গ্রামই বাংলার
প্রাণ। বাংলার
নিভৃত এক
গ্রামে জন্মেছিলেন
মা-বাবার
‘খোকা’,
বয়োজ্যেষ্ঠদের ‘মুজিবর’,
রাজনৈতিক অভিভাবকদের
‘মুজিব’,
সমবয়সীদের ‘শেখ
মুজিব’, কর্মী
ও অনুগামীদের
‘মুজিব
ভাই’ এবং
আমাদের সবার
‘বঙ্গবন্ধু’।
সন্তানের চোখে
বাবার প্রতিকৃতি
আরো প্রাণবন্ত—‘আমার
আব্বার শৈশব
কেটেছিল টুঙ্গিপাড়ার
নদীর পানিতে
ঝাঁপ দিয়ে,
মেঠো পথের
ধুলাবালি মেখে।
বর্ষার কাদাপানিতে
ভিজে। বাবুই
পাখি বাসা
কেমন করে
গড়ে তোলে,
মাছরাঙা কীভাবে
ডুব দিয়ে
মাছ ধরে,
কোথায় দোয়েল
পাখির বাসা,
দোয়েল পাখির
সুমধুর সুর
আমার আব্বাকে
দারুণভাবে আকৃষ্ট
করত।’ (শেখ
হাসিনা, ‘শেখ
মুজিব আমার
পিতা’, আগামী
প্রকাশনী, প্রথম
প্রকাশ ২০১৫,
পৃষ্ঠা ২৬)
গাঁয়ের এ
ছেলেটির বাঙালি
জাতির পিতায়
পরিণত হওয়ার
উপাখ্যান যেমন
চমকপ্রদ, তেমনি
অসাধারণ। কৃষকবান্ধব
বঙ্গবন্ধুর জাতির
পিতা হয়ে
ওঠার অপরূপ
ইতিহাসটিকে ব্যতিক্রমী
এক দলছুট
ঘটনা হিসেবে
আখ্যা দিয়েছেন
বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক
হায়াৎ মামুদ।
তার ভাষায়:
খুবই লক্ষণীয়
বিষয়, প্রাক-সাতচল্লিশ
অবিভক্ত বাংলার
রাজনীতিতে সত্যিকার
অর্থে কোনো
‘সাধারণ’
অভাজন ব্যক্তির
অস্তিত্ব ছিল
না। দেশবন্ধু
চিত্তরঞ্জন দাস,
নেতাজি সুভাষ
চন্দ্র বসু,
শরৎ চন্দ্র
বসু, কিরণশঙ্কর
রায়, সোহরাওয়ার্দী,
শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়,
আবুল হাশিম
প্রমুখ সবাই
‘অভিজন’
এলিট শ্রেণীর
মানুষ। এমনকি
শেরেবাংলা এ
কে ফজলুল
হক যে
তাদেরই স্বগোত্র—তার
প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা,
পেশা, অতুলনীয়
বাগ্মিতা বিচার
করলে না
মেনে উপায়
নেই। মওলানা
আবদুল হামিদ
খান ভাসানীও
‘অসাধারণ’
তার উৎসের
কারণে; একই
সঙ্গে ধর্মবেত্তা
ও ধর্মীয়
নেতা হওয়ার
ফলে এক
ধরনের বিশিষ্টতা
স্বতঃসিদ্ধ ও
স্বপ্রতিষ্ঠ হয়ে
ওঠে তার
ক্ষেত্রে। এদের
প্রত্যেকের সঙ্গে
বঙ্গবন্ধুর সামাজিক
অবস্থানগত পার্থক্য
উপলব্ধি না
করলে এ
বয়ঃকনিষ্ঠ উত্তরসূরির
অনন্যতা শনাক্ত
করা সম্ভব
নয়। তার
অসামান্যতা ছিল
তার আত্মপরিচয়ের
অহংকারে। (ড.
