জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে ৫ আগস্ট ২০২৫ অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ইউনূস বহুল প্রতীক্ষিত জুলাই প্রক্লেমেশন (ঘোষণাপত্র) পাঠ করেন। এ প্রক্লেমেশন উত্থাপিত হওয়ার পর থেকেই ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলছে। এ প্রক্লেমেশন প্রণয়নে প্রাতিষ্ঠানিক রাজনৈতিক দলগুলার বাইরে থাকা সমাজের নানা শ্রেণী-পেশার প্রতিনিধিদের মতামত নেয়া হয়নি বলে এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থান থেকে উত্থিত অনেক সামাজিক রাজনৈতিক গ্রুপের সঙ্গে আলাপ করা হয়নি বলে এমনিতেই জনগণের আকাঙ্ক্ষা ঠিকমতো ধারণ করতে পারবে কিনা, সে ব্যাপারে একটা শঙ্কা ছিল। গণ-অভ্যুত্থানের পরপর এ ঘোষণাপত্র ডিক্লেয়ার করতে পারলে যেভাবে তা জুলাই গণবিপ্লবের জন-আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করতে পারত, এক বছর পর তা থেকে বিচ্যুতি ঘটার সম্ভাবনা তো ছিলই। আবার দীর্ঘ এক বছরে গণ-অভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক দলগুলার নানা বিভেদ অনৈক্য ও দেশী-বিদেশী নানা শক্তির বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের নানা জটিল সমীকরণ হাজির হওয়ায় জুলাই প্রক্লেমেশন যে একটা আপস আর আত্মসমর্পণের দলিল হতে পারে, সে ব্যাপারেও একটা আশঙ্কা ছিল। সংক্ষেপে বলা যায়, ঘোষিত জুলাই ঘোষণাপত্র মূলত আনুষ্ঠানিক ও সরকারিভাবে জুলাই গণবিপ্লবের বিপ্লবী আকাঙ্ক্ষার কবর রচনা করেছে কসমেটিক সংস্কারের কথা বলে। তবে এটি অনিবার্যই ছিল কারণ ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকেই পুরনো সিস্টেম অক্ষত রাখার কৌশল হিসেবে বিদ্যমান ফ্যাসিবাদী মাফিয়া ব্যবস্থার বৈপ্লবিক পরিবর্তনের বদলে সংস্কারের আইডিয়া প্রচার করেছিল দেশের সিভিল সোসাইটি ও কথিত ইন্টেলেকচুয়ালরা। গণ-অভ্যুত্থানের পর তাকে বিপ্লবের দিকে নিতে না দেয়ার একটা ক্ল্যাসিক কৌশল হচ্ছে সংস্কারের আলাপ হাজির করা। আরব বসন্তও একই রকমভাবে ফেল করেছিল। প্রফেসর আসিফ বায়াত আরব স্প্রিংয়ের ব্যর্থতার জন্য দায়ী করেছেন মূলত তিনটি কারণকে—১) আরব স্প্রিংয়ে কোনো বিপ্লবী পার্টি বা ক্যারিশমেটিক নেতা না থাকা, বিপ্লবী আদর্শ না থাকা ও নিওলিবারেল পলিসির কারণে সেখানে সংস্কারবাদী চিন্তার প্রাধান্য, যা রাষ্ট্র কাঠামোর মৌলিক পরিবর্তনকে নস্যাৎ করে দেয় (দেখুন: Revolution without revolutionaries)। এখানে এসে আসিফ বায়াতের সঙ্গে আমি একমত যে সংস্কারের আলাপই মূলত বিপ্লব বেহাত করে দেয়। বাংলাদেশে হাতেগোনা কয়েকজন বুদ্ধিজীবী শুধু বিপ্লবী আলাপ তুলেছেন যে রাষ্ট্র কাঠামোর মৌলিক রূপান্তর ছাড়া জুলাই বিপ্লব বেহাত হবে। কিন্তু সংস্কারবাদী বুদ্ধিজীবীদের কারণে সব বেহাত হতে যাচ্ছে এখন। এমনকি সংস্কারও চান না এখন আর রাজনীতিবিদরা। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে সংস্কারবাদী ধারণাগুলো ডিপ স্টেট ও বিদেশী পরাশক্তি ও আঞ্চলিক শক্তির সঙ্গে যুক্ত কিছু মিডিয়া আউটলেট দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রচার হয়েছে। এ সমন্বিত প্রচেষ্টা কার্যত গণ-অভ্যুত্থানকে একটি সত্যিকারের বিপ্লবী আন্দোলনে পরিণত হওয়া থেকে বাধা দিয়েছে।

পুরনো রাষ্ট্র ব্যবস্থা উচ্ছেদ করে নতুন শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করাই জুলাইয়ের জন-আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু জুলাই ঘোষণাপত্রে তার প্রতিফলন নাই। বরং এ ঘোষণাপত্রের দৃষ্টিভঙ্গি মূলত সংস্কারমুখী—গণতান্ত্রিক নির্বাচন, আইনের শাসন, দুর্নীতি দমন, মানবাধিকার, স্বচ্ছতা এসবই জুলাই ঘোষণাপত্রে রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে (দফা ২৫)। এ নয়া উদারবাদী সংস্কারমুখী চিন্তার প্রধান সমস্যা হচ্ছে এটা নিওলিবারেল যুক্তি (Neoliberal rationality) দিয়ে বৈপ্লবিক চিন্তাধারাকে আটকে দেয়। যেমন বাংলাদেশ যে একটা রিপাবলিক হয়ে ওঠেনি তার প্রধান কারণ: ১) বলপ্রয়োগভিত্তিক ও জনগণকে কন্ট্রোল করার জন্য যেসব ঔপনিবেশিক আইন-কাঠামো (১৮৬১ সালের পুলিশ আইন ও ১৮৯৮ সালের ফৌজদারি কার্যবিধি, ঔপনিবেশিক প্রশাসন, ঔপনিবেশিক আমলাতন্ত্র) ছিল তা আমাদের আইনে ও সংবিধানে অক্ষত রয়ে গেছে ৪৭, ৭১ ও ৯০-এর পরও। ২) ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইন ২০০৩ সালের র‌্যাব বিলের মতো দমনমূলক আইনের মাধ্যমে একটা বলপ্রয়োগভিত্তিক রাষ্ট্রীয়-সার্বভৌমত্বভিত্তিক নিরাপত্তা রাষ্ট্র মডেল (security state) এবং ৩) ‘নির্বাহীপ্রধান-কেন্দ্রিক নির্বাচিত স্বৈরতন্ত্র’, ‘সংসদীয় স্বৈরতন্ত্র’, ‘সংসদীয় লুটতন্ত্র’ ও ব্যবসায়ী-ধনিকদের নিয়ন্ত্রিত মাফিয়া রাজনীতির কাঠামো। ফলে রাষ্ট্র কাঠামোর বৈপ্লবিক পরিবর্তন ছাড়া বাংলাদেশে কোনো গণতান্ত্রিক চর্চা ও নাগরিকদের মানবাধিকার, মর্যাদা সুরক্ষা ও রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। ঔপনিবেশিক আইন-কাঠামো অক্ষত রেখে এবং নিবর্তনমূলক, দমনমূলক আইন চালু রেখে সে আইন প্রয়োগ করে জনগণকে শাসন করাকেও ‘আইনের শাসন’ বলা যায়। ফলে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা আমাদের মুক্তি দেবে না। বরং গণতান্ত্রিক আইন দরকার। আবার সংসদীয় সার্বভৌমত্ব ও রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব-ভিত্তিক সংসদীয় স্বৈরতন্ত্র ও নির্বাচিত নির্বাহীপ্রধান কেন্দ্রিক স্বৈরতন্ত্র চালু রেখে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়া যে সম্ভব নয়, তাও গত কয়েক দশকে প্রমাণ হয়েছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যে