দেশে যখন স্থানীয় গ্যাসের ক্রমবর্ধমান হ্রাস শুরু হয়, ঠিক সে সময় বিপুল এ গ্যাসের ঘাটতি মেটাতে বাংলাদেশ বিভিন্ন দেশ থেকে এলএনজি আমদানির জোর প্রচেষ্টা চালায়। সময়টা ছিল ২০১৬ ও ২০১৭ সাল। ঠিক এ সময় দেশের গ্যাসের চাহিদা ও সরবরাহ সংকট মেটাতে এগিয়ে আসে কাতার এনার্জি। মূলত সে সময় কাতারের রাষ্ট্রীয় পেট্রোলিয়াম ও গ্যাস সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানটি কাতার গ্যাস নামে সবচেয়ে বেশি পরিচিত ছিল।
২০১৭ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর কাতার এনার্জির সঙ্গে এলএনজি আমদানি চুক্তি করে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশ (পেট্রোবাংলা)। এ চুক্তির আওতায় ২০১৮ সালের ২৪ এপ্রিল দেশে প্রথম এলএনজি কার্গো আসে। কাতার এনার্জির সঙ্গে চুক্তিটি ছিল বেশ সাশ্রয়ী, যা এখনো অব্যাহত রয়েছে। চুক্তির মেয়াদ ১৫ বছর। এ চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ ১ দশমিক ৮ মিলিয়ন থেকে আড়াই মিলিয়ন টন পর্যন্ত বছরে এলএনজি আমদানি করতে পারবে বাংলাদেশ।
রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের (আরপিজিসিএল) তথ্য অনুযায়ী, কাতার এনার্জির সঙ্গে চুক্তির পর এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে এলএনজি আমদানি হয়েছে ১৮ দশমিক ৬৪ মিলিয়ন টন (২০১৮-১৯ অর্থবছর থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত)। আর কাতার এনার্জি ট্রেডিং থেকে আমদানি হয়েছে দশমিক ৫৪ মিলিয়ন টন। সব মিলিয়ে দুটি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় কাতার এনার্জি থেকে দেশে এলএনজি এসেছে মোট ১৯ দশমিক ১৮ মিলিয়ন টন (৩১২ কার্গো এলএনজি), যা মোট এলএনজি আমদানির ৫০ শতাংশ।
দেশে গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় এখন এলএনজির হিস্যা প্রায় ৩০ শতাংশ। আর আমদানি হওয়া গ্যাসের হিস্যা ৬০ শতাংশের বেশি। দেশে গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় দাম ও নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহের ক্ষেত্রে কাতার এনার্জির ভূমিকা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে।
মধ্যপ্রাচ্যে চলা যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান সংঘাতে কাতারের এলএনজি স্থাপনা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ কারণে দেশটির সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি আমদানি চুক্তি বড় আকারে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিশেষ করে চলতি বছরে যেসব চুক্তির আওতায় এলএনজি কার্গো দেশে আসার কথা ছিল তা আসেনি।
পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, আমদানির জন্য চারটি দেশের সঙ্গে আটটি চুক্তি আছে বাংলাদেশের। এসব চুক্তির আওতায় এ বছর মোট ১০৩টি এলএনজি কার্গো আসার কথা। প্রথম নয় মাসে এসেছে মাত্র ২১টি। মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাবে চুক্তির অধিকাংশ কার্গো আসেনি।
পেট্রোবাংলা ও আরপিজিসিএল সূত্র বলছে, গত বছর এলএনজির ৬০ শতাংশ আমদানি হয় কাতার থেকে। এ বছর আরো বেশি আসার কথা ছিল দেশটি থেকে। কেননা এলএনজি আমদানির আটটি চুক্তির মধ্যে ছয়টির মূল উৎস কাতার। গত মার্চে কাতারের সবচেয়ে বড় এলএনজি ইউনিটে হামলার পর উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চলমান সংঘাতে হরমুজ প্রণালিতে নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ থাকায় তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) সরবরাহ নভেম্বর পর্যন্ত বাতিল (ফোর্স মেজর) করল কাতার এনার্জি। এর আওতায় ইউরোপ ও এশিয়ার বেশকিছু ক্রেতা দেশের এলএনজি সরবরাহ বাতিল অব্যাহত থাকবে। এশিয়ার ক্রেতাদের মধ্যে ফোর্স মেজরের আওতায় রয়েছে পাকিস্তান ও বাংলাদেশ।
কাতার থেকে এলএনজি আমদানি একপ্রকার বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাংলাদেশও গ্যাস সংকটে পড়েছে। এ কারণে উচ্চ দামে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি আমদানি করছে পেট্রোবাংলা। বিপুল অর্থ ব্যয়ে এলএনজি আমদান করতে গিয়ে চাপে পড়েছে বাংলাদেশ। সম্প্রতি এলএনজি সরবরাহ সংকটসহ নানা প্রসঙ্গ উঠে আসে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের কাতার সফরে। গত ১৯ আগস্ট দোহায় কাতারের প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আব্দুল রহমান আল থানির সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। বিশ্বের বর্তমান চ্যালেঞ্জিং পরিস্থিতিতে জ্বালানিনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশকে সম্ভাব্য সব ধরনের সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে কাতার। তবে কাতার থেকে শিগগিরই সরবরাহ বাড়ার তেমন সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না।










