বাংলাদেশ-ফিলিপাইন দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বর্তমান চিত্রকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন? বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতায় এখন সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা কোথায়?
বাংলাদেশ ও ফিলিপাইনের সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবে বন্ধুত্বপূর্ণ এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে। কিন্তু আমি মনে করি, আমাদের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কের তুলনায় অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক এখনো তার পূর্ণ সম্ভাবনায় পৌঁছতে পারেনি। আমাদের সামনে এখন সবচেয়ে বড় সুযোগ হলো দুই দেশের সম্পর্ককে শুধু ঐতিহ্যবাহী বাণিজ্যিক সম্পর্ক হিসেবে না দেখে একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব হিসেবে গড়ে তোলা। বাংলাদেশের রয়েছে বিশাল ভোক্তা বাজার, শক্তিশালী উৎপাদন সক্ষমতা, তরুণ জনগোষ্ঠী এবং দ্রুত সম্প্রসারিত শিল্পভিত্তি। অন্যদিকে ফিলিপাইন আসিয়ান অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনীতি, যার রয়েছে বড় ভোক্তা বাজার, আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক নেটওয়ার্ক এবং সেবা খাতে উল্লেখযোগ্য অভিজ্ঞতা। ফলে দুই দেশের অর্থনীতি অনেক ক্ষেত্রেই পরস্পরের পরিপূরক।
আমরা সম্প্রতি বাংলাদেশ–ফিলিপাইন বিজনেস ডেলিগেশন ২০২৬-এর মাধ্যমে সরাসরি দেখেছি, দুই দেশের ব্যবসায়ী ও প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সহযোগিতার যথেষ্ট আগ্রহ রয়েছে। বিশেষ করে কৃষি ও কৃষি-প্রক্রিয়াজাতকরণ, মৎস্য ও জলজ চাষ, পর্যটন, আতিথেয়তা, দক্ষতা উন্নয়ন, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, ডিজিটাল অর্থনীতি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং বিনিয়োগ—এসব খাতে বাস্তব ও দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতার সুযোগ রয়েছে।
আমার দৃষ্টিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে স্কিলস পার্টনারশিপ বা দক্ষতার অংশীদারত্ব। ফিলিপাইন দক্ষ জনশক্তি তৈরি ও আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে তাদের সম্পৃক্ত করার ক্ষেত্রে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। বাংলাদেশেও বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী রয়েছে। তাই আমরা যদি প্রশিক্ষণ, সনদপত্র, দক্ষতার গতিশীলতা এবং শিল্পভিত্তিক দক্ষতা উন্নয়নের ক্ষেত্রে সহযোগিতা করতে পারি, তাহলে এটি দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের একটি নতুন মাত্রা তৈরি করবে।
আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত—‘শ্রম রফতানি থেকে দক্ষতা অংশীদারত্ব।’ অর্থাৎ শুধু জনশক্তি পাঠানো নয়; বরং দক্ষতা, প্রশিক্ষণ, সনদপ্রাপ্তি ও জ্ঞান আদান-প্রদানের মাধ্যমে একটি দীর্ঘমেয়াদি মানবসম্পদ বিষয়ক অংশীদারত্বগড়ে তোলা।
ফিলিপাইনের বাজারে বাংলাদেশের রফতানি বাড়ানোর সুযোগ কতটা রয়েছে? কোন পণ্য ও খাতে সম্ভাবনা বেশি, আর বাজার সম্প্রসারণে প্রধান বাধাগুলো কী?
