপরিকল্পিত বিনিয়োগের মাধ্যমে শেয়ারহোল্ডারদের সম্পদ রক্ষা ও বৃদ্ধি করে। এটি আমাদের আয়ের উচ্চ গুণগত মান, সফল ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ও নিখুঁত করপোরেট সুশাসনেরই বহিঃপ্রকাশ।

গ্রীন ডেল্টার মূলধন পর্যাপ্ততা, ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা ও বর্তমান তারল্যের পরিস্থিতি কেমন?

আমাদের মূলধন গভীর ও সুদৃঢ়, ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা অত্যন্ত সুরক্ষিত এবং আমাদের তারল্যও বেশি শক্তিশালী। এ অনন্য আর্থিক ত্রয়ীর কারণেই গ্রীন ডেল্টা টানা এত বছর ধরে ‘ট্রিপল এ’ রেটিং বজায় রাখতে পেরেছে এবং দেশব্যাপী লক্ষাধিক পলিসিহোল্ডারকে নিরাপত্তা দিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে আমাদের ১ হাজার ৪২০ কোটি টাকারও বেশি মোট সম্পদ রয়েছে। প্রতি শেয়ারে ৭০ টাকার ওপরে স্থিতিশীল নিট অ্যাসেট ভ্যালুসহ কোম্পানির একটি বিশাল আর্থিক রিজার্ভ রয়েছে। ডেল্টা ইন্স্যুরেন্সের দায় পরিশোধের সক্ষমতা বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত সীমার চেয়ে সবসময় অনেক বেশি থাকে। এ পরিস্থিতি নিশ্চিত করে যে আমরা আমাদের মূলধনে কোনো ব্যাঘাত না ঘটিয়েই একসঙ্গে একাধিক বড় বা শিল্প খাতের বীমা দাবি মিটিয়ে দিতে পারি।

বর্তমানে আমাদের ৬০০ কোটি টাকার একটি বিনিয়োগ পোর্টফোলিও রয়েছে। এগুলো সরকারি বন্ড, মেয়াদি আমানত এবং শেয়ারবাজারে ভারসাম্যপূর্ণভাবে বিন্যস্ত। আমাদের রয়েছে শক্তিশালী নিট অপারেটিং ক্যাশ ফ্লো। সম্প্রতি আমরা তাৎক্ষণিকভাবে ৭০ কোটি টাকারও বেশি বীমা দাবি পরিশোধ করেছি।

সামগ্রিক শিল্পের দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশের বীমা খাতের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি কোনটি?

দেশের সামগ্রিক বীমা খাত মূলত তিনটি মারাত্মক ঝুঁকির সম্মুখীন। আস্থার সংকট ও কম বাজার প্রবৃদ্ধি, তারল্য সংকট এবং দুর্বল সুশাসন। বীমা খাতের অবদান দেশের জিডিপির দশমিক ৪ শতাংশেরও নিচে নেমে গেছে, যা আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলোর চেয়ে অনেক কম। পুরো শিল্পজুড়ে বীমা দাবি পরিশোধে ব্যাপক বিলম্বের খবর প্রতিনিয়ত সামনে আসায় সাধারণ মানুষ বীমাকে একটি প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা বেষ্টনী হিসেবে না দেখে অপচয় বা অপ্রয়োজনীয় খরচ হিসেবে বিবেচনা করে।

অনেক বীমা কোম্পানি তাদের বিনিয়োগের সিংহভাগ অর্থ বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোয় মেয়াদি আমানত হিসেবে আটকে রেখেছে। সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংক খাতে তারল্য বা নগদ টাকার সংকট দেখা দেয়ায় এ কোম্পানিগুলো বড় কোনো শিল্প দাবির বিপরীতে দ্রুত নগদ টাকা দিতে পারেনি। এছাড়া ৮০টিরও বেশি বীমা কোম্পানি সচল থাকলেও এ খাতে দক্ষ অ্যাকচুয়ারি ও রিস্ক ইঞ্জিনিয়ারের তীব্র অভাব রয়েছে। সঠিক ও কারিগরি মূল্যায়ন ছাড়া কম মূল্যে পলিসি বিক্রি করার কারণে কোনো বড় দুর্ঘটনা ঘটলে এ কোম্পানিগুলোর কাছে দাবি মেটানোর মতো পর্যাপ্ত তহবিল থাকে না।

বীমা খাতে আস্থা বৃদ্ধির জন্য করণীয় কী?

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে এগিয়ে নিতে হলে বীমা শিল্পকে কেবল স্বল্পমেয়াদি প্রিমিয়াম আয়ের পেছনে অন্ধের মতো ছোটা বন্ধ করতে হবে। আইডিআরএর কঠোর নিয়মকানুন বাস্তবায়ন, স্বচ্ছতা বৃদ্ধি ও তাৎক্ষণিকভাবে গ্রাহকের বীমা দাবি পরিশোধের মাধ্যমেই কেবল এ খাত জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারে এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির একটি অন্যতম শক্তিশালী স্তম্ভে পরিণত হতে পারে।