বৈশ্বিক বাজার ও অর্থনীতির মূল কেন্দ্রবিন্দু ক্রমেই এশিয়ার দিকে ধাবিত হচ্ছে, সে রূপান্তরে এশিয়ার বাণিজ্যিক তথা অর্থনৈতিক মানচিত্ৰে দ্ৰুত পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইনের পুনর্গঠন, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন, এনার্জি ট্রানজিশন এবং নতুন বৈদেশিক বিনিয়োগপ্রবাহ এ অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরো শক্তিশালী ও বহুমাত্রিক করছে।

এ পরিবর্তনের ধারায় ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে, যা কৌশলগত দিক থেকেও সমান তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলাদেশের জন্য এ পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় সুযোগ শুধু নতুন বাজার অনুসন্ধান নয়; বরং বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও মূলধনের একাধিক আঞ্চলিক উৎসের সঙ্গে আরো নিবিড়ভাবে যুক্ত হওয়া। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল এবং উন্নয়নশীল থেকে উন্নত দেশে উন্নীত হওয়ার ক্রান্তিলগ্নে, এমনকি উন্নীত হওয়ার পরবর্তী বাণিজ্য কাঠামোর প্রক্রিয়া ও প্রস্তুতির সন্ধিক্ষণে অর্থনৈতিক অংশীদারত্বের বৈচিত্র্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ।

চীন বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্য ও বিনিয়োগ অংশীদার, আর স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের চীন করিডরের বিকাশ আমাদের জন্য একটি বড় উদাহরণ। বাংলাদেশে কার্যরত চীনা বহুজাতিক গ্রুপগুলোর একটি বড় অংশ তাদের ব্যাংকিং অংশীদার হিসেবে বেছে নিয়েছে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডকে। আমাদের নিবেদিত চীন করিডর দল, রেনমেনবি (আরএমবি) নিষ্পত্তি সক্ষমতা, চীনের সরকারি এক্সপোর্ট ক্রেডিট এজেন্সি, চায়না এক্সপোর্ট অ্যান্ড ক্রেডিট ইন্স্যুরেন্স করপোরেশন (সিনোশিওর)-সমর্থিত অর্থায়ন কাঠামো এবং পদ্মা রেল সংযোগ ও ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের মতো বৃহৎ প্রকল্পে আমাদের সম্পৃক্ততার মাধ্যমে প্রতীয়মান হয় যে একটি আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক-সম্পন্ন ব্যাংক কীভাবে বিনিয়োগকারী, প্রকল্প ও দুই দেশের ব্যবসাকে একই আর্থিক অবকাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করতে পারে।

এখন বাংলাদেশের সামনে সুযোগ রয়েছে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতিগুলোর সঙ্গে একই ধরনের সংযোগ আরো জোরদার করার। এক্ষেত্রে আমদানি-রফতানি বাণিজ্যে সম্ভাবনার পাশাপাশি বিনিয়োগ, উৎপাদন ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইনে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে রয়েছে ব্যাপক সম্ভাবনা।

জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক এ পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ, যেখানে দীর্ঘদিনের উন্নয়ন সহযোগিতা এখন কৌশলগত অর্থনৈতিক অংশীদারত্বের রূপ নিচ্ছে। মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর ও বিদ্যুৎ কেন্দ্র, ঢাকা মেট্রোরেল, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল, মেঘনা-গোমতী সেতু এবং আড়াইহাজারের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের মতো রূপান্তরমূলক প্রকল্পে আমরা অর্থায়ন ও ব্যাংকিংয়ের বিভিন্ন পর্যায়ে যুক্ত থেকেছি। জাপান ও বাংলাদেশে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের নেটওয়ার্কের মেলবন্ধনের মাধ্যমে আমরা জাপান-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডোরে সরকারি এবং বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ এবং বাণিজ্য বাড়ার ক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা পালন করছি।

