বাংলাদেশের অটোমোবাইল বাজারে ধীরে ধীরে নতুন গাড়ির চাহিদা বাড়ছে। ফলে বৈশ্বিক গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যও তৈরি হচ্ছে নতুন সম্ভাবনা। টয়োটা মোটর করপোরেশনের সহযোগী প্রতিষ্ঠান টয়োটা টুসো গ্রুপের সরাসরি বিনিয়োগের মাধ্যমে বাংলাদেশে টয়োটা এখন গ্রাহকদের গাড়ি কেনা ও ব্যবহারের পুরো প্রক্রিয়াকে আরো সহজ ও নির্ভরযোগ্য করতে চায়।

টয়োটা বাংলাদেশ জানিয়েছে, তাদের লক্ষ্য কেবল গাড়ি বিক্রি করা নয়; বরং জেনুইন পার্টস, ওয়ারেন্টি সুবিধা ও মানসম্মত বিক্রয়োত্তর সেবার মাধ্যমে গ্রাহকদের দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা দেয়ার পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিকে গুরুত্ব দেয়া। বিশ্বজুড়ে বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবহার বাড়লেও বাংলাদেশের বর্তমান অবকাঠামো বিবেচনায় হাইব্রিড প্রযুক্তিকেই নিকট ভবিষ্যতের জন্য সবচেয়ে বাস্তবসম্মত ও টেকসই সমাধান হিসেবে দেখছে টয়োটা বাংলাদেশ। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে দেশজুড়ে কার্যক্রম ও সেবার পরিধি বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির।

টয়োটা বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রেমিত সিং বণিক বার্তাকে বলেন, ‘টয়োটা গাড়ির মালিকানা শুধু গাড়ি কেনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জেনুইন খুচরা যন্ত্রাংশ, টয়োটা লুব্রিক্যান্ট, ওয়ারেন্টি এবং নির্ভরযোগ্য বিক্রয়োত্তর সেবা পাওয়ার সুযোগও থাকতে হবে। আমরা চাই গ্রাহকরা যেন আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে নতুন গাড়ি কিনতে ও ব্যবহার করতে পারেন। গাড়ির মালিকানার প্রতিটি পর্যায়ে প্রয়োজনীয় সেবা ও জেনুইন যন্ত্রাংশ সহজে পাওয়া গেলে গ্রাহকের সঙ্গে আস্থার সম্পর্কও সুদৃঢ় হয়।’

পরিবেশবান্ধব পরিবহনে বাস্তবসম্মত সমাধান হাইব্রিড

বাংলাদেশের বাজারে টেকসই পরিবহন কৌশলের অংশ হিসেবে হাইব্রিড গাড়িকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে টয়োটা বাংলাদেশ। প্রতিষ্ঠানটির মতে, দেশের বর্তমান অবকাঠামো বিবেচনায় এ মুহূর্তে পুরোপুরি বৈদ্যুতিক গাড়ির তুলনায় হাইব্রিড গাড়ি বেশি উপযোগী। বিশেষ করে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতার প্রেক্ষাপটে হাইব্রিড প্রযুক্তিকে কার্যকর দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হিসেবে দেখছে প্রতিষ্ঠানটি।

প্রেমিত সিং বলেন, ‘বিশ্বজুড়ে নতুন গাড়ির চাহিদা বাড়ছে। বাংলাদেশেও ধীরে ধীরে এ বিষয়ে আগ্রহ তৈরি হচ্ছে। বৈদ্যুতিক গাড়ির বিস্তার অনেকটাই নির্ভর করে চার্জিং অবকাঠামো, বিদ্যুৎ সরবরাহের সক্ষমতা এবং একবার চার্জে কত দূর যাওয়া যাবে—এ বিষয়ে গ্রাহকের আস্থার ওপর।’ তিনি আরো বলেন, ‘এসব ব্যবস্থা পুরোপুরি গড়ে ওঠার আগ পর্যন্ত হাইব্রিড গাড়িই একটি বাস্তবসম্মত ও টেকসই সমাধান। টয়োটা হাইব্রিড প্রযুক্তির প্রসার অব্যাহত রাখার পাশাপাশি ভবিষ্যতে বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজার তৈরিতেও ভূমিকা রাখবে।’

হাইব্রিড গাড়িতে তুলনামূলক কম জ্বালানি লাগে এবং কার্বন নিঃসরণও কম হয়। দৈনন্দিন ব্যবহারের জন্য দেশজুড়ে চার্জিং নেটওয়ার্কের ওপরও নির্ভর করতে হয় না। টয়োটা বাংলাদেশের মতে, দেশের বাজারে হাইব্রিড শুধু একটি কার্যকর বিকল্প নয়, বরং অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমাধান। তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী, পরিবেশবান্ধব ও দৈনন্দিন ব্যবহারের উপযোগী হওয়ায় বাংলাদেশের জন্য হাইব্রিড প্রযুক্তিকে বিশেষভাবে কার্যকর মনে করছে প্রতিষ্ঠানটি।

