‘ট্রিপল এ’ রেটিং অর্জনের পেছনে প্রধান চালিকাশক্তি হলো আমাদের শক্তিশালী বাজার অবস্থান, ধারাবাহিকভাবে শক্তিশালী মূলধন ভিত্তি এবং মূলধন পর্যাপ্ততা অনুপাত ও তারল্য সংরক্ষণ-সংক্রান্ত নিয়ন্ত্রক বিধিমালার সঙ্গে পূর্ণ সামঞ্জস্য। আমরা দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বের শীর্ষ চারটি আন্তর্জাতিক অডিট ফার্মের একটির মাধ্যমে আমাদের আর্থিক বিবরণীর স্বাধীন নিরীক্ষা সম্পন্ন করে আসছি, যা আমাদের আর্থিক প্রতিবেদন, স্বচ্ছতা ও করপোরেট সুশাসনের প্রতি অঙ্গীকারকে আরো সুদৃঢ় করেছে। ২০২৫ সালে আমাদের সিএআর ছিল ১৭ দশমিক ১৪ শতাংশ, যা নিয়ন্ত্রক সীমার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। পাশাপাশি ঋণ পোর্টফোলিও ৭ দশমিক ৩১ শতাংশ এবং গ্রাহক আমানত ১৭ দশমিক ৬৯ শতাংশ বৃদ্ধি, পরিচালন আয় ৭ দশমিক ৪৩ শতাংশ বেড়ে ৩৪৮ কোটি টাকায় পৌঁছানো এবং সুদ-বহির্ভূত আয়ের ধারাবাহিক অবদান এ স্বীকৃতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। সর্বোপরি, পরিচালনা পর্ষদের বৈচিত্র্যময় অভিজ্ঞতা এবং সামগ্রিকভাবে শক্তিশালী সুশাসন কাঠামো এ রেটিং টানা অষ্টমবারের মতো ধরে রাখার ভিত্তি তৈরি করেছে। ফলে আমরা শুধু আর্থিক সূচকেই নয়, বরং আমানতকারী ও বিনিয়োগকারীদের কাছে আস্থার প্রতীক হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছি।

তহবিল সংগ্রহের খরচ কমাতে, বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে বা ব্যবসা সম্প্রসারণে এ রেটিং কোনো সুবিধা দিচ্ছে কি?

হ্যাঁ, এ রেটিং আমাদের জন্য সুনির্দিষ্ট এবং বাস্তব সুবিধা নিয়ে এসেছে। ‘ট্রিপল এ’ রেটিংপ্রাপ্ত হওয়ায় আমানতকারীরা আইপিডিসিকে তাদের অর্থের জন্য একটি অত্যন্ত নিরাপদ প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখে। গত কয়েক বছরে আর্থিক খাতে নানা নেতিবাচক অভিজ্ঞতা থাকলেও এ নিরাপত্তার নিশ্চয়তা স্বাভাবিকভাবেই আইপিডিসিকে আমানত সংগ্রহে বাড়তি সুবিধা দিয়েছে এবং একই সঙ্গে বিনিয়োগকারীদের আস্থা আরো সুদৃঢ় করেছে। গ্রাহক ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধির ফলে ২০২৫ সালে আমাদের গ্রাহক আমানত ১৭ দশমিক ৬৯ শতাংশ বেড়েছে, যা প্রাতিষ্ঠানিক তহবিলের ওপর নির্ভরশীলতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়েছে এবং তহবিলের উৎস আরো বৈচিত্র্যময় করেছে। ‘ট্রিপল এ’ রেটিং আমাদের নতুন ব্যবসা ও পণ্যের ক্ষেত্রে সম্প্রসারণের সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। IPDC Joyee, Bhalobasha Home Loan এবং Ichche Deposit-এর মতো উদ্যোগ এ আস্থার ওপর ভিত্তি করেই বাজারে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক ঋণদাতা ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে আলোচনায় আমাদের অবস্থান আরো সুদৃঢ় হয়েছে।

আপনাদের প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণের হার এখন কেমন? ঋণের গুণগত মান নিশ্চিত করতে কোন ধরনের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা অনুসরণ করছেন?