গণ-ক্ষমতার প্রকাশ ঘটেছে তার ভিত্তিতে ঔপনিবেশিক-ফ্যাসিস্ট-মাফিয়া সিস্টেমের রক্ষাকবচ আইনগুলো বাতিল/ব্যাপক সংস্কার করে নতুন গণতান্ত্রিক সংবিধান/গঠনতন্ত্র প্রণয়ন করে নতুন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের দিকে যাত্রা করাই ছিল গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী প্রধান রাজনৈতিক কাজ। জুলাই ঘোষণাপত্রের প্রধান ঘোষণাই হওয়া দরকার ছিল নির্বাচিত গণপরিষদ/গণভোটের মাধ্যমে নতুন গণতান্ত্রিক গঠনতন্ত্র/সংবিধান প্রণয়নের ঘোষণা দেয়া। অথচ জুলাই ঘোষণাপত্রে বলা হয়েছে: ‘বর্তমান সংবিধান ও সকল রাষ্ট্রীয় ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের গণতান্ত্রিক সংস্কার সাধনের অভিপ্রায় ব্যক্ত করছে’ (দফা ২২)। ‘সুশাসন ও সুষ্ঠু নির্বাচন...নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে বিদ্যমান সংবিধান ও সকল রাষ্ট্রীয় ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের গণতান্ত্রিক সংস্কার সাধনের অভিপ্রায়’ (দফা ২৫)। ফলে গণ-অভ্যুত্থানের পর নতুন রাষ্ট্র গড়ার জন্য নতুন গণতান্ত্রিক গঠনতন্ত্র প্রণয়ন করে রাষ্ট্রকাঠামোয় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনার যে গণদাবি ছিল তাকে দায়সারা সংস্কারের ঘোষণা দিয়ে ঠেকিয়ে দেয়ার কৌশল নেয়া হয়েছে। জুলাই ঘোষণাপত্রে যে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও সংবিধান সংস্কারের কথা বলা হয়েছে, তার বৈধতাও চাওয়া হয়েছে পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের সংসদের কাছে। ফলে এ প্রক্লেমেশনের নিজেরই বৈধতা নির্ভর করছে পরবর্তী সরকারের ওপর। দুনিয়াজুড়েই যেকোনো গণ-অভ্যুত্থানের বা গণবিপ্লবের প্রক্লেমেশন নিজেই নিজেকে বলবৎ করে। চলমান সংবিধান বা পরবর্তী সরকারের কাছে বৈধতা খোঁজার মানে হচ্ছে এ প্রক্লেমেশন গণ-অভ্যুত্থানে উত্থিত গণক্ষমতাকে অস্বীকার করছে।

যেখানে জুলাই ঘোষণাপত্রে দরকার ছিল অগণতান্ত্রিক কলোনিয়াল মাফিয়া লুটেরা রাষ্ট্র-কাঠামো ও ফ্যাশিস্ট রাষ্ট্র ব্যবস্থার উৎখাতের ঘোষণা দেয়া, সেখানে নিয়মতান্ত্রিক সংস্কারের ঘোষণা দিয়ে পুরনো সিস্টেম ও এস্টাব্লিশমেন্ট অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেয়া হয়েছে। ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের পর ৭২-এর সংবিধানে যে রকম বিদ্যমান ঔপনিবেশিক আইন বজায় রাখা হয়েছে, ৯০-এর গণ-অভ্যুত্থানের পর যেমন সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার কথা বলা হয়েছে, একই রকমভাবে জুলাই ঘোষণাপত্রে ঔপনিবেশিক মাফিয়া লুটেরা কাঠামোর রক্ষাকবচ ফ্যাশিস্ট সংবিধান বাতিল না করে তাতে ‘নিয়মতান্ত্রিক সংস্কার’ করে তা রক্ষার ধারাবাহিকতার কথাই বলা