প্রথমত, আমাদের ঋণ পোর্টফোলিওর গুণগত মান। দীর্ঘদিন ধরে আমরা দেশের আর্থিক খাতের অন্যতম নিম্ন খেলাপি ঋণের হার বজায় রেখেছি এবং একই সঙ্গে শক্তিশালী মূলধন পর্যাপ্ততা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করেছি। দ্রুত প্রবৃদ্ধির পরিবর্তে টেকসই ও মানসম্পন্ন প্রবৃদ্ধিকে আমরা সবসময় অগ্রাধিকার দিয়েছি।

দ্বিতীয়ত, আমাদের আর্থিক অন্তর্ভুক্তিমূলক (ফাইন্যান্সিয়াল ইনক্লুসন) ব্যবসায়িক মডেল। ঋণ বিতরণের পাশাপাশি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সৃষ্টি করার লক্ষ্যে আমরা দেশের ৬৪টি জেলায় আমাদের কার্যক্রম সম্প্রসারণ করেছি এবং রাজধানীকেন্দ্রিক ব্যবসার পরিবর্তে আঞ্চলিক অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছি।

তৃতীয়ত, আমাদের শেয়ারহোল্ডার, গ্রাহক ও অন্যান্য অংশীজনের প্রতি ধারাবাহিক দায়বদ্ধতা। অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মধ্যেও ২০২৪ ও ২০২৫ সালে আমরা ১০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ প্রদান করেছি। পাশাপাশি গ্রাহকের আস্থা, আমানতের নিরাপত্তা, নিয়ন্ত্রক অনুগত্য ও শক্তিশালী করপোরেট গভর্ন্যান্স বজায় রেখেছি।

অর্জিত রেটিং ব্যবসা সম্প্রসারণ, বিনিয়োগে কী ধরণের ভূমিকা রাখতে পারে?

‘ট্রিপল এ’ রেটিং কেবল একটি প্রতীকী স্বীকৃতি নয়; এটি ব্যবসায়িক সক্ষমতার একটি স্বাধীন মূল্যায়ন।

এই রেটিং আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী, ব্যাংক, উন্নয়ন সহযোগী এবং আন্তর্জাতিক অর্থায়নকারী সংস্থাগুলোর কাছে আরো গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে। পাশাপাশি গ্রাহক, শেয়ারহোল্ডার ও ব্যবসায়িক অংশীদারদের কাছে একটি শক্তিশালী বার্তা দেয় যে প্রতিষ্ঠানটি সুশাসন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং আর্থিক সক্ষমতার দিক থেকে সর্বোচ্চ মান বজায় রাখছে।

বর্তমান সময়ে ‘ট্রিপল এ’ রেটিং ধরে রাখতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী?

‘ট্রিপল এ’ রেটিং অর্জনের চেয়ে তা ধরে রাখা অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং।

বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় প্রথম চ্যালেঞ্জ হলো পোর্টফোলিওর গুণগত মান অক্ষুণ্ন রাখা। উচ্চ সুদহার, সীমিত বেসরকারি ঋণপ্রবাহ এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও সম্পদের মান ধরে রাখতে হবে।

দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ হলো প্রবৃদ্ধি ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা।

তৃতীয়ত, দীর্ঘমেয়াদি ও প্রতিযোগিতামূলক ব্যয়ের তহবিল নিশ্চিত করা। বর্তমান বাজারে দক্ষ সম্পদ-দায় (অ্যাসেট লায়াবিলিটি) ব্যবস্থাপনা এবং তহবিলের বৈচিত্র্য বজায় রাখাই হবে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার।

আপনারা ঋণের গুণগত মান নিশ্চিত করতে কী ধরনের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা অনুসরণ করছেন?

আমরা গর্বের সঙ্গে বলতে পারি, ইউনাইটেড ফাইন্যান্সের খেলাপি ঋণের হার দীর্ঘদিন ধরেই দেশের আর্থিক খাতের অন্যতম সর্বনিম্ন। এটি শক্তিশালী ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা সংস্কৃতি, সুশাসন ও দীর্ঘমেয়াদি দায়িত্বশীল ঋণনীতির ফল।

আমরা দীর্ঘদিন ধরে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে আসছি। ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে শুধু জামানত নয়, গ্রাহকের ব্যবসার ধরন, নগদপ্রবাহ ও পরিশোধ ক্ষমতাও মূল্যায়ন করি। প্রযুক্তিনির্ভর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা আরো শক্তিশালী করার জন্য আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম, তথ্য বিশ্লেষণ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ঝুঁকি শনাক্তকরণ এবং রিয়েল-টাইম পোর্টফোলিও মনিটরিংয়ের মাধ্যমে সম্ভাব্য ঝুঁকি প্রাথমিক পর্যায়েই চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হয়।

আমরা নির্দিষ্ট কোনো পণ্য, শিল্প, অঞ্চল বা গ্রাহকের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা এড়িয়ে চলি। এছাড়া ‘সিএমএসএমই’ অর্থায়নের ক্ষেত্রে আমরা শুধু ঋণ প্রদানেই সীমাবদ্ধ থাকি না; ব্যবসার বিকাশের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ধাপে ধাপে অতিরিক্ত ও উন্নতমানের নিরাপত্তা (কোল্যাটেরাল এনহান্সমেন্ট) নিশ্চিত করার নীতি অনুসরণ করি। এতে উদ্যোক্তার প্রবৃদ্ধি যেমন সমর্থন পায়, তেমনি প্রতিষ্ঠানের ঝুঁকিও নিয়ন্ত্রিত থাকে।

বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় তহবিল সংগ্রহ ও তারল্য ব্যবস্থাপনায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী?

