একসময় বাংলাদেশের গাড়ির বাজারে দক্ষিণ কোরিয়ার হুন্দাই মানেই ছিল আমদানি করা গাড়ি। ব্র্যান্ডটির গাড়ি আসত বিদেশ থেকে, বিক্রি ও পরবর্তী সেবা সীমাবদ্ধ থাকত স্থানীয় বাজারকেন্দ্রিক কার্যক্রমে। সে সম্পর্ক বদলাতে শুরু করে ২০২০ সালে। দক্ষিণ কোরিয়ার হুন্দাই মোটর কোম্পানির সঙ্গে অংশীদারত্বে বাংলাদেশের ফেয়ার টেকনোলজি স্থানীয়ভাবে গাড়ি সংযোজনের উদ্যোগ নেয়। চার বছর পর সে উদ্যোগ এখন দেশের অটোমোবাইল শিল্পে কোরীয় প্রযুক্তি ও স্থানীয় বিনিয়োগের একটি দৃশ্যমান উদাহরণ।
২০২১ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ ও ফেয়ার টেকনোলজির মধ্যে গাজীপুরের বঙ্গবন্ধু হাই-টেক সিটিতে হুন্দাই গাড়ি সংযোজন কারখানা স্থাপনের চুক্তি হয়। সে সময় ঢাকায় নিযুক্ত দক্ষিণ কোরিয়ার রাষ্ট্রদূত তার বক্তব্যে এটিকে বাংলাদেশে হুন্দাইয়ের গাড়ি সংযোজনের নতুন অধ্যায় হিসেবে উল্লেখ করেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, কোরিয়ার অন্যতম প্রধান ব্র্যান্ড হুন্দাই ফেয়ার গ্রুপের সঙ্গে অংশীদারত্বে বাংলাদেশে নিজেদের মডেল সংযোজনের পথে যায়।
কারখানাটির বাণিজ্যিক যাত্রা শুরু হয় ২০২৩ সালে। প্রথম পর্যায়ে হুন্দাই ক্রেটা এবং পরে টুসন স্থানীয়ভাবে সংযোজন করা হয়। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) শিল্প খাতবিষয়ক তথ্য অনুযায়ী, গাজীপুরের এ কারখানায় বছরে সর্বোচ্চ তিন হাজার গাড়ি সংযোজনের সক্ষমতা তৈরি হয়েছে, যা ধীরে ধীরে ১০ হাজার ইউনিটে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে এ স্থানীয় সংযোজন এখনো পূর্ণাঙ্গ গাড়ি উৎপাদন নয়। প্রাথমিক পর্যায়ে সম্পূর্ণ খোলা অবস্থায় আমদানি করা যন্ত্রাংশ বা সিকেডি ইউনিট বাংলাদেশে এনে গাড়ি সংযোজন করা হচ্ছে। ২০২৩ সালে কারখানাটি উদ্বোধনের সময় একেকটি ক্রেটা সংযোজনে এক হাজারের বেশি যন্ত্রাংশ আমদানির কথা জানানো হয়েছিল। স্থানীয় কারখানায় গাড়ির বডি ও চ্যাসিসে রঙ করা, সংযোজন এবং মান পরীক্ষা করা হয়।
এ ব্যবস্থার অর্থনৈতিক গুরুত্ব এখানেই। বাংলাদেশ সরকার অটোমোবাইল খাতে স্থানীয় সংযোজন ও উৎপাদন বাড়াতে কর সুবিধা ও অন্যান্য প্রণোদনা দিয়েছে। বিডার তথ্য অনুযায়ী, জাতীয় অটোমোবাইল নীতি ২০২০-এর লক্ষ্যই হলো ধীরে ধীরে স্থানীয় মূল্য সংযোজন বাড়ানো, যন্ত্রাংশ উৎপাদন গড়ে তোলা এবং গবেষণা ও উন্নয়ন সক্ষমতা তৈরি করা। নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করলে বাংলাদেশে উৎপাদিত গাড়ি কর সুবিধাও পেতে পারে।
স্থানীয় সংযোজনের প্রভাব বাজারেও দেখা যায়। ২০২৩ সালে স্থানীয়ভাবে সংযোজিত ক্রেটার দাম আমদানি করা সংস্করণের তুলনায় কমানো হয়েছিল। একই সঙ্গে হুন্দাইয়ের বিক্রিও বাড়তে শুরু করে। এর মধ্য দিয়ে স্থানীয় উৎপাদন শুধু আমদানি ব্যয় কমানোর পথ নয়, নতুন গাড়ির বাজার সম্প্রসারণেরও একটি হাতিয়ার হয়ে ওঠে।
এ কার্যক্রম ২০২৬ সালেও থেমে নেই। মে মাসে ফেয়ার টেকনোলজি বাংলাদেশে হুন্দাই ক্রেটা ফেসলিফট ২০২৬ বাজারে আনে। প্রতিষ্ঠানটি তখন নিজেকে বাংলাদেশে হুন্দাই যাত্রীবাহী গাড়ির আনুষ্ঠানিক পরিবেশক ও উৎপাদক হিসেবে উল্লেখ করে। একই সময়ে হুন্দাইয়ের বৈশ্বিক ওয়েবসাইটেও বাংলাদেশে ফেয়ার টেকনোলজিকে স্থানীয় অংশীদার হিসেবে তালিকাভুক্ত রাখা হয়েছে।
অর্থাৎ হুন্দাইয়ের বাংলাদেশ যাত্রা এখন আর শুধু বিদেশী গাড়ি এনে বিক্রির গল্প নয়। কোরীয় ব্র্যান্ডের প্রযুক্তি ও নকশার সঙ্গে বাংলাদেশের স্থানীয় বিনিয়োগ, শ্রম ও শিল্প অবকাঠামোর সংযোগ তৈরি হয়েছে। পরবর্তী চ্যালেঞ্জ হবে আমদানি করা যন্ত্রাংশের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে স্থানীয় যন্ত্রাংশ উৎপাদন ও মূল্য সংযোজন বাড়ানো। সেটি সম্ভব হলে হুন্দাইয়ের গাজীপুরের কারখানা শুধু বাংলাদেশের বাজারের জন্য গাড়ি সংযোজনের কেন্দ্র না হয়ে দেশের উদীয়মান অটোমোবাইল শিল্পের একটি বড় ভিত্তিতে পরিণত হতে পারে।