হয়েছে। সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার নামে রাজনৈতিক বন্দোবস্তে গভীরভাবে প্রোথিত কাঠামোগত পরিবর্তন রোধ করা হয়েছে। তাহলে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা বলতে কী বোঝায়? এর অর্থ হলো রাষ্ট্রীয়-সার্বভৌমত্বভিত্তিক নিরাপত্তা রাষ্ট্রের মডেলের ধারাবাহিকতা। এর মানে হলো সংবিধান দ্বারা সমর্থিত ঔপনিবেশিক আইনগুলোর টিকে থাকা। এর মানে সংসদীয়-সার্বভৌমত্বভিত্তিক স্বৈরতন্ত্র ও ব্যবসায়ী-ধনিক-নিয়ন্ত্রিত সংসদীয় লুটতন্ত্রের ধারাবাহিকতা। এর মানে প্রধানমন্ত্রীকেন্দ্রিক নির্বাচিত স্বৈরতন্ত্র অব্যাহত থাকা। গত এক বছরে অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্র, আইন, প্রশাসন ও নিরাপত্তা বাহিনীর ভেতরে থাকা ফ্যাসিবাদী যন্ত্র, কাঠামো ও প্রবণতাগুলো ভেঙে ফেলতে ব্যর্থ হয়েছে। ঔপনিবেশিক প্রশাসন, ঔপনিবেশিক আমলাতন্ত্র ও ঔপনিবেশিক আইন—যেমন ১৮৬১ সালের পুলিশ আইন ও ১৮৯৮ সালের ফৌজদারি কার্যবিধি—অক্ষত রয়েছে। ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইন ও ২০০৩ সালের র‌্যাব বিলের মতো দমনমূলক আইনও বাতিল হয়নি। পুলিশ, ডিজিএফআই ও অন্যান্য নিরাপত্তা সংস্থার ভেতরের দমনমূলক প্রক্রিয়াও রয়ে গেছে। বিভিন্ন কমিশনের প্রস্তাবিত সংস্কার প্রস্তাবগুলো মূলত ওপরের তলায় আঁচড় দেয়ার মতো, বিপ্লবী নয়। রাষ্ট্র কাঠামোয় বৈপ্লবিক পরিবর্তনের বদলে সংস্কারের আইডিয়াই এ ব্যর্থতার প্রধান কারণ। জুলাই ঘোষণাপত্রে সংস্কারের ব্যাপারে নীতিগত সিদ্ধান্ত ঘোষিত হলেও তাতে বিস্তারিত নেই। তবে কী কী সংস্কার করা হবে, তা জুলাই সনদে উল্লেখ থাকবে বলে জানিয়েছেন ঐকমত্য কমিশন। কিন্তু জুলাই সনদ নামে যেসব প্রস্তাব নিয়ে আলাপ হচ্ছে এগুলো আসলে বাংলাদেশের যে ফ্যাসিস্ট-ঔপনিবেশিক-মাফিয়া ক্ষমতা কাঠামো তা অক্ষত রেখে ক্ষমতার নানা কেন্দ্রে হাল্কা চেক অ্যান্ড ব্যালান্সের আলাপ। এগুলাকে জুলাই সনদ কেন বলছেন ইউনূস সরকার? এগুলো, এমনকি ৯০-এর অভ্যুত্থানের পরের সংস্কার প্রস্তাবের মতোই দায়সারা গোছের। জুলাই সনদে থাকা দরকার ছিল, কীভাবে দেশের ফ্যাসিস্টিক-ঔপনিবেশিক-মাফিয়া স্টেট কাঠামো ও কলকব্জাগুলো দূর করা হবে তার রূপরেখা। ফলে জুলাই সনদ আসলে কাজের নয়। এটা পুরনো কাঠামো অক্ষত রাখার একটা কৌশল। মোট ১০ বছরের বেশি একজন প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন না, উচ্চ কক্ষ প্রবর্তন—এ ধরনের কসমেটিক সংস্কার স্বাভাবিক সময়ই করা যায়, তার জন্য জুলাই গণ-অভ্যুত্থান লাগে না। জুলাই ঘোষণাপত্রে বৈষম্য দূর করার ব্যাপারে অঙ্গীকার থাকলেও বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নিওলিবারেল পলিসির আগ্রাসন ও মাফিয়া বিজনেস অলিগার্কদের ক্রনি ক্যাপিটালিজমের হেজিমনি প্রতিহত করে কীভাবে একটা জনকল্যাণমুখী অর্থনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠা করা যায়, সে ব্যাপারে কিছুই বলা হয়নি।

