বাবা আনোয়ার হোসেনের কোন স্মৃতিটি আপনাকে বেশি নাড়া দেয়?

বড় ছেলে হিসেবে বাবার সঙ্গে আমার স্মৃতি একটু বেশিই। এর মধ্যে দুটো স্মৃতি বেশি নাড়া দেয়। শেষদিকে বাবা খুব অসুস্থ হয়ে পড়লেন। একদম কথা বলতে পারতেন না। নিজেকেও ঠিকমতো প্রকাশ করতে পারতেন না। কিন্তু আমরা পরিবারের সদস্যরা যখন বাড়ি থেকে বের হতাম, তখন সবাই বাবার সঙ্গে কিছু সময় কাটাতাম। যখন বাবার পাশে গিয়ে বসতাম, তার হাত ধরে রাখতাম। এরপর যখন তার হাত ছাড়িয়ে ঘর থেকে বের হতাম, তিনি কিছুই বলতে পারতেন না। কেবল তাকিয়ে থাকতেন। বের হওয়ার জন্য উঠে দাঁড়িয়েছি, তাকিয়ে দেখছি—তিনি ধীরে ধীরে মাথা নাড়াচ্ছেন। আমাদের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকাচ্ছেন। আমাদের চলে যাওয়া যতক্ষণ দেখা যেত, খেয়াল করতাম তিনি ততক্ষণ তাকিয়েই আছেন এবং বলার চেষ্টা করছেন হয়তো—‘যেয়ো না’। কিন্তু কাজের প্রয়োজনে যেতেই হতো। এ স্মৃতিটা এখন খুব মনে পড়ে। অনেক কষ্টও দেয়। অপরাধবোধ হয়। মনে হয়—বাবাকে আরেকটু সময় দিতেই পারতাম। কেন দিলাম না!

অন্যটি হলো তখন আমি দার্জিলিংয়ের সেন্ট পলস স্কুলে পড়তে গিয়েছি। আমাদের পরিবারের কেউ তখনো বোর্ডিং স্কুলেই পড়েনি, দেশের বাইরের স্কুলে পড়া তো প্রশ্নই ওঠে না। স্কুলে যাওয়ার পর প্রথম বছরের পূজার ছুটির ঘটনা। আমি সবসময় বাবার বুকে ঘুমাতাম। সেবার ছুটির পর বাবার সঙ্গে প্রথম একসঙ্গে সময় কাটাচ্ছি। বাবার বুকে শোয়ার পর বুঝতে পারলাম তার চোখ দিয়ে পানি ঝরছে। আমি বুঝতে পারছি আমার চোখ দিয়েও পানি পড়ছে। বাবা-ছেলে দুজনই চুপচাপ কেঁদে যাচ্ছিলাম। ভীষণ সেই আবেগী মুহূর্তটা আজও অনুভব করি।

বাবার কোন পরামর্শটি আপনার চলার পথে বেশি কাজে লাগছে?

বাবা জীবনকে অন্য রকমভাবে দেখতেন। মানুষের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল অসাধারণ। তিনি সবসময় একটা কথা বলতেন—দেখো কেউ হয়তো গরিব হয়ে জন্মেছে কিন্তু সে মানুষ হয়ে জন্মেছে। মানুষ হিসেবেই তার সঙ্গে ব্যবহার করবে। কাউকে আলাদা ভেবো না। কখনই কারো সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করো না। সবার সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলবে। সে যদি তোমার জন্য হাত তুলে দোয়া না-ও করে, তোমার ভালো আচরণই আল্লাহ দোয়া হিসেবে কবুল করে নেবেন। ‍উনি সবার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করতেন। আমাকে সব শ্রেণীর মানুষের সঙ্গে মিশতে শিখিয়েছেন। এটি উনার কাছ থেকে পাওয়া আমার সবচেয়ে বড় সম্পদ। আর ব্যবসার ক্ষেত্রে যদি বলি, তিনি সবসময় বলতেন—ব্যবসায় লাভ থাকবে, লোকসানও থাকবে। তুমি সবসময় সঠিক কাজ, কঠোর পরিশ্রম ও কষ্ট করে যাবে। দেখবে এ লাভ-লসের মধ্যে থাকতে থাকতে তুমি একসময় সফল হবে।

