সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরেও বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৭ দশমিক ১ শতাংশ। কিন্তু কয়েক বছরের ব্যবধানে তা কমে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৬৯ শতাংশে। অর্থাৎ প্রবৃদ্ধির হার প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। প্রবৃদ্ধির এই ধীরগতি কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিনিয়োগ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের গতি কমে যাওয়াকে অর্থনীতিবিদরা এ পরিস্থিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখছেন। সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি এবং বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের দুর্বল প্রবৃদ্ধি বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ৬ দশমিক ১ শতাংশ, যা গত কয়েক বছরের তুলনায় অনেক কম।
মূল্যস্ফীতিও বর্তমানে অর্থনীতির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে মূল্যস্ফীতি বেড়ে ১১ দশমিক ৭ শতাংশে পৌঁছায়। যদিও পরে তা কিছুটা কমেছে, তবু এখনো ৯ শতাংশের ওপরে রয়েছে। গত তিন অর্থবছরের গড় মূল্যস্ফীতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা ছিল ৯ দশমিক ২ শতাংশ, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৯ দশমিক ৭৩ শতাংশ এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে ১০ দশমিক ৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করছে।
বৈদেশিক খাতেও চাপ বাড়ছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ২০২১-২২ অর্থবছরে যেখানে ছিল প্রায় ৪১ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার, তা কমে বর্তমানে ৩৩ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের বিপিএম৬ পদ্ধতি অনুযায়ী এ রিজার্ভের পরিমাণ আরও কম, প্রায় ২৮ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার। একই সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে বাণিজ্য ঘাটতিও বেড়েছে। ২০২৬ অর্থবছরের জুলাই-নভেম্বর সময়ে বাণিজ্য ঘাটতি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৮ দশমিক ৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে ব্যালেন্স অব পেমেন্টের ওপর চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
রফতানি খাতেও সাম্প্রতিক সময়ে দুর্বলতার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। টানা সাত মাস ধরে রফতানি আয়ের প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক ধারায় রয়েছে। একই সঙ্গে প্রবাসী আয়ের ক্ষেত্রেও অনানুষ্ঠানিক চ্যানেল—বিশেষ করে হুন্ডি বা হাওলা—ব্যবহারের কারণে বৈধ রেমিট্যান্স প্রবাহ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে।
ব্যাংকিং খাতের পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। খেলাপি ঋণের হার দ্রুত বেড়ে গেছে। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে যেখানে খেলাপি ঋণের হার ছিল ৮ দশমিক ১৬ শতাংশ, তা ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর নাগাদ বেড়ে ৩৫ দশমিক ৭ শতাংশে পৌঁছেছে। ব্যাংকিং খাতের এই দুর্বলতা বিনিয়োগ পরিবেশের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
অন্যদিকে সরকারি ঋণও দ্রুত বাড়ছে। কয়েক বছর আগে যেখানে সরকারের মোট ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ১৪ দশমিক ২৬ লাখ কোটি টাকা, তা বেড়ে বর্তমানে প্রায় ২২ দশমিক ৫১ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। এর সঙ্গে ঋণ পরিশোধের ব্যয়ও দ্রুত বাড়ছে। ২০১০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ঋণ পরিশোধের ব্যয় প্রায় ৬১৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সরকারের আর্থিক সক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি করছে।





