জননেত্রী শেখ হাসিনা। তার সম্পর্কে যথার্থ উপমা হলো, তিনি দুঃখের পাষাণে ঘষা সুবাসী চন্দন। তার জীবন, তার সংগ্রাম, তার দেশসেবা এবং আজ পৃথিবীজুড়ে তার যে অবস্থান—এ সম্পর্কে একটি কথা প্রযোজ্য, তিনি কোনো দিনও ফুল বিছানো পথে হাঁটেননি। বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনীতেও দেখেছি যে বঙ্গবন্ধু অত্যন্ত অল্প সময় তার সন্তান-সন্ততি হাসু-কামালদের জন্য বরাদ্দ রাখতে পেরেছিলেন। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা মূলত তার মায়ের তত্ত্বাবধানে বেড়ে উঠেছেন। পরবর্তীকালে বিদেশ-বিভূঁইয়ে থেকেছেন। দুই সন্তানকে দেখাশোনা করবেন, ওদের বড় করে তুলবেন, সংসার সামলাবেন—এমন সময়ে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের মর্মন্তুদ ঘটনা ঘটে গেল।
আমরা যদি বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার সঙ্গে নিজের অবস্থা মিলিয়ে চিন্তা করি, তবে সহজেই বুঝতে পারব তিনি কত কঠিন পথ পাড়ি দিয়েছেন। তিনি প্রায়ই বলেন, ‘মানুষ একজনের মৃত্যুশোক সইতে পারে না, আর একদিনে এতগুলো মৃত্যুর ভার আমি কীভাবে সয়েছি, তাও বিদেশে থেকে, যেখানে সান্ত্বনা দেয়ার মতো কেউ নেই।’ পুরো পরিবার হারিয়ে তখন তার ওপর গুরুদায়িত্ব বর্তাল। শুধু দুই সন্তান নয়, সবচেয়ে বড় দায়িত্ব ছোট বোন শেখ রেহানাকে নিয়ে। শেখ রেহানা শেখ হাসিনার সঙ্গে বিদেশে ছিলেন বলে বেঁচে যান। বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা একে অন্যের সঙ্গে দুঃখ ভাগাভাগি করে নিতে পেরেছিলেন। একে অন্যকে জড়িয়ে কাঁদতে পেরেছিলেন। বঙ্গবন্ধু পরিবারের ছোট মেয়ে শেখ রেহানা সেদিন বড় বোন শেখ হাসিনার সঙ্গে বিদেশে গিয়েছিলেন পরীক্ষার পরে অবকাশ যাপনের জন্য। সেখানে বসে পেতে হলো এই দুঃসহ খবর। পৃথিবীর ইতিহাসে এ ধরনের ঘটনা খুবই কম। ছোট্ট শিশু শেখ রাসেলসহ অন্যদের যেভাবে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে, তা মেনে নেয়া অসম্ভব। অথচ সেদিন এক বোন আরেক বোনকে সান্ত্বনা দিয়েছেন। শেখ হাসিনা ছায়া হয়ে থেকেছেন শেখ রেহানার মাথার ওপরে। শেখ রেহানা শেখ হাসিনাকে জড়িয়ে ধরে তার অশ্রু বিসর্জন করেছেন। দুঃখের পাষাণে ঘষা সুবাসী চন্দন কেন বলছি শেখ হাসিনাকে? এই যে তিনি দুঃখের ভেতর দিয়ে তিলে তিলে নিজেকে তৈরি করেছেন, দায়িত্ব পালন করেছেন, সন্তানদের বড় করেছেন এবং রেহানার দায়িত্বও নিয়েছেন এজন্য। রেহানাকে বিয়ে দেয়া এবং তার সন্তান-সন্ততিকেও নিজের করে নেয়া এজন্য। পঁচাত্তর-পরবর্তী সময়ে বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা একে অন্যের সঙ্গে নিজেদের দুঃখ ভাগাভাগি করেছেন, অংশীদার হয়েছেন। একই দুঃখের সাগরে দুজন ভেসেছেন। কেটেছেন সাঁতার। পঁচাত্তরের পর চেনা মানুষও তাদের জন্য অচেনা হয়ে গেছে। আশ্রয়টুকু পেতে বেগ পেতে হয়েছে। একদিকে বিদেশ-বিভুঁইয়ে জীবন, তার ওপর চতুর্দিকে বৈরী হাওয়া—এ এক নিদারুণ কষ্টগাথা। একপ্রকার বাধ্যতামূলক প্রবাসজীবন বেছে নিতে হলো তাদের। খুব চুপেচাপে থাকতে হলো। নাম-পরিচয় পর্যন্ত বদলে ফেলতে হলো ভারতের ডিফেন্স কলোনিতে থাকাকালে। যারা বঙ্গবন্ধুকে ভালোবাসেন, তাদের কেউ কেউ পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। কিন্তু যারা বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে সবচেয়ে বেশি সুযোগ-সুবিধা পেয়েছেন, তাদের অনেকের আচরণ রাতারাতি পাল্টে গিয়েছিল। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা নিজের ইচ্ছায় আওয়ামী লীগের সভাপতি হননি। আওয়ামী লীগের অত্যন্ত বিপর্যস্ত সময়ে তাকে দলের নেতাকর্মীরাই দায়িত্ব দিয়েছেন। আওয়ামী লীগকে রক্ষা করতে তত্কালীন নেতাকর্মীরা যথার্থ পদক্ষেপ নিয়েছিলেন বলে মনে করি। কিন্তু দলকে ছত্রভঙ্গ করতে তত্কালীন শাসকরা নানাভাবে চেষ্টা করেছেন। আন্তর্জাতিকভাবেও যারা ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের সঙ্গে জড়িত, তারাও চেষ্টার কমতি করেননি আওয়ামী লীগকে দমিয়ে দিতে। ষড়যন্ত্রীরা ভেবেছিল, আওয়ামী লীগ টুকরো টুকরো হয়ে যাবে। তারা হয়তো ভেবেছিল, শেখ হাসিনার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা নেই। তারা হয়তো এ কথা ভুলেই গিয়েছিল যে শেখ হাসিনা বেড়েই উঠেছেন রাজনীতির বাতাসে, রাজনৈতিক আবহে। কষ্ট কাকে বলে, তিনি তা মায়ের সঙ্গে থেকে উপলব্ধি করেছেন। তিনি মাকে দেখে শিক্ষা পেয়েছেন। বিপদে অবিচল থাকার যে চিত্র, যে ছবি আমরা দেখি, তা তিনি তার মায়ের কাছ থেকেই পেয়েছেন। সেই শিক্ষার বদৌলতে আমরা দেখি, ১৯৮১ সালে আওয়ামী লীগের যে সিদ্ধান্ত, আওয়ামী লীগের কর্মীদের যে আকাঙ্ক্ষা, সেই আকাঙ্ক্ষাকে পূর্ণতা দিতে সেদিন তিনি এ দেশের মাটিতে পা রেখেছিলেন, শত বিপত্তি উপেক্ষা করে। ১৯৮১ সালের সেই দিনটির কথা আমাদের মনে আছে। সেদিন বৃষ্টির পানি আর শেখ হাসিনার চোখের পানি একাকার হয়ে গিয়েছিল। তিনি বলেছিলেন, ‘আমি বঙ্গবন্ধুর হত্যার বিচার চাই, বাংলাদেশের মানুষের মুক্তি চাই।’ সেই মুক্তি আজকে ক্ষুধা থেকে মুক্তি, দারিদ্র্য থেকে মুক্তি, বঞ্চনা থেকে মুক্তির প্রতীক হয়ে উঠেছে। অগ্রগতির পথ থেকে বাংলাদেশকে সরিয়ে দেয়ার যে ষড়যন্ত্র, সেই ষড়যন্ত্রকে নস্যাৎ করে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে।
সেই ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার বর্বরতার কথা আমরা জানি। তারা বঙ্গবন্ধুর আদর্শের কাছে পরাজিত হয়ে শেখ হাসিনাকে শেষ করে দিতে ঘৃণ্য তত্পরতা চালিয়ে বহু ত্যাগী নেতাকর্মীকে হতাহত করেছে। তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া সংসদে এ ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় নির্মম পরিহাস করে বলেছিলেন, ‘ওনাকে মারতে যাবে কে, উনি ভ্যানিটি ব্যাগে গ্রেনেড নিয়ে সমাবেশে গিয়েছিলেন।’ এটি বিচারবোধহীন কথা। সংবেদনশীলতা ও মানবিক মূল্যবোধের অভাব বলব না, বরং বলব একথার মধ্যে সামান্যতম শিক্ষার লেশ নেই। শেখ হাসিনা সেদিন প্রাণে বেঁচে গেলেও তার কানের ক্ষতি হয়ে গিয়েছিল। এ ক্ষতি অনেক কমিয়ে আনা যেত যদি তিনি বিদেশে গিয়ে চিকিৎসা নিতে পারতেন। কিন্তু এখানে যারা আহত-নিহত, তাদের ছেড়ে জনতার নেত্রী শেখ হাসিনা সেদিন বিদেশে যাননি। এখন তিনি হিয়ারিং এইড ব্যবহার করেন। বিপদে অবিচল থাকতে পারেন তিনি। ঘোরতর বিপদেও, গ্লানিময় অবস্থায়ও কীভাবে