জাপানের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) স্বাক্ষর বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ও ইতিবাচক একটি পদক্ষেপ। জাপানের সঙ্গে আমাদের প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্যিক সম্পর্ক। এ চুক্তির জন্য জাপান-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি থেকে আমরা প্রায় চার বছর আগে থেকেই কাজ করছিলাম। এটি স্বাক্ষরিত হওয়ায় আমরা অত্যন্ত আনন্দিত।

চুক্তিটি স্বাক্ষরের পর এখন দুই দেশের সরকারকেই নিজ নিজ পার্লামেন্টে এটি অনুসমর্থন করতে হবে। আশা করছি, এ বছরের শেষ নাগাদ প্রক্রিয়াটি বেশ ভালোভাবে এগিয়ে যাবে। অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে যে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের ক্ষেত্রে যদি আমরা আরো তিন বছরের সময় বর্ধিতকরণ পাই, তবে এ মুহূর্তে ইপিএ করে কী লাভবান হলো? আসলে জাপানের অন্যান্য দেশের সঙ্গে করা ইপিএগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, চুক্তি স্বাক্ষরের এক-দুই বছরের মধ্যেই সেসব দেশে জাপানি বিনিয়োগ এবং পারস্পরিক বাণিজ্য উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।

এর মূল কারণ হলো ইপিএ স্বাক্ষরের মাধ্যমে একটি সুনির্দিষ্ট আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি হয়। ফলে জাপানি বিনিয়োগকারীরা আশ্বস্ত হন যে এ দেশের সঙ্গে যেহেতু ইপিএ রয়েছে, তাই তাদের বিনিয়োগ সম্পূর্ণ নিরাপদ। সেটি মেধাস্বত্ব রক্ষাসংক্রান্ত বিষয় হোক কিংবা বিনিয়োগজনিত কোনো সমস্যার সমাধান, সব ক্ষেত্রেই একটি আইনি নিশ্চয়তা তৈরি হয়। তাই ইপিএর প্রভাব সব সময়ই ইতিবাচক হয়।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে জাপানে আমাদের প্রধান রফতানি পণ্য হলো তৈরি পোশাক। এলডিসি থেকে উত্তরণের পর আমরা সেখানে জিএসপি সুবিধা পাব কিনা তা নিয়ে একটি শঙ্কা থাকে। কিন্তু ইপিএ কার্যকর থাকলে যতদিন এ চুক্তি বহাল থাকবে, ততদিন আমাদের শুল্কমুক্ত সুবিধা নিয়ে আর কোনো উদ্বেগ থাকবে না।

এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, এ চুক্তিতে জাপানের সুবিধা কী? আমরা জাপান থেকে প্রচুর গাড়ি এবং বিভিন্ন ধরনের ভারী যন্ত্রপাতি ও মেশিনারি আমদানি করি। ইপিএর আওতায় এ পণ্যগুলোর আমদানি শুল্ক আগামী ১৫ থেকে ১৭ বছরের মধ্যে ধীরে ধীরে হ্রাস পাবে। অর্থাৎ চুক্তি আজ সই হলো আর আগামী বছর থেকেই সব শুল্ক উঠে যাবে, বিষয়টি তেমন নয়। এর জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি রোডম্যাপ রয়েছে, যা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত সহায়ক।

ইপিএতে অনেক সুবিধার কথা লেখা আছে। কিন্তু সেগুলো ব্যবসায়ীদের কাজে লাগাতে হলে কিছু পরিবর্তন আনতে হবে। কোম্পানির ভেতরে কিছু কাঠামোগত পরিবর্তন দরকার। একই সঙ্গে সরকারের নীতিগুলোও ইপিএর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কিনা সেটা দেখার জন্য টাস্কফোর্স গঠন করা প্রয়োজন।

আমরা মনে করি, যেসব বিনিয়োগকারী এরই মধ্যে বাংলাদেশে ব্যবসা করছেন, তারা যদি এখানে সন্তুষ্ট না থাকেন, তবে আমরা যতই রোডশো বা প্রচারণামূলক কার্যক্রম করি না কেন, তা আশানুরূপ ফল দেবে না। কারণ নতুন বিনিয়োগকারীরা এ দেশে আসার আগে এখানকার বিদ্যমান বিনিয়োগকারীদের সঙ্গেই প্রথমে যোগাযোগ করেন। বর্তমান বিনিয়োগকারীরা যদি ইতিবাচক অভিজ্ঞতা পান, তবে তারা নিজেরাই আমাদের দূত হিসেবে কাজ করবেন এবং নতুন বিনিয়োগ নিয়ে আসবেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এফডিআই পরিসংখ্যানে জাপান থেকে যে ৫০০ মিলিয়ন ডলারের কথা বলা হচ্ছে, তা কিন্তু প্রকৃত চিত্র নয়। বাংলাদেশে জাপানের অন্যতম বৃহৎ বিনিয়োগ হলো জেটিআই, যার পরিমাণ প্রায় ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার। এ বিনিয়োগ অন্য দেশের মাধ্যমে হয়ে বাংলাদেশে আসায় তা সরাসরি জাপানি বিনিয়োগের পরিসংখ্যানে যুক্ত হয়নি। ফলে আমাদের এখানে জাপানের বিনিয়োগ আসলে ৫০০ মিলিয়ন ডলার নয়, বরং এটি অন্তত ২ বিলিয়ন ডলার।

অবশ্য ২ বিলিয়ন ডলারও তুলনামূলকভাবে বেশ ছোট একটি অংক। জাপান থেকে আমরা এখন পর্যন্ত ২০ বিলিয়ন ডলারের বেশি জাইকা অনুদান ও ঋণ পেয়েছি, সেই তুলনায় এ বিনিয়োগ ১০ শতাংশেরও কম। সুতরাং বিনিয়োগ কেন কম এবং এটি কীভাবে বাড়ানো যায়, সেটিই আসল প্রশ্ন।

কয়েক বছর ধরে আমরা এইড-নির্ভরতা থেকে ক্রমান্বয়ে ট্রেডের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। ১০ বছর আগের প্রবণতা যদি আমরা দেখি, তখন জাপানি বিনিয়োগ আসার মূল কারণ ছিল বাংলাদেশের সস্তা শ্রম। সে সময় জাপানি কোম্পানিগুলোর মূল লক্ষ্য ছিল এখানে পণ্য উৎপাদন করে তা বিদেশে রফতানি করা। তবে বর্তমানে সেই পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে। আমাদের অভ্যন্তরীণ বাজার অনেক বড় ও শক্তিশালী হয়ে উঠছে। ফলে জাপানি কোম্পানিগুলো এখন এ দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারের চাহিদা মেটাতেই মূলত বাংলাদেশে নতুন নতুন কলকারখানা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপন করছে। শুধু উৎপাদন খাতই নয়, বিভিন্ন জাপানি সেবা খাতের কোম্পানিও এখন বাংলাদেশে আসছে।

এখানে একটি বড় বিষয় হলো জাপানের বেশকিছু বড় ট্রেডিং কোম্পানি বাংলাদেশের স্বাধীনতার আগে থেকেই এ দেশে কাজ করছে; যেমন মিৎসুই, মিৎসুবিশি ও সুমিতোমো। দীর্ঘদিন ধরে এখানে থাকলেও বর্তমানে তাদের কার্যক্রমে একটি বড় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। আগে তারা মূলত আমদানি করা পণ্যের বাণিজ্য পরিচালনা করত, কিন্তু এখন তারা বাংলাদেশে সরাসরি বিনিয়োগ করছে এবং বাণিজ্য থেকে ক্রমান্বয়ে উৎপাদন বা উৎপাদন খাতের দিকে এগিয়ে আসছে। এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত সুসংবাদ।

আমি অত্যন্ত আশাবাদী যে আমাদের এ ২ বিলিয়ন ডলারের পুঞ্জীভূত বিনিয়োগের পরিমাণ দ্রুত বৃদ্ধি পাবে। ইপিএ বা মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির সুবাদে দুই দেশের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যও অনেক দূর এগিয়ে যাবে। আমরা যদি সঠিক দিকনির্দেশনা নিয়ে এগিয়ে যেতে পারি, তবে ২০৩০ সালের মধ্যে দুই দেশের বর্তমান ৪ বিলিয়ন ডলারের এ বাণিজ্য হয়তো ৮ থেকে ১০ বিলিয়ন ডলারে গিয়ে পৌঁছবে।