অভ্যুত্থানের পর মানুষের মধ্যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল এবার সব ক্ষেত্রে সত্যিকারের পরিবর্তনের ছোঁয়া লাগবে। নানা কমিশনও গঠিত হয়েছে। শিক্ষা খাত নিয়ে আপনার প্রত্যাশা কেমন ছিল?

অন্তত শিক্ষার বাজেটে বড় পরিবর্তন আশা করেছিলাম। আমরা এখনো জিডিপির মাত্র ২ শতাংশ শিক্ষা খাতে ব্যয় করি, যেখানে কোরিয়া জিডিপির ৫ থেকে ৬ শতাংশ ব্যয় করে। তারা গবেষণা খাতে পৃথিবীর অন্যতম শীর্ষ পাঁচটি দেশের মধ্যে অন্যতম বিনিয়োগকারী। সেখানে এখন প্রায় ৮০ শতাংশ গবেষণা তহবিল আসে প্রাইভেট সেক্টর থেকে, ২০ শতাংশ আসে সরকার থেকে। স্বাধীনতার পর থেকেই কেন আমরা শিক্ষায় বড় বিনিয়োগ করতে পারলাম না? আমি মনে করি এর মূল কারণ হলো রাজনৈতিক নেতৃত্বের চরম ব্যর্থতা। আমরা এমন নেতৃত্ব পাইনি যারা শিক্ষার গুরুত্ব বোঝে এবং জাতিকে একটি দীর্ঘমেয়াদি দিকনির্দেশনা দিতে পারে। আমরা কৃষিপ্রধান দেশ ছিলাম। কোরিয়াও ৬০-এর দশকে শতভাগ কৃষিপ্রধান ছিল। কিন্তু তাদের নেতৃত্ব তখনই বুঝেছিল শিল্পায়ন ছাড়া উন্নয়ন সম্ভব নয়। আমরা সেই ধরনের নেতৃত্ব তো পাইনি। উপলব্ধিতে পৌঁছাতে পেরেছি অনেক দেরিতে এবং শিল্পায়ন শুরু করেছি খুবই অপরিকল্পিতভাবে। শিক্ষা ও শিল্পের অগ্রসর পরস্পর নির্ভরশীল। আমার প্রত্যাশা থাকবে পরবর্তী যে সরকারই আসুক না কেন শিক্ষা খাতকে অগ্রাধিকার দেবে। বিশেষ করে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় সর্বোচ্চ বিনিয়োগ জরুরি।

উচ্চশিক্ষা বিশ্বমানের করতে প্রধান চ্যালেঞ্জ কী আর সরকার ও বিশ্ববিদ্যালয়ের করণীয় কী?

বাংলাদেশের ছাত্ররা বিদেশে যাচ্ছে। তারা ভালো করছে। কিন্তু বিদেশে কত শিক্ষার্থী ভর্তি হতে পারছে তার ওপর শিক্ষার আন্তর্জাতিকীকরণ নির্ভর করে না। আমার দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা কতখানি আন্তর্জাতিক মানের সেটাই হলো আন্তর্জাতিকীকরণ। সারা বিশ্ব শিক্ষা ক্ষেত্রে এগিয়ে যাচ্ছে। সেই শিক্ষা আমরা দিতে পারছি কিনা সেটাই মূল বিষয়। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়াতে হবে। আন্তর্জাতিক যে স্ট্যান্ডার্ড আছে সেটা আমরা দিতে পারছি না কেন তা দেখতে হবে। মিনিমাম একটা স্ট্যান্ডার্ড মানতে হবে। বিদেশী কারিকুলাম, টেকনোলজি, অন্যান্য আধুনিক সুযোগ-সুবিধা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় আত্তীকরণ করতে পারি। তাহলেই এটা হবে আন্তর্জাতিকীকরণের সবচেয়ে বড় সাফল্য।

শিক্ষার আন্তর্জাতিকীকরণে বৈশ্বিক সহযোগিতা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। আইইউবি এ বিষয়ে কীভাবে কাজ করছে?

আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বিশেষ করে গবেষণার ক্ষেত্রে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এর ধারাবাহিকতায় আমরা সম্প্রতি একটি আন্তর্জাতিক কনফারেন্সের আয়োজন করেছিলাম, যেখানে ১২টি দেশের গবেষক ও ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্টরা অংশ নিয়েছিল। দুই শতাধিক গবেষণাপত্র উপস্থাপন হয়েছে। এটি আন্তর্জাতিকীকরণের একটি প্রয়াস। এছাড়া বিভিন্ন বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে এমওইউ স্বাক্ষর করেছি। শিক্ষার্থী এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রামে অংশ নিচ্ছে, যৌথ গবেষণাও পরিচালিত হচ্ছে।

বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কেউ স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করলে বিশ্বের অনেক দেশ স্নাতক সমমানের বিবেচনা করে। আর স্নাতক ডিগ্রি ফাউন্ডেশন কোর্সের সমমানের। উচ্চশিক্ষার আন্তর্জাতিকীকরণে বিষয়টিকে কীভাবে দেখছেন?

এ অবস্থা থেকে উত্তরণের সবচেয়ে সহজ উপায় হলো প্রোগ্রাম অ্যাক্রেডিটেশন করতে হবে। যেমন ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষার অ্যাক্রেডিটেশনের জন্য ওয়াশিংটন অ্যাকর্ড আছে। বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি বোর্ড। এর মাধ্যমেও আমরা যদি কোনো প্রোগ্রাম অ্যাক্রেডিট করি, তাহলে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি মিলবে। একমাত্র অ্যাক্রেডিটেশনের মাধ্যমেই আমরা বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রির আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করতে পারব।

ইউনেস্কোর নির্দেশনা অনুযায়ী শিক্ষা খাতে অন্তত জিডিপির ছয় ভাগ বরাদ্দ রাখা উচিত। তবে দেশে বছরের পর বছর এ বরাদ্দ জিডিপির ২ শতাংশের আশপাশেই সীমাবদ্ধ। এ বিষয়ে আপনার মতামত কী?

প্রাথমিক ও মাধ্যমিক খাতে সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ দরকার। কারণ দুটি শিক্ষা ব্যবস্থা সবচেয়ে করুণ অবস্থায় আছে। বিশ্ববিদ্যালয়েও বরাদ্দ দরকার, গবেষণায় অর্থের অভাব আছে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে টাকার অভাবে গবেষণা হচ্ছে না—এটা আমি মানতে রাজি না। কারণ আমাদের দেশে জাতীয়ভাবে শিল্পায়ন ও মানবসম্পদের উন্নয়নের কোনো রূপরেখা নেই। সেখানে প্রাইভেট খাত আর বিশ্ববিদ্যালয় বলি, আমরা কিসের লক্ষ্যে গবেষণা করব? গবেষণা তো আমাদের প্রয়োগ করতে হবে। সেটা কোথায় করব? এগুলো সামনে এগিয়ে নেয়ার জন্য যে কাজগুলো করতে হবে, সে বিষয়ে সরকারের কোনো রূপরেখা নেই। আমার গবেষণাকে যদি দেশ ও সমাজের কাজে লাগাতে না পারি, তাহলে সেটা তো শুধু কাগজে-কলমে থেকে যাবে। কোনো সুফল পাওয়া যাবে না। সুফল পেতে গেলে সরকারিভাবে অগ্রগতির রূপরেখা, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়—এ তিনটার সমন্বয় করতে হবে। এটা জাতীয় উন্নয়নের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে হতে হবে। বিচ্ছিন্নভাবে একটা-দুইটা কাজ করা যেতে পারে। কিন্তু তা দিয়ে বেশিদূর অগ্রসর হওয়া যাবে না।