শুরুতে জানতে চাচ্ছি জেন-জি শিক্ষার্থীদের নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছেন কিনা?

শুধু জেন-জি না, জেনারেশন টু জেনারেশন একটা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যায়, এটি মেনে নিতে হবে। এখনকার জেনারেশন বইমুখী না। তারা মূলত সংক্ষিপ্ত ই-বুক, পিডিএফ ভার্সন পড়তে পছন্দ করে। তার পরও পুরো বই পড়তে চায় না। শিক্ষকরা ক্লাসে যে ম্যাটেরিয়াল পড়ান সেগুলোর ওপরই নির্ভর করতে চায়। আমাদের ইএলএমএস সিস্টেমে স্লাইড, নোট দেয়া হয়; যাতে তারা সেগুলো পড়তে পারে। পুরনো প্রশ্নপত্রও সমাধান করানো হয়। এভাবে তাদের পড়াশোনার প্রতি আগ্রহী করার চেষ্টা করি। এ প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশি নির্ভরশীল। অনেক ক্ষেত্রে আমরা দেখেছি শিক্ষার্থীরা তাদের শিক্ষকদের কাছে যেতে কিছু ভয় বা লজ্জা পায়। যদিও সবাই নয়। তারা সিনিয়রদের সঙ্গে কনসাল্টেশন করে পড়াশোনা করতে পছন্দ করে। তাই আন্ডারগ্র্যাজুয়েট অ্যাসিস্ট্যান্ট (ইউজিএ) নামে একটি সিস্টেম চালু করেছি। আন্ডারগ্র্যাজুয়েটের সবচেয়ে ভালো শিক্ষার্থীদের জন্য এটি প্রযোজ্য। আমরা একটা রুমের ব্যবস্থা করেছি, সেখানে গিয়ে জুনিয়র শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার বিভিন্ন সমস্যার সমাধান নিচ্ছে। এতে দুটো লাভ, জুনিয়র শিক্ষার্থীরা শিখতে পারছে আর সিনিয়ররা অন ক্যাম্পাস জব করতে পারছে। এভাবে শিক্ষার্থীদের মতো করে তাদের শিক্ষা দেয়ার চেষ্টা করছি। সব সময় ট্র্যাডিশনাল পদ্ধতিতে শেখানো যায় না। শিক্ষার্থীদের মতো করেই চিন্তা করতে হবে তারা আসলে কোথায় স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিকীকরণের প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নেয়ার জন্য আপনার মূল কৌশল বা রোডম্যাপ কী?

বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা নিশ্চিত করতে দুটি বিষয় থাকতে হবে। প্রথমত, কোয়ালিটি শিক্ষক; দ্বিতীয়ত ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড কারিকুলাম বা পাঠ্যক্রম। এ দুটির কোনো একটি বাদ দেয়া সম্ভব নয়। আমরা সব সময়ই চেষ্টা করি ভালো মানের শিক্ষক নিয়োগ দেয়ার। কিছুদিন পর পরই আমরা বিজ্ঞাপন দিয়ে শিক্ষক নিয়োগ করি। এখানে আমাদের বড় একটি চ্যালেঞ্জ হলো আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষক পাওয়া। বিশ্বের ভালো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রিধারী শিক্ষকদের নেয়ার চেষ্টা করি। এটা আমাদের প্রধান টার্গেট। এছাড়া কিছুদিন পরপরই আমাদের কারিকুলাম আপডেট করি। আপডেট করতে গিয়ে আন্তর্জাতিক স্ট্যান্ডার্ডে নেয়ার জন্য কমিটি আছে তারা কাজ করে। সম্প্রতি সিএসই বিভাগের কারিকুলাম নিয়ে কাজ চলছে—সেখানে আমরা এআই, রোবোটিকসসহ নতুন নতুন আইডিয়া যেগুলো আসছে সেগুলো অন্তর্ভুক্ত করব মেজর হিসেবে।

আপনি কীভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাক্রম ও গবেষণাকে ডিজাইন করছেন, যা স্থানীয় চাহিদা পূরণের সঙ্গে সঙ্গে আন্তর্জাতিক মানও ধরে রাখবে?

