জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম তত্কালীন পূর্ব বাংলার একটি প্রত্যন্ত অঞ্চলে। তার রাজনীতির হাতেখড়ি হয়েছিল নিজের এলাকায়। প্রথম রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেন স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে। উপলক্ষ ছিল ফরিদপুরে বাংলার দুই খ্যাতিমান রাজনীতিবিদ এ কে ফজলুল হক ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর আগমনকে ঘিরে সংবর্ধনার আয়োজন। একটি মফস্বল এলাকা থেকেই শুরু হয় তার নেতৃত্ব দেয়ার ক্ষমতা, যা সময়ের পরিক্রমায় ফরিদপুর ছাড়িয়ে কলকাতা, ঢাকা এমনকি তত্কালীন পূর্ব বাংলার সর্বত্র বিস্তৃত হয়েছে। মফস্বলের তরুণ শেখ মুজিবুর রহমান একসময় নেতৃত্ব দিয়েছেন সমগ্র বাঙালি জাতিকে। তবে বঙ্গবন্ধু পুরো রাজনৈতিক জীবনে মানুষের অধিকার আদায়ে ছিলেন সোচ্চার। বিশেষ করে নির্যাতিত-নিপীড়িত কৃষক ও শ্রমিকদের অধিকার রক্ষায় ছিলেন অগ্রগামী।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ভারতবর্ষের রাজনীতির উত্তাল সময়ে কলকাতায় পড়াশোনা করতে গিয়েছিলেন। কলকাতায় গিয়ে তার দুটি অর্জন হয়। প্রথমত, উচ্চশিক্ষা অর্জন; দ্বিতীয়ত, ভারতবর্ষের রাজনীতিতে এ সময় ঘটে যাওয়া উল্লেখযোগ্য কিছু ঘটনা থেকে অর্জিত প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ শিক্ষা। যে শিক্ষা তার পরবর্তী জীবনে তাকে একজন সুদক্ষ রাজনীতিবিদ হিসেবে গড়ে উঠতে সাহায্য করেছে। চল্লিশের দশকে বঙ্গবন্ধু রাজনীতির ময়দানে পুরোপুরি সক্রিয় কর্মী হিসেবে কাজ করেছেন, পরিচিতি পেয়েছেন ছাত্রনেতা হিসেবে। আবার স্বেচ্ছাসেবক ও সংগঠক হিসেবেও তার দক্ষতা তৈরি হয়েছিল এ সময়েই।

১৯৪৭ সালে ভারতভাগের পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুুজিবুর রহমান কলকাতা ছেড়ে ঢাকায় স্থায়ীভাবে চলে আসেন। ঢাকায় আসার পর পূর্ব বাংলার বেশ কয়েকটি অঞ্চলের কৃষি শ্রমিকদের একটি আন্দোলনে প্রথমবারের মতো সম্পৃক্ত হয়ে পড়েন। তিনি শৈশব থেকে সাধারণ ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর যে শিক্ষা পেয়েছিলেন, তা থেকেই অনুপ্রাণিত হয়ে এ সময় মফস্বলের কৃষি শ্রমিক শ্রেণী দাওয়ালদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে সম্পৃক্ত হয়ে পড়েন।

