দুই দশক ধরে বসুন্ধরা এলপি গ্যাস খাতে কাজ করছে। বর্তমানে কোম্পানিটির মার্কেট শেয়ারও শীর্ষে। নতুন বছরে বসুন্ধরার পরিকল্পনা কী?

বসুন্ধরা মূলত এক বছরের পরিকল্পনা করে না। বসুন্ধরা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করতে পছন্দ করে। বসুন্ধরা দূরদৃষ্টিসম্পন্ন একটি কোম্পানি। এলপিজি খাত নিয়ে আগামী ১০ বছরের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। যেখানে আগামীতে এলপিজির বাজারে বসুন্ধরার ৫০-৬০ শতাংশ শেয়ারের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। এলপিজি খাতে বসুন্ধরা অনেক বিনিয়োগ করছে। ভবিষ্যতে আরো বিনিয়োগ করবে। এরই মধ্যে এলপিজি আমদানির জন্য বড় দুটো জাহাজ আমরা কিনেছি। এভাবে আমরা এ খাতে বিনিয়োগ করে চলেছি।

এ মুহূর্তে বসুন্ধরা গ্রুপের এলপিজির মার্কেট শেয়ার ও বার্ষিক সরবরাহের পরিমাণ কত?

বাজারে ১২ লাখ টনের মতো এলপি গ্যাসের চাহিদা রয়েছে। সেখানে ২০-২৫ শতাংশ মার্কেট শেয়ার বসুন্ধরা এলপিজির। কোনো কোনো সময় এটির পরিবর্তন হয়। এটি মূলত বিক্রির ওপর নির্ভর করে।

এলপিজি খাতে ২৮টি কোম্পানি ব্যবসা পরিচালনা করছে। ছোট একটি বাজারে এতগুলো কোম্পানির ভবিষ্যৎ আসলে কী?

এটা বাংলাদেশে খুব কমন প্র্যাকটিস। অতিবিনিয়োগের কারণে অনেক সম্ভাবনাময় ব্যবসা বিনষ্ট হয়েছে। আমরা সবাই দেখাদেখি বিনিয়োগ করতে পছন্দ করি। সবাই স্বল্প সময়ে লাভবান হতে চাই। কিন্তু দেখা যায় যে সেটার ফলাফল এক পর্যায়ে বিফলে পরিণত হয়। এ খাতে অনেকেই টাকা লগ্নি করে তাদের বিনিয়োগ হারিয়েছেন। এতে দেশের অর্থনীতি সমস্যার সম্মুখীন হয়। এ খাতে ২৭-২৮টি কোম্পানি ব্যবসা করছে। অথচ অনুমোদন পেয়েছে ৫৪টি কোম্পনি। এলপিজি খাতে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত, চীন অথবা তুরস্ক, যাদের বড় এলপিজির মার্কেট রয়েছে। সেসব বাজারে দু-তিনটি কোম্পানি ব্যবসা করছে।

বিইআরসি প্রতি মাসে এলপি গ্যাসের মূল্য পুনর্নির্ধারণ করছে। অনেক কোম্পানি এ দাম বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করছে। এক্ষেত্রে বাজারে কোনো ধরনের প্রভাব দেখছেন কিনা?

প্রথমত, এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন থেকে যে মূল্যটা নির্ধারণ করছে, এজন্য তাদের আমরা ধন্যবাদ জানাতে চাই। তারও আগে ধন্যবাদ জানাতে চাই কনজিউমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশকে (ক্যাব)। কারণ তাদের একটি রিটের কারণে আদালতের নির্দেশক্রমে গণশুনানি করে মূল্যটা নির্ধারণ করা হচ্ছে। এতে আমাদের ইন্ডাস্ট্রির জন্য ভালোই হয়েছে। কারণ বিগত সময়ে দেখা যাচ্ছিল, ইন্ডাস্ট্রি নিয়ে, বিনিয়োগকারীদের নিয়ে অনেক ভ্রান্ত ধারণা ছিল। যেমন তারা তাদের মতো মূল্য নির্ধারণ করে অতিদামে বিক্রি করে, মানে একটা ধোঁয়াশা ছিল। এখন ওই ধোঁয়াশাটা কেটে গেছে। আমি মনে করি, ক্যাব একটি ভালো কাজ করেছে।

রান্নার গ্যাসের পাশাপাশি অটোগ্যাসের বাজার প্রসারিত হচ্ছে। এখন অনেক গাড়িও কনভারশন হচ্ছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশে অটোগ্যাসের বাজারটা আপনারা কীভাবে দেখছেন?

