একটি বন্ধ হয়ে যাওয়া আন্তর্জাতিক ব্যাংকের ধ্বংসাবশেষ থেকে জন্ম নিয়ে তিন দশকের ব্যবধানে দেশের সবচেয়ে স্থিতিশীল, সুশাসননির্ভর ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বেসরকারি ব্যাংকগুলোর কাতারে জায়গা করে নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এর স্বীকৃতি হিসেবে টানা চতুর্থবারের মতো ক্রেডিট রেটিং এজেন্সি অব বাংলাদেশ (সিআরএবি) থেকে দীর্ঘমেয়াদে সর্বোচ্চ AAA এবং স্বল্পমেয়াদে ST-1 রেটিং অর্জন করেছে ব্যাংকটি। এ রেটিং কেবল একটি স্বীকৃতি নয়, বরং ব্যাংকটির আর্থিক সক্ষমতা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার প্রতিফলন।

ইস্টার্ন ব্যাংকের এ অর্জনের ভিত্তি তৈরি হয়েছে ধারাবাহিক আর্থিক পারফরম্যান্সের ওপর। ২০২৫ সালে ব্যাংকটির কর-পরবর্তী মুনাফা দাঁড়িয়েছে ৯০১ কোটি টাকায় যা আগের বছরের তুলনায় ২০ শতাংশ বেশি। একই সময়ে আমানত বেড়ে হয়েছে ৫৫ হাজার ৬৪৫ কোটি টাকা, ঋণ ও অগ্রিম বেড়ে ৪৭ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা এবং বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ৪৮ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২১ হাজার ১৪৭ কোটি টাকায়। শুধু আকারে নয়, সম্পদের গুণগত মানেও ব্যাংকটি এগিয়ে রয়েছে। ২০২৫ সালের শেষে ইবিএলের খেলাপি ঋণের হার ছিল মাত্র ২ দশমিক ২৪ শতাংশ, যেখানে দেশের ব্যাংক খাতের গড় খেলাপি ঋণের হার ছিল কয়েক গুণ বেশি। একই সময়ে ব্যাংকটির মূলধন পর্যাপ্ততা (CRAR) ১৫ দশমিক ৪৯ শতাংশ, যা নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্ধারিত ন্যূনতম সীমার অনেক ওপরে।

ইস্টার্ন ব্যাংকের গল্প শুরু হয় ১৯৯২ সালে। আন্তর্জাতিক আর্থিক জগতে আলোচিত ব্যাংক অব ক্রেডিট অ্যান্ড কমার্স ইন্টারন্যাশনাল (বিসিসিআই) জালিয়াতি ও অর্থ পাচারের অভিযোগে বিশ্বজুড়ে বন্ধ হয়ে গেলে বাংলাদেশে এর কার্যক্রমও থেমে যায়। তখন আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থায় আস্থা ধরে রাখতে বাংলাদেশ সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগে বিসিসিআইয়ের বাংলাদেশ কার্যক্রম পুনর্গঠন করে প্রতিষ্ঠা করা হয় ইস্টার্ন ব্যাংক। কিন্তু নতুন এ ব্যাংকের শুরুটা মোটেও সহজ ছিল না। প্রতিষ্ঠাকালেই শত শত কোটি টাকার ঘাটতি ও দুর্বল সম্পদ নিয়ে যাত্রা শুরু করতে হয়েছিল।

প্রথম কয়েক বছর ছিল টিকে থাকার সংগ্রাম। খেলাপি ঋণ, দুর্বল সম্পদ এবং সীমিত ব্যবসায়িক সক্ষমতার মধ্যে ব্যাংকটিকে পুনর্গঠন করতে হয়। ১৯৯৫ সালে প্রথমবারের মতো কর-পরবর্তী মুনাফা অর্জন করে ইস্টার্ন ব্যাংক। এরপর ধীরে ধীরে একটি নতুন সাংগঠনিক সংস্কৃতি গড়ে ওঠে, যেখানে অগ্রাধিকার পায় পেশাদার ব্যবস্থাপনা, ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ, প্রযুক্তিনির্ভর সেবা ও করপোরেট সুশাসন। ২০০০ সালের পর ব্যাংকটির রূপান্তর আরো দৃশ্যমান হতে শুরু করে। নতুন নেতৃত্বের অধীনে ব্যবসা সম্প্রসারণ, দক্ষ মানবসম্পদ গঠন এবং গ্রাহককেন্দ্রিক সেবার ওপর জোর দেয়ায় ব্যাংকটি দ্রুত প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরে আসে।

সিআরএবির মূল্যায়নে ইবিএলের শক্তিশালী মূলধন ভিত্তি, পর্যাপ্ত তারল্য, বৈচিত্র্যময় আমানত কাঠামো, কঠোর ঋণ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, সুশাসন এবং ধারাবাহিক মুনাফাকে AAA রেটিংয়ের প্রধান ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ব্যাংকটির করপোরেট গভর্ন্যান্স, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং রক্ষণশীল ঋণনীতি অন্য অনেক ব্যাংকের তুলনায় বেশি কার্যকর বলেও মূল্যায়নে উঠে এসেছে।

দেশীয় রেটিংয়ের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পর্যায়েও ইবিএলের অবস্থান আলাদা। ২০১৬ সালে মুডিসের কাছ থেকে আন্তর্জাতিক ক্রেডিট রেটিং পাওয়া প্রথম বাংলাদেশী ব্যাংক ছিল ইস্টার্ন ব্যাংক। বর্তমানে মুডিস ব্যাংকটিকে B2 রেটিং দিয়েছে, যা বাংলাদেশের সার্বভৌম রেটিংয়ের সমপর্যায়ের। অর্থাৎ ব্যাংকটির নিজস্ব আর্থিক সক্ষমতার চেয়ে দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক ঝুঁকিই আন্তর্জাতিক রেটিংয়ের প্রধান নিয়ামক।

পরিসংখ্যান বলছে, ইস্টার্ন ব্যাংকের সাফল্য কোনো এক বছরের নয়; এটি দীর্ঘদিনের আর্থিক শৃঙ্খলা, বিচক্ষণ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও সুশাসনের ফল। যখন দেশের অনেক ব্যাংক আমানত ধরে রাখতেই হিমশিম খাচ্ছে, তখন টানা চার বছর সর্বোচ্চ AAA রেটিং ধরে রাখা ইঙ্গিত দেয়—আস্থা অর্জন করা কঠিন, কিন্তু তা ধরে রাখা আরো কঠিন। সেই কঠিন কাজটিই ধারাবাহিকভাবে করে যাচ্ছে ইস্টার্ন ব্যাংক।