শুরুতেই জেনে নেয়া যাক দাওয়াল কারা। বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে তিনি নিজেই দাওয়ালদের পরিচয় ও কাজ কী তা সুস্পষ্ট করেছেন। ফরিদপুর ও ঢাকা জেলার লোক খুলনা ও বরিশালে ধান কাটার মৌসুমে দল বেঁধে দিনমজুর হিসেবে কাজ করতে যেত। এদের কাজ ছিল ধান কেটে ঘরে উঠিয়ে দেয়া। এর বিনিময়ে তারা কাটা ধানের একটা অংশ পেত। এদের ‘দাওয়াল’ বলা হতো। হাজার হাজার লোক নৌকায় করে বিভিন্ন অঞ্চলে ধান কাটতে যেত। ধান কাটা শেষ হলে আসার সময় তাদের অংশের ধান নিজেদের নৌকায় করে বাড়িতে নিয়ে আসত। এভাবে কুমিল্লা জেলার দাওয়ালরা সিলেট জেলায় যেত। এরা প্রায় সবাই গরিব ও দিনমজুর। প্রায় দু-তিন মাসের জন্য এরা ঘরবাড়ি ছেড়ে বিভিন্ন এলাকায় যেত। তবে ধান কাটতে যাওয়ার আগে তারা মহাজনদের কাছ থেকে টাকা ধার করে সংসার খরচের জন্য পরিবারকে দিয়ে যেত। শর্ত ছিল ফিরে এসে ধার শোধ করবে। আবার এসব দাওয়ালের নিজস্ব নৌকা খুব কম ছিল। অনেক দাওয়াল অন্যের কাছ থেকে নৌকা ধার নিয়ে যেত। ফলে যাদের কাছ থেকে নৌকা ধার নিত, তাদেরও পাওনা ধানের একটা অংশ দিতে হতো। দাওয়ালরা ওই বছর সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করে ধান কাটতে যাওয়ার সময় কেউ তাদের বাধা দেয়নি। অবশ্য দাওয়ালরা যদি কোনো এলাকায় না যেত তাহলে ওই এলাকার জমির ধান কাটার উপায় ছিল না। ঋতু বৈচিত্র্যের কারণে একসঙ্গেই প্রায় সব ধান পেকে যেত বলে তাড়াতাড়ি জমির ধান কেটে আনতে হতো। অবশ্য স্থানীয়ভাবে এত কৃষক বা মজুর একসঙ্গে পাওয়া কষ্টকর ছিল। বহু বছর ধরে এসব অঞ্চলে এ পদ্ধতি চলে আসছিল।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর মুসলিম লীগ সরকারের নৈরাজ্যকর শাসন ও শোষণ প্রক্রিয়ার ফলে পূর্ব বাংলার কয়েকটি জেলায় এ সময় খাদ্য সমস্যা দেখা দিয়েছিল। বিশেষ করে ফরিদপুর, কুমিল্লা ও ঢাকা জেলার জনসাধারণ খাদ্য সমস্যার কারণে বিপদের সম্মুখীন হয়েছিল। খাদ্য সংকটের সময় সরকার আবার কর্ডন প্রথা চালু করেছিল। যার কারণে এক জেলা থেকে অন্য জেলায় কোনো খাদ্য যেতে দেয়া হতো না।

ফরিদপুর, ঢাকা ও কুমিল্লা জেলার হাজার হাজার লোক এ ধানের ওপর নির্ভর করত। দাওয়ালরা যখন ধান কাটতে যায়, তখন সরকার কোনো বাধা দেয়নি। কিন্তু সমস্যা দেখা দেয়, যখন তারা দুই মাস পর্যন্ত ধান কেটে তাদের ভাগ নৌকায় তুলে বাড়ির দিকে রওনা হয়। বাড়িতে তাদের বুভুক্ষু মা-বোন, স্ত্রী ও সন্তানরা পথ চেয়ে বসে আছে। যারা কোনো রকমে ধার করে সংসার চালাচ্ছে আর অপেক্ষা করছে কখন তাদের, স্বামী, ভাই, বাবা ফিরে আসবে ধান নিয়ে, পেট ভরে কিছুদিন ভাত খাবে। দাওয়ালদের নৌকা রওনা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সরকারি লোকজন তাদের পথ রোধ করে দাঁড়ায়। ‘ধান নিতে পারবে না, সরকারের হুকুম’, ‘ধান নামিয়ে রেখে যেতে হবে, নতুবা নৌকাসহ আটক ও বাজেয়াপ্ত করা হবে’ এ ধরনের কথা বলতে লাগল। কিন্তু যে দাওয়াল গত দু-তিন মাস অক্লান্ত পরিশ্রম করে ধান কেটেছে, তারা কি সহজে ধান দিতে চায়? শেষ পর্যন্ত সমস্ত ধান নামিয়ে রেখে লোকগুলোকে ছেড়ে দেয়া হয়।