মেঘনাঘাটের একাধিক বৃহৎ ক্ষমতার কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎ কেন্দ্রর অর্থায়ন, গুরুত্বপূর্ণ এলএনজি আমদানির ক্ষেত্রে আমাদের আর্থিক ভূমিকাসহ জ্বালানি খাতের একাধিক উদ্যোগে আমাদের সম্পৃক্ততা দেখিয়েছে যে একটি বহুজাতিক ব্যাংক কীভাবে বিনিয়োগের বিভিন্ন পর্যায়ে অর্থায়ন ও লেনদেন ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে একটি প্রকল্পকে বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে নিতে পারে।

বাংলাদেশ ও জাপানের স্বাক্ষরিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) কার্যকর হলে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পণ্য জাপানের বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাবে। তৈরি পোশাকের পাশাপাশি লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, ইলেকট্রনিকস, কৃষিপ্রক্রিয়াজাত পণ্য, আইসিটি ও অন্যান্য উচ্চমূল্য সংযোজনকারী খাতে রফতানি বহুমুখীকরণে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে বাড়বে প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষতা উন্নয়ন ও নতুন নতুন শিল্প বিনিয়োগ সুযোগ।

দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সম্পর্কও নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করছে। দীর্ঘদিন তৈরি পোশাক উৎপাদনে কেন্দ্রীভূত এ সম্পর্ক ক্রমেই অবকাঠামো, প্রকৌশল, ইলেকট্রনিকস, আইসিটি ও উচ্চতর মূল্য সংযোজনকারী উৎপাদনের দিকে বিস্তৃত হচ্ছে। কোরিয়ান প্রতিষ্ঠানগুলোর দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতি বাংলাদেশের জন্য শুধু বৈদেশিক বিনিয়োগের উৎস নয়; বরং প্রযুক্তি, দক্ষতা ও আঞ্চলিক সাপ্লাই চেইনে আরো গভীরভাবে যুক্ত হওয়ার সুযোগ। আমাদের করিডর ব্যাংকিংয়ের অন্যতম প্রধান সক্ষমতা হলো আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং নেটওয়ার্কের মাধ্যমে মূল কোম্পানি, স্থানীয় কার্যক্রম, সরবরাহকারী ও আন্তর্জাতিক বাজারকে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় যুক্ত করতে পারা।

একই ধরনের রূপান্তর মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোয়ও দৃশ্যমান। দীর্ঘদিন এ অঞ্চলের সঙ্গে সম্পর্কের প্রধান ভিত্তি ছিল জনশক্তি আর রেমিট্যান্স। তবে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতিগুলোর কাছ থেকে এখন বন্দর, লজিস্টিকস, এভিয়েশন, বিদ্যুৎ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ ও অংশীদারত্বের প্রস্তাব দ্রুত বাড়ছে। বাংলাদেশের জন্য এর অর্থ হলো সম্পর্কটিকে একমুখী শ্রম ও রেমিট্যান্স-প্রবাহ থেকে দ্বিমুখী বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও মূলধন প্রবাহে রূপ দেয়ার সুযোগ। আমাদের আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক এ দুই প্রান্তের বিনিয়োগকারী ও ব্যবসাকে সংযুক্ত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

এ ধরনের সম্পর্ক যত শক্তিশালী হয়, আর্থিক প্রয়োজনও তত বদলায়। একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান যখন বাংলাদেশে বিনিয়োগ করে, তখন প্রকল্পের শুরুতেই প্রতিষ্ঠানটির ঋণের পাশাপাশি প্রয়োজন হয় ক্যাপিটাল ফ্লো, ট্রেড ফাইন্যান্স, ব্যাংক গ্যারান্টি, ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল, বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা, পেমেন্ট ও ক্যাশ ম্যানেজমেন্টসহ একটি সমন্বিত আর্থিক সমাধান। একইভাবে কোনো বাংলাদেশী প্রতিষ্ঠান বিদেশে রফতানি বা বিনিয়োগ বাড়াতে চাইলে আন্তর্জাতিক ট্রেড, পেমেন্ট ও বৈদেশিক মুদ্রা সক্ষমতার সঙ্গে কার্যকর সংযোগ অপরিহার্য। স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের ভূমিকা এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে ১২১ বছরের নিরবচ্ছিন্ন উপস্থিতি নিয়ে আমরা এদেশে একমাত্র বহুজাতিক সর্বজনীন ব্যাংক হিসেবে কার্যক্রম পরিচালনা করছি।