২০২৫ সালে আমাদের এনপিএল রেশিও ৫ দশমিক ৯৭ শতাংশ, যা এ খাতের গড় ৩৭ দশমিক ১১ শতাংশের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম এবং নিয়ন্ত্রণযোগ্য পর্যায়ে রয়েছে। সম্পদের গুণগত মান সুরক্ষায় আমরা কঠোর ঋণ মূল্যায়ন ব্যবস্থা, নিয়মিত ঋণ পোর্টফোলিও পর্যবেক্ষণ এবং প্রাথমিক সতর্কীকরণ ব্যবস্থা অনুসরণ করছি, যার মাধ্যমে সম্ভাব্য ঝুঁকি আগেভাগেই চিহ্নিত করা সম্ভব হচ্ছে। ঋণ পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া আরো শক্তিশালী করা হয়েছে এবং ডিজিটাল ঝুঁকি বিশ্লেষণ ব্যবহার করে সম্ভাব্য দুর্বলতা সক্রিয়ভাবে শনাক্ত করা হচ্ছে। পাশাপাশি সংরক্ষণ ব্যবস্থা কঠোরভাবে বজায় রাখা হচ্ছে, যা বাংলাদেশ ব্যাংকের ঋণ শ্রেণীকরণ নির্দেশিকার সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং আর্থিক অবস্থার দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য।

তবে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের ব্যাঘাতের কারণে ঋণগ্রহীতাদের পরিশোধ সক্ষমতা প্রভাবিত হতে পারে। এ প্রেক্ষাপটে আমাদের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কাঠামো আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আমরা খাতভিত্তিক ঝুঁকি বৈচিত্র্যময় করছি, ঋণগ্রহীতার প্রোফাইলিং উন্নত করছি এবং স্ট্রেস টেস্টিংয়ের মাধ্যমে সম্ভাব্য ঝুঁকি আগেভাগে শনাক্ত করছি।

এ সক্রিয় উদ্যোগ আমাদের শুধু এনপিএল রেশিও নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়তা করছে না, বরং আমানতকারী ও বিনিয়োগকারীদের কাছে আস্থা বজায় রাখতেও সহায়তা করছে। ফলে আমরা ‘ট্রিপল এ’ রেটিং ধরে রাখতে সক্ষম হচ্ছি এবং একই সঙ্গে টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করার পথে এগিয়ে যাচ্ছি।

অর্জিত রেটিং ধরে রাখার ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ কী?

সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সামষ্টিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা। বিশেষ করে সুদের হার ওঠানামা, মুদ্রাস্ফীতির চাপ এবং সামগ্রিক দুর্বল ঋণ পরিবেশের মধ্যেও কার্যক্রমগত স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। ২০২৫ সালে উচ্চ সুদের হার এবং প্রতিযোগিতামূলক আমানত বাজারের প্রত্যক্ষ প্রভাবে তহবিলের ব্যয় (কস্ট অব ফান্ড) বেড়েছে। একই সঙ্গে ঋণগ্রহীতাদের পরিশোধ সক্ষমতার ওপর চাপ থাকায় ঋণ পোর্টফোলিওর গুণগত মান নিরবচ্ছিন্নভাবে পর্যবেক্ষণ করা এবং খেলাপি ঋণ ব্যবস্থাপনা আরো শক্তিশালী রাখা জরুরি। রেটিং ধরে রাখতে এ দুটি বিষয়, অর্থাৎ টেকসই প্রবৃদ্ধি এবং সম্পদের গুণগত মান, একসঙ্গে নিশ্চিত করাই আমাদের সামনে সবচেয়ে বড় কৌশলগত চ্যালেঞ্জ।

‘ট্রিপল এ’ রেটিং বজায় রাখা মানে শুধু আর্থিক সূচক শক্তিশালী রাখা নয়, বরং আমানতকারী ও বিনিয়োগকারীদের কাছে আস্থা ধরে রাখা। ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা, বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের ব্যাঘাত এবং জলবায়ু-সম্পর্কিত ঝুঁকি আমাদের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে আরো দুর্বল করছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট, যা উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে এবং আমদানিনির্ভর অর্থনীতিতে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে। কিন্তু আমাদের সুশৃঙ্খল ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং বৈচিত্র্যময় তহবিল সংগ্রহ কৌশল এ চাপ মোকাবেলায় সহায়তা করছে।

দেশের অর্থনীতিতে বিভিন্ন সংকট রয়েছে। এমন বাস্তবতায় তহবিল সংগ্রহ ও তারল্য ব্যবস্থাপনায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী?