শিল্পোদ্যোক্তা আনোয়ার হোসেনের খুব বেশি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল না। তিনি কঠোর পরিশ্রম ও কাজের মাধ্যমে দক্ষতা অর্জন করে সাফল্যের শীর্ষে পৌঁছেছেন। তার সন্তান হিসেবে আপনারা বিদেশে উচ্চ শিক্ষা অর্জন করেছেন। বাবার কাছ থেকে শেখা কোন বিষয়টি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় পাননি?

এটা ঠিক বাবার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল না। পরিস্থিতির শিকারের কারণে সেটি হয়নি। উনি যখন দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়েন তখন তার বাবা মারা যান। ফলে আট বছর বয়সেই তাকে ব্যবসার হাল ধরতে হয়। তবে তিনি ছিলেন মার্কেটিং জিনিয়াস। আমার প্রেক্ষাপটে যদি দেখি, ১৯৬২ সালে বা তার আগেই তিনি যেখানে পৌঁছেছেন, আমি এখনো সে জায়গায় পৌঁছতে পারিনি। তিনি খুব সুন্দর আঁকতেন। আনোয়ার’স-এর যে মনোগ্রাম আছে সেটি উনার হাতেই আঁকা। ১৯৫৬ বা ১৯৫৮ সালে তিনি এটি এঁকেছিলেন। ইউনিলিভার কোম্পানি তাদের লোগো পরিবর্তন করেছে। কিন্তু আনোয়ার গ্রুপের লোগো কখনো পরিবর্তন করা লাগেনি। এখনো দেখলে মনে হয় এটি আজকের যুগের সঙ্গে যায়।

বাবা যখন মালা শাড়ি নিয়ে এলেন, তখন এর দাম ছিল ৪০-৫০ টাকা। সেই সময় সবাই ছালার ভেতরে করে শাড়ি দিত। কিন্তু বাবা সুন্দর কাগজে ভরে প্যাকেজিং করে বিক্রি করতেন। এই প্যাকেজিং করতে শাড়িপ্রতি দুই টাকা খরচ হতো। বিজ্ঞাপনের জন্য পাকিস্তানি মডেল নিয়ে এলেন। তখন সবাই এটিকে ভেবেছিল বিলাসিতা। কিন্তু এটি ব্যবসাকে কতটা পরিবর্তন করেছে পরে বোঝা গেছে। পণ্যের জন্য প্যাকেজিং কতটা গুরুত্বপূর্ণ, সেটি এখন এসে আমরা বুঝছি। এখন পণ্যের প্যাকেজিংয়ে ৭-৮ শতাংশ পর্যন্ত অর্থ ব্যয় হয়।

এছাড়া বাবা প্রচুর ঘুরতেন। গোটা বিশ্ব তার দেখা ছিল। তিনি ঘুরে ঘুরে আইডিয়া সংগ্রহ করতেন। আমার সন্তানদের সঙ্গেও আমি নিজের জ্ঞানের অনেক পার্থক্য দেখি। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা পরিবর্তন হতে থাকবে, মানুষও এর সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেবে। কিন্তু উপস্থিত বুদ্ধি, ডেডিকেশন, কোনো কিছুকে ওউন করা, চ্যালেঞ্জ নেয়ার সাহস—এটা বাবার চরিত্রের মধ্যেই ছিল। তিনি মানুষকে এত ভালোবাসতেন যে কাউকে দিয়ে কাজ করানো লাগত না, নিজে থেকেই করে দিত। তিনি সবসময় আপডেট থাকতেন। বাংলাদেশে কোন পণ্যের উৎপাদন হচ্ছে না, আমি সেটি করব—এ মানসিকতা ছিল। প্রাইভেট সেক্টরে ব্যাংকিংসহ বাংলাদেশে ৩৬টি পণ্য আমরা তথা আনোয়ার গ্রুপই পরিচয় করিয়েছে।

আনোয়ার গ্রুপের ব্যবসার ধরনে নানা বৈচিত্র্যে ভরপুর। শাড়ি, ব্যাংকিং, ইস্পাত, ঢেউটিনসহ বিভিন্ন ক্যাটাগরির পণ্য—এসব কি উনার চিন্তাতেই করা?

