এ গৌরবময় অর্জন ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ডটিকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায় এবং ডেনিম শিল্প মানেই যে পরিবেশ দূষণ—দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এ ধারণাকে শক্ত চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়।
ঢাকার প্রায় ৮০ কিলোমিটার উত্তরে ময়মনসিংহে ভালুকার জামিরদিয়ায় ৩৪ একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত এনভয় টেক্সটাইলস লিমিটেডের কারখানা। এর বাণিজ্যিক যাত্রা শুরু হয় ২০০৮ সালে।
বর্তমানে সাড়ে তিন হাজারেরও বেশি কর্মীর প্রচেষ্টায় এটি একটি বিশাল শিল্পপ্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। এখান থেকে বছরে প্রায় ৫ কোটি ২০ লাখ গজ ডেনিম কাপড়ের পাশাপাশি এর স্পিনিং ইউনিট থেকে বছরে প্রায় ৩১ হাজার টন সুতা উৎপাদিত হয়।
নিউইয়র্ক ও হংকংয়ে আন্তর্জাতিক অফিস থাকার সুবাদে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ব্র্যান্ডগুলোর কাছে কাপড় সরবরাহ করে এ প্রতিষ্ঠান। তবে এর মূল শিকড় গৌরবের সঙ্গে বাংলাদেশেই আছে।
২০৫০ সালের মধ্যে কার্বন নির্গমন ‘নিট জিরো’ করা লক্ষ্য
শুধু ব্যাপক উৎপাদন এনভয় টেক্সটাইলসকে অন্য সবার চেয়ে আলাদা করেছে এমন নয়, বরং এর পেছনে রয়েছে সুশৃঙ্খল ও দায়িত্বশীল ব্যবস্থাপনা। সায়েন্স বেজড টার্গেটস ইনিশিয়েটিভ (এসবিটিআই) কর্তৃক নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ২০৫০ সালের মধ্যে কোম্পানিটি ‘নিট জিরো’ বা শূন্য কার্বন নির্গমনের পথে এগিয়ে চলেছে। এর অগ্রগতিও বেশ স্পষ্ট। কোম্পানির দেয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ থেকে ২০২৫ সালের মাঝে তাদের উৎপাদন কার্যক্রমে প্রতি গজ ডেনিমে সামগ্রিক গ্রিনহাউজ গ্যাস নির্গমন কমেছে প্রায় ১০ শতাংশ। প্রতি কেজি পণ্য উৎপাদনে কার্বন নির্গমনের তীব্রতা কমেছে প্রায় অর্ধেক। ২০৩০ সালের অন্তর্বর্তীকালীন লক্ষ্যমাত্রায় এ নির্গমন ৫৬ শতাংশ কমিয়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ও প্রযুক্তির ব্যবহার
গ্রিনহাউজ গ্যাস নির্গমন হ্রাসে কোম্পানির এ অগ্রগতির পেছনে বড় অবদান পরিবেশবান্ধব জ্বালানি এবং অপচয় রোধক (রিকভারি) প্রযুক্তির। কারখানার ২ দশমিক ২ মেগাওয়াটের ছাদভিত্তিক সোলার প্লান্ট প্রতি বছর ১ হাজার ৭৮৪ দশমিক ৬ টন গ্রিনহাউজ গ্যাস নির্গমন কমায়। সোলার প্লান্টের সক্ষমতা আরো ৫ মেগাওয়াট বাড়ানোর কাজ চলছে।
জ্বালানি সাশ্রয়ী এ উদ্যোগকে আরো শক্তিশালী করছে কিছু আধুনিক ব্যবস্থা। যেমন এক্সহস্ট গ্যাস বয়লার: জেনারেটরের বর্জ্য তাপ কাজে লাগিয়ে এটি বার্ষিক ১০ হাজার ৩৯৬ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড সমতুল্য গ্যাস সাশ্রয় করে। আর ‘জ্যাকেট ওয়াটার হিট রিকভারি সিস্টেম’ সাশ্রয় করে আরো ৩ হাজার ৪৯৪ টন কার্বন। এছাড়া রয়েছে দিনের আলোর সর্বোচ্চ ব্যবহার, অটো ব্লোডাউন, ইকোনমাইজার, দূষিত পানি ফিল্টারিং এবং একটি বায়োগ্যাস প্লান্ট।

পানি সাশ্রয়ে অভাবনীয় সাফল্য
পরিবেশ সুরক্ষায় কোম্পানির দ্বিতীয় বড় লড়াইটি হলো পানির অপচয় রোধ করা। প্রতিষ্ঠানটি প্রতি বছর ২১ লাখ ঘনমিটার ভূগর্ভস্থ পানি সাশ্রয় করে। কোম্পানির দেয়া তথ্যমতে, এ পরিমাণ পানি দিয়ে পুরো সিঙ্গাপুর শহরের ১ দশমিক ৩ দিনের পানির চাহিদা মেটানো সম্ভব!