বর্তমান পরিবেশে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো স্বল্পমেয়াদি তারল্য চাহিদা এবং দীর্ঘমেয়াদি তহবিলের প্রয়োজনীয়তার মধ্যে সঠিক ভারসাম্য বজায় রাখা। দেশীয় তহবিলের উৎসের সীমিত গভীরতা এবং উচ্চ সুদের হার পরিবেশে নতুন আমানত ব্যয়-সাশ্রয়ীভাবে সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়ছে, যা ২০২৫ সালে তহবিলের ব্যয় বাড়াতেও প্রতিফলিত হয়েছে। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আমরা তহবিলের উৎস বৈচিত্র্যময় করতে এবং প্রাতিষ্ঠানিক ঋণের পরিবর্তে খুচরা আমানতের ওপর জোর দিতে কাজ করছি। ২০২৫ সালে গ্রাহক আমানত ১৭ দশমিক ৬৯ শতাংশ বৃদ্ধি এই কৌশলের সাফল্যের প্রতিফলন। একই সঙ্গে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ঋণদাতা উভয়ের সঙ্গে শক্তিশালী সম্পর্ক বজায় রাখা আমাদের তারল্য ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। পাশাপাশি আমরা বিকল্প তহবিল সংগ্রহের উপায়, যেমন বন্ড ইস্যু এবং পুঁজিবাজারভিত্তিক অর্থায়নের সুযোগগুলোও অনুসন্ধান করছি। ফলে আমরা দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধি ও টেকসই উন্নয়নের জন্য একটি দৃঢ় ভিত্তি তৈরি করতে সক্ষম হব।

বাংলাদেশে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য করপোরেট বন্ড বাজার ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন কতটা সহায়ক? এক্ষেত্রে কী ধরনের নীতিগত পরিবর্তনের প্রয়োজন বলে মনে করেন?

আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য একটি সক্রিয় করপোরেট বন্ড বাজার অপরিহার্য। এটি দীর্ঘমেয়াদি মূলধনে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করে, স্বল্পমেয়াদি আমানতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কমায় এবং অবকাঠামো ও সবুজ অর্থায়নের মতো দীর্ঘমেয়াদি খাতে বিনিয়োগ সহজ করে। বর্তমানে এনবিএফআইগুলো তহবিলের জন্য মূলত আমানত ও ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরশীল, যা একটি কাঠামোগত দুর্বলতা তৈরি করে এবং সম্পদ-দায়ের মেয়াদগত অসামঞ্জস্যের ঝুঁকি বাড়ায়। বন্ড বাজার আরো গভীর ও কার্যকর করতে কর প্রণোদনা, বন্ড ইস্যু প্রক্রিয়া সহজীকরণ, দ্বিতীয়ত বাজারে তারল্য বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগকারী সুরক্ষা জোরদারসহ সমন্বিত নীতিগত সংস্কার প্রয়োজন বলে আমি দৃঢ়ভাবে মনে করি। এ সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন হলে করপোরেট বন্ড বাজার শুধু আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর দীর্ঘমেয়াদি তহবিল নিশ্চিত করবে না, বরং দেশের অবকাঠামো উন্নয়ন ও টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্যও একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করবে।

আপনাদের প্রতিষ্ঠানের আগামী পাঁচ বছরের কৌশলগত অগ্রাধিকার কী? দেশে আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতের ভবিষ্যৎ কেমন দেখছেন?

আগামী পাঁচ বছরে আমাদের কৌশলগত অগ্রাধিকারের কেন্দ্রে রয়েছে চারটি বিষয়: ডিজিটাল আর্থিক সেবা সম্প্রসারণের মাধ্যমে সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছানো; ঋণ ও বিনিয়োগ সিদ্ধান্তে ইএসজির সমন্বয় আরো গভীর করা; পুঁজিবাজারভিত্তিক বিভিন্ন ইন্সট্রুমেন্টের মাধ্যমে তহবিলের উৎস বৈচিত্র্যময় করা এবং প্রযুক্তি ও স্বয়ংক্রিয়করণের মাধ্যমে কার্যক্রমগত দক্ষতা বৃদ্ধি। টেকসই অর্থায়নের ক্ষেত্রে আমাদের সবুজ অর্থায়ন পোর্টফোলিও এরই মধ্যে ৮২ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়েছে এবং আইপিডিসি জয়ীর মতো প্লাটফর্মের মাধ্যমে নারী উদ্যোক্তা ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থায়ন আরো সম্প্রসারিত করা হবে। সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতের সম্ভাবনা আশাব্যঞ্জক। তবে এ সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগাতে নিয়ন্ত্রক সংস্কার, ডিজিটাল অবকাঠামো উন্নয়ন এবং সুশাসন শক্তিশালীকরণে অব্যাহত বিনিয়োগ প্রয়োজন।