পাটের ঐতিহ্য থেকে গার্মেন্টসের আধুনিকতায়
স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে শিল্পায়নের প্রথম প্রতীক হিসেবে পরিচিত আদমজী জুট মিল ছিল দেশের সর্ববৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠান। যুদ্ধবিধ্বস্ত ও সদ্য স্বাধীন এক দেশে যখন ‘শিল্পাঞ্চল’ শব্দটি কেবল ধারণাতেই সীমাবদ্ধ, তখন আদমজী হয়ে উঠেছিল অর্থনৈতিক সম্ভাবনার প্রথম আলোকচ্ছটা। তবে নব্বই দশকের শুরু থেকেই এ ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানের দুর্দিন শুরু হয়। এক পর্যায়ে ২০০২ সালের ৩০ জুন সরকার আদমজী জুট মিল বন্ধ ঘোষণা করে। ফলে ২৫-৩০ হাজার শ্রমিকের পদচারণায় মুখর জনপদে নেমে আসে নিস্তব্ধতা। কর্মহীন হয়ে পড়েন হাজারো শ্রমিক। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে আশপাশের অর্থনীতি ও সামাজিক কাঠামোয়।
এ দীর্ঘ নীরবতার ভেতর দিয়েই জন্ম নেয় এক নতুন স্বপ্ন। ২০০৬ সালে সরকার সিদ্ধান্ত নেয় নতুন করে এ জনপদকে শিল্পায়নের মাধ্যমে পুনরুজ্জীবিত করার। সেই পরিকল্পনারই বাস্তব রূপ আদমজী ইপিজেড। যেখানে একসময় ২৫-৩০ হাজার শ্রমিক কর্মরত ছিলেন, সেখানে বর্তমানে প্রায় ৭৫ হাজার শ্রমিক সরাসরি কাজ করছেন। ঐতিহ্যবাহী পাট শিল্পের স্থান দখল করেছে আধুনিক পোশাক শিল্প।
অর্থনৈতিক পুনর্জাগরণ
২৯২ দশমিক ৬২ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত আদমজী ইপিজেড এখন দেশের অন্যতম বৃহৎ ও কর্মচঞ্চল শিল্পাঞ্চলে পরিণত হয়েছে। রাজধানী ঢাকা ও বন্দরনগরী চট্টগ্রামের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত হওয়ায় এর ভৌগোলিক অবস্থান বিনিয়োগকারীদের কাছে বিশেষভাবে আকর্ষণীয়। এখানে এরই মধ্যে গড়ে উঠেছে হাই এন্ড গার্মেন্ট পণ্য উৎপাদনের একাধিক কারখানা, যেখানে তৈরি হচ্ছে উচ্চমূল্য সংযোজনকারী পোশাক পণ্য। টমি হিলফিগার, র্যালফ লরেন, মাইকেল কোরস, ভ্যান হিউসেনের মতো বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডের জন্য আদমজী ইপিজেডে তৈরি হচ্ছে রফতানিযোগ্য পণ্য।
ইপিজেড ঘিরে গড়ে উঠেছে ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্প, নতুন বাজার, পরিবহন ব্যবস্থা, আবাসিক এলাকা ও বিনোদন সুবিধা; যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক তৎপরতা বাড়িয়ে দিয়েছে। আদমজী ইপিজেড-কেন্দ্রিক এ আর্থসামাজিক পরিবর্তন নারায়ণগঞ্জ অঞ্চলের অর্থনীতিকে যেমন চাঙ্গা করেছে, তেমনি গড়ে তুলেছে এক নতুন শিল্পভিত্তিক শহর।

প্রথমবারের মতো বিলিয়ন ডলার রফতানি
সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আদমজী ইপিজেডে বিনিয়োগ ও রফতানির পরিমাণও বাড়ছে। শুধু ২০২৪-২৫ অর্থবছরেই আদমজীতে ৪২ দশমিক ২৯ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ এসেছে। এশিয়া, ইউরোপ ও আমেরিকার প্রায় ১৫টি দেশ বিনিয়োগ করেছে এই ইপিজেডে, যার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮০৮ দশমিক ৫৮ মিলিয়ন ডলারে। তবে বিনিয়োগপ্রবাহের চেয়েও বেশি আলোচনা হচ্ছে রফতানি আয় নিয়ে। প্রতি বছর এ অঞ্চল থেকে রফতানির পরিমাণও বাড়ছে উল্লেখযোগ্য হারে। শুধু গত অর্থবছরেই এ শিল্পাঞ্চল থেকে রফতানি হয়েছে ১ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলারের পণ্য। ২০০৬ সালে যাত্রা শুরুর পর এ বছরই রফতানি আয় প্রথম ১ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করে। সব মিলিয়ে ২০২৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত মোট রফতানি হয়েছে ৯ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন ডলার।

দেশের একমাত্র ব্রাইডাল ড্রেস কারখানা আদমজী ইপিজেডে
সকালের কুয়াশা তখনো পুরোপুরি কাটেনি। আদমজী ইপিজেডের ফটকে ঢুকতেই চোখে পড়ে একঝাঁক তরুণী, যাদের কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ, চোখে প্রত্যয়।
নারায়ণগঞ্জের এ শিল্পাঞ্চলে প্রতিদিনই এমন দৃশ্য দেখা যায়। কিন্তু তাদের গন্তব্যটি একটু আলাদা—একটি কারখানা, যেখান থেকে তৈরি হয় বিয়ের গাউন। ইতালি, স্পেন, ফ্রান্স ও জার্মানিসহ বিশ্বের ৫৫টিরও বেশি দেশে যেগুলো পরে বহু কনে পা রাখে জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে।
কারখানার নাম ইউবিএফ ব্রাইডাল লিমিটেড। এটি প্রথম ও একমাত্র প্রতিষ্ঠান, যারা কনের জন্য বিয়ের পোশাক, জুতা ও আনুষঙ্গিক নানা সামগ্রী তৈরি করে। প্রতিষ্ঠানটি বৈচিত্র্যময় ডিজাইনের ব্রাইডাল গাউন থেকে শুরু করে এক্সক্লুসিভ অ্যাকসেসরিজ এবং হালকা সাটিন-লেইসের জুতাও তৈরি করছে বিশ্বমান বজায় রেখে। এ কারখানায় তৈরি প্রতিটি পণ্য যাচ্ছে ইউরোপের শীর্ষস্থানীয় একটি ফ্যাশন ব্র্যান্ডের হয়ে।
বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম ব্রাইডাল পোশাক প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে নজির স্থাপন করেছে ইউবিএফ। অভিজ্ঞ কর্মী, আধুনিক প্রযুক্তি এবং বাছাইকৃত উন্নতমানের ফ্যাব্রিক ব্যবহার করেই তারা বিশ্ববাজারে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করছে।
এ কারখানায় তৈরি গাউনের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে শুরু হয় প্রায় ৫০০ থেকে ৫ হাজার ইউরোয়। অথচ সেগুলো তৈরি হয় বাংলাদেশের নারায়ণগঞ্জেই, যেখানে একজন কর্মীর নিপুণতা লুকিয়ে থাকে প্রতিটি ঢেউ খেলা গাউনের মধ্যে। ইউবিএফ ব্রাইডাল এখন বাংলাদেশের গর্ব। শুধু তৈরি পোশাক নয়, একেবারে ন্যারো-স্পেশালাইজড ‘ব্রাইডাল গার্মেন্টস’ শিল্পে বাংলাদেশের অবস্থান তৈরি করছে প্রতিষ্ঠানটি।

বাংলাদেশের দক্ষ শ্রমিক শক্তিই বিনিয়োগের প্রধান কারণ
কাজানসেভা অলেনা
উপব্যবস্থাপনা পরিচালক
সুপার প্রোটেকটিভ সুজ (প্রা.) লিমিটেড
শুরুতে আমরা বাংলাদেশে অভিজ্ঞতা নিতে আসি। এখানে এসে দেখি শ্রমশক্তি অত্যন্ত সাশ্রয়ী। তারা পরিশ্রমী ও সহজে প্রশিক্ষণযোগ্য। এ বাস্তবতা বিবেচনা করেই ২০০৮ সালে আমরা আদমজী ইপিজেডে ৫ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের মাধ্যমে যাত্রা শুরু করি। সীমিত অবকাঠামো ও লোকবল দিয়ে শুরু করলেও ধীরে ধীরে আমাদের উৎপাদন ও রফতানির পরিসর বেড়েছে।
আমরা মূলত ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রেড নিরাপত্তাসামগ্রী তৈরি করি। প্রধান রফতানি বাজার জার্মানি ও ইউক্রেন। এছাড়া আরো কয়েকটি ইউরোপীয় ও এশীয় দেশেও নিয়মিত রফতানি করি। বর্তমানে আমাদের কারখানায় ৭৫০ জন বাংলাদেশী শ্রমিক কাজ করছেন। তাদের প্রায় সবাইকে আমরা নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ করে তুলেছি।
আমরা বাংলাদেশে আমাদের উৎপাদনক্ষমতা আরো বাড়াতে চাই। কারণ আমি মনে করি, বাংলাদেশ এখনো শ্রমনির্ভর শিল্পের জন্য এক অসাধারণ জায়গা। এখানে শ্রমিকরা দক্ষ হয়ে উঠতে সময় নেন না। যেসব উদ্যোক্তা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় বিশ্বাস করেন, তাদের জন্য বাংলাদেশ বিনিয়োগের একটি চমৎকার গন্তব্য হতে পারে।
স্মার্ট ইপিজেড বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে
কে এম মাহবুব-ই-সোবহানী
নির্বাহী পরিচালক, আদমজী ইপিজেড
উৎপাদন কার্যক্রম নির্বিঘ্ন রাখতে আদমজী ইপিজেডে সুনিশ্চিত করা হয়েছে প্রয়োজনীয় ইউটিলিটি সেবা। ভূগর্ভস্থ পানি বিশুদ্ধ করে তা প্রতিটি কারখানায় সরবরাহ করা হয়। বিদ্যুৎ সরবরাহের ক্ষেত্রে মূলত ডিপিডিসির ওপর নির্ভরশীল হলেও নিজস্ব একটি পাওয়ার প্লান্টও প্রস্তুত রাখা হয়েছে জরুরি ব্যবহারের প্রয়োজনে। গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থাও নির্দিষ্ট চাহিদা অনুযায়ী মেটানো সম্ভব হচ্ছে। এসব ব্যবস্থাপনার ফলে উৎপাদন কখনো বিঘ্নিত হয় না।
টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে আদমজী ইপিজেড পরিবেশ সুরক্ষাকেও দিয়েছে সর্বোচ্চ গুরুত্ব। প্রতিটি কারখানার নিজস্ব ইটিপি রয়েছে, যার মাধ্যমে শিল্পবর্জ্য শোধন করে পরিবেশে নির্গত করা হয়। কারখানাগুলোর ইনলেট ও আউটলেট পানি নিয়মিতভাবে পরীক্ষা করা হয় এবং প্রতি মাসেই ঢাকা ও চট্টগ্রামে অবস্থিত স্বীকৃত ল্যাবরেটরিতে তা ল্যাব টেস্টের মাধ্যমে যাচাই করা হয়।
ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে আদমজী ইপিজেড নিয়েছে নতুন পরিকল্পনা। অবকাঠামো সম্প্রসারণ, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ আরো নিরবচ্ছিন্ন করা, স্মার্ট ইপিজেড বাস্তবায়ন, নারী ও প্রতিবন্ধী শ্রমিকদের জন্য বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণসহ একাধিক উন্নয়ন পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে।

শ্রমিকদের জন্য রয়েছে ২৪ ঘণ্টা স্বাস্থ্যসেবা ও ডে-কেয়ার
শিল্পোন্নয়ন মানে শুধুই উৎপাদন নয়। কর্মীদের জীবনমান উন্নয়নও এখন শিল্পাঞ্চলের অন্যতম আলোচনার বিষয়। একসময় জুট মিলের শ্রমিকদের জীবন যেখানে ছিল কষ্টসাধ্য আর সীমাবদ্ধ, সেখানে এখনকার আদমজী ইপিজেডের শ্রমিকরা পাচ্ছেন চিকিৎসা, সহায়তা ও সামাজিক নিরাপত্তার নানা সুযোগ-সুবিধা। তাই বদলে গেছে বাস্তবতা, উন্নত হয়েছে শ্রমিকদের জীবনযাপনের মান।
কোনো কারখানার কর্মী সংখ্যা ৫০০ অতিক্রম করলেই সে কারখানার জন্য নিজস্ব মেডিকেল ইউনিট করার বাধ্যবাধকতা আছে। আদমজী ইপিজেডের প্রায় প্রতিটি কারখানারই নিজস্ব মেডিকেল ইউনিট আছে। এর বাইরেও শ্রমিকদের জন্য কেন্দ্রীয়ভাবে বেপজার অধীনে স্থাপন করা হয়েছে আধুনিক চারতলা হাসপাতাল। এখানে রয়েছে ২০ শয্যার ইনডোর সুবিধা ও দুটি অ্যাম্বুলেন্স। প্রাথমিক চিকিৎসা ছাড়াও চোখ, দাঁত, গাইনিসহ বিভিন্ন সেবা দেয়া হয় এ হাসপাতালে। এছাড়া শ্রমিকদের অভিযোগ এবং শোনা প্রয়োজন ও সহায়তার জন্য ইপিজেডে চালু আছে ২৪ ঘণ্টার হেল্পলাইন।
নারী শ্রমিকদের কথা বিবেচনায় অধিকাংশ কারখানায় চালু করা হয়েছে ডে-কেয়ার সেন্টার বা শিশু পরিচর্যা কেন্দ্র। সন্তান নিয়ে কর্মক্ষেত্রে আসা নারীরা এখানে শিশুদের নিরাপদ পরিচর্যার নিশ্চয়তা পান, যা কর্মস্থলে তাদের মনোযোগ ও উৎপাদনশীলতা বাড়াতে সহায়ক ভূমিকা রাখছে।
অন্যান্য ইপিজেডের ন্যায় আদমজী ইপিজেডেও রয়েছেন সোশ্যাল কাউন্সেলর, যারা শ্রমিকদের মানসিক, সামাজিক ও শ্রম অধিকারবিষয়ক পরামর্শ দেন এবং পর্যবেক্ষণ করেন। এছাড়া ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিলেশনস ডিপার্টমেন্ট শ্রমিকদের বেতন, ইনক্রিমেন্ট, ছুটি, মাতৃত্বকালীন সুবিধা এসব বিষয় মনিটর করে এবং ইপিজেড শ্রম আইন অনুযায়ী তা নিশ্চিত করে।

উল্লেখযোগ্য পণ্য
একসময় যে স্থানটি শুধুই পাটজাত পণ্যের জন্য পরিচিত ছিল, সেই আদমজী এখন রূপ নিয়েছে বহুমুখী রফতানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানের আধুনিক এক ঘাঁটিতে। ব্রাইডাল গাউন থেকে শুরু করে উচ্চমূল্য সংযোজনকারী হাই এন্ড গার্মেন্টস যেমন মোটরসাইকেল সেফটি জ্যাকেট, স্পোর্টস জ্যাকেট, ব্লেজারসহ গার্মেন্টস অ্যাকসেসরিজ, সেফটি সুজ (ভারী জুতা), গাড়ির যন্ত্রাংশ, এমনকি মাছ ধরার বড়শিসহ বহু বৈচিত্র্যময় পণ্য এখন নিয়মিত উৎপাদন হচ্ছে আদমজী ইপিজেডে।
বর্তমানে পোশাক ও এর আনুষঙ্গিক পণ্য আদমজীর রফতানি কাঠামোর প্রধান ভিত্তি হলেও অন্যান্য শিল্প ও প্রযুক্তিনির্ভর পণ্য উৎপাদনের হার দ্রুত বাড়ছে। ইউরোপ ও আমেরিকার নিরাপত্তা সরঞ্জাম এবং গাড়ির যন্ত্রাংশের চাহিদা মেটাতে এখানকার কারখানাগুলো নিয়মিতভাবে সংশ্লিষ্ট পণ্য উৎপাদন ও রফতানি করছে।