আমি অত্যন্ত আশাবাদী যে, ফিলিপাইনের বাজারে বাংলাদেশের রফতানি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। তবে এর জন্য আমাদের প্রচলিত পদ্ধতিতে শুধু পণ্য রফতানি করলেই হবে না, ফিলিপাইনের বাজারের চাহিদা বুঝে লক্ষ্যভিত্তিক রফতানি কৌশল গ্রহণ করতে হবে।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, নিটওয়্যার, গৃহবস্ত্র, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, জুতা, পাট ও পাটজাত পণ্য, ঔষধশিল্প, কৃষি ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, সিরামিক, প্লাস্টিক পণ্য, হালকা প্রকৌশল ও ভোগ্যপণ্যর মতো খাতে সম্ভাবনা রয়েছে।
পাশাপাশি আইসিটি এবং ডিজিটাল সেবার ক্ষেত্রেও নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে শুধু পণ্য ভালো হলেই বাজার দখল করা সম্ভব নয়। আমাদের রফতানিকারকদের গুণমান, প্রতিযোগিতামূলক মূল্য, পণ্যের মানদণ্ড, সনদপত্র, প্যাকেজিং, ব্র্যান্ডিং ও বিক্রয়-পরবর্তী সেবার ওপর আরো বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বাজারসংক্রান্ত তথ্য-উপাত্ত। আমাদের অনেক উদ্যোক্তা ফিলিপাইনের বাজারের প্রকৃত চাহিদা, বিতরণ চ্যানেল, আমদানি পদ্ধতি ও ব্যবসায়িক সংস্কৃতি সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য পান না। ফলে ভালো পণ্য থাকা সত্ত্বেও বাজারে প্রবেশ কঠিন হয়।
আমার মতে, বড় বাধাগুলোর মধ্যে রয়েছে—
প্রথমত, ব্যবসায়ী পর্যায়ে সরাসরি যোগাযোগের ঘাটতি।
দ্বিতীয়ত, বাজারসংক্রান্ত তথ্যের সীমাবদ্ধতা।
তৃতীয়ত, লজিস্টিকস ও শিপিং খরচ।
চতুর্থত, মানদণ্ড ও সনদপ্রাপ্তির আবশ্যিক শর্তাবলি সম্পর্কে পর্যাপ্ত প্রস্তুতির অভাব এবং
পঞ্চমত, ফিলিপিনো বাজারে বাংলাদেশের ব্র্যান্ডের দৃশ্যমানতা তুলনামূলক কম।
তাই আমাদের কৌশলটি হতে হবে—‘বাজারে প্রবেশ করুন, বাজারকে বুঝুন এবং বাজার গড়ে তুলুন।’
শুধু একবার পণ্য পাঠিয়ে বাজার তৈরি হয় না। সেখানে স্থানীয় আমদানিকারক, পরিবেশক, ব্যবসায়িক অংশীদার এবং খুচরা নেটওয়ার্ক তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি ই-কমার্স ও ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের সুযোগও কাজে লাগাতে হবে। এখানে বিপিসিসিআই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। আমরা দুই দেশের ব্যবসায়ীদের মধ্যে বি২বি ম্যাচমেকিং, ট্রেড মিশন, বিজনেস ফোরাম, বাজার তথ্য বিনিময় এবং প্রাতিষ্ঠানিক নেটওয়ার্কিং আরো জোরদার করতে চাই।
আমি মনে করি, বাংলাদেশী উদ্যোক্তাদের জন্য ফিলিপাইনকে শুধু একটি রফতানির গন্তব্য হিসেবে দেখলে হবে না। এটিকে একটি কৌশলগত আসিয়ান বাজারহিসেবে দেখতে হবে।
বাণিজ্যের পাশাপাশি ফিলিপাইনের বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক অংশীদারত্ব বাংলাদেশে কীভাবে বাড়ানো যায়? আগামী পাঁচ-দশ বছরে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে কোন পর্যায়ে দেখতে চান?
বাংলাদেশে ফিলিপাইনের বিনিয়োগ বাড়াতে হলে প্রথমেই আমাদের ব্যবসাথেকেব্যবসা সংযোগবাড়াতে হবে। শুধু সরকারি পর্যায়ে আলোচনা করলেই হবে না, দুই দেশের কোম্পানি, উদ্যোক্তা, বিনিয়োগকারী, চেম্বার ও ব্যবসায়িক সমিতির মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ তৈরি করতে হবে।
বাংলাদেশে ফিলিপাইনের বিনিয়োগের জন্য আমি বিশেষভাবে সম্ভাবনাময় মনে করি কৃষিপ্রক্রিয়াজাতকরণ, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, পর্যটন ও আতিথেয়তা, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ, আইসিটি ও ডিজিটাল পরিষেবা, স্বাস্থ্যসেবা, নবায়নযোগ্য শক্তি, লজিস্টিকস, উৎপাদন ও ভোক্তা পণ্য খাতগুলোকে।
তবে আমরা শুধু‘বিনিয়োগ’ চাইলে হবে না। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত যৌথ উদ্যোগ এবং কৌশলগত অংশীদারত্ব ।
