বাংলাদেশের বাজারে ইউনিক্লোর খুচরা উপস্থিতি এখন আর নেই। ২০২৩ সালের জুনে গ্রামীণ ইউনিক্লোর সবক’টি দোকান বন্ধ করে ব্যবসা গুটিয়ে নেয় জাপানের ফাস্ট রিটেইলিং। তবে খুচরা বিক্রির সে অধ্যায় শেষ হলেও বাংলাদেশের সঙ্গে কোম্পানিটির ব্যবসায়িক সম্পর্ক শেষ হয়নি। বরং বৈশ্বিক পোশাক সরবরাহ ব্যবস্থায় বাংলাদেশ এখনো ফাস্ট রিটেইলিংয়ের গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদন ভিত্তিগুলোর একটি।
ইউনিক্লোর মূল প্রতিষ্ঠান ফাস্ট রিটেইলিংয়ের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে তাদের উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালনায় ঢাকায় রয়েছে একটি উৎপাদন কার্যালয়। সাংহাই, হো চি মিন সিটি, জাকার্তা ও বেঙ্গালুরুর পাশাপাশি ঢাকার কার্যালয়ের কর্মকর্তারা অংশীদার কারখানাগুলোর উৎপাদন অগ্রগতি ও পণ্যের মান তদারক করেন। কোম্পানিটি বলছে, উৎপাদন কার্যালয়ের প্রতিনিধিরা নিয়মিত কারখানা পরিদর্শন করে উৎপাদন ব্যবস্থাপনা ও মান নিয়ন্ত্রণে কাজ করেন।
বাংলাদেশে ফাস্ট রিটেইলিংয়ের উপস্থিতি অবশ্য নতুন নয়। জাপানের বাণিজ্য উন্নয়ন সংস্থা জেট্রোর তথ্য অনুযায়ী, ইউনিক্লো ২০০৮ সালে ঢাকায় একটি প্রতিনিধি কার্যালয় স্থাপন করে। তখনই বাংলাদেশ থেকে পোশাক সংগ্রহ বাড়ানোর লক্ষ্যে কার্যক্রম শুরু করেছিল প্রতিষ্ঠানটি। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের সক্ষমতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ইউনিক্লোর বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় দেশের ভূমিকা আরো বিস্তৃত হয়।
২০১৯ সালে জেট্রোর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ফাস্ট রিটেইলিংয়ের প্রকাশিত প্রধান পোশাক কারখানার তালিকায় বাংলাদেশে ছিল ২৪টি কারখানা। তখন চীন ও ভিয়েতনামের পর বাংলাদেশ ছিল তাদের তৃতীয় বৃহত্তম উৎপাদন ভিত্তি। একই প্রতিবেদনে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে জাপানি ক্রয়াদেশ বাড়ার বিষয়টিও উঠে আসে।
বর্তমানেও বাংলাদেশ ফাস্ট রিটেইলিংয়ের সরবরাহ ব্যবস্থায় রয়েছে। কোম্পানির ২০২৬ সালের ব্যবসায়িক তথ্য অনুযায়ী, ইউনিক্লোর উৎপাদন বিভাগের কর্মকর্তারা ঢাকাসহ নির্দিষ্ট উৎপাদন কার্যালয়গুলো থেকে অংশীদার কারখানার উৎপাদন, মান ও অগ্রগতি ব্যবস্থাপনা করেন। ইউনিক্লোর ব্যবসায়িক মডেলও মূলত নকশা, উপকরণ সংগ্রহ, উৎপাদন ও খুচরা বিক্রিকে একটি সমন্বিত ব্যবস্থার মধ্যে পরিচালনার ওপর নির্ভরশীল।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের সামগ্রিক সক্ষমতাও এ সম্পর্কের পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট রফতানি আয়ের ৮৮ শতাংশের বেশি এসেছে তৈরি পোশাক থেকে, এমন সময়ও দেখা গেছে, যখন নিটওয়্যার ও ওভেন পোশাক রফতানি উভয়ই শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি দেখিয়েছে। অর্থাৎ বৈশ্বিক পোশাক ব্র্যান্ডগুলোর জন্য বাংলাদেশের উৎপাদন সক্ষমতা এখনো দেশের বহির্বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান ভিত্তি।
এ সরবরাহ ব্যবস্থার সম্পর্ক শুধু ক্রয়াদেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ফাস্ট রিটেইলিং উৎপাদন অংশীদারদের জন্য মান, কর্মপরিবেশ ও দায়িত্বশীল ব্যবসা পরিচালনার নির্দিষ্ট কাঠামো অনুসরণ করে। জেট্রোর এক গবেষণায়ও বলা হয়েছে, কোম্পানিটি উৎপাদন অংশীদারদের জন্য আচরণবিধি প্রণয়ন করেছে এবং কারখানাগুলোর কর্মপরিবেশ পর্যবেক্ষণে নিয়মিত ব্যবস্থা অনুসরণ করে।
এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালে বাংলাদেশের উর্মি গ্রুপের ইউএইচএম লিমিটেড ফাস্ট রিটেইলিংয়ের জিইউ ব্র্যান্ডের ‘এক্সেলেন্ট ফ্যাক্টরি অ্যাওয়ার্ড ২০২৬’ পেয়েছে বলে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। টোকিওতে আয়োজিত ফাস্ট রিটেইলিং ফ্যাক্টরি সম্মেলনে দেয়া এ স্বীকৃতিকে বাংলাদেশের একটি কারখানার বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় সক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ফলে বাংলাদেশের সঙ্গে ইউনিক্লোর সম্পর্ককে শুধু একটি বিদেশী পোশাক ব্র্যান্ডের স্থানীয় বাজারে উপস্থিতি দিয়ে দেখলে চিত্রটি অসম্পূর্ণ থেকে যায়। ঢাকার দোকানের সাইনবোর্ড সরেছে, কিন্তু বৈশ্বিক পোশাক সরবরাহ ব্যবস্থার মানচিত্রে বাংলাদেশ থেকে গেছে। বরং খুচরা বাজারের বাইরে উৎপাদন, মান নিয়ন্ত্রণ ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় এ সম্পর্কের গভীরতাই বাংলাদেশ-জাপান বাণিজ্য সম্পর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে।