‘এনবিএফআই’ খাতের জন্য বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় তহবিল সংগ্রহের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু উচ্চ সুদহার বা সীমিত তারল্য নয়, বরং গ্রাহকের আস্থা অর্জন ও ধরে রাখা। সাম্প্রতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সংকটের কারণে আমানতকারীরা এখন অনেক বেশি সতর্ক। ব্যাংক হোক বা এনবিএফআই—সব ক্ষেত্রেই আস্থাই এখন তহবিল সংগ্রহের সবচেয়ে বড় ভিত্তি।

তাই শক্তিশালী ক্রেডিট রেটিং, সুশাসন, স্বচ্ছতা ও আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি তহবিলের উৎস বৈচিত্র্যময় করা, বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন সুবিধার কার্যকর ব্যবহার এবং গ্রাহকের আর্থিক সচেতনতা বৃদ্ধি দীর্ঘমেয়াদে আস্থা ও টেকসই তহবিল সংগ্রহে সহায়ক হবে।

করপোরেট বন্ড বাজার ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নে কোনো নীতিগত পরিবর্তন প্রয়োজন আছে কি?

বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য একটি কার্যকর করপোরেট বন্ড বাজার অপরিহার্য।

সাশ্রয়ী আবাসন, অবকাঠামো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি কিংবা দীর্ঘমেয়াদি ‘সিএমএসএমই’ বিনিয়োগ খাতে ৫-১০ বছরের অর্থায়ন প্রয়োজন। স্বল্পমেয়াদি ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভর করে এ চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়।

সেজন্য করপোরেট বন্ড বাজারকে আরো কার্যকর করতে বন্ড ইস্যুর প্রক্রিয়া সহজ করা, নিয়ন্ত্রক অনুমোদনের সময় কমানো, উচ্চ রেটিংধারী প্রতিষ্ঠানের বন্ডে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ উৎসাহিত করা এবং একটি সক্রিয় সেকেন্ডারি মার্কেট গড়ে তোলা জরুরি।

আমি বিশ্বাস করি, শক্তিশালী সুশাসন ও উচ্চ ক্রেডিট রেটিংসম্পন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো এ বাজারের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

আগামী পাঁচ বছরে আপনাদের প্রতিষ্ঠানের প্রধান কৌশলগত অগ্রাধিকার কী? বাংলাদেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতের ভবিষ্যৎ কীভাবে দেখছেন?

আগামী পাঁচ বছরে আমাদের কৌশল চারটি প্রধান ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে থাকবে।

প্রথমত, ‘সিএমএসএমই’ ও সাশ্রয়ী আবাসন অর্থায়নে নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা। উভয় খাত বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের সহায়তায় অর্থায়নের পাশাপাশি আমাদের সক্ষমতা, পণ্য, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও গ্রাহকসেবার মান আরো উন্নত করছি।

দ্বিতীয়ত, এসএমই উদ্যোক্তাদের জন্য একটি সমন্বিত ব্যবসায়িক সহায়তা (এসএমই অ্যাডভাইজরি সার্ভিসেস) ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা। উদ্যোক্তাদের দক্ষতা উন্নয়ন, আর্থিক ব্যবস্থাপনা, ডিজিটাল সক্ষমতা, বাজার সংযোগ এবং সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারের সঙ্গে কার্যকর সমন্বয়ের মাধ্যমে একটি টেকসই এসএমই ইকোসিস্টেম গড়ে তোলাই আমাদের লক্ষ্য।

তৃতীয়ত, গ্রাহক সংগ্রহ থেকে শুরু করে ক্রেডিট মূল্যায়ন, ঋণ বিতরণ, সংগ্রহ, পারফরম্যান্স ব্যবস্থাপনা এবং ঝুঁকি পর্যবেক্ষণ—পুরো মূল্য শৃঙ্খলে ডিজিটাল প্রযুক্তি, তথ্য-বিশ্লেষণ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার আরো বিস্তৃত করা হবে, যাতে গ্রাহক আরো দ্রুত, সহজ ও নির্ভরযোগ্য সেবা পান।

চতুর্থত, টেকসই প্রবৃদ্ধি, শক্তিশালী করপোরেট গভর্ন্যান্স এবং দীর্ঘমেয়াদি মূল্য সৃষ্টি। আমাদের লক্ষ্য শুধু ব্যবসার আকার বৃদ্ধি নয়; বরং একটি দক্ষ, দায়িত্বশীল, প্রযুক্তিনির্ভর ও দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিজেদের আরো সুসংহত করা।

বাংলাদেশের আর্থিক খাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমি আশাবাদী। যেসব প্রতিষ্ঠান অর্থায়নের পাশাপাশি উদ্যোক্তাদের সক্ষমতা উন্নয়ন এবং একটি শক্তিশালী ব্যবসায়িক ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে পারবে, তারাই আগামী দশকের নেতৃত্ব দেবে। ইউনাইটেড ফাইন্যান্স সে ভবিষ্যতের জন্যই আজ নিজেদের প্রস্তুত করছে।