পণ্যের বাজার ও বাণিজ্যের বৈচিত্র্যায়নের (ডাইভার্সিফিকেশন) কথা চিন্তা করলে এশিয়া প্যাসিফিক, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও রাশিয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য। অনেকে এশিয়া প্যাসিফিককে অপ্রচলিত গন্তব্য বললেও এটি আসলে আমাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য। ইউরোপ বা আমেরিকার পরেই প্রকৃতপক্ষে এশিয়া প্যাসিফিককে (চীনসহ) বিবেচনা করা উচিত। বিদ্যমান তথ্য-উপাত্ত অনুযায়ী এ অঞ্চলকে বাংলাদেশের বাণিজ্যের ‘থার্ড ফ্রন্টিয়ার’ বা তৃতীয় সম্ভাবনার দ্বার বলা চলে।
জাপানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিশাল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও মনে হয় সময় বা টাইমিং বাংলাদেশের অনুকূলে ছিল না। ২০১৩, ২০১৪ ও ২০১৫ সালের দিকে যখন খুব চেষ্টা করা হচ্ছিল, তখন জাপানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে বিশাল ব্যবসায়ী প্রতিনিধি দল নিয়ে বাংলাদেশে এসেছিলেন এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীও জাপান সফর করেছিলেন। কিন্তু বিষয়গুলো যখন এগোচ্ছিল, ঠিক তখনই ২০১৬ সালে ঢাকায় দুঃখজনক ঘটনাটি (হোলি আর্টিসান ঘটনা) ঘটার পর প্রায় দেড় বছরের মতো সবকিছু বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে ২০১৮-১৯ সালে ঘুরে দাঁড়ানোর পর জাপান থেকে দেশের সবচেয়ে বড় একক বিনিয়োগ হিসেবে ‘জাপান টোব্যাকো’ ব্যবসা কিনে নেয় এবং নতুন আগ্রহ তৈরি হয়। কিন্তু ২০২০ সালের শুরুতে কভিড মহামারী শুরু হয়ে যায়।
ব্যবসায়ে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে টাইমিং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সে সময় পার হয়ে গেলে সুযোগটি আর থাকে না। জাপান একসময় বিশ্বের দুই নম্বর অর্থনীতি থাকলেও তারা ধীরে ধীরে পিছিয়ে যাচ্ছে। জাপানের জনসংখ্যা প্রতি বছর প্রায় এক মিলিয়ন (দশ লাখ) করে কমছে এবং যে জনসংখ্যা আছে সেটাও দ্রুত বয়োবৃদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। ফলে ভবিষ্যতে বিদেশে প্রতিষ্ঠান সম্প্রসারণ করা বা ঢাকা কার্যালয়ে পাঠানোর মতো লোক খুঁজে পাওয়ার ক্ষেত্রেও তাদের সংকট তৈরি হতে পারে, কিংবা তাদের অর্থনীতির সে চাহিদাই থাকবে না। আজ থেকে ১০ বা ২৩ বছর আগে যখন আমি জাপানে প্রথম পড়তে যাই, তখন জাপান নিয়ে যে স্বপ্ন দেখতাম, বর্তমান বাস্তবতায় জাপান থেকে ভবিষ্যতে খুব বড় কিছু আশা করার সুযোগ আর দেখা যায় না।
মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশের অবশ্যই বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে বাণিজ্যের মূল শক্তি হলো আমাদের জনশক্তি। সেখানে সৌদি আরব, আরব আমিরাত বা ওমানে প্রায় ৪০-৫০ লাখ বাংলাদেশী কাজ করছেন। বাংলাদেশ থেকে যেসব কৃষি বা অন্যান্য পণ্য রফতানি করা হয়, তা মূলত এ প্রবাসীরাই ভোগ করে থাকেন। সামনে ২০৩০ সালে রিয়াদে এক্সপো এবং ২০৩৪ সালে সৌদি আরবে ফুটবল বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে তারা আট-নয়টি নতুন স্টেডিয়ামসহ বিশাল অবকাঠামোগত নির্মাণকাজ শুরু করছে। কাতারে বিশ্বকাপের কারণে অর্থনৈতিক অগ্রগতি হলেও সৌদি আরবে তার চেয়ে বহু গুণে বেশি প্রবৃদ্ধি হবে। সেখানে বিশাল প্রবাসী জনগোষ্ঠী থাকায় বাংলাদেশ এ বড় সুযোগটি গ্রহণ করতে পারে, তার জন্য ওই অঞ্চলে শান্তি বজায় থাকা এবং যুদ্ধ বিগ্রহ না থাকা একটি বড় শর্ত। যুদ্ধ লাগলে এ সম্ভাবনা অর্জন করা দুরূহ হয়ে পড়ে।
অন্যদিকে আফ্রিকা হলো অপার সম্ভাবনা ও সম্পদে ভরা একটি মহাদেশ, যার সম্ভাবনাকে এখনো পুরো বিশ্ব সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারেনি। চীনসহ অন্যান্য দেশ আফ্রিকার সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে এবং বাংলাদেশও ধীরে ধীরে আফ্রিকায় প্রবেশ করা শুরু করেছে। আমাদের ওষুধ বা ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানিগুলো আফ্রিকায় যাচ্ছে, কারখানা স্থাপন করছে এবং ইপিবি থেকেও ফার্মা মেলাগুলোয় অংশগ্রহণ করানো হচ্ছে। পাশাপাশি বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের কোম্পানিগুলোও কিছু আফ্রিকান দেশে সেবা দিচ্ছে।
বিদেশে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক মিশনগুলোর কাজ পর্যালোচনার জন্য আমার সভাপতিত্বে একটি কার্যনির্বাহী কমিটি রয়েছে, যেখানে সরকারি ও বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিরা নিয়মিত পর্যালোচনা বৈঠক করেন। গত মাসের বৈঠকে আলোচনা হয় যে আফ্রিকায় বাংলাদেশের নয়টি দূতাবাস থাকলেও কোনো কমার্শিয়াল উইং নেই। তাই আফ্রিকায় অন্তত একটি কমার্শিয়াল উইং খোলার প্রস্তাব করা হয়েছে, যা আফ্রিকার অপার সম্ভাবনা কাজে লাগানোর একটি ভালো শুরু হতে পারে।
রাশিয়ার সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্কটি বর্তমানে বেশ জটিল এবং তা পুরোপুরি রাজনীতি দ্বারা নির্ধারিত হচ্ছে। বিশ্ব রাজনীতির বড় নিয়ন্ত্রকদের বাইরে গিয়ে বাংলাদেশের মতো ছোট অর্থনীতির ব্যবসায়ীদের পক্ষে রাশিয়ার সঙ্গে ব্যবসা বাণিজ্য করা বেশ কঠিন। বাংলাদেশের এক নম্বর রফতানি গন্তব্য হলো আমেরিকা এবং ভূরাজনীতিতে তাদের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। রাশিয়ার ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও অর্থ পরিশোধের (পেমেন্ট) জটিলতার কারণে ব্যবসায়ীরা নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। এ রাজনৈতিক সংকট নিরসন না হওয়া পর্যন্ত রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাওয়া কঠিন।
পরিশেষে, আমেরিকা ও ইউরোপের মতো প্রধান গন্তব্যের বাইরে চীনসহ এশিয়া প্যাসিফিক, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকা হলো বাংলাদেশের বাণিজ্যের ‘থার্ড ফ্রন্টিয়ার’ বা তৃতীয় সম্ভাবনার দ্বার। এদের কোনোভাবেই কম গুরুত্ব দেয়া যাবে না, বরং বাণিজ্য প্রসারে প্রতিনিয়ত সংযোগ বজায় রেখে কাজ করে যেতে হবে।










