বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্কের ক্ষেত্রে ব্যক্তি, রাজনৈতিক দল, রাষ্ট্র কিংবা কূটনৈতিক অন্যান্য বিষয় বিবেচনার চেয়ে দুই দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ স্বার্থসংশ্লিষ্ট সম্পর্কটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কোনো নির্দিষ্ট সরকার কিংবা ব্যক্তির থেকে পুরো বাংলাদেশের অর্থনীতির সঙ্গেই জাপানের সম্পর্ক নানান কারণে এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক সক্রিয় ও সমন্বিত। অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে জাপান ও বাংলাদেশের আনুভূমিক অবস্থানে ব্যাপক ব্যবধান থাকলেও দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্পর্ক এ ব্যবধানের দূরত্ব কমাতে পারে বলে জাপান কৌশলগত কারণে মনে করে। জাপান বাংলাদেশকে যে ঋণ বা অনুদান দেয় তা তাদেরও বিনিয়োগ, যার মূল লক্ষ্য থাকে বাংলাদেশে জাপানি ব্যবসা-বাণিজ্য প্রসারের। সড়ক, সেতু, মেট্রোরেল কিংবা বিমানবন্দর নির্মাণে জাপান অর্থনৈতিক সহযোগিতা করে যেন জাপানি কোম্পানিগুলো কাজ পায় এবং তাদের রফতানি পণ্যের বাজার দখল করে। জাপানের জেট্রো বাংলাদেশের বাণিজ্য খাতে সক্ষমতা বৃদ্ধিতে, জাপানি পণ্য বাজারজাতকরণে তথা বাংলাদেশী পণ্যের (যার কাঁচামাল জাপান থেকে সরবরাহ করা হয়) জাপানের রক্ষণশীল বাজারে প্রবেশের সক্ষমতা ও পারঙ্গমতা/দক্ষতা বৃদ্ধিকল্পে।