হ্যাঁ, সবগুলো বাবার চিন্তা থেকেই আসা। তখন বাংলাদেশের মার্কেট ছিল খুবই ছোট। এখন দেশে স্টিলের মার্কেট ৬০-৬৫ লাখ টনের। কিন্তু বাবা যখন ব্যবসা করেছেন তখন মার্কেট ছিল ৬০-৭০ হাজার টনের। সে জন্য এক খাতে বিনিয়োগ বর্ধিত করার চেয়ে তিনি ভেবেছেন আরেকটি নতুন পণ্য বাজারে নিয়ে আসার বিষয়টি। ফলে দেশের আমদানি নির্ভশীলতা কমেছে। এভাবেই তিনি নতুন পণ্য বাজারে আনতেন।

আপনার এক বোনের নাম ‘মালা’। আপনার বাবার ব্যবসার খ্যাতি ছড়িয়েছিল মালা শাড়ি দিয়ে। এ শাড়ির নামকরণের কোন স্মৃতি আপনার মনে পড়ে?

এ গল্প আমার খুব ভালো জানা নেই। তবে মালা যখন জন্মেছে তখনই হয়তো শাড়িটির নামকরণ হয়েছে। তার জন্মের পর এটি বাজারে আসায় হয়তো এ নাম রাখা হয়। বিজ্ঞাপনে আনোয়ারের মালা শাড়ির জিঙ্গেলও খুব সহজ ছিল। ফলে এটি সহজেই মানুষের কাছে পৌঁছে যায়।

আনোয়ারের মালা শাড়ির অনেক জিঙ্গেল তুমুল জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। এর মধ্যে কোনটি আপনার মনে পড়ে?

একটা আছে—‘ওগো সুন্দরী, তোমার রূপে জ্বইলা মরি, তোমায় বউ বানাইয়া লইয়া যামু আমার বাড়ি।’ এরপর মেয়েটা বলছে—‘না না, তোমার বাড়ি যাব না, মালা শাড়ি না দিলে বিয়া করমু না।’ এটি তখন বেশ সাড়া ফেলেছিল। দেশের ইতিহাসের সঙ্গেও এটি ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে যায়। মালা শাড়িই বাংলাদেশের সত্যিকার অর্থে প্রথম ব্র্যান্ড। এর আগে বাংলাদেশে কোনো পণ্যেরই ব্র্যান্ড পাওয়া যাবে না।

শাড়িটির এখন কী অবস্থা?

মালা শাড়ি এখনকার কাতান-বেনারসির মতো ক্যাটাগরির। আমরা আর মালা শাড়ি বানাই না। কিন্তু অনেকেই এখনো ওই শাড়ি বানায়। যেটা গ্রামগঞ্জে মালা শাড়ি হিসেবেই বিক্রি হয়।

তার মানে শাড়ির জগতে আপনারা আর নেই?

না। ১৯৮৩-৮৪ সালের দিকে শাড়ির জগৎ থেকে আমরা বের হয়ে গেছি। কিন্তু মালা শাড়ির ইমপ্যাক্ট ছিল খুবই শক্তিশালী।

আনোয়ার গ্রুপের অধীনে বর্তমানে কোম্পানির সংখ্যা কত?

আমাদের এখন ২৬টির মতো কোম্পানি আছে। ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইউনিট আছে ১৮টি। বস্ত্র, পাট, সিমেন্ট, ইস্পাত, আবাসন, পলিমার, আসবাব, অটোমোবাইল, ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানসহ নানা খাতে আমাদের ব্যবসা রয়েছে। তবে এগুলোকে এখন আমরা একীভূত করে গোছাচ্ছি।

কোম্পানিগুলোর মধ্যে কোনটা সবচেয়ে ভালো অবস্থানে আছে?