অটোগ্যাসের বাজার এলপিজি বাজারের মতোই সম্ভাবনাময়। কিন্তু এ বাজারে কিছু বড় বড় চ্যালেঞ্জ আছে। সে চ্যালেঞ্জগুলো ওভারকাম করতে না পারলে এ বাজারে আসলে খুব বেশি সম্ভাবনা নাই। চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে অতিরিক্ত বিনিয়োগ। বাংলাদেশে এ সেক্টরে অনেক বেশি বিনিয়োগ করা হয়েছে। ছোট্ট একটা দেশে এরই মধ্যে চার-পাঁচশ স্টেশন হয়ে গেছে, যার আসলে কোনো দরকার ছিল না। আরো কমসংখ্যক স্টেশন দিয়েও সেবা দেয়া যেত।

দ্বিতীয় হলো, অটোগ্যাসের মূল্যের সঙ্গে সিএনজির মূল্যে সামঞ্জস্য থাকা উচিত। এখনো সিএনজির মূল্যের সঙ্গে আমাদের অটোগ্যাসের বড় ধরনের গ্যাপ আছে। তৃতীয় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, এখন হাইব্রিড গাড়ি আসা শুরু হয়েছে। যারা হাইব্রিড গাড়ি আনবে, তারা তো গাড়িটাকে সিএনজি বা এলপিজিতে রূপান্তর করবে না। এছাড়া বাংলাদেশে ইলেকট্রিক গাড়ি আনার প্ল্যান হচ্ছে। আরো কিছু বিশেষ চ্যালেঞ্জ আছে। আমার কাছে মনে হয়, এলপিজি অটোগ্যাসের এ ব্যবসা অনেক বেশি ভালনারেবল।

এখন আবাসিকে পাইপলাইনে গ্যাস সংযোগ বন্ধ আছে। একই সঙ্গে একটা বিষয় বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। সেটি হচ্ছে সিলিন্ডার গ্যাস ব্যবস্থাপনা, যেটাকে রেট বুলেট সিস্টেম বলা হচ্ছে। বসুন্ধরা এলপি গ্যাস এটা নিয়ে কাজ করছে। আপনারা আসলে এ সিস্টেম কতটুকু এগিয়ে নিতে পেরেছেন?

প্রথমত, আপনাকে বলতে চাই, বাসাবাড়িতে রেট বুলেট সিস্টেমের জনক হচ্ছে বসুন্ধরা এলপি গ্যাস। আমরা প্রথম টাঙ্গাইলের ঘাটাইল ক্যান্টনমেন্টে সেনাবাহিনীর ফোর্সদের অ্যাপার্টমেন্টে প্রথম রেট বুলেট সিস্টেম করি, যার মাধ্যমে হাজার খানেক ফ্ল্যাটে গ্যাস সরবরাহ করি। তারপর বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় আইকনিক প্রজেক্ট উত্তরা ১৮ নম্বরের রাজউকের বহুমুখী প্রকল্প, যেখানে সাত হাজারের বেশি ফ্ল্যাট আছে, সেখানে রেট বুলেট সিস্টেমে গ্যাস সরবরাহ করেছি। ঢাকা শহরের অনেক বড় বড় প্রজেক্টে এ সিস্টেম ব্যবহার করা হচ্ছে। এখন এটা খুব জনপ্রিয় প্রজেক্ট হয়ে গেছে। এটা খুবই বিজ্ঞানসম্মত এবং ব্যবহারকারীর জন্য খুব কনভেনিয়েন্ট। ঢাকা, চট্টগ্রাম ছাড়াও বিভাগীয় শহরগুলোতেও রেট বুলেট সিস্টেম জনপ্রিয় হচ্ছে।

আপনাদের এখন রেট বুলেট সিস্টেমের সামগ্রিকভাবে গ্রাহক সংখ্যা কত?

রেট বুলেট সিস্টেমের গ্রাহক সংখ্যা আপনাকে একদম নির্দিষ্টভাবে বলা খুব কঠিন। কারণ আমরা সেবা দিচ্ছি বড় বড় অ্যাপার্টমেন্টে। এছাড়া আমাদের পরিবেশকরা ছোট ছোট এ সিস্টেমে গ্যাস দিচ্ছে। ধরেন একটা ছয়তলা বিল্ডিং, যেখানে ১২টি ফ্ল্যাট। সেখানে আমরা সরাসরি যাই না। আমরা বড় প্রজেক্ট যেমন পিডব্লিউডি প্রজেক্ট, রাজউক প্রজেক্ট, ক্যান্টনমেন্ট প্রজেক্ট, যেখানে মিনিমাম ৫০০ থেকে এক হাজার বা তার বেশি ফ্ল্যাট আছে, সেখানে আমরা সরাসরি দিচ্ছি। এগুলো ধরলে আমাদের গ্রাহক সাত হাজারের মতো। কিন্তু আপনি যদি পরিবেশক ধরেন, তাহলে আমার ধারণা লাখের বেশি পরিবার এ সিস্টেম ব্যবহার করছে।

সম্প্রতি গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে বিতরণ কোম্পানিগুলো। সেখানে দেখা গেছে, বর্তমান যে মূল্যটা আছে, বিশেষত এক চুলা কিংবা দুই চুলা যেগুলো আছে, মূল্য প্রায় দ্বিগুণের বেশি বাড়ানোর একটা প্রস্তাব করা হয়েছে। যদি কোনো কারণে দাম বাড়ে, সেক্ষেত্রে এলপি গ্যাস তুলনামূলক সাশ্রয়ী হয়ে যাবে। বিষয়টা আপনারা কীভাবে দেখছেন?

প্রতি বছর মুদ্রাস্ফীতির কারণে পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি স্বাভাবিক ঘটনা। আমি নির্দিষ্ট দামের পক্ষে নই। ৯৭৫ থেকে বাড়িয়ে ২ হাজার ১০০ টাকা করা হবে, আমার বাসায় এক মাস কেউ থাকবে না, আমি এক মাসে ২ হাজার ১০০ টাকা শুধু শুধু দেব, আমি এটার পক্ষে নই। প্রিপেইড মিটারের একটা প্রজেক্ট ছিল, ১০ বছর ধরে মাত্র ১০ শতাংশ মানুষ ব্যবহার করে। প্রিপেইড মিটার সবাইকে দেয়া উচিত। যে যতটুকু ব্যবহার করবে, সে ততটুকু বিল দেবে।

সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ যেকোনো ধরনের জ্বালানি, প্রাকৃতিক গ্যাস, এলএনজি, পেট্রল, ডিজেল কিংবা অকটেনের দাম সমন্বয় করা দরকার। ভারতেও প্রাকৃতিক গ্যাস বা জ্বালানিগুলোর প্রতি মাসে মূল্য পরিবর্তন হয়। আমেরিকায় প্রতিদিন পরিবর্তন হচ্ছে। আপনি এলপিজিতে কোনো ভর্তুকি দেবেন না, প্রাকৃতিক গ্যাসে দেবেন, তখন তো এলপিজি শিল্প বড় হবে হবে না। যখন এলপিজিতে ৭ সতাংশ ভ্যাট দেবেন, এলএনজিতে কোনো ভ্যাট দেবেন না, তখন তো আপনি দুটো শিল্পকে সমভাবে মূল্যায়ন করছেন না।

আমরা জানি, এলপিজির ক্ষেত্রে বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ৩২ হাজার কোটি টাকা। বিপুল এ অংকটা বিনিয়োগ করেছে বেশির ভাগ বেসরকারি কোম্পানি এবং তাদের হাত ধরে এ টাকা দেশে বিনিয়োগ হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে আসলে সহযোগিতা কতটুকু পেয়েছেন?

এলপিজি ইন্ডাস্ট্রিজ আজ এ জায়গায় আছে কিন্তু সরকারের সদিচ্ছার কারণে। কিন্তু আমাদের এখনো তিনটি বড় সমস্যা আছে। প্রথমত, আমাদের গ্রাহক পর্যায়ে ৭ শতাংশ ভ্যাট দিতে হয়। এ ৭ শতাংশ ভ্যাট আসলে আমরা দিতে চাই না। তাহলে আমরা ভোক্তা পর্যায়ে আরো সুলভ মূল্যে দিতে পারতাম। দ্বিতীয়ত, মোংলা ও চট্টগ্রামে আমাদের জাহাজগুলো আসে, সেখানে যদি আরো একটু ড্রেজিং করা হতো, তাহলে আমরা আরো বড় জাহাজে পণ্য আনতে পারতাম। এতে খরচ একটু কমত। তৃতীয়ত, আমাদের একটি এলপিজি কোম্পানি করতে হলে ২০-২২ রকম প্রতিষ্ঠানের কাছে যেতে হয়। ওয়ান স্টপ সলিউশন যদি করে দেয়া হয়, তাহলে আরো সুবিধা হতো।

বসুন্ধরা এলপি গ্যাসের পক্ষ থেকে গ্রাহককে আরো কোনো বার্তা দেবেন?

২০ বছর ধরে নিরবিচ্ছিন্নভাবে এলপি গ্যাসের প্রথম কোম্পানি হিসেবে বাজারের শীর্ষ বেস্ট ব্র্যান্ড হিসেবে আমরা আছি। আমরা পরপর দুবার বেস্ট ব্র্যান্ডের পুরস্কার পেয়েছি। দুবার সুপার ব্র্যান্ড অ্যাওয়ার্ড পেয়েছি। আমাদের সব অর্জন গ্রাহকদের জন্যই। আমরা একটা অ্যাপ ডেভেলপ করছি, যাতে ভোক্তারা তার ঘরের যেকোনো জায়গা থেকে অ্যাপের মাধ্যমে অর্ডার দিয়ে পণ্যটি তার কাছে নিতে পারেন। এমন আরো কিছু পরিকল্পনা আমরা ভোক্তাদের জন্য করছি।