দাওয়ালদের ওপর এ ধরনের অত্যাচারের সংবাদ বঙ্গবন্ধু জানতে পেরে তিনি কর্মপন্থা স্থির করেন, যা তার আত্মজীবনীতে সুস্পষ্ট: ‘এ খবর পেয়ে আমার পক্ষে চুপ করে থাকা সম্ভব হলো না। আমি এর তীব্র প্রতিবাদ করলাম। সভা করলাম, সরকারি কর্মচারীদের সঙ্গে সাক্ষাৎও করলাম, কিন্তু কোনো ফল হল না। এদিকে খোন্দকার মোশতাক আহমদ এ কর্ডনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সভা শুরু করেছে বলে আমি খবর পেলাম। অনেক সভা-সমিতি, অনেক প্রস্তাব করলাম, কোনো ফল হলো না। এ লোকগুলো দিনমজুর। দুই মাস পর্যন্ত যে শ্রম দিল, তার মজুরি তাদের মিলল না। আর মহাজনদের কাছ থেকে যে টাকা ধার করে এনেছিল এ দুই মাসের খরচের জন্য, খালি হাতে ফিরে যাওয়ার পর দেনার দায়ে ভিটেবাড়িও ছাড়তে হলো।’

এই দাওয়ালদের ঘটনা পূর্ব বাংলার অর্থনীতি ও সমাজে কী ধরনের প্রভাব ফেলেছিল তাও জানা যায় অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে: ‘এ রকমের শত শত ঘটনা আমার জানা আছে। এদিকে ফরিদপুর, ঢাকা ও কুমিল্লা জেলার অনেক নৌকার ব্যবসায়ী ছিল যারা বড় নৌকায় করে ধান-চাল ওইসব জেলা থেকে এনে বিক্রি করত, তাদের ব্যবসাও বন্ধ হলো এবং অনেক লোক নৌকায় খেটে খেত তারাও বেকার হয়ে পড়ল। এদের মধ্যে অনেকেই আজ রিকশা চালায়। একমাত্র গোপালগঞ্জ মহকুমার কয়েক হাজার লোক খুলনা, যশোর ও অন্যান্য জায়গায় রিকশা চালিয়ে এবং কুলির কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করার চেষ্টা করতে লাগল।’ (পৃ. ১০৩-১০৫)

দাওয়ালদের পক্ষ নিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও আওয়ামী লীগ আন্দোলন শুরু করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে সরকার নির্দেশ দেয় দাওয়ালদের ধান কাটতে যেতে আপত্তি নেই। তবে দাওয়ালরা ধান আনতে পারবে না। ধান কাটার পর দাওয়ালদের তা নিকটতম সরকারি গুদামে জমা দিতে হবে এবং সেই গুদামের কর্মচারীদের কাছ থেকে একটি রসিদ গ্রহণ করে নিজের এলাকায় দাওয়ালরা ফিরে যাবে। দাওয়ালরা নিজের এলাকায় ফিরে রসিদ দেখিয়ে সেই পরিমাণ ধান নিজের জেলার নিকটতম গুদাম থেকে নিতে পারবে। এ সময় অবস্থা এমন হয়েছিল যে যদি দাওয়ালরা ধান কাটতে না যায়, তাহলে শুধু খুলনা জেলায়ই অর্ধেক জমির ধান পড়ে থাকবে, যা সরকার জানত। ১৯৪৮ সালের শেষে অথবা ১৯৪৯ সালের প্রথম দিকে পাকিস্তান সরকার এ নির্দেশ জারি করে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, দাওয়ালরা ধান কেটে গুদামে জমা দিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু অধিকাংশ দাওয়াল ফিরে এসে তাদের ন্যায্য ধান পায়নি। কোনো রকম পাকা রসিদ না দিয়ে শুধু সাদা কাগজে লিখে দিয়েই সরকারি গুদামের কর্মচারীরা ধান নামিয়ে রেখেছিল। দাওয়ালরা সেই রসিদ নিয়ে দেশের গুদামে গেলে তাদের গালাগালি করে তাড়িয়ে দেয়া হয়েছিল। আবার অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, সরকারি গুদামের কর্মচারীদের উেকাচ দিলে অর্থাৎ সামান্য কিছু ব্যয় করলে কিছু ধান পাওয়া যেত। সরকারি এমন কর্মকাণ্ডে দাওয়ালরা সর্বস্বান্ত হয়ে পড়ে।

সরকারি এ নীতি ও দাওয়ালদের ওপর যে অত্যাচার করা হচ্ছিল, তার প্রতিক্রিয়ায় এ সময় খুলনা জেলায় একটি ঘটনা ঘটে। ফরিদপুর জেলার সরকারি লোকজন দাওয়ালদের প্রায় ২০০ নৌকা ধানসহ আটক করে। দাওয়ালরা রাতের অন্ধকারে সরকারি হুকুম না মেনে ‘আল্লাহু আকবর’, ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ ইত্যাদি ধ্বনি দিয়ে ধানসহ নৌকা নিয়ে যাত্রা করে। নৌকা ১০-১৫ মাইল যাওয়ার পর পুলিশ বাহিনী লঞ্চ নিয়ে তাদের ধাওয়া করে বাধা দেয়। কিন্তু দাওয়ালরা কোনো বাধাকে পরোয়া না করেই অগ্রসর হতে থাকে। শেষ পর্যন্ত পুলিশ দাওয়ালদের নৌকা লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ে তাদের থামায়। দাওয়ালরা বাধা দিয়েও পুলিশ ও সরকারি লোকজনের সঙ্গে পেরে ওঠেনি। দাওয়ালদের কাছ থেকে জোরপূর্বক নদীর তীরে এক মাঠের মধ্যে সব ধান নামিয়ে রাখা হয় এবং দাওয়ালদের শূন্য হাতে ফিরিয়ে দেয়া হয়। পুলিশি নির্যাতন ও ধান আটক সত্ত্বেও এ ধানের কী অবস্থা হয়েছিল তার বর্ণনা রয়েছে অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে: ‘যদিও সরকারি গুদামে সে ধান ওঠে নাই। পরের দিন ভীষণভাবে বৃষ্টি হয়ে সে ধান ভেসে যায়। আমি খবর পেয়ে খুলনায় এলাম, তখনো অনেক নৌকা আটক রয়েছে ধানসহ। এ সময় দাওয়ালদের নিয়ে সভা করে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবের বাড়িতে শোভাযাত্রাসহকারে উপস্থিত হলাম। জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন প্রফেসর মুনীর চৌধুরীর বাবা আবদুল হালিম চৌধুরী। তিনি আমার সঙ্গে আলাপ করলেন এবং বললেন, তার কিছুই করার নেই, সরকারের হুকুম। তবে তিনি ওয়াদা করলেন, সরকারের কাছে টেলিগ্রাম করবেন সমস্ত অবস্থা জানিয়ে। আমি দাওয়ালদের নিয়ে ফিরে এলাম। আমি নিজেও টেলিগ্রাম করলাম। দাওয়ালদের বললাম, ভবিষ্যতে যেন তারা এভাবে আর ধান কাটতে না আসে, একটা বোঝাপড়া না হওয়া পর্যন্ত। খাজা নাজিমুদ্দীন সাহেব তখন বড়লাট। কারণ জিন্নাহ মারা যাওয়ার পর তাকে গভর্নর জেনারেল করা হয়েছিল।’