আতিউর রহমান,
‘শেখ
মুজিব বাংলাদেশের
আরেক নাম’,
আলোঘর প্রকাশনা,
প্রথম প্রকাশ
২০১৮, প্রাবন্ধিক
হায়াৎ মামুদের
লেখা ভূমিকা)
এ অসামান্য
নেতৃত্বের বিকাশের
শুরুর দিকটায়
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
ছিল এক
উর্বর চারণভূমি।
বাংলা ভাষার
মর্যাদার ওপর
কর্তৃত্ববাদী, অমানবিক
ও আমলা-মিলিটারিকেন্দ্রিক
পাকিস্তান সরকারের
আঘাতের প্রতিবাদে
গ্রাম থেকে
উঠে আসা
বিকাশমান মধ্যবিত্তের
সন্তানেরা ক্ষোভে
ফেটে পড়ে।
তাই বাঙালি
জাতীয়তাবাদের বিকাশে
ভাষা আন্দোলনের
গুরুত্ব এতটা
তাত্পর্যপূর্ণ। আর
১৯৪৮ সালের
শুরু থেকেই
এ আন্দোলনের
নেতৃত্বে ছিলেন
তত্কালীন ছাত্রনেতা
শেখ মুজিবুর
রহমান। পূর্ব
বাংলার উদীয়মান
মধ্যবিত্ত শ্রেণীর
একজন প্রতিনিধি
হিসেবে নেতৃত্ব
দিলেও তার
সঙ্গে গভীর
সংযোগ ছিল
এ দেশের
কৃষক, শ্রমিক
ও নিম্নমধ্যবিত্তসহ
সাধারণ মানুষের।
তাই তো
একুশে ফেব্রুয়ারির
গণবিস্ফোরণের প্রথম
বার্ষিকী উদযাপনের
অংশ হিসেবে
১৯৫৩ সালের
একুশে ফেব্রুয়ারি
আরমানিটোলা ময়দানে
অনুষ্ঠিত এক
জনসভায় তিনি
উচ্চারণ করেছিলেন,
‘১৯৫২
সালের ভাষা
আন্দোলন শুধু
ভাষার দাবিতে
ছিল না,
সেটা ছিল
আমাদের জীবন-মরণের
লড়াই। আমরা
মানুষের মতো
বাঁচতে চাই।
আমরা খাদ্য
চাই, বস্ত্র
চাই, আশ্রয়
চাই, নাগরিক
অধিকার চাই।
আমরা কথা
বলার অধিকার
চাই, শোষণমুক্ত
সমাজ চাই।’
(‘সিক্রেট
ডকুমেন্টস’, প্রতিবেদন
নং ৪৭,
২১ ফেব্রুয়ারি,
১৯৫৩)।
সিপাহি বিদ্রোহের
পর থেকেই
বাংলার উদ্বৃত্ত
ইংল্যান্ডে চালান
হয়ে যায়।
বাংলার উৎপাদক
শ্রেণীর টিকে
থাকাই মুশকিল
হয়ে যায়।
কলকাতাকেন্দ্রিক পাট
শিল্পের পশ্চাদ্ভূমি
ছিল পূর্ব
বাংলা। পূর্ব
বাংলার কৃষক
শ্রেণী (মূলত
মুসলমান ও
নিম্নবর্ণের হিন্দু)
উপেক্ষিতই থেকে
যায়। তবে
কৃষক সন্তানেরাও
খানিকটা শিক্ষার
সুযোগ পেয়ে
বাড়তি শিক্ষা,
চাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্যের
সুযোগের প্রত্যাশা
করে। কিন্তু
সে সুযোগ
না পেয়ে
আঞ্চলিক চেতনার
বিকাশ ঘটতে
শুরু করে।
ইংরেজ সরকার
এ আঞ্চলিক
চেতনার সুযোগ
নিয়ে ১৯০৫
সালের বঙ্গভঙ্গ
ঘটায়। এর
পর থেকে
পূর্ব বাংলার
মানুষের
মনে আঞ্চলিক
চেতনা আরো
জোরদার হয়।
পূর্ব বাংলার
অর্থনৈতিক বিকাশের
সম্ভাবনা সৃষ্টি
হতে থাকে
এ অঞ্চলের
মানুষের মনে।
কিন্তু পূর্ব
বাংলার জনগণের
বিকাশের এ
প্রত্যাশা বেশি
দিন স্থায়ী
হয় না।
১৯১১ সালে
বঙ্গভঙ্গ রদ
হয়ে যায়।
ইংরেজদের ওপর
পূর্ব বাংলার
মুসলিম তথা
বাঙালি মুসলিম
সমাজের আস্থার
অবনতি ঘটে।
তারাও ইংরেজবিরোধী
আন্দোলনে অংশ
নিতে শুরু
করে। এ
প্রেক্ষাপটেই ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা
করা হয়।
এর ফলে
নেতৃত্ব দেয়ার
জন্য নবাবদের
পরিবর্তে উদীয়মান
মধ্যবিত্ত শ্রেণী
এগিয়ে আসতে
শুরু করে।
একপর্যায়ে হিন্দু-মুসলিম
যৌথ আন্দোলন
স্বদেশী ও
খেলাফত আন্দোলনের
সমন্বয় ঘটে।
পরবর্তী সময়ে
কিছু ধর্মীয়
রক্ষণশীল ধারণার
সংযোজন ঘটালে
ভারতবর্ষের যৌথ
জাতীয় আন্দোলনে
ফাটল ধরে।
হিন্দু-মুসলমান
আলাদা পথের
সন্ধান করতে
শুরু করে।
এভাবেই পাকিস্তান
ধারণার জন্ম
হয়।
ফজলুল হক,
সোহরাওয়ার্দী, আবুল
হাশিমদের নেতৃত্বেই
পূর্ব বাংলার
সামন্তবাদবিরোধী কৃষক
শ্রেণী পাকিস্তান
আন্দোলনে ব্যাপক
হারে অংশগ্রহণ
করে। শেখ
মুজিবুর রহমান
তখন তরুণ
নেতা। সোহরাওয়ার্দীর
নেতৃত্বে রাজনীতি
করছিলেন। সিলেট
গণভোটের সময়
তাদের সক্রিয়
ভূমিকার কথা
অনস্বীকার্য। তাদের
প্রত্যাশা ছিল
পূর্বাঞ্চলে এমন
পাকিস্তান হবে,
যেখানে বিনা
ক্ষতিপূরণে জমিদারি
প্রথার উচ্ছেদ
ঘটবে, কৃষক
সন্তানদের শিক্ষা,
চাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্যের
সুযোগ বাড়বে।
এ প্রত্যাশায়
বাংলা ফের
বিভক্ত হলো।
কিন্তু শেষ
পর্যন্ত যে
অস্বাভাবিক পাকিস্তান
রাষ্ট্রটি তৈরি
হলো তাকে
মধ্যবিত্ত কৃষক
সন্তানদের কাছে
‘ভ্রান্ত
প্রত্যূষ’ বলেই
আবির্ভূত হলো।
রাজধানী চলে
গেল পশ্চিম
পাকিস্তানে। ব্যবসা-বাণিজ্য,
দপ্তর, আদালত
ওই অঞ্চলকে
ঘিরেই গড়ে
ওঠে। শিল্পায়ন,
আমদানি, বিদেশী
সাহায্য সবকিছুই
কেন্দ্রীভূত হতে
থাকে পশ্চিমাংশে।
কিন্তু রফতানির
সিংহভাগ (পাট)
আসে পূর্ব
বাংলা থেকে।
আর সেই
রফতানি আয়ের
বেশির ভাগ
খরচ হয়
পশ্চিম পাকিস্তানের
উন্নয়নে। শেখ
মুজিবের সরব
বিরোধিতা সত্ত্বেও
জমিদারি প্রথা
ক্ষতিপূরণসহ উচ্ছেদ
হওয়ার ফলে
জোতদাররা তাদের
ক্ষতি পুষিয়ে
নেয়। বিদেশী
সাহায্যনির্ভর উন্নয়নের
সুবিধা পায়
পশ্চিম পাকিস্তান।
ছিটেফোঁটা সুবিধা
পায় পূর্ব
বাংলার মধ্যস্বত্বভোগীরা।
পূর্ব বাংলা
শুধু আমদানি
বিকল্প শিল্পের