জুলাই প্রক্লেমেশনে ৭৫-এর নভেম্বর অভ্যুত্থানকে ‘সিপাহি জনতার সম্মিলিত বিপ্লব’ বলে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে, অথচ ২৪-এর জুলাইকে গণ-অভ্যুত্থান বলা হয়েছে। জুলাই যদি বিপ্লব না হয়, তাহলে ৭৫-এর নভেম্বর অভ্যুত্থান কীভাবে বিপ্লব হয়? আমার মতে, বাংলাদেশের জুলাই ছিল গণ-বিপ্লবের সব পটেনশিয়াল ধারণ করা একটা গণ-অভ্যুত্থান, যাকে গণতান্ত্রিক বিপ্লবে রূপ দেয়ার জন্য দরকার হচ্ছে চলমান ফ্যাসিবাদী-কলোনিয়াল-মাফিয়া সিস্টেমের উচ্ছেদ করে একটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কাঠামো প্রবর্তন। কিন্তু ফ্যাসিবাদী-কলোনিয়াল-লুটেরা-মাফিয়া সিস্টেমের সব নাট বল্টু ও কলকব্জা অক্ষত রেখে জুলাইকে খালি নির্বাচন, সুশাসন আর আইনের শাসনের মতো সংস্কারবাদী বয়ানে বন্দি করে গণবিরোধী শাসনকাজ পরিচালনা অব্যাহত রাখার পুরনো বন্দোবস্তই পেশ করেছে জুলাই ঘোষণাপত্র। এটা আসলে জুলাইয়ের যে স্পিরিট ও জন-আকাঙ্ক্ষা, তার বিরোধী। এ ঘোষণাপত্র ২৪-এর জুলাইকে ৯০-এর পরিণতির দিকেই নিয়ে যাবে। বাংলাদেশের জনগণের মুক্তির তেমন কিছু নাই এ জুলাই ঘোষণাপত্রে। শোষণ-জুলুম অব্যাহত রাখার ঔপনিবেশিক আমলাতন্ত্র, মাফিয়া বিজনেস অলিগার্ক, মাফিয়া গোয়েন্দা সংস্থা, পার্লামেন্টারি স্বৈরতন্ত্র ও ক্লেপটোক্রেসি, নিবর্তনমূলক আইনকানুন, গণনিপীড়নের হাতিয়ার পুলিশ-আইন, গণসার্বভৌমত্ব-বিবর্জিত এলিট শাসনপ্রণালির সংবিধান, নাগরিক অধিকারহীন রাষ্ট্রকাঠামো বাতিল করে একটি গণতান্ত্রিক গঠনতন্ত্র তৈরির রূপরেখা দরকার ছিল আমাদের, এসবের কিছুই নাই জুলাই ঘোষণাপত্রে। এসব না করে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যের ভিত্তিতে হালকা সংস্কারের যে জুলাই ঘোষণাপত্র দেয়া হলো, তা জুলাই গণবিপ্লবের প্রতি সবচেয়ে বড় অবিচার।

একটি গণ-অভ্যুত্থান বা গণবিপ্লবের ঘোষণাপত্র ঘোষণা করে যে গণ-অভ্যুত্থান সরকারের বৈধতা জনগণের শক্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত, যা সে অভ্যুত্থানের মাধ্যমে প্রকাশ হয়। কিন্তু অধ্যাপক ইউনূস ঘোষিত জুলাইয়ের ঘোষণাপত্র এ মূলনীতি উল্লেখ করতেই ব্যর্থ হয়েছে। বরং এটি বর্তমান সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদ থেকে বৈধতা পাওয়ার চেষ্টা করেছে। জুলাই ঘোষণাপত্র নতুন নির্বাচিত সংসদ থেকেও বৈধতা চায়। এমনকি এটি তার সংস্কারের অনুমোদনও নতুন সংসদের কাছ থেকে চায়। রাজনৈতিক বিজ্ঞান ও বিপ্লব বা গণ-অভ্যুত্থানবিষয়ক সাহিত্য অনুযায়ী যেখানে জনগণের সমষ্টিগত ইচ্ছা ও সার্বভৌম প্রকাশ একটি নতুন সংবিধান প্রণয়ন কিংবা সাংবিধানিক সংস্কারের বৈধ ভিত্তি, সেখানে