বৈশ্বিক টয়োটা মান অনুসরণে কার্যক্রম

অটোমোবাইল খাতে ২০ বছরের বেশি অভিজ্ঞতা রয়েছে প্রেমিত সিংয়ের। বাংলাদেশের বাজার সম্পর্কেও তার গভীর ধারণা রয়েছে। তিনি জানান, টয়োটা বাংলাদেশের ব্র্যান্ডিং, পরিচালন কৌশল ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা টয়োটা মোটর করপোরেশনের বৈশ্বিক কৌশলের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই তৈরি করা হয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের গ্রাহকদের চাহিদা ও প্রত্যাশাকেও গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য, মূল্যবোধ ও নীতিমালা টয়োটা মোটর করপোরেশনের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ। একই সঙ্গে বাংলাদেশের গ্রাহকদের নির্দিষ্ট চাহিদা ও প্রত্যাশা অনুযায়ী আমাদের কর্মপরিকল্পনাও সাজানো হচ্ছে।’

টয়োটা বাংলাদেশ জাপানের শতভাগ প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগে প্রতিষ্ঠিত একটি কোম্পানি। প্রতিষ্ঠানটির মালিকানার ৯৯ শতাংশ টয়োটা টুসোর এবং বাকি ১ শতাংশ টয়োটা টুসো করপোরেশনের। বাংলাদেশে এরই মধ্যে গাড়ি বিতরণ ও বিক্রয় কার্যক্রম শুরু করেছে প্রতিষ্ঠানটি। পর্যায়ক্রমে সার্ভিস নেটওয়ার্ক ও বিক্রয়োত্তর সেবার পরিধি বাড়ানোর পাশাপাশি ভবিষ্যতে দেশে গাড়ি তৈরির সক্ষমতা গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে।

প্রেমিত সিং বলেন, ‘বিশ্বের কয়েকটি গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এরই মধ্যে বাংলাদেশে যন্ত্রাংশ এনে গাড়ি তৈরির পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। টয়োটাও এ দেশে একই ধরনের কার্যক্রম শুরুর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের বাজারে এসেছি। তাই এ মুহূর্তে আমাদের প্রধান অগ্রাধিকার হলো বিক্রয় ব্যবস্থাকে আরো কার্যকর করা, বিক্রয়োত্তর সেবার পরিধি বাড়ানো, খুচরা যন্ত্রাংশের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা এবং নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ।

প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য টয়োটা গাড়িকে বাংলাদেশের গ্রাহকদের জন্য আরো সহজলভ্য করে তোলার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে গাড়ি ব্যবহার ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয়ও সহনীয় রাখা। এরই মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়েও গাড়ি সরবরাহ শুরু করেছে টয়োটা বাংলাদেশ।

টয়োটার সরাসরি প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলাদেশে কার্যক্রম পরিচালনায় বৈশ্বিক ‘টয়োটা ওয়ে’ অনুসরণ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে কোম্পানিটি। বিশেষ করে লিন সাপ্লাই চেইন ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দ্রুত গাড়ি সরবরাহ, খুচরা যন্ত্রাংশ সহজে পাওয়া এবং নিরবচ্ছিন্ন ওয়ারেন্টি সেবা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটি মনে করে, অটোমোবাইল খাতের নীতিমালায় কার্যকর পরিবর্তন আনতে হলে সংশ্লিষ্ট সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

বাংলাদেশের উপযোগী গাড়িতে গুরুত্ব

বাংলাদেশে তুলনামূলকভাবে বড় পরিবারের সংখ্যা বেশি। তাই সাত সিটের ফ্যামিলি কার এ দেশের জন্য বেশ উপযোগী হতে পারে। পাশাপাশি শহরের যানজট ও দৈনন্দিন গাড়ি ব্যবহারের বাস্তবতায় হাইব্রিড গাড়ি বাড়তি সুবিধা দেয়। কারণ এতে জ্বালানি ও বৈদ্যুতিক শক্তি—দুটোর সমন্বয়ে জ্বালানি সাশ্রয় হয় এবং গাড়ির কার্যক্ষমতাও বাড়ে।

এ বাস্তবতা বিবেচনায় বাংলাদেশের বাজারের উপযোগী উল্লেখযোগ্যসংখ্যক হাইব্রিড মডেল আনছে টয়োটা। একই সঙ্গে গ্রাহকরা যেন হাইব্রিড প্রযুক্তির প্রকৃত সুবিধা আরো ভালোভাবে বুঝতে পারেন, সে বিষয়েও গুরুত্ব দিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। বাংলাদেশে সেডান, এসইউভি, পিকআপ, মিনিবাস ও বাসসহ বিভিন্ন মডেলের গাড়ি আনছে টয়োটা।