বাইরে গরম ও ধুলোবালির পরিচিত বাস্তবতা, কিন্তু কারখানার ভেতরে প্রবেশ করলেই দৃশ্যপট বদলে যায়। রয়েছে আলোর সর্বোচ্চ ব্যবহার। কৃত্রিম আলোর ওপর নির্ভরতা কমিয়ে প্রাকৃতিক আলোয় আলোকিত করা হয়েছে কর্মপরিসর। বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা এমন যে কোথাও ভারি বা দমবন্ধ অনুভূতি নেই। উৎপাদন ফ্লোরে ব্যস্ততা থাকলেও নেই অস্বস্তিকর গরম বা ঘিঞ্জি পরিবেশ। কর্মীদের জন্য রয়েছে চিকিৎসাসেবা, বিশ্রামাগার, নামাজের স্থান এবং কর্মজীবী মায়েদের জন্য ডে-কেয়ার সুবিধা। একটি পোশাক কারখানার চেয়ে বরং এটি অনেকটা আধুনিক কর্মপরিবেশভিত্তিক শিল্প ক্যাম্পাসের অনুভূতি দেয়।

এমন পরিবেশই গাজীপুরের হ্যাম্স গার্মেন্টসকে এনে দিয়েছে এক অনন্য স্বীকৃতি। যুক্তরাষ্ট্রের ইউএস গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিলের (ইউএসজিবিসি) মূল্যায়নে ১১০-এর মধ্যে ১০৮ পয়েন্ট অর্জন করে কারখানাটি বিশ্বের সর্বোচ্চ স্কোরধারী গ্রিন বিল্ডিংয়ের স্বীকৃতি পেয়েছে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের ইতিহাসে এটি শুধু একটি রেকর্ড নয়, বরং টেকসই শিল্পায়নের ক্ষেত্রে নতুন এক মানদণ্ড।

২০১০ সালে প্রতিষ্ঠিত হ্যাম্স গার্মেন্টস লিমিটেড নিজেদের একটি ভার্টিক্যালি ইন্টিগ্রেটেড পোশাক প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলেছে। সাত হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হওয়া প্রতিষ্ঠানটির দর্শন হলো উৎপাদন, গুণগত মান, প্রযুক্তি ও পরিবেশগত দায়বদ্ধতার সমন্বয়ে বিশ্বমানের শিল্প স্থাপনা নির্মাণ। সেই দর্শনেরই প্রতিফলন দেখা যায় কারখানার প্রতিটি অংশে।

df

কারখানার অর্জনকে বিশেষ করে তুলেছে এর প্রায় নিখুঁত পরিবেশগত পারফরম্যান্স। আন্তর্জাতিক গ্রিন বিল্ডিং মূল্যায়ন পদ্ধতি লিডের আটটি বিভাগের মধ্যে সাতটিতেই পূর্ণ নম্বর অর্জন করেছে প্রতিষ্ঠানটি। অবস্থান ও যোগাযোগ সুবিধা, টেকসই স্থাপনা ব্যবস্থাপনা, জ্বালানি দক্ষতা, উপকরণ ব্যবস্থাপনা, অভ্যন্তরীণ পরিবেশের মান, উদ্ভাবন এবং আঞ্চলিক অগ্রাধিকারের মতো প্রতিটি ক্ষেত্রেই সর্বোচ্চ মানদণ্ড পূরণ করেছে হ্যাম্স।

এ সাফল্যের পেছনে রয়েছে দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশ ব্যবস্থাপনা। কারখানায় শতভাগ বৃষ্টির পানি সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করা হয়। ভবনের নকশা ও অবকাঠামো এমনভাবে পরিকল্পনা করা হয়েছে, যাতে আশপাশের তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখা ‘হিট আইল্যান্ড’ বা তাপদ্বীপ প্রভাব কমে। রাতের আলোক দূষণ নিয়ন্ত্রণ, পরিবেশবান্ধব পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম এবং বর্জ্য পুনর্ব্যবহারের জন্য পৃথক ব্যবস্থাও রয়েছে। কাপড়, ধাতু ও অন্যান্য উপকরণ উৎস পর্যায়েই আলাদা করা হয়, ফলে উৎপাদন বর্জ্যের বড় অংশ পুনর্ব্যবহার করা সম্ভব হয়।

জ্বালানি ব্যবস্থাপনায়ও হ্যাম্স গার্মেন্টস আলাদা নজির স্থাপন করেছে। কারখানার ছাদে স্থাপিত সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা মোট জ্বালানি চাহিদার উল্লেখযোগ্য অংশ পূরণ করে। প্রাকৃতিক আলো, এলইডি আলোকায়ন এবং স্মার্ট নিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তির মাধ্যমে বিদ্যুৎ ব্যবহার কমানো হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির তথ্যমতে, সামগ্রিকভাবে জ্বালানি ব্যবহারে ৭৫ শতাংশের বেশি সাশ্রয় সম্ভব হয়েছে।

পানি ব্যবস্থাপনায়ও অনুসরণ করা হচ্ছে একই ধরনের শৃঙ্খলা। সেন্সরনির্ভর স্বল্প-প্রবাহ প্রযুক্তি, পানি শোধন ও পুনর্ব্যবহার ব্যবস্থা, কুলিং টাওয়ারের পানি পুনরায় ব্যবহার এবং বৃষ্টির পানি আহরণের মাধ্যমে বিশুদ্ধ পানির ব্যবহার ৫১ শতাংশের বেশি কমানো গেছে। বাইরের ল্যান্ডস্কেপ রক্ষণাবেক্ষণেও পানি ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা হয়েছে।

তবে হ্যাম্স গার্মেন্টসের সবচেয়ে বড় শক্তি হয়তো প্রযুক্তি বা অবকাঠামো নয়, বরং মানুষকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা কর্মপরিবেশ। কারখানাজুড়ে প্রাকৃতিক আলো, নির্মল বাতাস ও আরামদায়ক তাপমাত্রা নিশ্চিত করার ফলে কর্মীদের জন্য স্বাস্থ্যকর পরিবেশ তৈরি হয়েছে। আধুনিক অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা, বর্জ্য শোধন প্লান্ট (এসটিপি), হাইড্র্যান্ট, সুস্পষ্ট নির্গমন পথ এবং প্রশিক্ষিত জরুরি সাড়া-দল কর্মস্থলের নিরাপত্তাকে আরো জোরদার করেছে।

একসময় বাংলাদেশকে বিশ্ব চিনত স্বল্প ব্যয়ে পোশাক উৎপাদনের দেশ হিসেবে। হ্যাম্স গার্মেন্টসের মতো কারখানাগুলো সেই পরিচয়কে নতুন মাত্রা দিচ্ছে। তারা দেখিয়ে দিচ্ছে, প্রতিযোগিতা শুধু উৎপাদনের পরিমাণে নয়; পরিবেশ, কর্মপরিবেশ এবং টেকসই উন্নয়নের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ বৈশ্বিক নেতৃত্ব দিতে পারে। গাজীপুরের এ কারখানা তাই কেবল একটি শিল্প স্থাপনা নয়, বরং বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের ভবিষ্যতের একটি প্রতিচ্ছবি। আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলো এখন ইএসজি (এনভায়রনমেন্টাল, স্যোশাল ও গভর্ন্যান্স) মানদণ্ডকে গুরুত্ব দিচ্ছে, ফলে হ্যাম্সের মতো কারখানাগুলো বাংলাদেশের রফতানি সক্ষমতার নতুন প্রতীক হয়ে উঠছে।