জাপান দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বিনিয়োগে স্বচ্ছতা ও সুনীতিকে প্রাধান্য দেয়। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা তাদের কাছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। আর তা যথাযথভাবে ধারণ করতে ব্যর্থ হলেই সময়ে সময়ে সম্পর্কে শীতলতা নেমে এসেছে অনিবার্যভাবে। বিশেষ করে কোনো বিষয়ে অর্থায়নের পর সেক্ষেত্রে স্বচ্ছতা না থাকলে জাপানের পার্লামেন্ট তা নিয়ে অনেক সমালোচনা উত্থাপন করে। যেমন আশির দশকে একটি বড় দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে, যা নিয়ে জাপানজুড়ে সমালোচনার ঝড় ওঠে। এমনকি সেখানে পোস্টারিং পর্যন্ত হয় যে এমন একটি দেশে তোমরা বিনিয়োগ করছ কেন। এ নিয়ে পর পর তিন-চার বছর জাপানের সঙ্গে সম্পর্কে একটা টানাপড়েন ছিল। তবে ৯০-এর দশকে গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় আসার সঙ্গে সঙ্গে জাপান-বাংলাদেশের ব্যাপারে অনেক আন্তরিক হয়ে ওঠে। এ সময় জাপানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের সূত্র ধরে অনেক ক্ষেত্রে বিনিয়োগ প্রস্তাব করে তারা। ১৯৯৫ সালে জাপান ইন্টারন্যাশনাল কোঅপারেশন এজেন্সি (জাইকা) ‘দ্য স্টাডি অন ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভেলপমেন্ট অন চিটাগং রিজিওন ইন দ্য পিপলস রিপাবলিক অব বাংলাদেশ’ নামে একটি বিশেষ সমীক্ষা বাংলাদেশ সরকারের কাছে পেশ করে। এ প্রতিবেদনে বাংলাদেশে বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণে স্পেশাল ইকোনমিক জোন গঠনের পরামর্শ দেয়া হয়। সমীক্ষায় ২৫ বছর মেয়াদি একটি বিনিয়োগ মহাপরিকল্পনা উপস্থাপন করা হয়। যার মধ্যে কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ পাড়ে জাপানিদের জন্য একটি বিশেষ রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল, কর্ণফুলী নদীর তলদেশ দিয়ে টানেল নির্মাণ, গভীর সমুদ্রে আধুনিক কনটেইনার সুবিধা সংবলিত সমুদ্রবন্দর এবং চট্টগ্রামে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব করা হয়। চট্টগ্রাম ও চট্টগ্রাম-সংলগ্ন এলাকা ঘিরে শিল্পবেষ্টনী গড়ে তুলতে পারলে সিঙ্গাপুর, ব্যাংকক ও চট্টগ্রামকে নিয়ে একটি ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্রায়াঙ্গেল গঠিত হতে পারে বলে প্রতিবেদনে অভিমত প্রকাশ করা হয়। সে সময় জাপানিরা চট্টগ্রামকে একটি হাব হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছিল। এটার বাস্তবায়ন সম্ভব হলে ভারতের দিল্লি থেকে মুম্বাই অথবা ওয়াশিংটন ডিসির থেকে নিউইয়র্ক যেমন গুরুত্বপূর্ণ তেমনি রাজধানী ঢাকার পাশাপাশি বন্দরনগরী চট্টগ্রামও নতুন করে গুরুত্ব পেত। ভূরাজনীতির ফেরে পড়ে বাংলাদেশ জাপানি সহায়তা নিয়ে অবকাঠামো উন্নয়নে আগ্রহী হয়নি। জাপানিদের জন্য ইকোনমিক জোন প্রতিষ্ঠায় জাপানিদের আগ্রহ আয়োজনে টানাপড়েন সৃষ্টি হয় চট্টগ্রামের অদূরে কোরীয় বিনিয়োগকারীদের জন্য বিশেষ ইপিজেড প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের বিতর্কিত ভূমিকার কারণে। ১৯৯৬-৯৮ সালে চট্টগ্রামে শুধু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে জাপানি সহায়তায়। কর্ণফুলী নদীর তলদেশে টানেল তৈরি হয়েছে ২০ বছর পর চীনের অর্থায়নে। মাতারবাড়ী সোনাদিয়ায় জাপানি বিনিয়োগ এসেছে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যে সংযোগ স্থাপনের পরিকল্পনায়।

২০১৫ সালে জাপানের প্রধানমন্ত্রী বিশাল বিনিয়োগ প্রতিনিধি দল নিয়ে বাংলাদেশ সফরে এসে মোটা অংকের বিনিয়োগ ঘোষণা করে যান। তার ব্যবহার হয়েছে মেট্রোরেল, শাহজালাল বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল নির্মাণের মতো বড় প্রকল্পে বিতর্কিত ব্যয়বাহুল্য দিয়ে। জাপানকে এমন অভ্যাস ও আচরণে আগে পাওয়া যায়নি।

১৯৯৭ সালের ঘটনা হবে। বাংলাদেশ সরকার থেকে দূতাবাসে যে যৎসামান্য অর্থ বরাদ্দ দেয়া হতো তা দিয়ে কোনো রকম সাদামাটাভাবে আমাদের জাতীয় দিবস পালন করতে হতো। দূতাবাস থেকে সেবার মনে করা হলো স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানটা জমকালোভাবে উদযাপন করা হবে। এ সময় আমাদের কনসাল জেনারেল ছিলেন টয়োটার ভাই টয়োডা, তিনি নাগোয়াতে থাকেন। এ সময় আমাদের দুজন কর্মকর্তাকে পাঠিয়ে দেয়া হয় তাকে এ অনুষ্ঠান সম্পর্কে আগ্রহী করে তোলার ক্ষেত্রে। উনি বিনা বাক্যব্যয়ে একটি ভালো পরিসংখ্যানের স্পন্সর দিয়ে দিলেন। আমরা একটি পাঁচতারকা হোটেলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস নিয়ে জমকালো পার্টি দিলাম। সেখানে অনেক জাপানি সংসদ সদস্য থেকে শুরু করে বাংলাদেশের শুভাকাঙ্ক্ষী আরো অনেককে দাওয়াত করা হয়েছিল। তারা অনুষ্ঠানে এসে খেয়েদেয়ে চলে যান সেদিন। কিন্তু পরদিন সংসদে গিয়ে বাংলাদেশকে তুলোধুনো করতে শুরু করেন জাপানি সহায়তা দপ্তরের কর্তাব্যক্তিদের। তারা প্রশ্ন ওঠান আমরা কি ওই দেশকে সাহায্য করি যারা টোকিওতে এসে এত বড় জাঁকজমকপূর্ণ ডিনার দিতে পারে? এর জন্য ঢাকা থেকে আমাদের ব্যাখ্যা দিতে হয়েছিল কেন কীভাবে এ জাতীয় ডিনারের আয়োজন করা হয়েছিল।