একটি ফিলিপিনো কোম্পানি যদি বাংলাদেশের কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে উৎপাদন করে, তাহলে শুধু বিনিয়োগ আসবে না—সঙ্গে আসবে প্রযুক্তি, ব্যবস্থাপনাগত দক্ষতা, আন্তর্জাতিক বিপণন নেটওয়ার্ক ও নতুন কর্মসংস্থান।
একইভাবে বাংলাদেশী কোম্পানিগুলোও ফিলিপিনো অংশীদারদের মাধ্যমে আসিয়ান বাজারে প্রবেশের সুযোগ পেতে পারে।
আমি মনে করি, আগামী পাঁচ থেকে দশ বছরে আমাদের সম্পর্ককে তিনটি পর্যায়ে এগিয়ে নিতে হবে।
প্রথম পর্যায়: বাণিজ্য সম্প্রসারণ—দুই দেশের মধ্যে পণ্য ও সেবার বাণিজ্য উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে হবে।
দ্বিতীয় পর্যায়: বিনিয়োগ ও যৌথ উদ্যোগ দুই দেশের কোম্পানির মধ্যে যৌথ উদ্যোগ, প্রযুক্তি অংশীদারত্ব এবং সহ-উৎপাদন বাড়াতে হবে।
তৃতীয় পর্যায়: কৌশলগত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব—শেষ পর্যায়ে আমরা চাই বাংলাদেশ ও ফিলিপাইন একে অন্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক ব্যবসায়িক অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হোক।
আমি এমন একটি সম্পর্ক দেখতে চাই, যেখানে শুধু ‘বাংলাদেশে তৈরি’ পণ্য ফিলিপাইনে যাবে না, বরং‘বাংলাদেশ-ফিলিপাইন অংশীদারত্বে নির্মিত’-এর ধারণাও তৈরি হবে।
অর্থাৎ দুই দেশের কোম্পানি একসঙ্গে উৎপাদন করবে, প্রযুক্তি বিনিময় করবে, দক্ষতা উন্নয়ন করবে এবং তৃতীয় দেশের বাজারেও যৌথভাবে প্রবেশ করবে। এখন সময় ট্রেড মিশন থেকে বিজনেস মিশনে"যাওয়ার। আমার মতে, আগামী দিনে আমাদের পদ্ধতিতে একটি মৌলিক পরিবর্তন প্রয়োজন। শুধু সরকারি প্রতিনিধি বা ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদল পাঠিয়ে মিটিং করলেই হবে না, আমাদের প্রতিনিধিদল হতে হবে ফলাফলভিত্তিক। প্রতিটি ব্যবসায়িক লক্ষ্যের আগে নির্দিষ্ট খাত, লক্ষ্যভুক্ত কোম্পানিএবং সম্ভাব্যতা বা বিনিয়োগকারী চিহ্নিত করতে হবে। লক্ষ্যশেষে কতগুলো বিটুবি বৈঠকহলো সেটিই মূল সাফল্য নয়; বরং কতগুলো ব্যবসায়িক চুক্তি, সমঝোতা স্মারক, বিনিয়োগ প্রস্তাব এবং ফলো-আপ প্রকল্প তৈরি হলো—সেটিই হবে সাফল্যের প্রকৃত মাপকাঠি।
এক্ষেত্রে বিপিসিসিআই দুই দেশের বেসরকারি খাতের মধ্যে একটি কার্যকর ব্যবসায়িক সংযোগ হিসেবে কাজ করতে আগ্রহী।
দুই দেশের তরুণ উদ্যোক্তাদের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভবিষ্যতের অর্থনীতি হবে উদ্ভাবনচালিত এবং প্রযুক্তিভিত্তিক। তাই স্টার্টআপ, ডিজিটাল অর্থনীতি, ই-কমার্স, ফিনটেক ও প্রযুক্তিনির্ভর পরিষেবার ক্ষেত্রেও আমাদের নতুন সহযোগিতার পথ খুঁজতে হবে।
একই সঙ্গে দুই দেশের চেম্বার অব কমার্সের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক আরো শক্তিশালী করতে হবে। নিয়মিত ব্যবসায়িক ফোরাম, বিনিয়োগ সংলাপ, বিটুবি বৈঠক, বাণিজ্য মিশন এবং খাতভিত্তিক প্রদর্শনী আয়োজন করা যেতে পারে।
বাংলাদেশ ও ফিলিপাইনের মধ্যে সম্পর্কের সম্ভাবনা অনেক বড়। আমাদের এখন প্রয়োজন সে সম্ভাবনাকে বাস্তব বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, দক্ষতা ও কর্মসংস্থানে রূপান্তর করা। আমি বিশ্বাস করি, দুই দেশের সরকার যদি একটি সহায়ক নীতি-পরিবেশ সৃষ্টি তৈরি করে এবং বেসরকারি খাত যদি আরো সক্রিয়ভাবে এগিয়ে আসে, তাহলে বাংলাদেশ–ফিলিপাইন অর্থনৈতিক সম্পর্ক একটি নতুন উচ্চতায় পৌঁছতে পারে। বিপিসিসিআইয়ের লক্ষ্য খুব পরিষ্কার—দুই দেশের ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের মধ্যে একটি স্থায়ী, কার্যকর ও ফলপ্রসূ সেতুবন্ধন তৈরি করা।
আমরা চাই, আগামী দশকে বাংলাদেশ ও ফিলিপাইন শুধু বন্ধুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র হিসেবে নয়, বরং একটি শক্তিশালী কৌশলগত অর্থনৈতিক অংশীদারত্বের অংশীদার হিসেবে বিশ্বমঞ্চে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করুক।
এখন সময়, সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলার নয়—সম্ভাবনাকে বাস্তব ব্যবসায়িক সাফল্যে রূপ দেয়ার।