কাঁচামাল জোগান
দিত। পূর্ব
বাংলার কৃষকদের
কাছে তাই
পশ্চিম পাকিস্তানি
শাসনে ঔপনিবেশিক
শাসনেরই আরেক
রূপ বলে
মনে হতো।
পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়াশীল
শাসকচক্রের বিরোধিতা
শুরু করেন
পূর্ব বাংলার
তরুণ কর্মীরা।
এদের বেশির
ভাগই ছিলেন
কৃষক সন্তান।
কেউ কেউ
আবার এক
প্রজন্মের শহরবাসী।
তাদের দৃষ্টিভঙ্গি
ধর্মনিরপেক্ষ। আধুনিক।
অনেকেই অস্পষ্টভাবে
হলেও বামঘেঁষা।
তারাই আওয়ামী
মুসলিম লীগের
সক্রিয় কর্মীদল
হিসেবে বেড়ে
ওঠেন, যাদের
নেতৃত্বে ছিলেন
শেখ মুজিবুর
রহমান। ধীরে
ধীরে গড়ে
ওঠে বাংলাদেশের
কৃষকদের আকাঙ্ক্ষার
প্রতি সংবেদনশীল
বাঙালি জাতীয়তাবাদী
এক সচেতন
মধ্যবিত্ত শ্রেণী।
বাংলা ভাষার
ওপর আঘাত
এলে এরাই
তীব্রভাবে প্রত্যাঘাত
হানে। ভাষা
প্রশ্নটি ছিল
সামনের প্রসঙ্গ।
পেছনে ছিল
আঞ্চলিক নিপীড়নের
বিরুদ্ধে বিদ্রোহের
তীব্র আকাঙ্ক্ষা।
তাই এ
বিদ্রোহ ছিল
অনিবার্য। পাকিস্তানি
শাসক শ্রেণীর
ভাঁওতাবাজির প্রধান
শিকার কৃষক-শ্রমিকরাই
তৈরি করেছিলেন
ভাষা আন্দোলনের
নির্মাণ রসদ।
তাই বিকাশমান
মধ্যবিত্তের নেতৃত্বে
গড়ে ওঠা
ওই আন্দোলন
দ্রুতই জাতীয়
রূপ নেয়।
এ আন্দোলনে
অংশগ্রহণকারীরা প্রায়
সবাই এসেছিলেন
বঙ্গবন্ধুর মতো
শ্রেণী অবস্থান
থেকে। তাদের
চাওয়া পাওয়াও
ছিল প্রায়
একই রকম।
ভাষা আন্দোলনে
সাধারণ মানুষের
অংশগ্রহণ ধীরে
ধীরে স্বতঃস্ফূর্ত
হয়ে উঠেছিল।
ভাষা আন্দোলনে
অংশগ্রহণকারীদের শ্রেণী
থেকেই বের
হয়ে এসেছিল
ঊনসত্তর এবং
একাত্তরের জাতীয়তাবাদী
ও মুক্তিযুদ্ধের
নেতৃত্ব। ১৯৪৮-৫২
পর্বে বাঙালি
জাতীয়তাবাদের যে
শুভ সূচনা
হয় তারই
সফল উত্তরণ
ঘটে একাত্তরে।
ঔপনিবেশিক ও
তার সহযোগী
শ্রেণীর বিরুদ্ধে
অধস্তন শ্রেণীর
(তথা পেটি
বুর্জোয়া, ধনী
ও মাঝারি
ব্যবসায়ী, বুদ্ধিজীবী,
শ্রমিক, কৃষক)
এক অভূতপূর্ব
সম্মিলন ঘটেছিল
বলেই এ
উত্তরণ সম্ভব
হয়েছিল।
ভাষা আন্দোলনের
পরবর্তী সময়ে
বঙ্গবন্ধু সারা
বাংলাদেশ ঘুরে
ঘুরে বাংলা
ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার
মর্যাদা দেয়ার
পাশাপাশি সাধারণ
মানুষের অর্থনৈতিক
বঞ্চনার কথাও
প্রাঞ্জল ভাষায়
তুলে ধরেন।
এ সময়টায়
তার নেতা
সোহরাওয়ার্দীকে সঙ্গে
নিয়ে সারা
পূর্ব বাংলা
সফর করেন
এবং জনসভা
করেন। তার
