মূলত দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থায় আস্থার অভাব, সঠিক রোগ নির্ণয়ে ঘাটতি এবং অনুন্নত সেবা ব্যবস্থাপনার কারণেই এ বিপুলসংখ্যক মানুষ দেশের বাইরে চিকিৎসা নিতে যাচ্ছে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির মাত্র ১ শতাংশেরও কম সরকারি বরাদ্দ পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে। ফলে উন্নত চিকিৎসার আশায় বিপুলসংখ্যক মানুষ বিদেশমুখী হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় স্বাস্থ্য খাতে সরকারি ব্যয় বাড়ানোর পাশাপাশি উন্নত প্রযুক্তি ও আধুনিক চিকিৎসা যন্ত্রপাতি ব্যবহারে বেসরকারি বিনিয়োগও বাড়ানো প্রয়োজন।
স্বাস্থ্য খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থার ঘাটতির পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ কাজ করছে। অনেক রোগীর মধ্যে রোগ নির্ণয় সঠিক হচ্ছে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ থাকে। অনেক সময় চিকিৎসা ব্যয় হঠাৎ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা এবং লুকানো খরচের ভয়ও রোগীদের উদ্বিগ্ন করে তোলে। পাশাপাশি বাজারে নকল ওষুধ কিংবা নিম্নমানের চিকিৎসাসামগ্রীর উপস্থিতি নিয়েও মানুষের মধ্যে আশঙ্কা রয়েছে।
ডিসিসিআইয়ের (ঢাকা চেম্বার অব কমার্সে) তথ্য অনুসারে, বিদেশে চিকিৎসা নেয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশীদের প্রধান গন্তব্য ভারত। দেশটির চিকিৎসা ভিসার প্রায় ৫২ শতাংশই বাংলাদেশীদের জন্য ইস্যু করা হয়। ২০২৪ সালে প্রায় ৪ লাখ ৮২ হাজার বাংলাদেশী রোগী ভারতে চিকিৎসা নিয়েছে। চিকিৎসা নেয়ার ক্ষেত্রে ভারতের পরেই রয়েছে থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়া। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় চীনেও অনেক রোগী চিকিৎসাসেবা নিতে যাচ্ছে।
এছাড়া হাসপাতাল ব্যবস্থাপনায় সেবার মান নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। রোগীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা, পর্যাপ্ত পরামর্শ না পাওয়া, সেবাকর্মীদের সমন্বয়ের অভাব এবং সেবার সামগ্রিক মান নিয়ে অসন্তোষের কারণে অনেকেই দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর আস্থা হারাচ্ছেন।
অন্যদিকে স্বাস্থ্য খাতে সরকারি বিনিয়োগ তুলনামূলকভাবে কম হওয়ায় আধুনিক অবকাঠামো ও প্রযুক্তি উন্নয়নে বাধা তৈরি হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী স্বাস্থ্য খাতে সরকারি ব্যয় বাড়ানো না গেলে উন্নত চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের স্বাস্থ্য খাতে মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দেয়া জরুরি। প্রথমত, রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তি ও উন্নত মানের ডায়াগনস্টিক সুবিধা বাড়াতে হবে। উন্নত চিকিৎসা যন্ত্রপাতি ও ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ালে রোগ নির্ণয় হবে দ্রুত ও নির্ভুল।
উন্নত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করতে হবে। আধুনিক হাসপাতাল, গবেষণা ও বিশেষায়িত চিকিৎসা কেন্দ্র গড়ে তুলতে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, পরিকল্পিত বিনিয়োগ, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং সেবার মানোন্নয়নের মাধ্যমে দেশের স্বাস্থ্য খাতকে শক্তিশালী করা সম্ভব। এতে একদিকে যেমন দেশের মানুষ উন্নত চিকিৎসাসেবা পাবে, অন্যদিকে চিকিৎসা ব্যয়ে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশের মধ্যেই ধরে রাখা সম্ভব হবে। হাসপাতাল ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও সেবার মান নিশ্চিত করা প্রয়োজন। রোগীবান্ধব পরিবেশ ও সুশৃঙ্খল সেবা ব্যবস্থাপনা গড়ে তুললে দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা বাড়বে।