বাংলাদেশ ও জাপানের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের একটি বড় অনুষঙ্গ হলো বিগত ৫৫ বছরে ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও বাণিজ্যিক আদান-প্রদানের প্রসারতা। এ কথা গুরুত্বপূর্ণ যে আধুনিক পর্যায়ে দুই দেশের সম্পর্কের গভীরতা এবং গতিপ্রকৃতিতে অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং বাংলাদেশ-জাপান দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের উত্থান-পতন বিশেষ নির্দেশক হিসেবে কাজ করেছে।

১৯৭১ সালে স্বাধীনতা লাভের ঠিক পর পরই জাপান সরকার বাংলাদেশের যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি পুনর্গঠনে এগিয়ে আসে। বাংলাদেশে জাপানি বাণিজ্য ও সে সুবাদে বিনিয়োগে জাপানিরা বরাবরই আগ্রহ দেখিয়ে এসেছে। জাপানই হয়েছে এশিয়ায় বাংলাদেশের রফতানি বাণিজ্যের অন্যতম গন্তব্যস্থল। আবার জাপানি পণ্য বাংলাদেশের আমদানি বাণিজ্যের সিংহভাগ দখল করে আছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ পর্যায়ে ২০২৫-এর ডিসেম্বরে জাপানের সঙ্গে পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্টের আগে জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক কোনো বাণিজ্য চুক্তি না থাকলেও দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য চলে মুক্তবাজার নীতিতে এবং গ্যাট ও অধুনা ডব্লিউটিও নিয়ন্ত্রিত অনুশাসন অনুসারে। বাংলাদেশের পণ্য জাপানের বাজারে প্রবেশে ৩৮টি স্বল্পোন্নত দেশের মতো জিএসপি সুবিধা পেয়ে থাকে। জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশন (জেট্রো) জাপানে বাংলাদেশী পণ্যের বাজার সৃষ্টিতে নানান টেকনিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স দেয়। বাংলাদেশের হিমায়িত চিংড়ি জাপানের বাজারে বেশ জনপ্রিয়তা পেলেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের তুলনায় মূল্য কাঠামো ভিন্ন হওয়ায় জাপানে বাংলাদেশী চিংড়ির সরবরাহ ওঠানামা করেছে। জাপানিরা এখন প্রক্রিয়াজাত চিংড়ির দিকে ঝুঁকছে। বাংলাদেশ থেকে রেডিমেড গার্মেন্টসের চাহিদা থাকলেও সরবরাহ সময় বেশি লাগার কারণে জাপানে তৈরি পোশাকের প্রবেশ আশানুরূপ হতে সময় নিচ্ছে। জাপানের বাজারে বাংলাদেশ অন্যতম চামড়া সরবরাহকারী দেশ। বিশেষ করে বাংলাদেশের ছাগলের (ব্ল্যাক বেঙ্গল গোট) চামড়ার বেশ কদর জাপানের বাজারে। বাংলাদেশের চা ‘দ্য স্টার অব বেঙ্গল’ ব্র্যান্ড নামে জাপানের বাজারে ঠাঁই পেয়েছিল। জাপান-বাংলাদেশ বাণিজ্য প্রসারের ক্ষেত্রে জাপান চেম্বার অব কমার্স, ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বারস অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ (এফবিসিসিআই) এবং সাম্প্রতিক কালে সংগঠিত বাংলাদেশ-জাপান চেম্বার অব কমার্সের ভূমিকা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলাদেশের ইপিজেডগুলোতে জাপানি বিনিয়োগ বাড়ছে। আর সে সুবাদে জাপানে বাংলাদেশের রফতানি বাড়ছে। ১৯৮৪ সালে বাংলাদেশ-জাপান যৌথ অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সহযোগিতা কমিটি আত্মপ্রকাশের পর দুই দেশের সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে গঠনমূলক ও ফলপ্রসূ যোগাযোগের ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়।

জাপানে উৎপাদন ব্যয় বৃব্ধির ফলে এবং শ্রমশক্তির অপ্রতুলতার প্রেক্ষাপটে জাপানিরা আশির দশকে তাদের উৎপাদন ব্যবস্থাপনাকে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে স্থানান্তর করে। এ প্রবণতা ডলারের সঙ্গে ইয়েনের মূল্যমান নির্ধারণসংক্রান্ত ১৯৮৫ সালের প্লাজা চুক্তি স্বাক্ষরের পর আরো বেড়ে যায়। ১৯৮৬ সালে জাপান সরকার বিশ্বায়নের তাগিদে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো থেকে আমদানি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়। ফলে যেসব দেশ থেকে জাপানে রফতানি বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে সেসব দেশে জাপানি বিনিয়োগ উৎসাহিত হয়। এসব বাস্তব অবস্থার প্রেক্ষাপটে জাপানি কোম্পানিগুলো বিদেশে, বিশেষ করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উদীয়মান শিল্প সম্ভাবনাময় দেশগুলোতে তাদের উৎপাদন ব্যবস্থাপনাকে ব্যাপকভাবে স্থানান্তরে উদ্যোগী হয়। ভূরাজনীতির কারণে বাংলাদেশ সে সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়।

এটা ঠিক আশির দশকের শেষ ভাগের আগে বাংলাদেশ জাপানিদের কাছে বিনিয়োগস্থল হিসেবে সম্যক পরিচিত ছিল না। তখন পর্যন্ত বাংলাদেশ তাদের কাছে জনসংখ্যার ভারে ন্যুব্জ, দারিদ্র্য, রোগ-শোক, বন্যা ও ঘূর্ণিঝড় আক্রান্ত দেশ হিসেবেই পরিচিত ছিল। ৯০-এর দশকে বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠার পর থেকে বৈদেশিক বিনিয়োগের আকর্ষণে সরকারি উদ্যোগ বেশ জোরেশোরে গৃহীত হওয়ার ফলে ১৯৯১ সাল থেকে বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগ প্রবাহ বাড়তে থাকে। জাপানি অর্থনীতির মন্দা ভাবের প্রেক্ষাপটেও বর্তমানে সে প্রবাহ অব্যাহত আছে।

২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত জাপানি বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে বেসরকারি খাতে মোট ২ হাজার ৩৪৫ মিলিয়ন ডলারের ১৫২টি বিনিয়োগ প্রকল্প নিবন্ধিত করেছে। বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগের সিংহভাগ এসেছে রাসায়নিক সেক্টরে (৫৭%)। এরপর টেক্সটাইল সেক্টরের (১৬%) অবস্থান। তারপর মেটাল প্রডাক্টস (১৩%), ইলেকট্রনিকস (১১%) এবং অন্যান্য (৩%)। বাংলাদেশের প্রাকৃতিক গ্যাস তুলনামূলকভাবে কম দামে পাওয়ার ফলে রাসায়নিক সার প্রস্ততিতে এর সহজ জোগান সম্ভব হয়েছে। বাংলাদেশের বিকাশমান গার্মেন্টস শিল্পের পশ্চাৎ সংযোগ হিসেবে টেক্সটাইল সেক্টরেও জাপানি বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তার প্রেক্ষাপটে জাপানের নিশিমেন, টয়োবো করপোরেশন এবং বাংলাদেশের এ কে খান গ্রুপ ইন্টারন্যাশনাল মিলস প্রজেক্ট স্থাপনের একটি উদ্যোগ এবং ১৫০ মিলিয়নের মারুবেনী এসারের আরেকটি বড় প্রকল্প (কোল্ড রোল স্টিল মিলস লি.) দীর্ঘদিন ধরে বাস্তবায়নের অপেক্ষায় ছিল।

