যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ২৫০তম বার্ষিকী শুধু একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক নয়, বরং দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরো বিস্তৃত ও কৌশলগত পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ।
বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বাণিজ্যে ভারসাম্যহীনতার কথা বলা হচ্ছে। তবে আমি এটিকে সংকট হিসেবে নয়, বরং সম্ভাবনা হিসেবে দেখি। এ ব্যবধান কমানোর যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে এবং বাংলাদেশ সরকার যে উদ্যোগ নিয়েছে, আমরা বেসরকারি খাত থেকেও তাতে ইতিবাচকভাবে সাড়া দিয়েছি। আমাদের বিশ্বাস, বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো দুই দেশের মধ্যে পণ্য ও বিনিয়োগপ্রবাহ আরো বাড়ানো।
মেঘনা গ্রুপ দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিপুল পরিমাণ সয়াবিনবীজ আমদানি করছে। ভবিষ্যতেও এ আমদানি অব্যাহত থাকবে। এ লক্ষ্যে আমরা যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইউএস সয়াবিন এক্সপোর্ট কাউন্সিলের (ইউএসএসইসি) সঙ্গে বড় অংকের আগ্রহপত্র ও সরবরাহসংক্রান্ত সমঝোতায় যুক্ত রয়েছি। এটি শুধু একটি বাণিজ্যিক চুক্তি নয়, বরং দুই দেশের কৃষি ও শিল্প খাতের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতার ভিত্তি।
সম্প্রতি মেঘনা গ্রুপ বাংলাদেশের প্রথম প্রতিষ্ঠান হিসেবে ‘টেকসই মার্কিন সয়াবিন লেবেল’ অর্জন করেছে। দক্ষিণ এশিয়ায়ও হাতে গোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান এ স্বীকৃতি পেয়েছে। এটি আমাদের জন্য শুধু একটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি নয়, বরং দায়িত্বশীল ব্যবসা পরিচালনার প্রতিফলন। বিশ্বজুড়ে এখন খাদ্য, পশুখাদ্য ও ভোজ্যতেল শিল্পে টেকসই উৎস থেকে কাঁচামাল সংগ্রহের গুরুত্ব দ্রুত বাড়ছে। ফলে ‘মার্কিন সয়াবিন টেকসই নিশ্চয়তা প্রটোকল’-এর আওতায় পরিবেশবান্ধব চাষাবাদ, মাটির স্বাস্থ্য সংরক্ষণ, পানির দক্ষ ব্যবহার, বায়ুর মান রক্ষা এবং দায়িত্বশীল ভূমি ব্যবস্থাপনার মতো বিষয়গুলো আন্তর্জাতিকভাবে যাচাই করা হয়। এতে শিল্পপ্রতিষ্ঠান নিশ্চিত হতে পারে যে তারা নিরাপদ, মানসম্মত ও টেকসই উৎস থেকে কাঁচামাল সংগ্রহ করছে। আমি মনে করি, এ উদ্যোগের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষক ও বাংলাদেশের শিল্প খাতের মধ্যে একটি কার্যকর সেতুবন্ধ তৈরি হয়েছে। এ ধরনের অংশীদারত্ব ভবিষ্যতের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নতুন মানদণ্ড হয়ে উঠবে।
বর্তমানে আমরা যুক্তরাষ্ট্র থেকে আরো বেশি কৃষিপণ্য ও শিল্প কাঁচামাল আমদানির সম্ভাবনা নিয়ে কাজ করছি। সেখান থেকে ভুট্টা আমদানির উদ্যোগ রয়েছে। পাশাপাশি অপরিশোধিত জ্বালানি তেল, এলপিজি, পেট্রোকেমিক্যাল ও শিল্প-কারখানায় ব্যবহৃত উন্নত মানের যন্ত্রপাতি ও ইকুইপমেন্ট আমদানির ক্ষেত্রেও বড় সুযোগ রয়েছে। আমাদের গ্লাস ফ্যাক্টরিসহ বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য প্রয়োজনীয় আধুনিক যন্ত্রপাতির একটি অংশ এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র থেকে সংগ্রহ করা হচ্ছে।
খাদ্য শিল্পেও যুক্তরাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। আমরা শিল্প-কারখানায় ব্যবহারের জন্য যুক্তরাষ্ট্র থেকে উচ্চমানের গম আমদানি করি, যা বিশেষ করে বেকারি ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্পে ব্যবহৃত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিপণ্যের গুণগত মান আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত। তবে মূল্য প্রতিযোগিতা ও আমদানি প্রক্রিয়া আরো সহজ করা গেলে দুই দেশের বাণিজ্য আরো সম্প্রসারণ হবে। একই সঙ্গে তৃতীয় কোনো দেশের মাধ্যমে আমদানির পরিবর্তে বাংলাদেশের সক্ষম শিল্পগোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমে সরাসরি আমদানি উৎসাহিত করা গেলে সরকার ও ব্যবসা উভয় পক্ষই আর্থিকভাবে লাভবান হবে।
আমাদের অভিজ্ঞতায়, বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস ও সংশ্লিষ্ট বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো অত্যন্ত সহযোগিতাপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বাজারসংক্রান্ত তথ্য, সম্ভাবনাময় পণ্য, প্রযুক্তিগত সহায়তা ও নলেজ শেয়ারিংয়ের মাধ্যমে তারা বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দুই পক্ষের মধ্যে মতবিনিময় ও ব্যবসায়িক সহযোগিতাও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
আমরা বিশ্বাস করি, আগামী দিনের বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক হবে আরো গভীর, আরো বহুমাত্রিক ও পারস্পরিক লাভজনক। শুধু বাণিজ্য নয়, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, টেকসই কৃষি, জ্বালানি নিরাপত্তা, শিল্পায়ন ও সরবরাহ শৃঙ্খলের আধুনিকায়নেও দুই দেশ একসঙ্গে কাজ করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ২৫০তম বার্ষিকী আমাদের জন্যও একটি বার্তা বহন করে। সেটি হলো দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্ব গড়ে ওঠে পারস্পরিক আস্থা, উন্মুক্ত বাণিজ্য, উদ্ভাবন ও যৌথ সমৃদ্ধির ভিত্তিতে। বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র যদি সেই দর্শনকে সামনে রেখে এগিয়ে যায়, তবে আগামী দশক দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের জন্য একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে।
মোস্তফা কামাল: চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক
মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ (এমজিআই)