অবিচল থেকে সুন্দরকে এগিয়ে নিতে হয়, সেটি তিনি অনেক ভালো জানেন। আজকে পৃথিবীর পরিপ্রেক্ষিতে যদি দেখি, আওয়ামী লীগকে একটি সুসংগঠিত, শক্তিশালী দল হিসেবে তিনি এগিয়ে নিচ্ছেন। নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এ আওয়ামী লীগকে নিয়ে বঙ্গবন্ধুর যে স্বপ্ন, দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানো, শোষিত মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা—এ কাজগুলো একের পর এক সম্পাদন করে যাচ্ছেন বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা। বঙ্গবন্ধু কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত বেতবুনিয়ার যে ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্র এবং আজকের বাংলাদেশ নিজস্ব স্যাটেলাইট মহাকাশে পাঠাচ্ছে, সেটি একটি সুন্দর ধারাবাহিকতা। বাংলাদেশে আজ অর্থের অভাবে কেউ কষ্ট পায় না, আজকে মেয়েরা আন্তর্জাতিক খেলার মাঠে প্রতিযোগিতায়, শিক্ষার প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যাচ্ছে। সব ক্ষেত্রে তারা সফলতার স্বাক্ষর রাখছে। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা ‘মাদার অব হিউম্যানিটি’ হিসেবে খ্যাতি পেয়েছেন। তিনি যে শুধু দেশের মানুষের জন্য কাজ করছেন এমনটি নয়, বরং ১০ লাখ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দিয়ে পৃথিবীতে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। পৃথিবীর ধনী রাষ্ট্রগুলো যখন অসহায় এ মানুষদের আশ্রয় দিয়ে সাহস পায়নি তখন শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ‘প্রয়োজনে একটি রুটি আমরা ভাগাভাগি করে খাব’—শেখ হাসিনার এ মানবিকতা পৃথিবীতে অনন্য।
তিনি এক বছরের একটি শিশুর সঙ্গে যেমন সহজ হতে পারেন, আবার একজন বয়স্ক-বিধবা, যার চুল পেকে গেছে, মেরুদণ্ড বেঁকে গেছে, তাকে জড়িয়ে ধরে পিঠে হাত রেখে কথা বলতে পারেন। সেই বৃদ্ধাও তার সঙ্গে মন খুলে কথা বলতে পারেন।
এই যে করোনার সময়ে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে টাকা পাঠালেন তিনি অসহায় মানুষের জন্য, অনেকে তা বুঝে উঠতেই পারেনি, কে পাঠাল এ টাকা। এই যে মোবাইলে টাকা পাঠানো, এই যে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের সুবিধাগুলো মানুষের দুয়ারে পৌঁছে দেয়া—এগুলো অতীতে কোনো দিন কেউ চিন্তা করেনি। অথচ নিরাপত্তার কথা বলে খালেদা জিয়া তার শাসনামলে বাংলাদেশকে সাবমেরিন কেবলে যুক্ত করেননি। মেয়েদের যে অবৈতনিক শিক্ষা, বিনা পয়সায় বই—এগুলো তো কেউ ভাবেনি আগে। এগুলো একমাত্র শেখ হাসিনাই করেছেন। আজকের করোনার সময় তার যে নেতৃত্ব, সেটা সন্দেহাতীতভাবে সারা বিশ্বে এবং বাংলার নিভৃত পল্লীর একটা গৃহকোণেও সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। শেখ হাসিনার কল্যাণমুখী সরকারের মানবসেবা পৃথিবীর বুকে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। তিনি বাংলার মানুষকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছেন যে ‘কাছে আছি, পাশে আছি’।
মতিয়া চৌধুরী: সংসদ সদস্য, সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ





