বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন, ভূমিধস ও লবণাক্ততার মতো বহুমাত্রিক ঝুঁকির কারণে প্রতিবছর লাখো মানুষ ঘরবাড়ি হারাচ্ছে, জীবিকা বদলাতে বাধ্য হচ্ছে কিংবা নতুন করে অভিবাসনের পথে হাঁটছে। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত এ সংকটকে আরও জটিল করে তুলছে।

আন্তর্জাতিক সংস্থা আইডিএমসি ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) যৌথ বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০১০ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ১ কোটি ৪১ লাখের বেশি অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতির ঘটনা ঘটেছে। এ হিসাবে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ভারত ও পাকিস্তানের পরেই বাংলাদেশের অবস্থান।

তবে পরিস্থিতি কেবল অতীতের পরিসংখ্যানে সীমাবদ্ধ নয়। আইডিএমসির সর্বশেষ মূল্যায়নে দেখা গেছে, ২০০৮ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে দেশে ২ কোটি ১০ লাখের বেশি দুর্যোগজনিত বাস্তুচ্যুতির ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। সংস্থাটি সতর্ক করেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ভবিষ্যতে এ ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।

বাংলাদেশের দুর্যোগ ঝুঁকির ভৌগোলিক কেন্দ্রবিন্দু এখনো উপকূলীয় অঞ্চল। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের ঝুঁকি মানচিত্রে বরগুনা, পটুয়াখালী, কক্সবাজারসহ বেশ কয়েকটি জেলা ‘অতি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত। এসব এলাকায় ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন ও জলবায়ুজনিত ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা তুলনামূলক বেশি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দুর্যোগের প্রকৃত চিত্র বোঝার জন্য শুধু প্রাণহানি বা ক্ষয়ক্ষতির হিসাব যথেষ্ট নয়; কত মানুষ দীর্ঘমেয়াদে বাসস্থান ও জীবিকা হারাচ্ছে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি, নদীভাঙন ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে অনেক পরিবার ধীরে ধীরে শহরমুখী হচ্ছে। ফলে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও অন্যান্য নগরাঞ্চলে জলবায়ু-প্রভাবিত জনগোষ্ঠীর চাপ বাড়ছে।

২০২৪ সালেও দুর্যোগজনিত বাস্তুচ্যুতির প্রবণতা ঊর্ধ্বমুখী ছিল। আইডিএমসির তথ্য অনুযায়ী, ওই বছরে বাংলাদেশে প্রায় ২৪ লাখ বাস্তুচ্যুতির ঘটনা ঘটে, যা আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। দীর্ঘস্থায়ী বর্ষা, বন্যা এবং ঘূর্ণিঝড় এ বৃদ্ধির প্রধান কারণ ছিল। শুধু মৌসুমি বন্যার কারণেই প্রায় ১৩ লাখ মানুষের স্থানচ্যুতি ঘটে।

এদিকে, জাতিসংঘের অভিবাসন সংস্থা আইওএমের ২০২৫ সালের দেশব্যাপী মূল্যায়নে দেখা গেছে, বর্তমানে প্রায় ৪৯ লাখ ৫৫ হাজার মানুষ প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত কারণে অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত অবস্থায় রয়েছে। এটি বাংলাদেশের জন্য প্রথম জাতীয় পর্যায়ের সমন্বিত হিসাব, যা সংকটের ব্যাপ্তি নতুনভাবে তুলে ধরেছে।

অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতি বলতে একটি দেশ বা অঞ্চলের স্থানীয় বাসিন্দাদের যেকোনো কারণে বাস্তুচ্যুত হয়ে ওই দেশ বা অঞ্চলের অন্যত্র চলে যাওয়াকে বোঝায়। গোটা বিশ্বেই এখন প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতির সংখ্যা বাড়ছে। বিশ্বনেতারাও এখন জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধি নিয়ে উত্কণ্ঠিত হয়ে পড়েছেন। নিউইয়র্কে চলমান জাতিসংঘের সম্মেলনেও এখন আলোচিত ইস্যুগুলোর অন্যতম হলো বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অভিঘাত।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেই এ মুহূর্তে বিশ্বের সবচেয়ে জলোচ্ছ্বাস ও ঘূর্ণিঝড়প্রবণ এলাকাগুলোর একটি হয়ে উঠেছে বঙ্গোপসাগর। বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট দুর্যোগগুলোর পাশাপাশি সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিও এখন বাংলাদেশকে অনেক নাজুক অবস্থানে ঠেলে দিয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, বারবার জলোচ্ছ্বাস ও ঘূর্ণিঝড়ের সময়ে অতিবৃষ্টি, তীব্র বায়ুপ্রবাহ ও ঝড়ের কারণে অভিঘাত এলাকার প্রচুর ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বাসস্থান ও টিকে থাকার সরঞ্জাম হারিয়ে অসহায় পড়ছে অনেকেই। সরকারের নেতৃত্বে আগে থেকে নেয়া সতর্কতামূলক পদক্ষেপ এখন প্রাণহানি কমালেও সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের জীবিকার সুরক্ষা দেয়া সম্ভব হচ্ছে না।

দেশে অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতির একটি বড় কারণ ধরা হয় নদীভাঙনকে। বাঁধ নির্মাণসহ নানা উপায়ে অপরিণামদর্শী নদী শাসন, সংলগ্ন খাল ভরাট ও পানিপ্রবাহের গতিপথ সংকুচিত হয়ে আসার কারণে প্রতি বছরই দেশের নদ-নদীগুলোর তীরবর্তী এলাকায় ভয়াবহ ভাঙন দেখা যাচ্ছে। নদীতে বিলীন হচ্ছে ঘরবাড়ি, কৃষিজমি ও গোচারণভূমি। জীবন-জীবিকা হারিয়ে শহরাঞ্চলে এসে ভিড় করছে ক্ষতিগ্রস্তরা।

বিশ্ব পরিবেশ দিবসের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয় যে, প্রাকৃতিক দুর্যোগ আর কেবল সাময়িক বিপর্যয় নয়; এটি ক্রমেই জনসংখ্যা, অর্থনীতি ও নগর ব্যবস্থাপনার দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জে পরিণত হচ্ছে। সেই বাস্তবতায় দুর্যোগ-পরবর্তী পুনরুদ্ধার নয়, বরং ঝুঁকি হ্রাস ও অভিযোজনভিত্তিক উন্নয়নই আগামী দিনের সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার।