এ মূল্যায়নের ক্ষেত্রে আমরা একাধিক বিষয় সমন্বিতভাবে বিবেচনা করি। এর মধ্যে রয়েছে প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা, নগদ প্রবাহের স্থায়িত্ব, মূলধনের শক্ত ভিত্তি, লাভজনকতা, ব্যবসায়িক অবস্থান, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, করপোরেট গভর্ন্যান্স, ব্যবস্থাপনার দক্ষতা ও ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক সম্ভাবনা। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিল্প খাতের অবস্থা, সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিবেশ ও সম্ভাব্য ঝুঁকিও মূল্যায়নের অংশ।

অর্থাৎ শুধু বড় আকারের প্রতিষ্ঠান হলেই ‘ট্রিপল এ’ পাওয়া যায় না; ধারাবাহিকভাবে শক্তিশালী আর্থিক ভিত্তি, সুশাসন এবং দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীল কার্যক্ষমতাই এ রেটিংয়ের মূল ভিত্তি।

রেটিংয়ের নিরপেক্ষতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করতে আপনারা কী ধরনের মানদণ্ড অনুসরণ করেন?

ক্রেডিট রেটিংয়ের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো বিশ্বাসযোগ্যতা। তাই স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা আমাদের জন্য সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।

রেটিং প্রক্রিয়ায় বিশ্লেষক, রিভিউ টিম ও রেটিং কমিটি পৃথকভাবে কাজ করে, যাতে ব্যক্তিগত মতামতের পরিবর্তে একটি যৌথ ও তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিশ্চিত হয়। প্রতিটি রেটিং নির্ধারিত পদ্ধতি, নীতিমালা ও অভ্যন্তরীণ মান নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে সম্পন্ন হয়।

এছাড়া স্বার্থের সংঘাত (কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট) এড়াতে কঠোর নীতিমালা অনুসরণ করা হয়। বিশ্লেষকদের স্বাধীনতা, তথ্যের গোপনীয়তা, নিয়মিত মান যাচাই এবং প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক সেরা অনুশীলনের সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রাখার মাধ্যমে রেটিংয়ের বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করা হয়।

ক্রেডিট রেটিং এজেন্সিগুলো দেশের আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধিতে কী ধরনের ভূমিকা রাখে?

ক্রেডিট রেটিং এজেন্সি একটি দেশের আর্থিক অবকাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আমাদের প্রধান কাজ হলো একটি প্রতিষ্ঠানের ঋণ পরিশোধ সক্ষমতা, আর্থিক স্থিতি, ব্যবসায়িক ঝুঁকি এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা সম্পর্কে স্বাধীন ও পেশাদার মূল্যায়ন করা। এ মূল্যায়নের মাধ্যমে বিনিয়োগকারী, ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য অংশীজন একটি প্রতিষ্ঠানের ঝুঁকি সম্পর্কে আরো তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে, যেখানে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন ও বন্ড বাজারের সম্প্রসারণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে নির্ভরযোগ্য ক্রেডিট রেটিং বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। একটি কার্যকর রেটিং ব্যবস্থা বাজারে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সুশাসনকে উৎসাহিত করে, যা সামগ্রিকভাবে আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা শক্তিশালী করতে সহায়তা করে।

বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের করপোরেট খাতের প্রধান শক্তি ও দুর্বলতা কী বলে মনে করেন?

বাংলাদেশের করপোরেট খাতের অন্যতম শক্তি হলো উদ্যোক্তাদের অভিযোজনক্ষমতা, তরুণ কর্মশক্তি, ক্রমবর্ধমান দেশীয় বাজার ও রফতানিমুখী শিল্পের সম্ভাবনা। বিভিন্ন বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জের মধ্যেও অনেক প্রতিষ্ঠান স্থিতিস্থাপকতা প্রদর্শন করেছে।

তবে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, অর্থায়নের ব্যয় বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের চাপ, কিছু ক্ষেত্রে করপোরেট গভর্ন্যান্সের সীমাবদ্ধতা এবং তথ্য প্রকাশের মানোন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা এখনো বিদ্যমান।

আমি মনে করি, শক্তিশালী সুশাসন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, প্রযুক্তিনির্ভর কার্যক্রম ও অধিক স্বচ্ছ আর্থিক প্রতিবেদন নিশ্চিত করতে পারলে বাংলাদেশের করপোরেট খাত আরো প্রতিযোগিতামূলক ও টেকসই হয়ে উঠবে।

বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক মানের করপোরেট গভর্ন্যান্স প্রতিষ্ঠায় ক্রেডিট রেটিং কীভাবে আরো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে?

আধুনিক ক্রেডিট রেটিং শুধু আর্থিক অনুপাত বিশ্লেষণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বর্তমানে করপোরেট গভর্ন্যান্স, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, বোর্ডের কার্যকারিতা, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, তথ্য প্রকাশের মান ও নৈতিক ব্যবসায়িক চর্চাও মূল্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

যখন কোনো প্রতিষ্ঠান উপলব্ধি করে যে উন্নত সুশাসন তার ক্রেডিট প্রোফাইলকে শক্তিশালী করতে পারে এবং অর্থায়নের সুযোগ ও ব্যয়কে ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত করতে পারে, তখন তারা স্বাভাবিকভাবেই আন্তর্জাতিক মানের গভর্ন্যান্স চর্চার দিকে আরো বেশি মনোযোগ দেয়।

এ অর্থে ক্রেডিট রেটিং শুধু ঝুঁকি মূল্যায়নের একটি মাধ্যম নয়; এটি উন্নত করপোরেট সংস্কৃতি ও দীর্ঘমেয়াদি টেকসই ব্যবসা গড়ে তোলার একটি ইতিবাচক প্রণোদনাও।

আগামী দিনে দেশের ক্রেডিট রেটিং শিল্পের বিকাশে কোন নীতিগত বা কাঠামোগত পরিবর্তন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন বলে আপনি মনে করেন?

বাংলাদেশে ক্রেডিট রেটিং শিল্পকে আরো শক্তিশালী করতে কয়েকটি বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন।

প্রথমত, বাজারভিত্তিক দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন, বিশেষ করে করপোরেট বন্ড বাজারের আরো সম্প্রসারণ জরুরি। বন্ড বাজার যত বিস্তৃত হবে, মানসম্পন্ন ক্রেডিট রেটিংয়ের চাহিদাও তত বাড়বে।

দ্বিতীয়ত, তথ্যের সহজলভ্যতা ও নির্ভুলতা বাড়ানো প্রয়োজন, যাতে মূল্যায়ন আরো তথ্যসমৃদ্ধ ও কার্যকর হয়।

তৃতীয়ত, বাজারের সব অংশীজনের মধ্যে ক্রেডিট রেটিং সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং রেটিংকে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা দরকার।

সবশেষে নিয়ন্ত্রক সংস্থা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বিনিয়োগকারী ও ক্রেডিট রেটিং এজেন্সিগুলোর মধ্যে আরো ঘনিষ্ঠ সমন্বয় গড়ে উঠলে দেশের আর্থিক বাজার আরো স্বচ্ছ, দক্ষ ও গভীর হবে বলে আমি বিশ্বাস করি।