ওয়াটারএইড বাংলাদেশের GO4IMPact প্রকল্পের আওতায় কারিগরি দিকনির্দেশনায় গড়ে ওঠা এ উদ্যোগগুলো এখন একটি বড় প্রশ্নের সামনে দাঁড়িয়ে: বাংলাদেশের বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কি সত্যিই বদলের সময় এসেছে?
ব্ল্যাক সোলজার ফ্লাই: প্রকৃতির নিজস্ব বর্জ্য পরিশোধক
ব্ল্যাক সোলজার ফ্লাই বা বিএসএফ, এটি সাধারণ মাছির মতো কোনো রোগবাহী পতঙ্গ নয়। এ বিশেষ প্রজাতির মাছি লার্ভা বা শুঁয়োপোকা পর্যায়ে অবিশ্বাস্যভাবে দ্রুত জৈব বর্জ্য খেয়ে ফেলে, রান্নাঘরের উচ্ছিষ্ট, বাজারের পচা সবজি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতের বর্জ্য, সবই। মাত্র দুই সপ্তাহে এরা বিপুল পরিমাণ জৈব বর্জ্য হজম করে ফেলে।
এ প্রক্রিয়ায় দুটি মূল্যবান উপজাত তৈরি হয়। প্রথমত, লার্ভার শরীর নিজেই প্রোটিনসমৃদ্ধ পশুখাদ্য: মুরগি, মাছ এমনকি শূকরের খাবার হিসেবে সরাসরি ব্যবহারযোগ্য বা শুকিয়ে সংরক্ষণযোগ্য। দ্বিতীয়ত, লার্ভার মলমূত্র ও প্রক্রিয়াজাত বর্জ্য থেকে তৈরি হয় চমৎকার জৈব সার, যা রাসায়নিক সারের তুলনায় মাটির জন্য অনেক বেশি উপকারী। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পরিপক্ব বিএসএফ মাছি কামড়ায় না, রোগ ছড়ায় না এবং মানুষের বসবাসের এলাকা এড়িয়ে চলে।
বাংলাদেশের শহরাঞ্চলে গড়ে মাত্র ৫৫ শতাংশ বর্জ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হয়। বাকিটা রাস্তার পাশে, নালায়, খালে বা খোলা জমিতে পড়ে থাকে। নওগাঁও এর ব্যতিক্রম ছিল না। ধামইরহাট পৌরসভা ও এর আশপাশের ইউনিয়নগুলোতে বাজারের বর্জ্য, গৃহস্থালির উচ্ছিষ্ট—সবকিছু একসঙ্গে যেকোনো ফাঁকা জায়গায় ফেলার প্রচলন ছিল। পরিবেশ দূষণ ছাড়াও এটি কৃষিজমি ও জলাশয়ের ওপর চাপ ফেলছিল।
GO4IMPact-এর পদ্ধতি: বড় অবকাঠামোর আগে মানুষ ও পদ্ধতি
সুইজারল্যান্ড সরকারের অর্থায়নে পরিচালিত GO4IMPact কর্মসূচি—ওয়াটারএইড বাংলাদেশ ও সুইসকনট্যাক্টের যৌথ উদ্যোগ, নওগাঁ ও সাতক্ষীরায় কাজ শুরু করেছিল একটু ভিন্ন দর্শন নিয়ে। বড় বর্জ্য শোধনাগার নির্মাণের আগে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করো, বিদ্যমান সম্পদ ও যন্ত্রপাতির সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করো, কর্মীদের প্রশিক্ষণ দাও এবং সর্বোপরি মানুষের মধ্য থেকেই সমাধান খোঁজো।
নওগাঁয় এ দর্শনের বাস্তব প্রকাশ ঘটেছে তিনটি পরস্পর সম্পূরক উদ্যোগের মাধ্যমে: ব্ল্যাক সোলজার ফ্লাই চাষ, ভার্মিকম্পোস্টিং বা কেঁচো সার উৎপাদন এবং বায়োগ্যাস প্লান্ট। এ তিন পদ্ধতিরই কেন্দ্রে রয়েছে একটি সাধারণ নীতি; জৈব বর্জ্যকে বোঝা হিসেবে না দেখে সম্পদ হিসেবে দেখা।
শেফালীর গল্প: একটি উদ্যোগের জন্ম
শেফালী প্রথমে সন্দিহান ছিলেন। মাছি দিয়ে সার? মাছি দিয়ে মুরগির খাবার? গ্রামের অনেকে হাসাহাসিও করেছিলেন। কিন্তু GO4IMPact-এর প্রশিক্ষণে যোগ দেয়ার পর যখন হাতে-কলমে দেখলেন পুরো প্রক্রিয়াটি, তখন তার সন্দেহ বদলে গেল কৌতূহলে। বিএসএফ চাষের প্রশিক্ষণ পেয়েছেন এমন ১৮ জন নারীর মধ্যে শেফালী তাদের একজন, যারা এরই মধ্যে নিজের উদ্যোগ চালু করেছেন।
শেফালীর মতো আরো নারী কাজ করছেন ভার্মিকম্পোস্টিংয়ে, অর্থাৎ কেঁচো ব্যবহার করে জৈব বর্জ্যকে উন্নতমানের জৈব সারে রূপান্তর করার পদ্ধতিতে। এছাড়া নওগাঁর আলমপুর, হাজীনগর ও রসুলপুর—তিনটি স্থানে চালু হয়েছে বায়োগ্যাসভিত্তিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সমাধান। এ প্লান্টগুলো জৈব বর্জ্য থেকে গ্যাস উৎপাদন করছে, যা রান্নার কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে একদিকে বর্জ্যের পরিমাণ কমছে, অন্যদিকে জ্বালানি খরচ সাশ্রয় হচ্ছে।
নারী নেতৃত্বে সবুজ উদ্যোগ: কেন এটি ভিন্ন
বিএসএফ চাষ, ভার্মিকম্পোস্টিং ও ট্রাইকোডার্মা উৎপাদনে যে নারীরা যুক্ত হয়েছেন, তাদের অধিকাংশই আগে কখনো সংগঠিত কোনো অর্থনৈতিক কার্যক্রমে যুক্ত ছিলেন না। এ নারীদের কাছে একটি ছোট উদ্যোগ মানে শুধু আয় নয়, মানে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা, পরিবারে ও সমাজে একটু বেশি কণ্ঠস্বর।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কথা উঠলে সাধারণত প্রকৌশল, প্রযুক্তি ও নীতিনির্ধারণের ভাষায় কথা হয়। কিন্তু মাঠ পর্যায়ে যারা প্রতিদিন বর্জ্যের সঙ্গে লড়াই করেন, তাদের মধ্যে নারীরা অনুপস্থিত থাকেন বলেই অনেক সমাধান কার্যকর হয় না। GO4IMPact-এর এ উদ্যোগ প্রমাণ করছে যে নারীদের কেন্দ্রে রাখলে সমাধানগুলো শুধু পরিবেশবান্ধব হয় না, সামাজিকভাবেও টেকসই হয়।
প্রতি বছর ৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবসে আমরা প্রকৃতির কথা বলি, দূষণের কথা বলি, জলবায়ু পরিবর্তনের কথা বলি। কিন্তু নওগাঁর শেফালীর গল্পটি বলে অন্য একটি কথা। পরিবেশ রক্ষা কেবল বড় নীতি বা বড় প্রযুক্তির ব্যাপার নয়। কখনো কখনো একজন নারীর হাত, কিছু মাছির লার্ভা আর একটু উদ্যোগই পারে পুরো একটি এলাকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনার চিত্র পাল্টে দিতে।