এ ঘটনার সত্যতা পাওয়া যায় সিক্রেট ডকুমেন্টসের (সিক্রেট ডকুমেন্টস অব ইনটেলিজেন্স ব্রাঞ্চ অন ফাদার অব দ্য নেশন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান) গোয়েন্দা প্রতিবেদনে। ২৮ জানুয়ারি ১৯৪৯ সালের গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে যে ‘টুঙ্গিপাড়ার শেখ মুজিবুর রহমান এবং খুলনার টুটপাড়ার শামছুল আলম পৌনে ৯টার দিকে খুলনা মিউনিসিপ্যাল পার্কে পৌঁছলেন। সেখানে কুমিল্লা, ঢাকা ও ফরিদপুরের ৩৫০ জন দাওয়াল উপস্থিত ছিলেন। তিনি তাদের বললেন ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেটের বাড়ির দিকে যেতে তার নেতৃত্বে। তার কাছে তারা ধান নিয়ে বাড়ি ফেরার অনুমতিপত্র দাবি করবেন। ‘আল্লাহু আকবর’, ‘আমাদের দাবি মানতে হবে’ স্লোগান দিয়ে মিছিল নিয়ে তারা অগ্রসর হলেন। ডিএমের বাড়ি পৌঁছে তারা দাবি জানালেন, হয় তাদের অনুমতি দিতে হবে নয় খাবার দিতে হবে। বর্তমানে প্রকাশিত সিক্রেট ডকুমেন্টসের গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে দাওয়ালদের আন্দোলনে স্থানীয় কেউ জড়িত

নয়। বরং তাদের উসকানি দিচ্ছে কমিউনিস্ট ভাবাপন্ন দুজন পরিচিত মুসলমান নেতা। যারা দাওয়ালদের উসকানি দেয়ার মিশন নিয়ে এ জেলায় এসেছিলেন। এদের মধ্যে একজন ছিলেন মুনীর চৌধুরী, তত্কালীন খুলনা জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আবদুল হালিম চৌধুরীর ছেলে।

উল্লেখ্য, মুনীর চৌধুরী তখন খুলনার দৌলতপুর কলেজে ইংরেজির শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। অন্যজন কমিউনিস্ট ছিলেন, শেখ মুজিবুর রহমান। (মুনতাসীর মামুন, বঙ্গবন্ধুর জীবন ছাত্র রাজনীতি থেকে জাতীয় রাজনীতি ১৯২০-১৯৪৯, পৃ. ১১২-১১৩)

দাওয়ালদের পক্ষে পরবর্তী সময়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আবার সোচ্চার হয়েছিলেন। বিভিন্ন সভায়ও তিনি দাওয়ালদের পক্ষে কথা বলেছেন। বর্তমান ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নবীনগর থানার কৃষ্ণনগর হাইস্কুল উদ্বোধন করার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল তত্কালীন খাদ্য বিভাগের পরিচালক এনএম খানকে। এ অনুষ্ঠানে আরো আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল গায়ক আব্বাস উদ্দিন আহমদ, সোহরাব হোসেন, বেদার উদ্দিন আহমদ ও শেখ মুজিবুর রহমানকে। উল্লেখ্য, এনএম খান একসময় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এসডিও ছিলেন এবং সুদক্ষ প্রশাসক হিসেবে তার সুনাম ছিল। কৃষ্ণনগর হাইস্কুলের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এনএম খানকে উদ্দেশ্য করে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আপনি এ দেশের অবস্থা জানেন। বহুদিন বাংলাদেশে কাজ করেছেন, আজ ফুড ডিপার্টমেন্টের ডিরেক্টর জেনারেল আপনি, একবার বিবেচনা করে দেখেন এ দাওয়ালদের অবস্থা এবং কী করে এরা বাঁচবে? সরকার তো খাবার দিতে পারবে না। যখন পারবে না, তখন এদের মুখের গ্রাস কেড়ে নিতেছে কেন?’ (অসমাপ্ত আত্মজীবনী, পৃ. ১১১)