একেকটা একেক শিল্পে আছে। সবসময়ই আমাদের মূল ব্যবসা ছিল টেক্সটাইল। সেজন্য আনোয়ার হোসেনের ছেলে হিসেবে আমি টেক্সটাইল খাতকে সবচেয়ে সম্মান করি। কেননা এ খাত দিয়েই আমাদের যাত্রা শুরু হয়েছিল। রিয়েল স্টেটের কথা বললে—আনোয়ার ল্যান্ডমার্ক খুব প্রিমিয়াম মার্কেটে কাজ করছে। এটি সংখ্যায় না, গুণগত মান নিয়ে কাজ করছে। বাংলাদেশ যখন দীর্ঘস্থায়ী, বড় ও কমপ্লিকেটেড কোনো প্রজেক্ট হয়, তখন আনোয়ার ইস্পাত ও আনোয়ার সিমেন্ট এ দুটোর নাম আসে। এ-ওয়ান পলিমার ব্যান্ড ও গুণগত মানের দিক থেকে নিশ্চিতভাবে দেশের পলিমার শিল্পের নেতৃত্ব পর্যায়ে থাকবে। আনোয়ার সিমেন্ট শিট—আমার ভাষায় দেশের শিল্পে রেভল্যুশন তৈরি করেছে। যারা উচ্চ খরচে বাড়ি করার সামর্থ্য রাখে না তাদের জন্য বড় সুযোগ নিয়ে এসেছে। এটি পোলট্রি ও গরুর খামার শিল্পে আরো বড় প্রভাব ফেলেছে। ফলে একেকটা সেক্টর একেকভাবে অবদান রাখছে। আবার কোনোটা হয়তো বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে অবদান রেখেছে। কাজেই কোনোটিকে আলাদাভাবে সেরা বা ভালো হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেয়া আমার পক্ষে সম্ভব না।

আপনার ভাই-বোনদের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাই?

আমরা এখনো এক পরিবার। প্রতি শুক্রবার ভাইবোনরা একসঙ্গে বসে দুপুরের খাবার খাই। আমরা তিন ভাই মাকে নিয়ে একই বাসায় থাকি। সবাই যখনই বাসা থেকে বের হই, তার আগে মার সঙ্গে দেখা করি। মার সঙ্গে সময় কাটিয়ে তারপর সবাই বের হয়। আবার যখন বাইরে থেকে বাসায় ফিরি তখনো আগে মায়ের ঘরে যাই। তার সঙ্গে কিছু সময় কাটিয়ে তারপর নিজ নিজ রুমে ফিরি।

আমরা ভাই-বোনেরা ব্যবসায়িকভাবেও এখনো একসঙ্গেই আছি। কোনো সম্পত্তি ভাগ হয়নি। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয়, আমি চেয়ারম্যান, তাই সব কাজ আমি করছি। আসলে সারা দিন আমি তেমন কোনো কাজই করি না। আমার ভাই হোসেন খালেদ, হোসেন মেহমুদ এবং এখন আমার দুই ছেলে ফুরকান হোসেন ও ওয়াইজ আর হোসেন ব্যবসার হাল ধরেছে। ছোট ভাইয়ের মেয়ে ফাইজাহ মেহমুদও ঢুকে গেছে। ওরাই মূলত ব্যবসা দেখছে। হোসেন মেহমুদ খুবই শান্ত প্রকৃতির, সে কোম্পানির জটিল বিষয়গুলো বেশি দেখে। খালেদ আউটগোয়িং, লিয়াজোঁ, পিআরগুলো দেখে। আমার দুই ছেলে স্টিল, স্টিল মিল, সিমেন্ট, সিমেন্ট শিট, এ-ওয়ান পলিমার—এসব দেখছে। মেহমুদের মেয়ে টেক্সটাইলের রফতানির দিকগুলো দেখাশোনা করে। চেয়ারম্যান হিসেবে আমাকে একেবারেই বেকার বলা যায়... (হাসি)।