জুলাই ঘোষণাপত্র তা অস্বীকার করেছে এবং নতুন নির্বাচিত সংসদ থেকে বৈধতা নিতে চাচ্ছে। আমি মনে করি, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের থিংক ট্যাংকরা ঘোষণাপত্র কী, তার ধারণা ও মর্ম বোঝেন না। তারা বিভ্রান্ত ও কার্যত জুলাই গণ-অভ্যুত্থান সরকার ও তার কর্মকাণ্ডের বৈধতা ভবিষ্যৎ সংসদের হাতে তুলে দিয়েছে। একটি ঘোষণাপত্র কীভাবে একটি গণ-অভ্যুত্থান ও তার কার্যকলাপের বৈধতা এমন একটি সংবিধান থেকে চাইতে পারে, যখন সে গণ-অভ্যুত্থানই ছিল সাংবিধানিক ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে? এটি কি আত্মবিরোধী নয়? এ ঘোষণাপত্র সংসদকে গণ-অভ্যুত্থানে প্রকাশিত জনগণের সম্মিলিত ইচ্ছার চেয়ে বেশি সার্বভৌম বিবেচনা করছে। আধুনিক গণতন্ত্র অনুযায়ী ‘সংসদীয় সার্বভৌমত্ব’ অবৈধ ও অগণতান্ত্রিক। বরং সার্বভৌমত্ব হওয়া উচিত জনগণের। তাই জনগণের দ্বারা নির্বাচিত একটি গণপরিষদই হওয়া উচিত নতুন সংবিধান প্রণয়ন বা বড় ধরনের পরিবর্তনের দায়িত্বপ্রাপ্ত, শুধু সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নয়। সংবিধান হলো একটি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক ও আইনি দলিল, সংসদ নয়। সংসদের কাজ হলো সংবিধানের ভিত্তিতে আইন প্রণয়ন করা, সংবিধান তৈরি বা বড় ধরনের পরিবর্তন নয়। আমি মনে করি, আমাদের একটি নতুন গণতান্ত্রিক সংবিধান প্রয়োজন, যা সংসদীয় সার্বভৌমত্বভিত্তিক সংসদীয় স্বৈরতন্ত্র, সংসদীয় লুটপাটতন্ত্র ও নির্বাহী প্রধানকেন্দ্রিক স্বৈরতন্ত্রকে উৎখাত করতে পারে এবং ঔপনিবেশিক দমনমূলক আইন ও ব্যবস্থাকে উৎখাত করতে পারে। কিন্তু জুলাই ঘোষণাপত্র কেবল সাংবিধানিক সংস্কারের কথা বলে এবং সাংবিধানিক ধারাবাহিকতাকে সমর্থন করে—যা এটিকে একটি দুর্বল ঘোষণাপত্র করে তোলে যে ঘোষণাপত্র পুরনো ব্যবস্থা ও কাঠামো সংরক্ষণকেই নিশ্চিত করে। সংবিধান প্রণয়ন ও সংশোধন কোনোটাই নির্বাচিত সাংসদদের হাতে থাকা উচিত নয়। আধুনিক গণতান্ত্রিক কাঠামোয় সংবিধান প্রণয়ন ও সংশোধন উভয়ের জন্যই আলাদা নির্বাচিত সংবিধান সভা (Constituent assembly) লাগে। এই যে সংবিধান সংশোধনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে নির্বাচিত সাংসদদের এখতিয়ার হিসেবে রাখা হয়েছে বাংলাদেশে আইনি ও রাজনৈতিক কাঠামোয় এটাকেই বলা যায়, পার্লামেন্টারি সার্বভৌমত্বভিত্তিক পার্লামেন্টারি স্বৈরতন্ত্র। সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ ভোটের জোরে এ দেশের সংবিধান সংশোধন এতবার করা হয়েছে যে তাতে সংবিধান আর আগের ফর্মেও নাই। একটা নতুন সংবিধান প্রণয়নের পর এর সংশোধন কঠিন করে দিতে হবে, যেমন উভয় কক্ষের অনুমোদন প্লাস গণভোটের বিধান যুক্ত করতে হবে অথবা নতুন সংবিধান সভা ছাড়া সংশোধন করা যাবে না, এটা থাকতে হবে।

