এক দেশের সঙ্গে আরেক দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক কেবল পণ্য আমদানি-রফতানির হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকে না। ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী, পর্যটক, শিক্ষার্থী ও পেশাজীবীদের চলাচলও তৈরি করে অর্থনৈতিক যোগাযোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পথ। বাংলাদেশ ও সিঙ্গাপুরের ক্ষেত্রে সে যোগাযোগের অন্যতম দৃশ্যমান মাধ্যম হয়ে উঠেছে সিঙ্গাপুর এয়ারলাইনস (এসআইএ)। ঢাকা-সিঙ্গাপুর আকাশপথে চার দশকের যাত্রায় প্রতিষ্ঠানটি এখন সিঙ্গাপুরকে শুধু গন্তব্য হিসেবে নয়, বরং এশিয়া-প্যাসিফিক, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বিস্তৃত বাজারের সঙ্গে বাংলাদেশের একটি সংযোগস্থল হিসেবে উপস্থাপন করছে।

সিঙ্গাপুর এয়ারলাইনসের নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ঢাকা থেকে সিঙ্গাপুরে প্রতিদিন সরাসরি ফ্লাইট পরিচালনা করছে প্রতিষ্ঠানটি। প্রায় ৪ ঘণ্টার এ যাত্রায় বোয়িং ৭৮৭-১০ উড়োজাহাজ ব্যবহার হচ্ছে। সিঙ্গাপুরে পৌঁছে যাত্রীরা চাঙ্গি বিমানবন্দরের মাধ্যমে এসআইএর বিস্তৃত আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।

সিঙ্গাপুর এয়ারলাইনস লিমিটেড বাংলাদেশের মহাব্যবস্থাপক রবিন চেং কিংয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, ১৯৮৬ সালে ঢাকা-সিঙ্গাপুর রুটে ফ্লাইট পরিচালনা শুরুর মধ্য দিয়ে এসআইএ বাংলাদেশকে সিঙ্গাপুর ও বিশ্বের বিভিন্ন গন্তব্যের সঙ্গে যুক্ত করার যাত্রা শুরু করে। চাঙ্গি হাবের মাধ্যমে এশিয়া-প্যাসিফিক, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বিস্তৃত গন্তব্যের সঙ্গে বাংলাদেশের সংযোগ তৈরি হয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, শিক্ষা ও বিনিয়োগে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ আরো শক্তিশালী হয়েছে।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, গত চার দশকে বাংলাদেশের বেসামরিক বিমান চলাচল খাতের বিকাশে সরকারি সংস্থা, বাণিজ্য অংশীদার ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছে সিঙ্গাপুর এয়ারলাইনস। পর্যটন, ব্যবসায়িক ভ্রমণ ও কার্গো পরিবহন সম্প্রসারণেও প্রতিষ্ঠানটি ভূমিকা রেখেছে। বর্তমানে দৈনিক ফ্লাইটের পাশাপাশি উন্নত কেবিনসেবা, ডিজিটাল উদ্ভাবন ও গ্রাহকসেবার মানোন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশে কার্যক্রম সম্প্রসারণ করছে এসআইএ। কর্মীদের নিয়মিত প্রশিক্ষণের মাধ্যমেও সেবার উৎকর্ষ বজায় রাখছে প্রতিষ্ঠানটি।

বাংলাদেশ-সিঙ্গাপুর অর্থনৈতিক সম্পর্কের বিস্তারের সঙ্গে এ আকাশপথের গুরুত্বও বাড়ছে। সিঙ্গাপুরের বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০১২-১৭ সালের মধ্যে দুই দেশের পণ্যবাণিজ্য গড়ে বছরে প্রায় ১২ শতাংশ হারে বেড়ে ৪ দশমিক ৩ বিলিয়ন সিঙ্গাপুর ডলারে পৌঁছেছিল। একই সময়ে বাংলাদেশে অবকাঠামো, আতিথেয়তা, সরবরাহ ও খাদ্যসেবা খাতে সিঙ্গাপুরের বিনিয়োগও উল্লেখযোগ্য ছিল।

দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরো গভীর করার লক্ষ্যে ২০২২ সালে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। পরবর্তী সময়ে সম্ভাব্য বাংলাদেশ-সিঙ্গাপুর মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা এগিয়েছে। সিঙ্গাপুরের বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয় বলছে, প্রস্তাবিত চুক্তির লক্ষ্য দুই দেশের পণ্য ও সেবার বাণিজ্য এবং বিনিয়োগপ্রবাহ বাড়ানো, শুল্ক কমানো, বাণিজ্য প্রক্রিয়া সহজ করা এবং বাজারে প্রবেশাধিকার উন্নত করা।

এ বাস্তবতায় আকাশপথ কেবল যাত্রী পরিবহনের মাধ্যম নয়, বরং বাণিজ্যিক সম্পর্কের অবকাঠামোর অংশ। সিঙ্গাপুরের সরকারি এক গবেষণায়ও সরাসরি ও উন্নততর বিমান যোগাযোগের সঙ্গে শক্তিশালী বাণিজ্যিক এবং বিনিয়োগপ্রবাহের সম্পর্কের কথা উঠে এসেছে।

সিঙ্গাপুর এয়ারলাইনসের বাংলাদেশ কার্যক্রমে তাই যাত্রী পরিবহনের পাশাপাশি ব্যবসা ও বিনিয়োগের সংযোগও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, টেকসই প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যে ২০৫০ সালের মধ্যে কার্যক্রমে নিটশূন্য কার্বন নিঃসরণ অর্জনের লক্ষ্য রয়েছে। আধুনিক ও জ্বালানিসাশ্রয়ী উড়োজাহাজ, টেকসই বিমান জ্বালানি এবং পরিচালন দক্ষতা বাড়ানোর মাধ্যমে এ লক্ষ্য অর্জনে কাজ করছে এসআইএ।

চার দশক পেরিয়ে ঢাকা-সিঙ্গাপুর আকাশপথ এখন দুই দেশের মানুষের চলাচলের পথের পাশাপাশি বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও বৈশ্বিক বাজারে প্রবেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু হয়ে উঠেছে।