জাপান আসলে ভারত, মিয়ানমার, শ্রীলংকা, বাংলাদেশ প্রভৃতি দেশের সঙ্গে জড়াতে চাইছে কেন, তাদের কি এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার ইচ্ছা বেড়ে গেছে? আসলে জাপান পরাশক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে চাইছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ, মিয়ানমার এমনকি ভারতের মতো দেশগুলোর সঙ্গে তার সম্পর্ক উন্নয়ন জরুরি। জাপান মনে করে এ দেশগুলোর যে উপযুক্ত সম্পদ রয়েছে তা কাজে লাগিয়ে তারা সমৃদ্ধ হতে পারে। আর তার উপযুক্ত ব্যবহার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে জাপান সহায়ক ভূমিকা পালনে আগ্রহী হয়ে উঠেছে। চীন-জাপান কিংবা কোরিয়া-জাপান দ্বন্দ্বের ডামাডোলে বাংলাদেশের বিভ্রান্ত কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সুযোগ নেই। এক্ষেত্রে প্রতিটি সিদ্ধান্ত গ্রহণের ব্যাপারে বাংলাদেশকে সতর্ক ও সক্রিয় থাকতে হবে। অনেক নিকট প্রতিবেশী দেশের মধ্যে ঐতিহাসিক মনোমালিন্য থাকে, কোরিয়া-জাপান কিংবা চীন-জাপানের বিভেদ অনেকটা তেমনি। অর্থনৈতিক উন্নয়নসহ আঞ্চলিক ক্ষমতাবলয় গঠনে এদের কেউ কাউকে সহ্য করতে পারে না। দীর্ঘদিন থেকে তাদের মধ্যে চলমান প্রতিশোধের রাজনীতি নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। তবে তাদের অভ্যন্তরীণ নীতি এখন ধীরে ধীরে পাল্টাচ্ছে।

এক্ষেত্রে বাংলাদেশের কর্মভূমিকা কি ঠিক রয়েছে? বাংলাদেশের অবস্থান ভূরাজনৈতিকভাবে অনেক গুরুত্বপূর্ণ। বঙ্গোপসাগর বলয়ে চীনের আধিপত্য কমিয়ে আনার চেষ্টায় জাপান। প্রতিটি ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান গ্রহণ সম্পর্কে সতর্ক হওয়াটা জরুরি।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল আদর্শ সবার সঙ্গে মিত্রতা স্থাপন করা। কিন্তু কারো সঙ্গে বৈরিতা নয়। উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে আমাদের সবারই প্রয়োজন রয়েছে। তাই অর্থনৈতিক কূটনীতির ক্ষেত্রে প্রত্যেকের সঙ্গে মিলেমিশে চলতে হবে। আমাদের সব থেকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে অবকাঠামোগত উন্নয়ন খাতে। নিজেদের শক্তিশালী করা ও গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই। ৫৫ বছরে আজ পর্যন্ত ৩৩ দশমিক ৬২ বিলিয়ন ডলারের জাপানি সরকারি সহায়তা আর ২০২২ সাল পর্যন্ত মাত্র ৬৭৬ মিলিয়ন ডলারের বেসরকারি বিনিয়োগ আমরা ব্যবহার করতে সক্ষম হয়েছি। ভৌত অবকাঠামো ও জ্বালানি খাতে কয়েকটি মেগা প্রকল্পে প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলারের জাপানি সহায়তা গ্রহণে দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি পরিবেশে ব্যবহারে বাংলাদেশের প্রস্তুতি বা কর্মভূমিকা অবিলম্বে সুচিন্তিতভাবে গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।

লেখক: সরকারের সাবেক সচিব, এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান এবং জাপানে বাংলাদেশের সাবেক বাণিজ্য দূত]