সিক্রেট ডকুমেন্টস অনুযায়ী ১৯৪৯ সালে যখন খাজা নাজিমুদ্দীন গোপালগঞ্জ সফরে আসেন তখন দাওয়ালদের পক্ষে কথা বলার জন্য ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেটকে বঙ্গবন্ধু অনুরোধ করেছিলেন। একই বিষয়ে সত্যতা পাওয়া যায় বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনীতে: ‘আমি খাজা সাহেবকে দাওয়ালদের অসুবিধার কথা বলবার জন্য ম্যাজিস্ট্রেটকে অনুরোধ করেছিলাম। কবির (এমডি) সাহেব নিজেও খুব চিন্তিত ছিলেন দাওয়ালদের ব্যাপার নিয়ে। কারণ ফরিদপুরে যে দুর্ভিক্ষ হবে সে সম্বন্ধে কোনো সন্দেহ ছিল না।’ (পৃ. ১০৭) সিক্রেট ডকুমেন্টস ও মুনতাসীর মামুন রচিত বঙ্গবন্ধুর জীবন ছাত্র রাজনীতি থেকে জাতীয় রাজনীতি গ্রন্থে দেখা যায়, ১৯৪৯ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি গোপালগঞ্জ শহরের বাইরে ঘোষেরচরে এক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এ সমাবেশে শেখ মুজিবুর রহমান দাওয়ালদের পক্ষে বক্তব্য রেখেছিলেন। এতে তিনি দাওয়ালদের দুঃখ-দুর্দশা দূর করে তাদের দাবি মানার কথা বলেছিলেন। যদি তা করা না হয়, তাহলে গোপালগঞ্জের অনেক লোক না খেয়ে মারা যাবে। স্থানীয় এমএলকে অনুরোধ করেছিলেন সিভিল সাপ্লাই মন্ত্রীর কাছে এ দাবি উপস্থাপন করার জন্য। (পৃ. ১১৯)

দাওয়াল সম্প্রদায়ের ওপর সরকারি এ নিপীড়নের বিরুদ্ধে সর্বপ্রথম সোচ্চার হয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি তাদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের জন্য সভা-সমাবেশ করেছেন, এমনকি সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গেও যোগাযোগ করেছেন। দাওয়াল সম্প্রদায়ের লোকজন যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সেটিই ছিল তার মূল লক্ষ্য। যাদের শ্রমের বিনিময়ে অবস্থাসম্পন্ন ব্যক্তিদের গোলায় ধান উঠত, অথচ এসব লোক নিজেদের স্বার্থে সরকারের সঙ্গে সহযোগিতা করে দাওয়ালদের সর্বস্বান্ত করে তোলে। একদিকে যেমন তারা নিজের ন্যায্য ধানের ভাগ থেকে বঞ্চিত হয়, তেমনি ঋণের ভারেও জর্জরিত হয়। কেননা বেশির ভাগ দাওয়ালের ধান কাটার মৌসুমে সংসারের খরচ নির্বাহের জন্য ও ক্ষেত্র বিশেষে নৌকা ধার করার জন্য মহাজনদের কাছ থেকে টাকা ধার করতে হতো। কিন্তু সরকারি নিপীড়নের কারণে যখন তারা ধান পায়নি তখন মহাজনরা দাওয়ালদের সামান্য সম্পদ ভিটেমাটি কেড়ে নেয়। পরিণতিতে দাওয়ালরা হয়ে পড়ে নিঃস্ব। তারা পেটের দায়ে স্ত্রী-সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দেয়ার জন্য জীবিকা পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়। এসব কিছু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে এতটা গভীরভাবে স্পর্শ করে যে তিনি এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে বাধ্য হন। যেখানে তত্কালীন সমাজে সব সচেতন মানুষের উচিত ছিল তাদের পাশে দাঁড়ানো, কিন্তু তারা তা করেনি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানই একমাত্র রাজনীতিবিদ, যিনি বাংলার মফস্বল অঞ্চলের কৃষি শ্রমিক শ্রেণী দাওয়ালদের পক্ষে অবস্থান নিয়ে আন্দোলন শুরু করেন।

 

ড. মোশারফ হোসেন: ইতিহাস গবেষক ও শিক্ষক, ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ (ইউল্যাব)