২০১৯ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে তাদের পানির ব্যবহার কমেছে প্রায় ৪৫ শতাংশ এবং ২০২৭ সালের মধ্যে তা ৯০ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার প্রতিনিয়ত কমানো হচ্ছে এবং কারখানার ব্যবহৃত পানি শোধন করে পুনরায় উৎপাদন প্রক্রিয়ায় ফিরিয়ে আনা হচ্ছে।

স্বীকৃতি ও ভবিষ্যৎ বার্তা
এনভয় টেক্সটাইলসের এ অনন্য প্রচেষ্টা দেশ ও দেশের বাইরে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। এ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি ৪৬টি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কার লাভ করেছে, যার মধ্যে আছে জাতীয় পরিবেশ পদক, লিড গ্রিন সনদ প্রভৃতি। এ অর্জন বাংলাদেশের টেক্সটাইল খাতে কোম্পানিকে অন্যতম শীর্ষ সম্মানিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে পৌঁছে দিয়েছে।
যে শিল্পটি সাধারণত পরিবেশের ক্ষতি করার জন্য বিশ্বজুড়ে সমালোচিত, সেই শিল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে দাঁড়িয়ে এনভয় টেক্সটাইলস একটি স্পষ্ট বার্তা দিতে চায়: ব্যবসায়ের পরিধি বৃদ্ধি এবং পরিবেশের প্রতি দায়বদ্ধতা— দুটিই একসঙ্গে সম্ভব। সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য, দৃশ্যমান ফলাফল এবং একটি কঠোর সময়সীমা সামনে রেখে কোম্পানিটি প্রমাণ করছে যে ‘নিট জিরো’ কেবল একটি স্লোগান নয়, বরং এটি এমন এক গন্তব্য যা তারা ছুঁতে চায়। আর এ যাত্রায় তারা নতুন করে লিখছে পরিবেশবান্ধব ডেনিম উৎপাদনের আসল সংজ্ঞা।
রাসায়নিক ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা
রাসায়নিক ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও এ কারখানা অনন্য। এটি বৈশ্বিক মানদণ্ড মেনে শতভাগ নিরাপদ রাসায়নিক ব্যবহার নিশ্চিত করে এবং ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্লান্ট (ইটিপি) থেকে উৎপন্ন শতভাগ স্লাজ বা বর্জ্য ‘জিওসাইকেল’ প্রক্রিয়ায় পরিবেশসম্মতভাবে নিষ্কাশন করে। কোম্পানির নতুন ‘রিসাইকেল ইউনিট-২’ টেক্সটাইল বর্জ্যকে পুনরায় ব্যবহারযোগ্য মিশ্র সুতায় রূপান্তর করছে, যা দৈনন্দিন উৎপাদনে চক্রাকার অর্থনীতি নিশ্চিত করে।
কারখানার মোট জায়গার প্রায় ৩১ শতাংশ সবুজায়নের জন্য সংরক্ষিত রাখা হয়েছে, যেখানে রয়েছে একটি বহুমুখী লেক ও একটি ইকো পার্ক। বছরব্যাপী বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির মাধ্যমে এখানে বার্ষিক ১০ হাজার টনেরও বেশি কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষিত হয়।
পণ্য ডিজাইনের শুরুতেই যাতে পরিবেশবান্ধব পদ্ধতি নিশ্চিত করা যায়, সেজন্য বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ‘জিনোলজিয়া’র সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে গড়ে তুলেছে বাংলাদেশের প্রথম ‘ইকোল্যাব’। এর মাধ্যমে একদম প্রাথমিক ধাপ থেকেই কম পানি ও কম রাসায়নিকের ব্যবহার নিশ্চিত করা হয়, যাতে পরে আলাদা করে কোনো পদক্ষেপের প্রয়োজন না পড়ে।