আমরা সব সময়ই চেষ্টা করি আমাদের দেশের সমস্যা সমাধানে ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করতে। শিক্ষকদেরও বলেছি তাদের সঙ্গে কথা বলে কোলাবরেশন করতে, তারা ইন্ডাস্ট্রিতে কী কী সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে সেগুলো শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলাপ করে সমাধান দেয়ার জন্য। এতে আমাদের স্থানীয় সমস্যার সমাধান হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক স্ট্যান্ডার্ড ধরে রাখতে হলে কারিকুলাম আন্তর্জাতিক মানের করতে হবে। বিভিন্ন দেশে প্র্যাকটিক্যাল যেভাবে সমস্যার সমাধান করে আমাদেরও সে পথে যেতে হবে। তাহলে আমাদের গ্র্যাজুয়েটরা দেশের বাইরেও ভালো করতে পারবে।

আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা ও প্রকাশনা বৃদ্ধিকে উৎসাহিত করতে বিশ্ববিদ্যালয় কী ধরনের প্রণোদনা, অনুদান বা অবকাঠামোগত সহায়তা দিচ্ছে?

বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ড ইউনাইটেড গ্রুপ থেকেই আমাদের ১০ কোটি টাকা গবেষণার জন্য বরাদ্দ দিয়েছে। এরই মধ্যে আমরা ৮ কোটি টাকা পেয়েছি। এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব গবেষণা বাজেটের বাইরে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও গবেষণার জন্য ৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে। এ অর্থায়ন দিয়ে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে গবেষণা প্রজেক্ট করা হয়, যা পুরো ব্যয় আমরা বহন করি। এছাড়া বিভিন্ন জার্নালে গবেষণা প্রকাশ করতে হলে দুই-আড়াই লাখ টাকা দিতে হয়। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমরা শিক্ষকদের এ অর্থ দিচ্ছি। গবেষণা প্রকাশ করতে কোনো সীমাবদ্ধতা নেই, কোনো শিক্ষক যদি বছরে ১০টি পেপারও প্রকাশ করেন আমরা প্রকাশনার সব টাকা দিই। গত বছর একজন শিক্ষক গবেষণা প্রকাশে ৭৫ লাখ টাকা খরচ করেছে, যার পুরোটাই আমরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহন করেছি। তিনি সেরা টু পারসেন্ট সায়েন্টিস্টের একজন। রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট ও টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্টের জন্য আমরা ফান্ড দিয়ে থাকি। শিক্ষকরা স্কোপাস ইনডেক্স জার্নালে গবেষণা প্রকাশ করলে প্রতি পাবলিকেশনের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভাতা দেয়া হয়। মোট কথা, গবেষণা প্রকাশ করার জন্য আর্থিক সহায়তা, গবেষণা প্রকাশের পর ভাতা এবং শিক্ষার্থীদের জাতীয় পর্যায়ে কনফারেন্সে অংশ নেয়ার জন্য রেজিস্ট্রেশন ফি দেয়া হয়। সম্প্রতি আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে আমাদের শিক্ষার্থীরা পেপার প্রেজেন্ট করলে তার রেজিস্ট্রেশন ফিসহ যাবতীয় ব্যয় আমরা বহন করব। শিক্ষকরা কনফারেন্সে অংশ নিলেও আমরা আর্থিক সহায়তা করি। এভাবে আমরা গবেষণায় উৎসাহ দিতে নানাভাবে প্রণোদনা দিচ্ছি। ফলে গত কয়েক বছরে ইউআইইউর গবেষণার মান ও সংখ্যা দুটোই বেড়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের কতগুলো প্রোগ্রামের আন্তর্জাতিক অ্যাক্রেডিটেশন আছে?

ইউআইইউর বিজনেস অ্যান্ড ইকোনমিকস স্কুলের সবগুলো প্রোগ্রাম যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল ফর বিজনেস স্কুলস অ্যান্ড প্রোগ্রামসের (এসিবিএসপি) ১০ বছরের স্বীকৃতি আছে। এছাড়া ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) এবং ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিকস ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই) বিভাগ ইনস্টিটিউট অব ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশের (আইইবি) অ্যাক্রেডিটেশন রয়েছে। সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ নতুন, গ্র্যাজুয়েট বের না হওয়া পর্যন্ত অ্যাক্রেডিটেশনের জন্য আবেদন করা যাচ্ছে না। আশা করছি ২০২৬ সালের শুরুতে এ বিভাগের অ্যাক্রেডিটেশনের জন্য আবেদন করব। বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিলেও আমরা ধীরে ধীরে আবেদন করব।

বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক র‍্যাংকিং নিয়ে অনেক আলোচনা হয়। আপনি কি গুণগত শিক্ষার মানদণ্ড হিসেবে র‍্যাংকিংকে বিবেচনা করেন?

এটি আসলেই কঠিন প্রশ্ন। র‍্যাংকিং নির্ভর করে কয়েকটি ইনডেক্সের ওপর। এসব ইনডেক্সের বাইরেও কীভাবে শিক্ষা দেয়া হচ্ছে এ রকম অনেক কিছুই রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় আছে দুই ধরনের। একটি রিসার্চ ইউনিভার্সিটি, আরেকটি টিচিং ইউনিভার্সিটি। বাংলাদেশে যেসব বিশ্ববিদ্যালয় আছে রিসার্চ ইউনিভার্সিটি বলতে যা বোঝায় মূলত সে রকম বিশ্ববিদ্যালয় নেই। আর র‍্যাংকিংগুলো মূলত রিসার্চ ফোকাস করেই করা হয়। ফলে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যেসব গবেষণা করে তার মানের কারণেও র‍্যাংকিংয়ে অনেক পিছিয়ে যাই আমরা। আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মূলত টিচিং ইউনিভার্সিটি। শিক্ষকরা অনেক প্রেশারে থাকেন। একজন শিক্ষককে রিসার্চের চেয়ে টিচিংয়ে অনেক বেশি সময় দিতে হয়। কিন্তু বিদেশে গবেষণায় বেশি সময় ব্যয় করেন শিক্ষকরা। যে কারণে আমরা গবেষণায় বেশি ভালো করতে পারি না। বিভিন্ন র‍্যাংকিংয়ে একেকটিতে একেক রকম প্যারামিটার থাকে। এসব প্যারামিটারের বাইরেও অনেক কিছু রয়েছে। শুধু র‍্যাংকিং দিয়েই বিশ্ববিদ্যালয়ের মানদণ্ড মূল্যায়ন করা যায় না, এটি ঠিক নয়।

আপনি কোন কোন নির্দিষ্ট সূচকে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছেন?

আমরা গবেষণায় বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি। অন্যরা আমাদের কী বলছেন সেগুলো আমলে নিয়ে কাজ করছি। বিশেষ করে ইন্ডাস্ট্রিতে যারা আছেন তারা কী চান। আমরা তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে আমন্ত্রণ জানিয়ে তাদের কথা, পরামর্শ, চাহিদার কথা শুনব। সেভাবে আমাদের কারিকুলামে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন নিয়ে আসব। টিচিং মডিউল হয়তো পরিবর্তন করব। এভাবেই আমরা এগিয়ে যেতে চাই।

উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন শেষে এ বিশ্ববিদ্যালয়কে কোন অবস্থানে রেখে যেতে চান?

দুই বছর হলো উপাচার্যের দায়িত্ব পালন করছি। এই সময়ে আমি চেষ্টা করেছি গবেষণার সংস্কৃতি গড়ে তোলার। আগামী দুই বছরে আমার পরিকল্পনা কারিকুলাম আরো বেশি সমৃদ্ধ করব। ইন্ডাস্ট্রির চাহিদার আলোকে কারিকুলাম ঢেলে সাজাতে চাই। গবেষণায় আরো বেশি ফোকাস করতে চাই। আসলে বাংলাদেশের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণে কোনো কিছু স্থির নয়। যে কারণে শিক্ষার্থীরা বেশির ভাগই দেশের বাইরে চলে যেতে চায়। এর কারণ আমাদের সবার অজানা নয়। আমাদের অগ্রগতি খুব বেশি গতিশীল নয়। তাই আমি চাইব আগামী দুই বছর ভালো মানের গবেষণা, ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে কোলাবরেশন বৃদ্ধি করতে। গুণগত মানের কোনো সীমা নেই। আমাদের প্রতিনিয়তই কাজ করে যেতে হবে।