১৯৯৬ সালে যে স্বপ্ন নিয়ে ইউএপি যাত্রা শুরু করেছিল, তিন দশকে সেই স্বপ্ন কতটুকু অর্জিত হয়েছে বলে আপনি মনে করেন?
ইউএপি যখন যাত্রা শুরু করে তখন আমাদের স্বপ্ন যা ছিল প্রাপ্তি তার চেয়ে বহুগুণ বেশি। শুরুতে আমাদের অবস্থা ছিল খুব সাধারণ। ভাড়া করা বিল্ডিংয়ে মাত্র তিনজন ছাত্র এবং মাসে খরচ ছিল প্রায় ৯ লাখ টাকা। ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্যরা ছিলেন মূলত সরকারের উচ্চপদস্থ আমলা ও স্বনামধন্য ব্যক্তিরা, যেমন সাবেক কেবিনেট সেক্রেটারি, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর প্রমুখ। উদ্যোক্তাদের মধ্যে আমিই ছিলাম তখন সবচেয়ে তরুণ। শুরুতে আর্থিক চাপ থাকলেও আমরা ধীরে ধীরে এগিয়েছি। তৃতীয় সেমিস্টারে ছাত্রসংখ্যা ১৬০-এ পৌঁছায় এবং তৃতীয় বছরে এসে আমরা ব্রেক-ইভেনে না পৌঁছলেও একটা সন্তোষজনক অবস্থায় আসি।
আজ তিন দশকে আমরা যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, তা আমাদের কল্পনারও বাইরে ছিল। গ্রিন রোডে আমাদের নিজস্ব ক্যাম্পাস এখন দুই লাখ বর্গফুটের বিশাল জায়গাজুড়ে। এটি একটি আর্ট অব স্টেট বিল্ডিং, যা ফাইভ স্টার মানের সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন। ক্লাসরুম, ল্যাব, ফ্লোর, লিফট থেকে শুরু করে ফায়ার সেফটি—কোথাও আমরা আপস করিনি। এখন আমাদের প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো জায়গার সংকুলান, কারণ বছরে প্রায় সাত-নয় হাজার শিক্ষার্থী এখান থেকে বের হচ্ছে। আমি মনে করি, আমরা আমাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী সার্থকভাবেই এগিয়েছি, তবে দেশের চাহিদা অনুযায়ী মানসম্মত শিক্ষার জোগান দিতে আমাদের আরো অনেক দূর যেতে হবে।
আন্তর্জাতিক মান ধরে রাখতে এবং কোয়ালিটি এডুকেশন নিশ্চিত করতে ইউএপি কী ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছে?
ইউএপির মূলমন্ত্রই হলো সংখ্যার চেয়ে মানের দিকে নজর দেয়া। দেশের জব মার্কেটে প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির গ্র্যাজুয়েটরা এখন নেতৃত্ব দিচ্ছে। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, চাকরি ক্ষেত্রে প্রায় ৪৪ শতাংশ অবদান প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির। আমাদের গ্র্যাজুয়েটরা যদি যোগ্য না হতো, তবে তারা বিবিসি, ওয়ার্ল্ড ব্যাংক বা আইএমএফের মতো জায়গায় চাকরি পেত না। উদাহরণস্বরূপ আমাদের ফার্মেসি বিভাগের সুনাম দেশসেরা। আমাদের একজন গ্র্যাজুয়েট ইনসেপ্টাতে ৪৫ হাজার টাকা বেতনে জয়েন করেছে, যেখানে অন্যদের অফার ছিল ৩৫ হাজার। এই বাড়তি ১০ হাজার টাকা মূলত ইউএপির কোয়ালিটির মূল্যায়ন।
মানোন্নয়নের জন্য আমরা এখন পিএইচডি ডিগ্রিধারী শিক্ষকের সংখ্যা বাড়ানোর দিকে জোর দিচ্ছি। আমাদের টার্গেট হলো ৫০-৬০ শতাংশ শিক্ষক যেন পিএইচডিধারী হন। শিক্ষক নিয়োগে আমরা পিএইচডি এবং প্রকাশনা বা রিসার্চকে প্রাধান্য দিচ্ছি। এছাড়া বিশ্বের প্রায় ৩৮টি স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে আমাদের সমঝোতা স্মারক রয়েছে। ইউনেস্কোর ফান্ডিংয়ে আমাদের একটি মাস্টার্স প্রোগ্রাম (এলএলএম) চলছে, যেখানে নেপাল, মালদ্বীপ ও ভারত থেকে শিক্ষার্থীরা পড়তে আসছে। আমরা আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখেই শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছি।
সরকার ইউজিসি বিলুপ্ত করে ‘উচ্চ শিক্ষা কমিশন’ গঠনের খসড়া তৈরি করেছে। এ বিষয়ে প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিগুলোর কিছু উদ্বেগ রয়েছে। বিশেষ করে কমিশন বা সরকারি নীতিমালার ক্ষেত্রে আপনাদের প্রত্যাশা কী?
সরকারের এ খসড়া নীতিমালা নিয়ে আমরা কিছুটা চিন্তিত। আমরা মনে করি, এ নীতিমালা প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির মানোন্নয়নের বদলে বাধার সৃষ্টি করতে পারে। সরকারের ভূমিকা হওয়া উচিত সহায়তাকারীর, নিয়ন্ত্রণকারীর নয়। সরকার হলো মস্তিষ্কের মতো, যা নির্দেশনা দেবে, কিন্তু হাত-পায়ের কাজ করবে না। প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিগুলো মূলত ট্রাস্টের অধীনে পরিচালিত অলাভজনক প্রতিষ্ঠান। এখানকার উদ্যোক্তারা ব্যবসায়িক মানসিকতা থেকে আসেননি, সমাজসেবার মানসিকতা থেকে এসেছেন। সরকার যদি উপাচার্য বা ট্রেজারার নিয়োগের পুরো নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নিয়ে নেয় এবং সেখানে রাজনৈতিক প্রভাব চলে আসে, তবে শিক্ষার মান ধরে রাখা অসম্ভব হবে। আমরা দেখেছি, সরকারি অনেক জুট মিল বা টেক্সটাইল মিল অলাভজনক হয়ে বন্ধ হয়ে গেছে, কিন্তু প্রাইভেট সেক্টর টিকে আছে তাদের দক্ষতার কারণে। তাই প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির পরিচালনায় অতিরিক্ত সরকারি হস্তক্ষেপ বা আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
আরেকটি বিষয় হলো ট্যাক্স। ট্রাস্ট আইনের মূল কথা হলো এটি অলাভজনক, এখান থেকে আমরা কোনো লভ্যাংশ নিই না। আয়ের পুরো টাকাটাই পুনরায় ইউনিভার্সিটির উন্নয়নে বিনিয়োগ করা হয়। অথচ সরকার আমাদের ওপর ১৫ শতাংশ ট্যাক্স আরোপ করেছে, যা স্ববিরোধী। শিক্ষার প্রসারে সরকারের উচিত ছিল আরো প্রণোদনা দেয়া, উল্টো ট্যাক্স আরোপ করে এবং ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করার মতো ঘটনা ঘটিয়ে আমাদের কাজকে বাধাগ্রস্ত করা হচ্ছে। আমরা চাই সরকার এমন আইন করুক, যা এ সেক্টরের সহায়ক হয়।
আন্তর্জাতিকীকরণের যুগে বাংলাদেশের শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ইউএপি তাদের ল্যাব, রিসার্চ বা কারিকুলাম আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে কী পদক্ষেপ নিচ্ছে?
গুণগত শিক্ষা নিশ্চিত করতে অবকাঠামো এবং সাংগঠনিক কাঠামো—দুটোই জরুরি। ইউএপি এই দুই জায়গাতেই শক্ত অবস্থানে আছে। আমরা প্রতি বছর ইনফ্রাস্ট্রাকচারের বাইরেও শুধু গবেষণার জন্য একটি নির্দিষ্ট বাজেট বরাদ্দ রাখি। আমাদের শিক্ষকদের বাধ্যতামূলকভাবে প্রতি বছর আন্তর্জাতিক মানের জার্নালে গবেষণা প্রকাশ করতে হয়। ইউনেস্কোর সঙ্গে কাজ করছি, যা আমাদের শিক্ষার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির প্রমাণ। তবে আরো উন্নতির সুযোগ আছে। ইউজিসি বা সরকারের উচিত নিছক তদারকি বা খবরদারি না করে, কোয়ালিটি অডিট এবং সুপারভিশনে জোর দেয়া। অনেক বিদেশী শিক্ষার্থী ভর্তির আবেদন করে, বিশেষ করে ফার্মেসিতে, কিন্তু আসনস্বল্পতার কারণে আমরা তাদের নিতে পারি না। সঠিক সহায়তা পেলে আমরা বিদেশ থেকেও প্রচুর শিক্ষার্থী আনতে পারতাম।
সরকারের পলিসিগত জায়গা থেকে আপনারা সুনির্দিষ্ট কী ধরনের সহায়তা চান, যা পেলে আরো স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবেন?
প্রথমত, গবেষণা ও শিক্ষার উপকরণের জন্য আন্তর্জাতিক পেমেন্ট গেটওয়ে সহজ করা দরকার। লাইব্রেরির অনলাইন অ্যাকসেস, জার্নাল সাবস্ক্রিপশন বা বিদেশ থেকে রিসোর্স আনতে গেলে পেমেন্ট পাঠানো নিয়ে আমাদের অনেক জটিলতায় পড়তে হয়। প্রক্রিয়াটি সহজ করা দরকার।
দ্বিতীয়ত, দক্ষ জনবলের অভাব পূরণে সহায়তা। অনেক সময় দেশে যোগ্য উপাচার্য বা ডিন পাওয়া যায় না। আমরা যদি বিদেশ থেকে যোগ্য একাডেমিক বা প্রশাসক নিয়ে আসতে চাই, তবে সরকারের পক্ষ থেকে সেই অনুমতি বা প্রক্রিয়া সহজ করা উচিত। সরকার যদি স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে আলোচনা করে তাদের অভিজ্ঞতার আলোকে পলিসি তৈরি করে, তবে এ সেক্টরের অনেক সমস্যার সমাধান হবে।
আগামী দিনগুলোতে ইউনিভার্সিটি নিয়ে আপনার পরিকল্পনা কী?
আমাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বেশ ব্যাপক। প্রথমত, ভৌত অবকাঠামো বাড়ানো। বর্তমানে আমাদের গ্রিন রোড ক্যাম্পাসের ঠিক উল্টো দিকে এক বিঘা জমি নেয়া হয়েছে এবং পাশে আরো কিছু জমি নেয়ার প্রক্রিয়া চলছে। এছাড়া পূর্বাচলে আমরা নয় বিঘা জমি কিনেছি। আমাদের লক্ষ্য আগামী কয়েক বছরের মধ্যে ছাত্র ধারণক্ষমতা ১৫ হাজারে উন্নীত করা।
দ্বিতীয়ত, যুগোপযোগী নতুন বিভাগ চালু করা। আমরা আইটি, এআই (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা), মেকাট্রনিকস, রোবোটিকস এবং ডিজিটাল মাল্টিমিডিয়ার ওপর জোর দিচ্ছি। আমাদের পরিকল্পনা আছে একটি স্বতন্ত্র আইটি ইনস্টিটিউট গড়ে তোলার, যেখানে প্রথাগত ডিগ্রির বাইরে গিয়ে হাতে-কলমে প্রযুক্তিগত শিক্ষা দেয়া হবে।
তৃতীয়ত, আমাদের একটি বড় লক্ষ্য হলো দক্ষ জনশক্তি রফতানি। পূর্বাচলের ক্যাম্পাসে আমরা নার্সিং এবং কেয়ারগিভার ট্রেনিং ইনস্টিটিউট করার পরিকল্পনা করছি। জাপান, জার্মানি ও সুইডেন থেকে আমাদের কাছে প্রস্তাব এসেছে। তারা কারিকুলাম ও কারিগরি সহায়তা দেবে, আমরা ইনফ্রাস্ট্রাকচার দেব। বিশ্ববাজারে, বিশেষ করে ইউরোপ ও জাপানে কেয়ারগিভারের বিশাল চাহিদা রয়েছে। এছাড়া এভিয়েশন সেক্টরেও (যেমন অ্যারোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং, কেবিন ক্রু) কাজ করার সুযোগ আছে। সরকার যদি সহযোগিতা করে এবং আমরা যদি সঠিক পরিবেশ পাই, তবে আমরা গতানুগতিক শিক্ষার বাইরে গিয়ে এমন কিছু বিশেষায়িত ইনস্টিটিউট গড়ে তুলতে চাই, যা দেশের অর্থনীতিতে সরাসরি অবদান রাখবে।










