অস্ট্রেলিয়া ও বাংলাদেশের বাণিজ্য সম্পর্কের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য পণ্যের পরিপূরকতা। অস্ট্রেলিয়া বাংলাদেশে পাঠায় ডাল, ছোলা, তুলা, কৃষিপণ্য ও শিল্পের কাঁচামাল। বিপরীতে অস্ট্রেলিয়ার বাজারে বাংলাদেশের প্রধান রফতানি পণ্য তৈরি পোশাক। অস্ট্রেলিয়ার সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশে দেশটির রফতানি ৩৮০ কোটি অস্ট্রেলীয় ডলারে পৌঁছেছে। ওই বছর বাংলাদেশ অস্ট্রেলিয়ার ২২তম বৃহত্তম রফতানি বাজারে পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশের দিক থেকেও অস্ট্রেলিয়ার বাজারে রফতানি বাড়ছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যের ভিত্তিতে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়ে অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশের পণ্য রফতানি হয়েছে ৫৭ কোটি ৮০ লাখ মার্কিন ডলার। এর আগে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রফতানি ছিল প্রায় ৯০ কোটি ৭২ লাখ ডলার। অর্থাৎ অস্ট্রেলিয়া বাংলাদেশের তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন পণ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বাজার হয়ে উঠেছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশের আমদানি চিত্রে অস্ট্রেলিয়ার গুরুত্ব আরো স্পষ্ট। অস্ট্রেলিয়ার সরকারি বাণিজ্য তথ্যে দেখা যায়, দেশটির বাংলাদেশমুখী রফতানির বড় অংশজুড়ে রয়েছে কৃষিপণ্য, তুলা, লোহা ও ইস্পাতের বর্জ্য এবং তেলবীজ। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের কাঁচামাল সরবরাহেও অস্ট্রেলিয়ার ভূমিকা রয়েছে। অস্ট্রেলিয়া নিজেও তাদের প্রাকৃতিক তন্তু রফতানি এবং বাংলাদেশের তৈরি পোশাক আমদানিকে দুই অর্থনীতির পারস্পরিক পরিপূরকতার উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
ডাল ও ছোলার বাণিজ্য এ সম্পর্কের একটি দৃশ্যমান দৃষ্টান্ত। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অস্ট্রেলিয়ার সরকারি বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সংস্থা অস্ট্রেড জানায়, কুইন্সল্যান্ড থেকে চট্টগ্রামে ৩৩ হাজার টন দেশী ছোলা পাঠানো হয়েছে। বাংলাদেশে খাদ্যপণ্যের চাহিদা এবং অস্ট্রেলিয়ার কৃষিপণ্যের সরবরাহ সক্ষমতা এ বাণিজ্যকে ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ করে তুলছে।
ডালের বাজারে অস্ট্রেলিয়ার এগ্রি ডাইরেক্ট অস্ট্রেলিয়া অন্যতম উল্লেখযোগ্য রফতানিকারক। অস্ট্রেলিয়ার সরকারি রফতানি অর্থায়ন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি গম, ছোলা, মসুর ডাল, ক্যানোলা ও ওটস রফতানি করে এবং বাংলাদেশে ছোলা ও মসুর ডাল সরবরাহের জন্য ৬ লাখ ৬০ হাজার অস্ট্রেলীয় ডলারের একটি চুক্তিও করেছে।
বাংলাদেশের আমদানিকারকদের মধ্যেও রয়েছে বেশ কয়েকটি বড় ও পরিচিত প্রতিষ্ঠান। বাণিজ্যিক চালানভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, অস্ট্রেলিয়া থেকে ডাল বা ছোলা আমদানি করেছে হাসান অটোমেটিক ডাল মিল, নাবিল নাবা ফুডস, বঙ্গ মিলার্স, এসিআই পিওর ফ্লাওয়ার, সারদা ট্রেডার্স, এরাইজিং ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল ও পাপড়ি অটোমেটিক ফুড। এর মধ্যে এগ্রি ডাইরেক্ট অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে মেসার্স মেঘনা ডাল মিলের সরাসরি বাণিজ্যিক চালানের তথ্যও রয়েছে। ২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বরের একটি চালানে প্রতিষ্ঠানটি অস্ট্রেলিয়া থেকে ২ লাখ ৫০ হাজার কেজি ছোলা আমদানি করেছে।
অস্ট্রেলিয়া বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি এম. মকসুদ বলেন, ‘অস্ট্রেলিয়া থেকে বাংলাদেশে কৃষিপণ্য ও খনিজ পণ্য আমদানি হচ্ছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাক, চামড়াজাত পণ্য ও পাটজাত পণ্যের রফতানি আরো বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার তুলা ও উল বাংলাদেশে এনে প্রক্রিয়াজাত করে আবার রফতানি করা যেতে পারে।’
তবে বাণিজ্য বাড়ানোর পথে পরিবহন ব্যয় বড় বাধা বলে মনে করেন তিনি। তার ভাষায়, ‘দুই দেশের মধ্যে সরাসরি নৌ যোগাযোগ না থাকায় পণ্য পরিবহনে অতিরিক্ত সময় ও ব্যয় হচ্ছে।’ তার মতে, অস্ট্রেলিয়ার বাজারে বাংলাদেশী ব্যবসায়ীদের উপস্থিতি বাড়ানো এবং সরাসরি বাজার অনুসন্ধানও জরুরি।
দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক শুধু পণ্য বাণিজ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অস্ট্রেলিয়ার সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশটিতে ২৪ হাজারের বেশি বাংলাদেশী শিক্ষার্থী পড়াশোনা করেছে। শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, কৃষি, জ্বালানি ও অবকাঠামোতেও সহযোগিতার ক্ষেত্র বিস্তৃত হচ্ছে। ২০২৫-৩০ মেয়াদের অস্ট্রেলিয়া-বাংলাদেশ উন্নয়ন অংশীদারত্ব পরিকল্পনাতেও অর্থনৈতিক সম্পর্ক ও প্রবৃদ্ধিকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।
ভবিষ্যতের সম্ভাবনা নিয়ে মকসুদ বলেন, ‘নবায়নযোগ্য জ্বালানি, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, কৃষি, পুনর্ব্যবহার ও চক্রাকার অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা রয়েছে।’ তার মতে, বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে শুধু পণ্য রফতানি নয়, বাংলাদেশে অস্ট্রেলীয় বিনিয়োগও বাড়ানো প্রয়োজন।
ফলে অস্ট্রেলিয়া-বাংলাদেশ বাণিজ্যে একদিকে ডাল, ছোলা, তুলা ও কৃষিপণ্য পাঠাচ্ছে অস্ট্রেলিয়া, অন্যদিকে তৈরি পোশাক, চামড়া ও পাটজাত পণ্য পাঠাচ্ছে বাংলাদেশ। সরাসরি পরিবহন, বাজার সম্প্রসারণ ও বিনিয়োগের বাধা কমানো গেলে এ পরিপূরক বাণিজ্যিক সম্পর্ক আগামী দিনে আরো বহুমুখী হওয়ার সুযোগ রয়েছে।