বক্তৃতায় গরিব
চাষীদের ভাগ্যোন্নয়ন
ছাড়াও পাট
ব্যবস্থাপনা ও
শিক্ষানীতির ব্যাপক
সমালোচনা করেন।
জনগণের দুঃখ-বঞ্চনার
দায় রাষ্ট্রকে
নিতে হবে
বলে তিনি
বারবার দাবি
করেন। তিনি
তার ভাষণে
প্রশাসন ব্যবস্থায়
দুর্নীতি ছড়িয়ে
পড়ার কথা
বলেন। কর
কাঠামোয় গরিবের
স্বার্থ যে
বিঘ্নিত হচ্ছিল
সে কথাও
তুলে ধরেন।
খাদ্য সংকটে
সরকারের উদাসীনতারও
তিনি তীব্র
সমালোচনা করেন।
এভাবেই তিনি
ধীরে ধীরে
গণমানুষের পছন্দের
নেতায় পরিণত
হন।
এর পর
পরই আসে
চুয়ান্নর প্রাদেশিক
নির্বাচন। ওই
নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট
গঠন এবং
তার নির্বাচনী
ইশতেহার ২১
দফা প্রণয়নেও
শেখ মুজিবুর
রহমান গুরুত্বপূর্ণ
ভূমিকা পালন
করেন। ওই
২১ দফায়
বাংলা ভাষাকে
রাষ্ট্রভাষা করার
দাবি ছাড়াও
পূর্ব বাংলার
সাধারণ মানুষের
চলমান অর্থনৈতিক
সংকট থেকে
মুক্তির উপায়ের
নানা কর্মসূচি
যুক্ত করতে
ভূমিকা রাখেন
তিনি। এসব
দাবির মূলেই
ছিল পাকিস্তানের
দুই অঞ্চলের
মাঝে বিরাজমান
বৈষম্য কী
করে দূর
করা যায়।
ফলে পূর্ব
বাংলার মানুষ
বিপুলভাবে যুক্তফ্রন্টের
পক্ষে ভোট
দেন। চুয়ান্নর
নির্বাচনে বিজয়ের
পর মাত্র
দুই সপ্তাহের
জন্য শেখ
মুজিবুর রহমান
কৃষি ও
সমবায়মন্ত্রী হয়েছিলেন।
অল্প কয়েকদিনের
মধ্যেই তিনি
এ অঞ্চলের
শ্রমিক, কৃষক
তথা সাধারণ
মানুষের কল্যাণে
সমবায়ের বিকাশসহ
গুরুত্বপূর্ণ কিছু
সিদ্ধান্ত নেন।
কিন্তু পাকিস্তানি
শাসকগোষ্ঠীর ষড়যন্ত্রে
এ সরকার
বেশিদিন টিকতে
পারেনি। সরকারের
পতনের পর
পরই তাকে
আটক করা
হয়। এরপর
জেল থেকে
বের হয়ে
তিনি সাংবিধানিক
পরিষদের সদস্য
হিসেবে বাংলা
ভাষার মর্যাদাসহ
গরিব-দুঃখী
মানুষের পক্ষে
সর্বক্ষণ সোচ্চার
ছিলেন। ১৯৫৬
সালে আবার
তিনি আতাউর
খানের মন্ত্রিসভায়
শিল্প, বাণিজ্য
ও দুর্নীতি
দমন মন্ত্রণালয়ের
দায়িত্ব গ্রহণ
করেন। এ
সময়টায় তিনি
পূর্ব বাংলায়
শিল্প ও
ব্যবসায় কেন
উদ্যোক্তা শ্রেণী
গড়ে উঠতে
পারেনি সে
প্রশ্নের উত্তর
খুঁজে পান।
পাকিস্তানের রাষ্ট্রযন্ত্র
পূর্ব বাংলাকে
তাদের ‘কলোনি’
হিসেবে ব্যবহার
করত বলে
এখানে খুব
বেশি শিল্প-কারখানা
গড়ে ওঠেনি।
যাও-বা
গড়ে উঠেছে
সেগুলোর মালিকানাও
ছিল অবাঙালি
উদ্যোক্তাদের হাতে।