গণ-অভ্যুত্থান বা গণবিপ্লবের সরকারকে বিদ্যমান গণবিরোধী মৌলিক কাঠামো পরিবর্তন করতে হয়। দুনিয়াজুড়েই গণ-অভ্যুত্থানের সরকারই এ কাজ করার নজির বেশি। কিন্তু জুলাই ঘোষণাপত্র প্রস্তাবিত বা প্রতিশ্রুত সাংবিধানিক সংস্কার এবং অন্যান্য রাষ্ট্রীয় প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার বাস্তবায়নের ভার পরবর্তী নির্বাচিত সংসদ ও নির্বাচিত সরকারের ওপর অর্পণ করায় এসব সংস্কার বাস্তবায়ন না হওয়ার ঝুঁকি রয়ে যাবে। কেননা বাংলাদেশের নির্বাচিত সরকারগুলো বার বার তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেনি। পরবর্তী দুই বছরের মাঝে সংস্কারকাজ বাস্তবায়ন করতে হবে এ ক্লজ উল্লেখ করে জুলাই সনদকে বাস্তবায়ন না হওয়ার ঝুঁকির মুখে ফেলে দেয়া হয়েছে। নব্বইয়ের নাগরিক অভ্যুত্থানের পরও চার জোটের যেসব সংস্কার প্রস্তাব ছিল তা বাস্তবায়ন হয়নি। যেমন সব মৌলিক অধিকারবিরোধী আইন বাতিল করা হবে, এ প্রস্তাব ছিল নব্বইয়ের সংস্কার প্রস্তাবে, কিন্তু সেটা বাস্তবায়ন করেনি নির্বাচিত সরকার। অর্থাৎ জুলাই ঘোষণাপত্র ও জুলাই সনদকে লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক অর্ডারের (এলএফও) মতো কোনো অধ্যাদেশ কিংবা গণভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় আইনের অন্তর্ভুক্ত না করে পরবর্তী সংসদ ও সরকারের কাছে তার বৈধতা ও বাস্তবায়নের জন্য রেখে দেয়াতে এসব কসমেটিক সংস্কারও কতটুকু বাস্তবায়ন হবে সে আশঙ্কা রয়ে যায়।

নব্বইয়ের মতো জুলাই প্রক্লেমেশনে আবার পুরনো কাঠামোই রেখে দেয়া হয়েছে। ৯০ এর মতো আবারো সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার অজুহাতে পুরনো সংবিধানে হাল্কা সংস্কার করে পুরনো রাজনৈতিক বন্দোবস্তই অক্ষত রাখার ঘোষণা দেয়া হইল। এখনকার যেই রাজনৈতিক সংকটগুলা মানে গণসার্বভৌমত্বহীন রাষ্ট্রীয়/পার্লামেন্টারি সার্বভৌমত্ব, পার্লামেন্টারি স্বৈরতন্ত্র, প্রধানমন্ত্রীকেন্দ্রিক নির্বাচিত স্বৈরতন্ত্র, সংসদীয় লুটপাটতন্ত্র, মাফিয়াঅলিগারকদের দ্বারা সংসদীয় দখলদারিত্ব, ঔপনিবেশিক গণনিপীড়নকারী আইন এবং প্রশাসন কাঠামো এই সবকিছুই পুরনো সংবিধানের ক্ষমতাকাঠামো প্রেসক্রাইব করার পরও এ সংবিধান বাতিল না করে তার কাছেই জুলাইয়ের গণক্ষমতাকে বিসর্জন দেয়া হয়েছে। জুলাইয়ের কোনো জন-আকাঙ্ক্ষাই হাল্কা কসমেটিক সংস্কারে বাস্তবায়নযোগ্য নয়, দরকার হচ্ছে নতুন গণতান্ত্রিক গঠনতন্ত্র প্রণয়ন। এভাবেই জুলাই ঘোষণাপত্র রক্তাক্ত গণ-অভ্যুত্থানের পরিবর্তনকামী আকাঙ্ক্ষাকে নস্যাৎ করে একে বড়জোর ‘সংস্কারমুখী রেজিম চেঞ্জ’-এ পর্যবসিত করছে।

ড. যোবায়ের আল মাহমুদ: সমাজ ও রাজনীতি বিশ্লেষক এবং সহযোগী অধ্যাপক, ফার্মেসি অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়