চীন, জাপান, কোরিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক কেন্দ্রগুলোয় আমাদের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক স্থানীয় জ্ঞান ও সক্ষমতাকে বৈশ্বিক মূলধন এবং ব্যবসায়িক সংযোগের সঙ্গে যুক্ত করে। একজন বিনিয়োগকারীর নিজ দেশের ব্যাংকিং সম্পর্ক এবং বাংলাদেশে তার কার্যক্রমকে একই আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কে সংযুক্ত করাই আমাদের করিডর প্রপোজিশনের মূল শক্তি।

বড় প্রকল্পের অভিজ্ঞতা আমাদের একটি বিষয় স্পষ্টভাবে শিখিয়েছে—অর্থায়নকে প্রকল্পের শেষ ধাপ হিসেবে দেখলে চলবে না, প্রকল্পের শুরুতেই ব্যাংক, স্পন্সর, বিনিয়োগকারী ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনকে যুক্ত করা গেলে অর্থায়ন কাঠামো, ঝুঁকি বণ্টন এবং পরিবেশগত ও সামাজিক মান সম্পর্কে আগেই স্বচ্ছতা তৈরি হয়। ভালো অর্থায়ন একটি দুর্বল প্রকল্পকে ভালো করতে পারে না, কিন্তু একটি ভালো প্রকল্পকে বাস্তবায়নযোগ্য ও টেকসই করে তুলতে পারে।

বাংলাদেশের নিজস্ব বাজারের জন্যও এটা সত্য। অবকাঠামোর দীর্ঘমেয়াদি চাহিদা, ডিজিটাল অর্থনীতির সম্প্রসারণ এবং ক্রমবর্ধমান মধ্যবিত্ত ভোক্তাশ্রেণী আগামী বছরগুলোয় নতুন বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করবে। ফলে বাংলাদেশকে শুধু স্বল্পব্যয়ের উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে নয়, বরং একটি বিনিয়োগ গন্তব্য, ক্রমবর্ধমান ভোক্তা বাজার এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকে সংযুক্ত করার একটি অর্থনৈতিক প্লাটফর্ম হিসেবেও দেখার সুযোগ রয়েছে।

আমাদের কাছে উদীয়মান এশিয়ায় বাংলাদেশের পরবর্তী অধ্যায় তাই শুধু কত বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য হলো, সে হিসাব নয়; কী পরিমাণ বৈদেশিক বিনিয়োগ নতুন উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি করছে, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও দক্ষতার উত্তরণে ভূমিকা রাখছে এবং কতটি বাংলাদেশী প্রতিষ্ঠান আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইনে যুক্ত হচ্ছে—এসব বিষয়ও সমান গুরুত্বপূর্ণ। একটি আন্তর্জাতিক ব্যাংক হিসেবে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের ভূমিকা এ অর্থনৈতিক সংযোগকে কার্যকর করা, পাশাপাশি বিনিয়োগকারী, বাংলাদেশী ব্যবসা, প্রকল্প ও বৈশ্বিক মূলধনের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করা।

এ সংযোগ যত দৃঢ় হবে, বাংলাদেশের জন্য তত বেশি সুযোগ তৈরি হবে বিনিয়োগকে উৎপাদনে, উৎপাদনকে রফতানিতে এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারত্বকে দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধিতে রূপ দেয়ার ক্ষেত্রে। টেকসই অর্থনৈতিক সম্পর্কের ভিত্তি হলো আস্থা; এ আস্থার ওপর দাঁড়িয়েই স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার বিশ্বস্ত অংশীদার হয়ে আছে।

অর্থনীতির এমন এক সন্ধিক্ষণে "ইমার্জিং এশিয়া" প্রতিপাদ্যকে ঘিরে এ বিশেষ ক্রোড়পত্র অত্যন্ত সময়োপযোগী।

স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে বেছে নেয়ার জন্য দৈনিক বণিক বার্তাকে জানাই ধন্যবাদ এবং পত্রিকাটির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে জানাই অভিনন্দন ও শুভকামনা।