দুই অঞ্চলের মধ্যে ক্রমবর্ধমান বৈষম্যের কথা বলতে তিনি ছিলেন সদাই সোচ্চার। তাই সামরিক শাসন জারি করার পর সবার আগে তাকেই গ্রেফতার করা হয়। দুই বছরেরও বেশি সময় দুর্বিষহ জেলজীবন শেষে তিনি ফের ‘দুই অর্থনীতির’ বিপদ নিয়ে কথা বলতে শুরু করেন। তদ্দিনে সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যু হয়েছে। এরপর তিনি আওয়ামী লীগকে তার মতো করে ঢেলে সাজান। আর বৈষম্যের অর্থনীতির অবসানকল্পে ছয় দফা ঘোষণা করেন। এ ছয় দফা ছিল বাঙালির রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তি সনদ। এ ছয় দফার পক্ষে জনরায় নিতেই তিনি ১৯৭০ সালের নির্বাচনে অংশ নেন এবং বিপুলভাবে বিজয়ী হন। এ বিজয় পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী মেনে নিতে পারেনি। তাই তিনি বাঙালির মুক্তির জন্য মুক্তিযুদ্ধের সূচনা করেন। স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। ১৯৭২ সালে বন্দিদশা থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীন বাংলাদেশে ‘শান্তি, প্রগতি ও সমৃদ্ধির’ অভিযাত্রার সূচনা করেন। মাত্র নয় মাসে জাতিকে উপহার দেন অধিকারভিত্তিক উন্নয়নের জন্য একটি চমত্কার সংবিধান। চালু করেন প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা। আর ধ্বংসস্তূপ থেকে সমৃদ্ধির অভিযাত্রায় পুরো জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে এগোতে থাকেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের কালরাতে এ ‘দিঘল পুরুষ’কে বিশ্বাসঘাতকের দল হত্যা করে। সাময়িকভাবে হলেও থমকে দাঁড়ায় ভাষা আন্দোলনের পাটাতনে দাঁড়ানো মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ। দেশ চলতে থাকে উল্টো পথে। অনেক সংগ্রামের পর ফের দেশ ফিরে এসেছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সিক্ত অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের পথে। এ নবযাত্রা অক্ষুণ্ন থাক, সে কামনাই করছি। একই সঙ্গে স্মরণ করছি বঙ্গবন্ধুকে তার জন্মদিনে, যিনি চ্যালেঞ্জ উত্তরণের জন্য এক ‘লড়াকুু মন’ দিয়ে গেছেন বাঙালি জাতির মননে।
ড. আতিউর রহমান: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু চেয়ার অধ্যাপক এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর






